লেখা তরজমা

হিজরত : ভিন্ন চোখে

হিজরত : ভিন্ন চোখে 

সাজ্জাদুর রহমান

 

প্রাথমিক আলাপঃ

রাসূল(সাঃ) এর নবুয়ত লাভের পর থেকে মদীনায় ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্টা হবার আগপর্যন্ত ইসলামের ইতিহাসে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা কোনটি?

চলুন,উত্তর ভাবতে ভাবতে আমরা আবাবিল পাখির ডানায় ভর দিয়ে উমর(রাঃ) শাসনামল থেকে ঘুরে আসি।

চারদিক থেকে ইসলামের বিজয় অভিযানের খবর বাতাসের সাথে ভেসে আসত রাজধানী মদীনায়। ইসলামী রাষ্ট্রের সীমানা বিস্তৃতি পেয়ে ইরাকসিরিয়াফিলিস্তিনের পর মিশর এবং তৎকালীন পারস্য সাম্রাজ্যও অন্তর্ভুক্ত হল। সুশাসনন্যায়বিচারইনসাফ বিস্তৃত ছিল পুরো সাম্রাজ্য জুড়েই। এতকিছুর পরেও কিছু একটার অভাব ছিল।

সমস্যা দেখা যেতে লাগল। সময় মিলানো যাচ্ছিল না। তখনো মুসলিমরা বছর মনে রাখত কোন বিশেষ ঘটনার প্রেক্ষিতে। যেমন ধরুন, রাসূল(সাঃ) জন্মগ্রহণ করেছিলেন ৫৭০ খ্রীষ্টাব্দে। কিন্তু আরবের লোকেরা তা মনে রেখেছিল হস্তী বাহিনী আগমনের বছর হিসেবে। সূরা ফীলে যার বর্ণনা রয়েছে। হিজরত সংঘটিত হল ৬২২ খ্রীষ্টাব্দে। কিন্তু মুসলিমদের কাছে সেটি হিজরতের বছর হিসেবে পরিচিত ছিল। নির্দিষ্ট কোন একক ছিল না।

রাষ্ট্রের সীমানার বিস্তৃতিতে প্রশাসনিক কাজে দ্রুততা এবং স্বচ্ছতারও প্রয়োজন ছিল। দিন,মাস কিংবা বছর পরিমাপের কোন নির্দিষ্ট একক না থাকায় বিশৃঙ্খলা দেখা যেতে লাগল। একক হিসেবে ব্যবহারের জন্য বিভিন্ন প্রস্তাব ছিল। কেউ ছিল গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের পক্ষে, কেউ বা চাচ্ছিলেন তৎকালীন প্রচলিত পার্শ্ব কোন সাম্রাজ্যের ব্যবহৃত ক্যালেন্ডার।

উমর(রাঃ) সাহাবীদের ডাকলেন। সমস্যা বললেন। সমাধান নিয়ে বিস্তর আলোচনা চলল। কেউ বলল রাসূল(সাঃ) এর জন্মসালকে শূণ্য ধরে নতুন বছর গণনা হোক আবার কেউ বলল হিজরতের বছরকে শূণ্য ধরতে। আলোচনার পর অবশেষে দ্বিতীয় মতটাই গ্রহণযোগ্য হল। কারণ হিজরত ছিল সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ইভেন্ট বা ঘটনা যা সাহাবীদেরকে উদ্ধুদ্ধ করেছিল শূন্য হিসেবে এটাকেই ধরতে। এর মাধ্যমে এটাও প্রমাণ হয়ে গেল যে মদীনায় ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা হবার আগপর্যন্ত ইসলামের ইতিহাসে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা হচ্ছে এই হিজরত।

কেন হিজরত সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ? কেনই বা রাসূল(সাঃ) এর জন্মসাল নয় কিংবা নবুয়ত লাভের বর্ষ নয়? প্রশ্ন থেকে যায় এখানে। চলুন অতীত হাতড়ে কিছু মণি-মুক্তো খুঁজে ফিরি আবার।

শুরুর কথকতাঃ

নবুয়তের দশম বর্ষ। ৬২০ খ্রীষ্টাব্দ। ইতিহাসে এই বছরকে বলা হয় “আমুল হুযন”। অর্থাৎ দুঃখ-কষ্টের বছর। দুই মাস মতান্তরে দুই দিনের ব্যবধানে পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেন রাসূল(সাঃ) এর প্রিয় দুইজন ব্যক্তি। তাঁর চাচা আবু তালিব এবং স্ত্রী হযরত খাদিজা(রাঃ)। সেই বছরই রাসূল(সাঃ) দাওয়াত প্রদানের উদ্দেশ্যে তায়েফে গিয়েছিলেন। সেখানেও হয়েছিলেন নির্যাতনের শিকার। তায়েফের মর্মান্তিক ঘটনাবলী সবচেয়ে বেশি কষ্ট দিয়েছিল রাসূল(সাঃ) কে। এতেই কি শেষ? আবু তালিব ছিলেন মক্কার কাফেরদের নির্যাতন থেকে রাসূল(সাঃ) এর নিকট দূর্গের মত। আর খাদিজা(রাঃ) ছিলেন আশ্রয় এবং ভরসার জায়গাতাঁর সন্তান জন্মদানকারী স্ত্রী। তাদের মৃত্যুতে মক্কার কাফেররা হঠাৎ খাঁচাছাড়া বানরের মত লাফালাফি শুরু করল এবং রাসূল(সাঃ) এর উপর অত্যাচারের মাত্রা বাড়িয়ে দিল।

