অনুভূতির মিশ্র অভিধানে
সাজ্জাদুর রহমান
০১
আমার জীবনের দিনচক্রে আমি দেখি মাঝেমাঝেই একই দিনে কয়েক ঘটনার সম্মিলন হয়ে যায়। ঘটনাগুলো সবসময় একইরকম থাকে না। যেমন একদিন হয়ত হল সুখ-সুখ, আরেকদিন হয়ে যাবে সুখ-দুখ, বা কোনোদিন সুখ-দুখ-সুখ কিংবা দুখ-দুখ-দুখ। সত্য যে সুখ-সুখ অবস্থাটা খুবই কম পরিমাণে আসে, ব্যাপারটা একদিক থেকে যদিও উৎসাহব্যঞ্জক। কালের মোটিভেশন স্রোতে আমরা একদিকে ছুটতেই শিখেছি। খুব প্যাচাইয়ে না বললে সেটা হবে পরম সুখের বিপরীতে। এটা আমার কথাও না, ফারাবীও বহু বছর বলে গিয়েছেন খানিক এরকমটাই। আমাদের সুখ খুঁজতে হয় তবে ভুলটা হয় সুখানুভূতি প্রাপ্তের উপায় অনুসন্ধানে। জীবনদর্শন বাঁধা দেয়, পারিপার্শ্বিকতা আস্তিন টেনে ধরে, চিন্তা-গুলো মস্তককে দাস বানায় কিংবা পা-গুলো সাহসিকতার বিরুদ্ধে ঘাম ঝরায়। এসব বেড়াগুলো বাংলোবাড়িতে থাকা সৌন্দর্যবর্ধায়ক কাঠের লম্বা-ত্রিকৌণ দেয়ালের মত, ইচ্ছা হলেই পেরুনো যায় তবে ফলকে থাকা প্রবেশ নিষেধাজ্ঞা মনভ্যন্তরে ভদ্রতামূলক অস্বীকৃত হয়। কে জানি একদা আফসোস করেছিল, “সত্য বলা তো আসলেই সহজ একদম চা-বিস্কুট ধরণের, তবে চায়ে বিস্কুট পতিত হবার মত সত্যতেও অনেকের পতন ঘটে। সত্য বলার দণ্ডে নয়, না বলার আত্মম্ভরিতায়”। ব্যাপারটা গোলমেলে। এখানে সত্য কি আসলে? চা সত্য নাকি বিস্কুট? সত্য-মিথ্যার মাঝে থাকে পুলসিরাত, হয় এপার নয় ওপার। মাঝে দাঁড়ানোর বিলাসিতা একান্তই ব্যক্তিগত। চা সত্য হলে বিস্কুট মিথ্যা, আবার একইভাবে এদের বিপরীতও। আমার কাছে বিস্কুটই সত্যের কাছাকাছি, শক্তসমর্থ। মিথ্যার বেসাতিতে সহজেই সলিল সমাধি হয় তবে একদম ডুবে যায় না, নিচে গিয়ে ঠিকই একটু একটু করে বাড়তে থাকে। একসময় চা শেষ হয় বিস্কুটগুড়ো তখনো পেয়ালায় থেকে অস্তিত্বের স্লোগান দেয়।
জীবনভাঙ্গার গান শুনেছেন? জীবনকে ভেঙ্গেচুরে নবছাঁচে ঢেলে পুনঃউত্থান। জীবন এখানে জীবনদর্শনের প্রতিরূপ। এখানে ভাঙ্গার সুরেও থাকে মিলনের করুণ রস। সত্যের চেয়ে বড় কিছুই হতে পারে না হরদম জপতে থাকা আমরাও জালকে সত্যের ছায়াবরণে আলিঙ্গন করি। আমার কাছে আমরা এখানেই সুখপ্রাপ্তিতে পথ হারাই। প্রসঙ্গত, মিথ্যার মানে সবার কাছে একই হওয়া যথার্থ নয়। এর বিভিন্ন দিক-বেদিক-প্রতিদিক থাকতেই পারে। তবে সত্য মানে আমি এটা মনে করা বোধহয় প্রয়োজনীয় নয় আবশ্যকীয়। এই আমি সবকিছু বিবর্জিত আমি, সব বাঁধনহারা আমি, সব ঝেড়ে ফেলে ছুটে চলা আমি, দাসত্ব ভেদ করা আমি। আমি-র এই দীক্ষা বোধহয় প্রথম দেখেছিলাম নজরুলেই। সব বাঁধন ছেড়ে দূর্বার গতিতে সত্যের পিছে ছুটে চলা এক বিদ্রোহী। এই মনোভাবনার মত ঐশ্বর্য আর কিছুই নয়। এটিই কি পরম সুখ নয়?
