লেখা তরজমা

উমর ইবনে খাত্তাব (রাঃ)

উমর ইবনে খাত্তাব (রাঃ) – তাওফীক মোবারক

অনুবাদ - সাজ্জাদুর রহমান 

তার পুরো নাম হচ্ছে উমর ইবনে খাত্তাব ইবনে নুফায়েল ইবনে আব্দুল উজ্জা। আবরাহার হাতি বাহিনী আগমনের ত্রিশ বছর পর আনুমানিক ৫৮৩ খ্রিষ্টাব্দে মক্কার কুরাইশ বংশের অন্তর্গত আদি গোত্রে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। রাসূল (সাঃ) আবরাহার হাতি বাহিনী আগমনের পরের বছরে জন্মগ্রহণ করেন। তার বংশধারা উর্ধ্বতন নবম পুরুষ ‘কা’ব ইবনে লুবাই ইবনে গালিব’ থেকে মুহাম্মাদ (সাঃ) এর সাথে মিলে যায়। তার মেয়ে হাফসা (রাঃ) উম্মাহাতুল মুমিনিনদের একজন হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেন। এই সম্পর্কে তিনি রাসূল (সাঃ) এর শ্বশুরও হন। তার উপনাম ছিল ‘আবু হাফস’। সাধারণত প্রথম সন্তানের নামের সাথে মিলিয়েই উপনাম হত। তার মা ‘হানতামা বিনতে হাশিম’, সম্পর্কে আবু জাহল ইবনে হিশামের পিতৃব্য আত্মীয়া। আবু জাহল ইসলামের বড় দুশমনদের একজন ছিলেন।

তার দাদা নুফায়েল ইবনে আব্দুল উজ্জা বিচারিক দক্ষতা এবং পরামর্শিক প্রজ্ঞার জন্য বিখ্যাত ছিলেন। ধারাবাহিকতায় তিনিও জ্ঞান এবং পর্যাপ্ত শিক্ষার সুযোগ সমৃদ্ধ এক বিশিষ্ট পরিবারে জন্মেছিলেন। এই তাড়নাতেই পরবর্তীতে তিনি জ্ঞানানুসন্ধানে ব্যাপৃত হন। জাহেলী যুগের আরবে অল্পসংখ্যক মানুষ যারা লিখতে এবং পড়তে জানতেন তন্মধ্যে তিনিও একজন ছিলেন। কবিতার জন্য তার বিশেষ আগ্রহ ছিল। তিনি ইসলামী এবং ইসলামপূর্ব যুগের বহু কবিতা মুখস্থ করেছিলেন। কথায়-বক্তৃতায় মাঝেমাঝেই সেগুলো থেকে তিনি উদ্ধৃত করতেন। তিনি অসাধারণ বাগ্মী ছিলেন। তার বক্তব্য হত স্পষ্ট, উৎসাহব্যঞ্জক, প্রজ্ঞাপূর্ণ এবং সহনশীল। এরকম বিবিধ গুণাবলীর কারণে কুরাইশগণ তাঁকে প্রতিনিধি হিসেবে বাছাই করেছিল। এখান থেকে গোত্রের মাঝে তার বিশিষ্টতা এবং আধিপত্যের ব্যাপারেও সুন্দর ধারণা পাওয়া যায়।

তার বাবা খাত্তাব ছিলেন রূঢ় আচরণের অধিকারী। তাঁকে পরিবারের পশুপাল দেখাশোনা করা এবং জ্বালানী সংগ্রহে সাহায্য করতে হত। একই কাজগুলোই তাঁকে করতে হত খালাদের জন্যও। অর্ধজাহানের খলীফা হওয়ার পরেও তিনি এসবের স্মৃতিচারণ করতেন। একদিন তিনি বলছিলেন, “যখন আমি বনু মাখযুম গোত্রের পশুপাল চড়িয়ে খালার কাছে ফিরতাম তখন তিনি আমাকে পারিশ্রমিক হিসেবে মুঠোভর্তি খেজুর এবং কিসমিস দিতেন। সেগুলো খেয়েই আমাকে সারাদিন কাটাতে হত!” তারপর আব্দুর রহমান ইবনে আউফ (রাঃ) তাঁকে জিগেস করেছিলেন, “কেন তিনি লোকেদের সামনে নিজেকে এভাবে ছোট করে দেখাচ্ছেন?” উত্তর এসেছিল, “যখন আমার মনে গর্ব এবং অহংকার ভাব উদ্বোলিত হয় তখন এভাবেই এসব থেকে বেঁচে থাকি, এগুলো আমাকে অতীতের কথা মনে করিয়ে দেয়”। কি অসাধারণই না ছিল খলীফা উমর (রাঃ) এর ব্যক্তিত্ব!