শুধু তাই কি? সাহাবী(রাঃ) দের উপরেও অত্যাচারের সীমা ছাড়িয়ে যেতে থাকল পূর্বের থেকে। এমনকি হযরত আবু বকর (রাঃ) অতিষ্ঠ হয়ে তৎকালীন হাবশায় হিজরতের জন্য রওনা দিয়েছিলেন কিন্তু পথিমধ্যে ইবনে দাগনা নামক একজন ব্যক্তি তাকে ফিরিয়ে এনে আশ্রয় দেন। তীব্র দুঃখ-কষ্টের এই বছরে এভাবেই চলত নির্যাতন ও অত্যাচারের স্টিম রোলার। সেই বছরের শেষের দিকে রাসূল(সাঃ) হযরত সাওদা(রাঃ) কে বিবাহের প্রস্তাব দিলেন এবং সাওদা(রাঃ) প্রস্তাব গ্রহণ করলেন। হযরত সাওদা(রাঃ) প্রাথমিক যুগেই ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন এবং স্বামীসহ আবিসিনিয়ায় হিজরত করেছিলেন। আবিসিনিয়া থেকে ফেরার পথে তার স্বামী ইন্তেকাল করলে ইদ্দত পালন শেষ হবার পর রাসূল(সাঃ) এর সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন।

তবে এই ৬২০ খ্রীষ্টাব্দ শুধুই কি কষ্টের ছিল? চারদিকে এই কষ্টের আধারের মাঝে এক ফোটা আলোকের মত কিছু মুগ্ধকর ঘটনাও ঘটেছিল। রাত্রি পার হলেই যেমন সুবহে সাদিকের দিগন্তরেখা আকাশে দেখা যায় সেরকমই ঐ বছরের শেষের দিকে রাসূল(সাঃ) কিছু উদ্দীপনামূলকউৎসাহব্যঞ্জক খবরও পান। 

চলুন, ইতিহাসের পাতা উল্টাই এবং উপভোগ করি কিছু সোনালী মুহূর্ত।

এতসব দুঃখজনক ঘটনার পরে রাসূল(সাঃ) নতুন উদ্যমে কাজ শুরু করার পরিকল্পনা করলেন। মক্কার আশেপাশের গোত্রগুলোর নিকটে দাওয়াত পৌছানো এবং তাদের থেকে তাঁর নিরাপত্তার আশ্বাস নেবার জন্য রাসূল(সাঃ) বিভিন্ন গোত্রপ্রধানদের নিকট যেতে থাকলেন। নেতিবাচক উত্তরই অধিকাংশ সময় পাওয়া যাচ্ছিল কিংবা কিঞ্চিৎ ইতিবাচক। তেমনই একদিন রাসূল(সাঃ)আবু বকর(রাঃ) এবং আলী(রাঃ) কে নিয়ে মক্কার বাইরে বনু যোহাল এবং বনু শায়বান ইবনে ছালাবা গোত্রকে দাওয়াত দানের জন্য গিয়েছিলেন। তাদের থেকে কিঞ্চিৎ ইতিবাচক আশ্বাস  পেয়ে ফেরার সময় মিনার পাহাড়ী পথে দেখা পেলেন ছয়জন যুবকের। তারা ছিল মদীনার খাযরায গোত্রের। সদ্য যুদ্ধ শেষ হওয়া ইয়াসরিব(মদীনা) থেকে এসেছিলেন তারা। তারা উম্মুখ ছিলেন আশার বাণী শুনতে, ভরসার জায়গা পেতে কিংবা শান্তির জন্য এক টুকরো রোদ্দুর খুজতে যা তাদের নিশানা দিবে। রাসূল(সাঃ) তাদেরকে কুরআনের বাণী শুনালেন এবং তা তাদের কাছে ছিল শান্তির সেই নিশানা যার খোঁজ হন্য হয়ে করছিলেন তারা। তারা সম্মত হলো ইসলামকে জীবনবিধান রূপে মেনে নিয়ে মদীনায় তা প্রচার করতে। তারা এর বিনিময়ে রাসূল(সাঃ) এর কাছে একটি শান্তি ও সমৃদ্ধশালী রাষ্ট্রব্যবস্থা এবং পারস্পরিক মৈত্রীবন্ধনে আবদ্ধ এক আদর্শ সমাজ প্রত্যাশা করেছিল। মহান রাব্বুল আলামীন এভাবেই দুঃখের পর সুখ দান করেন কেননা তারা ওয়াদা করেছিল মদীনায় সবাই এক ছাউনীর নিচে আসলে রাসূল(সাঃ) হবেন আরবের সবচেয়ে সম্মানিত মানুষ এবং তারা তাদের কৃত ওয়াদা রেখেছিল, তারা সত্য বলেছিল। পরবর্তীতে হিজরতের পর তারা আনসার উপাধি পেয়েছিল। কতই না উত্তম এবং মধুর সেই উপাধি!