আজকের দিনটিকে বলতে হবে মহৎ-বেদনাকর। একদিকে জন্মলাভের বেহেশতী খোশখবর অপরপাশে মৃত্যুর পয়গাম পাওয়া মানবের খোশনসীব। খুউব দ্বিধায় মন ঘুরপাক খাচ্ছে আজকে সুখ-সুখ হবে না-কি দুখ-সুখ। মৃত্যুকে খোশনসীবি ভাবা যায়, জন্মকেও ভাবা যায় কন্টকাকীর্ণ। অনুভূতি-পাল্টানুভূতির খপ্পরে বর্ণের মারপ্যাঁচে মনে ফাঁস জড়ানোর আকাঙ্ক্ষা নেই। চারদিকে চেপে বসা হাজারো কুখবরের ভীড়ে মনোসুখ জড় হয়, মানুষ খোলস পাল্টায়, নিরানন্দের পালে জোর হাওয়া লাগে।
আজকের মূল বয়ান দুজনকে নিয়ে। আমার দাদু এবং কাজী নজরুল ইসলাম। আমাকে সর্বক্ষণ প্রেরণা দিয়ে আসা দুইজন। স্মৃতির মিনারে কতকিছুই তো জমা! মুয়াজ্জিনের কন্ঠ ভারী তাই আযান আজকে নামাসুরে শুনা যায়। একজন আজকেই চলে গিয়েছিলেন রবের ডাকে সাড়া দিয়ে আরেকজন আজকেই এসেছিলেন এই ধরাতে। কি অদ্ভুত না! আনন্দ এবং বেদনা একত্রে ধারণ করতে পারে এরকম শব্দ কি আছে? একইরকমভাবে, একই পরিমাণে ঠিক যেন অর্ধ-অর্ধ। বেদনামধুর কথাটা ঠিক খাটে না এখানে, হয়ত নেই। মনুষ্যনুভূতির এই বিরাট অংশটা সাহিত্যিকরা কেনো অবহেলা করে গেল?
০২
সাহিত্যে বিষন্নমধুর বলতে একটা পরিভাষা আছে। ব্যাপারটা এরকম যে কষ্ট এবং ভালোলাগা এমন ভাবে মিশে যায় যেন সমসত্ত্ব মিশ্রণ। আলাদা করা যায় না বরং আলাদা করবার উপায় থাকে না। আজকেও সেরকমই একদিন। কবিকে এবং দাদুকে নিয়ে দুটি লেখাই বোধহয় দুই হাজার সতের সালের। অনুভূতি জড়তায় অনুর্বর মস্তিষ্কের সুযোগে সেগুলোই তুলে দিলাম।
সকালটা অন্যান্য দিনের মতোই সাধারণ ছিলো। প্রি-টেষ্ট এর ফিজিক্স পরীক্ষা ছিলো সেদিন। পরীক্ষাটাও ভালোই দিয়েছিলাম। সু-সংবাদ গুলো যেমন অনেক সময় অপ্রত্যাশিত থাকে তেমনি দুঃসংবাদ গুলোও হঠাৎ করেই ঝাপিয়ে পড়ে।
প্রতিদিনকার রুটিন ছিলো সময়ে বাঁধা। পরীক্ষার জন্য পড়তে হতো একটু বেশিই। হাসি-খুশি মানুষটিকে সবসময় দেখতাম আমাদের সম্পর্কে উদ্বিগ্ন থাকতে। নিয়মিত খোঁজখবর নিতেন লেখাপড়ার এবং উপদেশ দিতেন ভালো মানুষ হবার। অসুস্থ মানুষটি হঠাতই কিছুটা সুস্থ হয়েছিলেন, প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে এসেছিলো তার মাঝে। প্রবাদে যেমন বলা আছে "পিপীলিকার পাখা গজায় মরিবারও তরে" অনেকটা সেরকম পরস্থিতি। ডায়াবেটিসের কারণে যিনি দেড় মাস হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন সেই তিনিই লাঠি নিয়ে দিব্যি হেটে বেড়াতেন,একা একাই। এরকম সুস্থ মানুষটি হঠাতই পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেন।