ইসলামের প্রথম দিনগুলোতে তিনি ছিলেন অন্যতম সরব প্রতিপক্ষ। অন্যান্য কুরাইশ নেতাদের মত তিনিও নব্য ইসলামগ্রহণকারীদের উপর জুলুম করতেন। উম্মু আব্দুল্লাহ বিনতে হানতামা আবিসিনিয়ায় হিজরত করার সময়ের একটি ঘটনা উল্লেখ করেন। তখন উমর তা জানতে পেরে এসে জিগেস করেছিলেন, “কেন সে হিজরত করছে?” তিনি বলেছিলেন, “তার এবং অন্যান্য মুসলিমদের উপর অকথ্য নির্যাতনের মুখে টিকতে না পেরে”। উমর এই কথার দ্বারা কষ্ট অনুভব করলেও নব্য মুসলিমদের প্রতি তার ব্যবহার পরিবর্তন করেনি। কেননা এর কিছুদিন পরেই কুরাইশ নেতাদের সাথে এক বৈঠকের পর তিনি মুহাম্মাদ (সাঃ) কে হত্যার জন্য প্রস্তুত হন। উদ্দেশ্য পূরণ করতে তিনি দারুল আরকামের দিকে রওনা হন, যেখানে রাসূল (সাঃ) তার সাহাবীদের দারস দিতেন এবং প্রয়োজনে থাকতেন। পথে তিনি নুয়াইম ইবনে আব্দুল্লাহ (রাঃ) এর দেখা পান যে তাঁকে থামাতে চেষ্টা করে। বাকবিতণ্ডার একপর্যায়ে উমর জানতে পারে তার বোন এবং বোনজামাইও ইসলামকে বরণ করেছে। রাগে অগ্নিশর্মা উমর হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে আগে বোনের বাড়ির দিকেই যাত্রা করেন। বাড়ির সামনে গিয়ে শুনতে পান ভেতর থেকে ভেসে আসছে সুমধুর তেলাওয়াতের সুর! ধরে ফেলেন সুরটি হচ্ছে পবিত্র কুরআনের। ক্রোধের পারদ চরমে পৌঁছে, বোনের গায়ে হাত তুলে রক্তাক্ত করেন, অবশেষে হুশ ফিরে। অনুশোচনায় দগ্ধ হন, জানতে চান এতক্ষণ তারা কি পড়ছিল। বোন অস্বীকৃতি জানায়, পবিত্রতা ছাড়া এ কালাম ধরা যে বারণ! ওযু করে উমর এসে কুরআনের পাণ্ডুলিপিটি হাতে নেয়, সূরা ত্বহার কতিপয় আয়াত সেখানে লেখা ছিল। যেন এক নতুন উমর জন্ম নিল! খাব্বাব (রাঃ) এর পরামর্শে তখনি ছুটে গেলেন দারুল আরকামে, হাতে উদ্ধত তরবারী! দূর থেকে হামজা (রাঃ) তা দেখতে পেয়ে হুঙ্কার ছাড়েন “আজ উমরকে তার তরবারী দিয়েই হত্যা করা হবে যদি সে বদুদ্দেশ্যে এসে থাকে!” নাঙ্গা তলোয়ার নবীর দরবারে এসে খসে পড়ে! উমরের তরবারী দিক পরিবর্তন করে এবার কাফেরদের দিকে ধাবিত হয়।