আমার দাদা, আমরা তাকে দাদু বলেই ডাকতাম। ছোটবেলা থেকেই স্বপ্ন ছিলো বড় হয়ে দাদুর মতো হবো,দাদুর মতোই সবকিছু করবো। সেই স্বপ্ন সত্যি করতেই আমি জোর করেই মাদরাসায় ভর্তি হয়েছিলাম, নিজের ইচ্ছায়, দাদুর মতো হবার তাড়নায়। দাদু মাদরাসায় পড়েছেন, কামিল সম্পূর্ণ করেছিলেন। গাজীপুরের কাশিমপুরের অন্তর্গত বাগবাড়ী মাদরাসার প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন এবং ২০০২ সালে অবসর নেবার সময় অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করে অবসর গ্রহণ করেন।
দাদুর সাথে কাটানো মূহুর্ত গুলো ছিলো অনেক রঙিন। দাদুর সাথে হাটতে যাওয়া, তার অভিজ্ঞতা শোনা, ঠিক মধ্যদুপুরে তার সাথে গল্প করা সহ আরো অনেক।
নিজকে পূর্ণ ভাবতাম আমি। ক্লাসে কিংবা কোনো অনুষ্ঠানে যদি পরিবার সম্পর্কে বলতে বলা হতো তবে আমি বলতাম আমার সবাই আছে। দাদা-দাদী, নানা-নানী সবাই আছে। অপূর্ণতা মানুষের সহজাত ধর্ম, এটা থাকবেই।
এখনো মাঝে মাঝে বিশ্বাস করতে কষ্ট হয় দাদু সত্যিই নেই। এখনো দাদুর কথাগুলো অনুভব করি,হঠাৎ যেনো তার ডাক শুনতে পাই। আবার হয়তো দাদু ঠিক মধ্যদুপুরে তার অভিজ্ঞতাগুলো বলবে,এরকম ভাবনা মাঝে মাঝেই আসে। দাদু ডাকটাকে খুব, খুউব মিস করি।
০৩
যখন কোনো স্যাড স্টোরি শুনি স্বভাবতই সেই স্টোরির নায়ক কিংবা নায়িকার উপর এক ধরণের সিমপ্যাথী জন্ম নেয়। কাজী নজরুলের প্রতি ভালোবাসা ঠিক এরকম একটি পরিস্থিতির শিকার আমার কাছে। দুঃখু মিয়ার দুঃখের কাহিনী পড়ে যে সিমপ্যাথী জন্ম নিয়েছিলো তা আজ ভালোবাসায় রূপান্তর হয়েছে। যখন একেবারেই ছোট ছিলাম "প্রভাতী ", "লিচুচোর", "খুঁকি ও কাঁঠবেড়ালী" কবিতাগুলো পড়ে কাজীর প্রতি মুগ্ধ হয়েছিলাম। "সংকল্প" কবিতার মাধ্যমে পেয়েছিলাম একটি সুন্দর স্বপ্ন দেখবার পথ। খাতার পেছনে লেখা "চল চল চল" সবসময়ই পড়তাম। কাজী নজরুলের কবিতা পড়ার অনুভূতিই ছিলো অন্যরকম।
"মানুষ", "পাপ", "সাম্যবাদী ", "নারী", "বারাঙ্গনা " কবিতা গুলো পড়লেই এক অন্যরকম সমাজের চিত্র চোখের সামনে ভেসে উঠে।সমাজের অসংগতি গুলো কি সুন্দর ভাবেই না তুলে ধরেছেন। "কান্ডারী হুশিয়ার" কবিতায় কবির নিরপেক্ষতার পরিচয় কি নিপুণ ভাবে ফুটে উঠেছে, সমগ্র মানবতার জন্যই কবির চিন্তা বিস্তৃত। "কুলি-মজুর" কবিতায় মানুষের অধিকার নিয়ে কবি কলম চালিয়েছেন। "সব্যসাচী" কবিতায় কবি লিখেছেন এমন কিছু লোকের কথা যারা সমাজের ভালোর জন্য সবকিছুই করতে প্রস্তুত। মানুষের কাছে তার কর্ম, তার সৃষ্টির থেকে প্রিয় কিছুই নেই। সৃষ্টির আনন্দে মানুষ আত্নহারা হয়ে যায়। "আজ সৃষ্টি সুখের উল্লাসে" কবিতায় সৃষ্টির আনন্দের স্বরূপ আমরা বুঝতে পারি। "আনন্দময়ীর আগমনে" পড়ে বুঝেছি কবিতার আঘাত ঠিক কতটা কঠিন।