আল্লাহর রাসূল তার ইসলাম গ্রহণের জন্য বিশেষভাবে দোয়া করেছিলেন। তিনি ছিলেন চল্লিশতম মুসলমান। রাসূল আল্লাহর কাছে বলেছিলেন, “হে আল্লাহ্‌! আবু জাহল ইবনে হিশাম অথবা উমর ইবনে খাত্তাব এর মাঝে যেকোনো একজনকে তোমার জন্য কবুল করে ইসলামকে শক্তিশালী করো”। আল্লাহ্‌ উমর (রাঃ) কে মকবুল বান্দাদের কাতারে নামিয়েছিলেন। তার ইসলাম গ্রহণ ছিল মুসলিমদের প্রকাশ্যে আসার দিন। ইসলামের সুসত্য এবং সুমহান দাওয়াতকে তিনি প্রকাশ্যে ছড়িয়ে দিতে সবাইকে নিয়ে বেড়িয়ে পড়েছিলেন মক্কার অলিগলিতে। তার সাহসিকতা এবং নেতৃত্বের দক্ষতা নবীকে মুগ্ধ করেছিল, তাই উপাধি পেলেন “ফারুক”। ফারুক অর্থ সত্য এবং মিথ্যার মাঝে পার্থক্যকারী।

রাসূল (সাঃ) থেকে সরাসরিই তিনি ইসলামী জ্ঞান আহরণ করেছেন। তিনি ছিলেন অন্যতম নিকটতম সাহাবী। অন্যান্য সাহাবীদের মত তিনি শুধু জেনে এবং তা ছড়িয়ে দিয়েই ক্ষান্ত হতেন না বরং তিনি প্রশ্ন করতেন। বিভিন্ন পরিস্থিতিতে তার বুঝে আসা ব্যাখ্যাটাও (ইজতিহাদ) তিনি রাসূলকে শুনাতেন। এমনকি কিছু আয়াতও নাযিল হয়েছে তার ভাষ্যগুলোকে সত্য প্রমাণ করে। সহীহ বুখারীতে এসেছে,

“উমর (রাঃ) বলেন, ‘তিনটি বিষয়ে আল্লাহ্‌র বক্তব্যের সাথে আমার ভাষ্য অলৌকিকভাবে মিলে গিয়েছিল। যেমন, আমি একবার বলেছিলাম হে আল্লাহর রাসূল! কেনো আপনি মাকামে ইবরাহীমে (ইবরাহীম আঃ যার উপর দাঁড়িয়ে কাবা নির্মাণ করেছিলেন) নামাজ পড়ছেন না? অতঃপর আল্লাহ্‌ এটি নিয়ে আয়াত পাঠান। আমি আরেকবার বলেছিলাম, হে আল্লাহর রাসূল! আপনার সাথে সৎ এবং অনৈতিক লোক সবাই দেখা করতে আসে। কেনো আপনি স্বীয় স্ত্রীদেরকে পর্দার আদেশ দিচ্ছেন না? অতঃপর আল্লাহ্‌ পর্দার বিধান সংক্রান্ত আয়াত দিলেন। আরেকবার আমি শুনেছিলাম রাসূল তার কয়েকজন স্ত্রীর সাথে কোনো ব্যাপারে রাগান্বিত হয়েছেন। আমি তাদের কাছে গিয়ে বললাম, ‘হয় তোমরা চুপ হবে নচেৎ আল্লাহ্‌ তার নবীকে আরো উত্তম স্ত্রী দিবেন!’ অতঃপর আল্লাহ্‌ সূরা তাহরীমের ০৫ নং আয়াত নাযিল করলেন”[2]

প্রসঙ্গত আরেকটি উদাহরণও আছে। মুনাফিক আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই মারা গেলে রাসূল (সাঃ) তার জানাযা পড়ানোর জন্য উদ্যত হন। তখন উমর (রাঃ) এগিয়ে গিয়ে তাঁকে বাঁধা দেন। তারপরও তিনি মুচকি হাসি দিয়ে এগিয়ে যান এবং জানাযা পড়ান। পরবর্তীতে পবিত্র কুরআনের ০৯ নং সূরার ৮৪ নং আয়াত নাযিল হয়। সেখানে রাসূলকে নিষেধ করা কোনো মুনাফিকের জন্য জানাযা পড়তে এবং তাদের কবরের পাশে দোয়া করতে।

এই দিকগুলো রাসূল (সাঃ) এর একটি ভাষ্যকে সমর্থন করে। “তোমাদের আগের উম্মতের মধ্যে অনেক মুহাদ্দাস (যার ক্বলবে সত্য কথা অবতীর্ণ হয়) ব্যক্তি ছিলেন। আমার উম্মতের মধ্যে যদি কেউ মুহাদ্দাস হয় তবে সে হচ্ছে ‘উমর’[4]। তাত্ত্বিক ইবনে হাজার আসকালানী[5] ‘মুহাদ্দাস’ শব্দটির কিছু দিক বলেছেন। এসবের যেকোনো একটি যার মাঝে থাকবে সে মুহাদ্দাস হবে। ১/ অনুপ্রাণিত ব্যক্তি, ২/ স্বতঃস্ফূর্তভাবে সত্য বলে এমন ব্যক্তি, ৩/ নবী না হওয়ার পরেও যার সাথে ফেরেশতারা কথা বলে এবং ৪/ যার অন্তর্দৃষ্টি রয়েছে[6]। উমরের মন্তব্য এবং সেসবের সাথে কুরআনের সম্মতি দিয়ে বুঝাই যায় যে তিনি একজন মুহাদ্দাস ছিলেন। এই মৌলিক গুণটি তাকে রাসূলের আরো কাছে নিয়েছিল। যা তাকে দিয়েছিল অন্যদের চেয়ে অধিক এবং অতুলনীয় এক সম্মান।

রাসূলের অন্তর্ধানের পর সর্বসম্মতিতে মুসলিম উম্মাহর দায়িত্ব এসেছিল আবু বকর (রাঃ) এর কাঁধে। মারা যাওয়ার আগে তিনি বিশিষ্ট সাহাবাদের সাথে পরামর্শ করে ওসিয়ত করে যান উমর (রাঃ) এর খেলাফতের। তবে মুসলিম উম্মাহর উপর উমরের নেতৃত্ব আসবে তা ছিল রাসূলেরই একটি ভবিষ্যদ্বাণী। তার বিভিন্ন বক্তব্যেই এর ঈঙ্গিত পাওয়া যায়। সহীহ মুসলিমে এক বর্ণনায় এসেছে, “নবী বলেন, ‘আমি স্বপ্নে দেখলাম কুয়া থেকে বালতি দিয়ে পানি তুলছি। তারপর আবু বকর এল, সেও এক-দুই বালতি পানি তুলল। তারপর উমর এসে বালতিটি নিল এবং সেটি বৃহদাকার হল! মানুষের মাঝে আমি কাউকে এতটা শক্তিশালী দেখিনি! সে তা দিয়ে পানি তোলার পর সবাই ভরপেট পান করল এবং সেখানে যত উট ছিল সবার উদরভর্তিও হল।[7]

হাদীসটি থেকে আমরা রাসূল পরবর্তী মুসলিম নেতৃত্ব নিয়ে একটি পূর্বাভাস পাই। আরো বুঝা যায় যে, উমরের নেতৃত্বে মুসলিম জাহান অধিক সমৃদ্ধির সামনে দাঁড়াবে, শক্তিশালী হবে। বালতি বড় হয়ে যাওয়া এবং তা থেকে মানুষ এবং উটপালের পরিতৃপ্ত হওয়াটা এরকমই অর্থ দেয়। এই ভবিতব্য সত্য হয়েছিল আমরা জানি। তার খেলাফতকালে ইসলামী সভ্যতা ছড়িয়েছিল অর্ধবিশ্বে। আদালত, হিকমত, সাহসিকতা এবং ধার্মিকতাকে ভিত্তি তিনি শাসনব্যবস্থাকে নতুন রূপ দিয়েছিলেন। তিনিই প্রথম মুসলিম শাসক যাকে “আমিরুল মুমিনিন” বলে ডাকা হয়েছিল।

একজন নেতৃস্থানীয় সাহাবী হিসেবে ইসলামী সভ্যতায় তার অবদান অবিস্মরণীয়। তার প্রজ্ঞা, দূরদৃষ্টি, পথনির্দেশনা, আদালত, ন্যায়পরায়ণতা এবং আন্তরিকতা তাকে এই সভ্যতার অন্যতম প্রাণপুরুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। কিছু উদাহরণের মাধ্যমেই তা পরিষ্কার হবে।