ইসলামের ইতিহাস ভিত্তিক "খালিদ বিন ওয়ালিদ", "ওমর ফারুক" কবিতাগুলো একেকটি অমুল্য সৃষ্টি। এই কবিতাগুলো পড়বার সময় এক অন্যরকমের ভালোলাগা কাজ করে। তৎকালীন বিখ্যাত ব্যক্তি যেমন, মুস্তফা পাশা, জগলুল পাশা সহ প্রমুখ ব্যক্তিদের নিয়ে লিখেছেন স্বরণীয় কবিতা। কবির অন্যতম বিখ্যাত সৃষ্টি “কাব্য আমপারা।” এই কাব্য আমপারায় কবি ভাবের বিন্দুমাত্র পরিবর্তন না করেই ভাষার অর্থবহ ও সামঞ্জস্যশীল ব্যবহারের মাধ্যমে এক অনবদ্য অনুবাদ করেছেন কবিতার সাহায্যে, ছন্দের মারপ্যাঁচে। কবি রাসূল(সাঃ) এর জীবনি লিখতে শুরু করেছিলেন "মরু ভাস্কর" নামে, শেষ করে যেতে পারেননি। এটাও রচিত হচ্ছিলো ছন্দের কারুকাজে। বিদ্রোহী কবির বিখ্যাত "বিদ্রোহী " কবিতা সম্পর্কে কিছুই বলার নেই। কবির রচিত সাহিত্যের গভিরতা বুঝার জন্য এটিই যথেষ্ট। সাম্যের কবি, দ্রোহের কবি নামে কবির পরিচিতি ব্যাপক হলেও তার সাহিত্যের একটি অংশ জুড়ে রয়েছে প্রেমের উপাখ্যান। কবির রচিত ১৮টি গল্পের মাঝে ১৬টিই যে প্রেমের! কবির ১৮ টি গল্প মোট ৩টি গ্রন্থে প্রকাশিত হয়েছে।
কবির প্রবন্ধ সংকলনও রয়েছে। এছাড়া কাব্যনুবাদ ৩টি, ছোটদের কাব্যগ্রন্থ ২টি এবং মোট কাব্যগ্রন্থ ২৩টি। কবির ৩টি উপন্যাসও রয়েছে। "বাঁধনহারা, মৃত্যুক্ষুধা ও কুহেলিকা " কবির তিনটি উপন্যাস। "বাঁধনহারা" উপন্যাসটি হচ্ছে পত্রোপন্যাস। অর্থাৎ পুরো উপন্যাসটি পত্রের আলোকে লেখা হয়েছে। অসাধারণ একটি রচনা। এটিতে যে বিদ্রোহীতার আভাস পাওয়া যায় সেটিই বিদ্রোহী কবিতায় পূর্ণাঙ্গতা লাভ করে। "মৃত্যুক্ষুধা" উপন্যাসটি কবির সমসাময়িক প্রেক্ষাপট নিয়েই রচিত। সাধারণ গ্রাম্য পরিবেশে খৃস্টান মিশনারিদের দাপট, গ্রামের হাবাগোবা মানুষের অন্ধ বিশ্বাস, টাকার অভাবে বিশ্বাসে অভাব এরকম কিছু প্রেক্ষাপটেই রচিত এটি। "কুহেলিকা " উপন্যাসে কবির জীবন সম্পর্কে এক সুন্দর বিশ্লেষণ প্রকাশ পায়। মূলত বিপ্লবীদের নিয়ে লিখিত একটি উপন্যাস।
কাজী নজরুলের রচিত সঙ্গীত গুলোর কথাও আলাদা ভাবে বলতে হয়। "রমযানের ঐ রোযার শেষে", "জাগিলে 'পারুল' কি গো ' সাত ভাই চম্পা ' ডাকে", "বাগিচায় বুলবুলি তুই ফুল শাখাতে দিসনে আজি দোল" ইত্যাদি সহ আরো কিছু মাষ্টারক্লাস সঙ্গীত তার কলমের খোঁচায়ই রচিত হয়েছে। বাংলা গজলের প্রতিষ্ঠাতা তো তিনিই। “ হে নামাজী, আমার ঘরে নামাজ পড়ো আজ” সঙ্গীতটার কথা আলাদা ভাবেই বলতে হয়। কাজী নজরুল ইসলাম, দ্রোহের কবি, সাম্যের কবি, মানবতার কবি, আমাদের জাতীয় কবি। কাজী নজরুলের সঠিক মূল্যায়নের জন্য প্রয়োজন তার রচিত সাহিত্যের যথাযথ মূল্যায়ন। একজন মানুষকে তার কর্মের যথাযথ মূল্যায়নের মাধ্যমেই আমরা সম্মান জানাতে পারি। নজরুলের সাহিত্য চর্চা শুধু দিবস কেন্দ্রিক নয়, বছরের ৩৬৫ দিনই বজায় থাকুক।
____________________________________________________
২৫/০৫/২০২১

0 মন্তব্যসমূহ