১/ ইয়ামামার যুদ্ধে সত্তর জন হাফেজে কুরআন শাহাদাত বরণ করলে মুসলিম মানসে একটি সংকট দেখা দেয়। আবু বকর (রাঃ) ছিলেন তখন খলীফা। উমর (রাঃ) এর পরামর্শে তিনি তখন কুরআন সংকলনের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। যা ছিল ইতিহাসে প্রথম।

২/ নিজ খেলাফতকালে তিনি মদীনাকে পরিণত করেন ফিকহশাস্ত্রের পুণ্যভূমি হিসেবে। যাকে বলা যায় সেন্টার অব ফতোয়া এবং ফিকহ। যেসব সাহাবাগণ এতদবিষয়ে অভিজ্ঞ ছিলেন তাদেরকে তিনি মদীনায় তার নিকটে রাখেন। তন্মধ্যেও কিছু সাহাবাকে তিনি খেলাফতের বিভিন্ন প্রান্তে পাঠান যেন লোকেরা ইসলামকে সঠিকরূপে জানতে এবং বুঝতে পারে। আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউ’দ, হুযায়ফা ইবনে ইয়ামান, আম্মার ইবনে ইয়াসির, ইমরান ইবনে হুসাইন এবং সালমান ফারসী (রাদিয়াল্লহু আনহুমা) কে ইরাকে পাঠান। একইভাবে মুয়ায ইবনে জাবাল, উবাদা ইবনে সামিত, আবু দারদা, বিলাল ইবনে রাবাহ সহ আরো কয়েকজনকে সিরিয়ায় পাঠান। তারা সেসব স্থানে গিয়ে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেন। ধীরে ধীরে দামেস্ক এবং কুদস (ফিলিস্তিন) হয়ে উঠেছিল শিক্ষাঙ্গনের প্রধান কেন্দ্র। খলীফা হিসেবে দূরে পাঠানো শিক্ষকদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ এবং সার্বিক রক্ষণাবেক্ষণও করতেন। গবেষণাসংক্রান্ত তথ্য আদান-প্রদানও হত তাদের মাঝে।

৩/ মক্কা, বসরা, কুফা এবং সিরিয়াতে স্থাপিত ফিকহের বিখ্যাত প্রতিষ্ঠানগুলো তৈরির পিছনে তার ছিল প্রত্যক্ষ প্রভাব। উদাহরণস্বরূপ আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) এর কথা বলা যায়। তাকে বিশেষভাবে মক্কার ফিকহ স্কুলের ভবিষ্যতের নেতৃত্বের জন্য তৈরি করা হয়েছিল। বিভিন্ন পরামর্শ কাউন্সিলে তাকে রাখা হত আর এভাবেই তাকে গড়ে তুলা হয় একজন প্রখ্যাত মুফাসসির হিসেবে। ধারাবাহিকতায় আবু মূসা আশয়ারী এবং আনাস ইবনে মালেক (রাদিয়াল্লহু আনহুমা) দের কথাও আসবে। তারা বসরায় শিক্ষাদানে ব্যাপক কাজ করেছেন। মদীনায় থাকাকালীন তারা উমরের খুব কাছের সঙ্গী ছিলেন। একইভাবে আমর ইবনে আস (রাঃ) এবং তার ছেলেদের মিশরে পাঠানো হয়। মিশরের এই দলে আব্দুল্লাহ ইবনে উকবাও ছিলেন। কাল পরিক্রমায় তারা হয়ে উঠেছিলেন মিশরের শিক্ষাবিস্তারের অগ্রপথিক, স্বনামধন্য তাত্ত্বিক।

৪/ তিনি সৈন্যদের কথাও বিবেচনায় রাখতেন। যুদ্ধের কঠিন মূহুর্তে এবং পরেও যেন তারা আল্লাহ্‌ ও তার রাসূলের দেখানো পথ হতে দূরে সরে না যায় তার খেয়াল রাখতেন। তাদের নিকটেও পাঠানো হত শিক্ষক এবং তাত্ত্বিকদের।

৫/ “কিয়াস” এর প্রচলনে তিনি বেশ ভূমিকা রাখেন। কুরআন এবং হাদিসে যে বিষয়গুলো নিয়ে অস্পষ্ট নির্দেশনা থাকত সেসবকে পরিষ্কার এবং বোধগম্য করে তিনি গভর্ণর ও বিচারকদের চিঠি লিখতেন, পরামর্শ দিতেন। তার লিখিত ‘কিয়াস’গুলি নিয়ে দুই খণ্ডের একটি বইও রচিত হয়। “মুহাম্মাদ রাওয়াস কালাজি রচনা করেন মাওসুয়াতুল ফিকহে ‘উমর বিন খাত্তাব’” বা দ্যা এনসাইক্লোপিডিয়া অব উমর ইবনে খাত্তাব’স জুরিসপ্রুডেন্স। নিঃসন্দেহে এটি একটি বিরাট অবদানমূলক কাজ।

৬/ রমজান মাসে তারাবিহ এর নামাজ জামায়াতে আদায়ের প্রচলন তিনিই করেন।

তিনি দীর্ঘসময় খলীফা ছিলেন। প্রশাসনিক বিভিন্ন দিকেও তিনি বেশকিছু জিনিস প্রচলন করেন। প্রশাসনিক সুবিধার্থে, পুরো মুসলিম জাহানকে এক আদেশের অধীনে আবদ্ধ রাখতে তার গৃহীত বেশকিছু কার্যক্রম অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

৭/ হিজরী সাল গনণা তার সময়কাল থেকেই শুরু হয়। এই সাল প্রচলের ফলে অনেক কাজই সহজ হয়েছিল। মুসলিম্রা পেয়েছিল নিজস্ব দিনপঞ্জি। এর আগে তাদের নির্ভর করতে হত পার্শ্ববর্তী রাজ্যসমূহের দিনপঞ্জির উপর অথবা অনিয়মিত জিনিস দিয়ে তারিখ মনে রেখে। যেমন, রাসূলের জন্মের বছরকে বলা হত হস্তী আগমনের বছর। এই হিজরী সাল শুরু হয়েছিল রাসূলের হিজরতের বছর থেকে।

৮/ তিনি ‘বায়তুল মাল’ এর শুরু করেন। এটাকে বলা যায় ‘পাবলিক ট্রেজারি’। এখান থেকে জনকল্যাণমূলক দান, গরীবদের জন্য সাহায্য এবং সরকারী কর্মচারীদের বেতন-ভাতা সরবরাহ করা হত। রাসূল (সাঃ) এবং আবু বকর (রাঃ) এর জামানায় ইসলামী রাষ্ট্রের আয়তন ছিল খুবই ছোট। তাই যা সম্পদ আহরণ হত তা সবার মাঝেই তাৎক্ষণিক সুষম বণ্টন হত, কুরআনের ভাষ্যনুযায়ী। যখন ধীরে ধীরে আঞ্চলিক বিস্তৃতি ঘটল তখন এই অর্থব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণের জন্য সুষ্ঠু এবং কার্যকরী উপায়ের প্রয়োজন দেখা দিল। এখান থেকে ইসলামী রাষ্ট্রের গরীব অমুসলিম অধিবাসীদেরকেও ভাতা দেওয়া হত।

৯/ তিনি সরকারব্যবস্থাকেও বেশ গুছালো করেন। তিনি বিচারিক আদালত, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন সরকারী কার্যক্রমের জন্য বিভাগ তৈরি করেন। বাজার নিয়ন্ত্রণের জন্যও তার আলাদা বিভাগ ছিল এবং এর দায়িত্ব পেয়েছিলেন একজন মহিলা সাহাবী।

১০/ তিনি বিচারক, শিক্ষক, সৈন্য, সরকারী কর্মচারী এবং গভর্ণরদের নির্দিষ্ট বেতনকাঠামোর আওতায় আনেন।

১১/ তিনি গভর্ণরসহ সরকারী কর্মকর্তাদের দূর্নীতি, দূর্ব্যবহার, দায়িত্বে অবহেলা ইত্যাদির ব্যাপারে বেজায় সতর্ক ছিলেন। জনগন যেন নির্বিঘ্নে অভিযোগ দায়ের করতে পারে তাই আলাদা গণবিভাগও ছিল।

১২/ ইসলামী অঞ্চলে তিনিই সর্বপ্রথম খারাজ বা ভূমি ট্যাক্সের ধারণা নিয়ে আসেন। ইসলামী রাষ্ট্রের সীমানা বাড়ার সাথে সুষ্ঠু ও সঠিকভাবে এর ব্যবহার করাও গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

১৩/ তিনি বিজিত এলাকায় নতুন নতুন শহর তৈরি করতেন, অনুর্বর জমি আবাদের জন্য প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থাও নেওয়া হত। এর মাধ্যমে শুধু বড় শহরগুলিই উন্নত নয়, সমাজের পুনঃনির্মাণ এবং রাষ্ট্রের সাধারণ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও ঘটত।

১৪/ সর্বপ্রথম মুসলিম হিসেবে পানযোগ্য এবং সেচযোগ্য পানির জন্য তিনি খাল খননও করেছিলেন। উল্লেখযোগ্য হচ্ছে টাইগ্রীস/ফোরাত নদী এবং বসরা শহরের মধ্যকার খালটি। পানাহার এবং কৃষিকাজের সুবিধার জন্য এসব তৈরি করা হত। একইভাবে সেতু, রাস্তা, মহাসড়কও তার শাসনামলে অজস্র তৈরি হয়েছে।

১৫/ তাকে আধুনিক হোটেল ব্যবস্থার রূপকারও বলা যায়। তিনি মুসাফিরদের সুবিধার্থে রাস্তার পাশে এরকম খাবার ঘর বা দারুল দাকিক তৈরি করিয়েছিলেন। এছাড়াও ডাকব্যবস্থা, নিরাপত্তা বাহিনী বা পুলিশ, সংরক্ষণ বিভাগ বা আর্কাইভ ডিপার্টমেন্ট (যেখানে সরকারী বিভিন্ন তথ্যাবলী সহ রাষ্ট্রের গুরুত্বপুর্ণ জিনিসগুলো জমা রাখা হয়) ও তিনি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তার সময়ে ইসলামী সাম্রাজ্যে আদমশুমারীও হয়েছিল।

সভ্যতার অন্যতম বড় একটি অনুষঙ্গ হল স্বাধীনতা। এখানে বাক-স্বাধীনতা, অভিব্যক্তির স্বাধীনতা, চিন্তার স্বাধীনতা, ধর্মীয় স্বাধীনতা সহ মানুষের স্বাভাবিক চিন্তা ও স্বাধীন সত্ত্বা থাকাটা প্রয়োজনীয়। তবে এখানে কুরআন ও হাদীসে বর্ণিত সীমাবদ্ধতাটাও আবশ্যক পালনীয়। তার খেলাফতে আমরা এরকম স্বাধীনতার উদাহরণও দেখতে পাই।

১/ খলীফা হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ার পর প্রথম ভাষণেই তিনি তাকে সমালোচনার অধিকার সবার মাঝেই ছড়িয়ে দিয়েছিলেন। যদি প্রয়োজন হয় তবে যেন তার দায়িত্ব থেকেও বিচ্ছিন্ন করা হয় যদি সে সত্যপথ হতে বিচ্যুত হয়।

২/ এক জুমার খুতবায় তাকে পরিহিত কাপড়ের ব্যাপারে প্রশ্ন করা হয়। খুতবা দিচ্ছিলেন, এমতাবস্থায় একজন ব্যক্তি দাঁড়াল প্রশ্ন করার জন্য। বলল, “আমরা সবাই যে কাপড় টুকরোগুলো পেয়েছি তা দিয়ে খলীফার গায়ের এত বড় জামা বানানো সম্ভবপর নয়”। তার ছেলে আব্দুল্লাহ দাঁড়িয়ে জানাল তার টুকরোটা সে পিতাকে দিয়েছে। এভাবেই ব্যাপারটি নিষ্পত্তি হল।

৩/ একবার তিনি চেয়েছিলেন বিয়েতে মোহরানার পরিমাণ নির্দিষ্ট করে দিবেন। এর প্রেক্ষিতে এক মহিলা সাহাবী দাঁড়ালেন। উমরকে স্মরণ করিয়ে দিলেন মহান রাব্বুল আলামীনও এই মোহরানাকে নির্দিষ্ট করে দেন নাই। ইচ্ছাভিত্তিক। অতঃপর উমর এ ব্যাপারে মহিলা সাহাবীর বক্তব্য মেনে নিয়ে এবং তাকে ধন্যবাদ জানান সংশোধন করে দেওয়ার জন্য।

৪/ তার শাসনামলে জেরুজালেম বিজয় হয়েছিল। পাদ্রী অনুরোধ করার পরেও তিনি গীর্জাতে নামাজ পড়েননি। তার অধীনস্ত দাসের সাথে একই উটে পালাক্রমে চেপে মরুভূমি পার হয়ে জেরুজালেমে পৌছেছিলেন অর্ধ জাহানের বাদশা উমর ইবনে খাত্তাব।

২৬ শে জিলহজ্জ্ব, ২৩ হিজরী, ৬৪৪ খ্রিষ্টাব্দে তিনি মৃত্যুর মুখোমুখি হলেন। আবু লু’লু নাম্নী এক অগ্নিপূজক ফজর নামাজের সময় তার পিঠে ছুরিকাঘাত করেছিল। সেটিই তাকে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগের দোরগোড়ায় নিয়ে আসল। অতঃপর তিনি বিশিষ্ট সাহাবীদের ডেকে একটি দল করে দিয়ে গেলেন। তারা হচ্ছেন, উসমান, আলি, তালহা, যোবায়ের, আব্দুর রহমান ইবনে আউফ এবং সাদ (রাদিয়াল্লহু আনহুমা)। এদের মধ্য থেকেই একজনকে খলীফার দায়িত্ব নিতে হবে। সর্বসম্মতিক্রমে এই দায়িত্ব গিয়ে ঠায় নেয় উসমান (রা:) এর কাছে। এর মাধ্যমে তিনি দারুণভাবে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার উদাহরণ দেখান। এই অসাধারণ ব্যক্তিত্বের অধিকারী মানুষটাকে হারিয়ে যেন আজ আমরা ম্রিয়মাণ। বাস্তবে তারা না থাকলেও আমাদের অন্তরে সবসময় তারা আছেন। ইসলামী সভ্যতা বিস্তার, সমৃদ্ধির বিচারে তিনি ছিলেন অনন্যা। আমরা হারিয়েছি ইসলামী সভ্যতার অন্যতম প্রবাদপুরুষকে, হারিয়েছি আমাদের “আমিরুল মুমিনিনকে”!

ফুটনোট

[2] সহীহ বুখারীঃ ৪২১৩

[4] সহীহ বুখারী৩৬৮৯

[5] মৃত্যু ৮৫২/ ১৪৪৮

[6] ইবনে হাজার আসকালানী, ফাতহুল বারী শরহে সহীহ বুখারী, ভলিউমঃ ৭, বৈরুতঃ দারুল মা’রিফাহ, ১৯৭৭।

[7] সহীহ মুসলিমঃ ৬০৯০, (ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ৫৯৮০)


গ্রন্থপঞ্জী

1.      সাল্লাবি, আলি মুহাম্মাদ। “উমর ইবনে খাত্তাবঃ হিজ লাইফ এণ্ড টাইমস”। অনুবাদঃ নাসিরুদ্দিন খাত্তাব। রিয়াদঃ ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক পাবলিশিং হাউজ, ২০০৭।

2.     সুয়ুতি, জালালুদ্দিন। দ্যা হিস্ট্রি অব দ্যা খলীফা’স হু টুক দ্যা রাইট ওয়ে। অনুবাদঃ আব্দুসসামাদ ক্লার্ক। লন্ডনঃ ত্ব-হা পাবলিশার্স, ১৯৯৫।

3.     ইবনে হাজার আসকালানী। ফাতহুল বারী শরহে সহীহ বুখারী। বৈরুতঃ দারুল মারিফাহ, ১৯৭৭।

4.      খান, মজিদ আলী। দ্যা পায়াস ক্যালিফস। কুয়ালালামপুরঃ ইসলামিক বুক ট্রাস্ট, ১৯৯৮।

5.     কালাজি, মুহাম্মাদ রাওয়াস। মাওসুয়াতুল ফিকহ ‘উমর ইবনে খাত্তাব’। কুয়েতঃ মাকতাবাতুল ফালাহ, ১৯৮১।


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