এই ঘটনার প্রেক্ষিতেই সংঘটিত হয়েছিল ইসলামের ইতিহাসের আরো দুটি বড় ঘটনা। যা আমরা বাইয়াতে আকাবা নামে জানি। ৬২১ খ্রীষ্টাব্দে প্রথম বাইয়াতে আকাবা সংঘটিত হয় এবং ৬২২ খ্রীষ্টাব্দে সংঘটিত হয় দ্বিতীয় বাইয়াতে আকাবা বা বাইয়াতে আকাবায়ে কোবরা নামেও পরিচিত। এর মাধ্যমে ইয়াসরিবের(মদীনা) মানুষেরা রাসূল(সাঃ) কে নিরাপত্তা প্রদানের পূর্ণ আশ্বাস দিল এবং তাকে আমন্ত্রণ জানাল ইয়াসরিবে। মুসলমানগণ পেল নতুন এক রাষ্ট্রের শুভাগমন বার্তা যেখানে তাদের বাসস্থান, সমাজব্যবস্থা, আদর্শ লালিত হবে। যেখানে ইসলামের প্রচার বেগবান হবে, যেখানে জীবনবিধান রূপে ইসলামের উৎকর্ষতা সাধন হবে। যেখানে মুসলিমগণ অত্যাচার, নির্যাতনের শিকার হবে না, তারা সুখে, সমৃদ্ধিতে বাস করতে পারবে।

সাহাবীগণ হিজরত করা শুরু করলেন মক্কা থেকে এবং যারা ইতিপূর্বে আবিসিনিয়ায় হিজরত করেছিলেন তারাও মদীনার উদ্দেশ্যে যাত্রা করলেন কেননা রাসূল(সাঃ) তাদের অনুমতি দিয়েছিলেন।

হিজরতের পরিচয়:

এখন, হিজরতের পরিচয়ে আসি। হিজরত অর্থ হচ্ছে সবকিছু ত্যাগ করে শুধুমাত্র প্রাণরক্ষার্থে কোথাও চলে যাওয়া। তবে এই প্রাণ কি ঝুঁকিহীন? যাত্রাপথে যেকোনো মুহূর্তে প্রাণ সংহার হতে পারে,সম্পদ বাজেয়াপ্ত হতে পারে কিংবা পরিবার থেকেও আলাদা হয়ে যাওয়া লাগতে পারে,এরকম সম্ভাবনা কি ছিল না? এসব মেনে নিয়েই সাহাবাগণ বিপদসংকুল পথে পা বাড়িয়েছিলেন। জীবন, পরিবার, সম্পদ সবই বাজি রেখেছিলেন আল্লাহর দ্বীনকে প্রতিষ্ঠার জন্য, আল্লাহকে ভালোবেসে। পবিত্র কুরআনের সূরা নাহলের ৪১ এবং ১১০ নং আয়াতে মুহাজিরদের (যারা হিজরত করেছিল) সুসংবাদ প্রদান করেছেন।

চলুনঘুরে আসা যাক অতীতের সেই সোনালী অধ্যায় থেকে যখন মুসলিমগণ ইসলামের প্রতি ভালোবাসার জন্য সবকিছু ত্যাগ করে প্রস্তুত ছিলেন এমন কি তা যদি তার স্ত্রী-পুত্রও হয় কিংবা বহু বছরের সাধনায় জমানো ধন-সম্পদ। মরুর জাহাজের পিঠে আরোহণ করে ইতিহাসের মাঠ পেরিয়ে চলুন আবার যাই আরবের ধূলোদ্যানে।

কিছু মর্মস্পর্শী ঘটনাঃ

হযরত আবু সালমা(রাঃ)। স্ত্রী এবং পুত্র নিয়ে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন প্রাথমিক যুগেই। প্রথম বাইয়াতে আকাবা সংঘটিত হবার পর পরিবার নিয়ে নিরাপদ এবং নতুন বাসস্থানের জন্য রওনা দিলেন হবু নতুন বাসভূমি ইয়াসরিব বা মদীনার উদ্দেশ্যে। পথিমধ্যে তার শ্বশুরালয় জেনে গেল যে আবু সালমা(রাঃ) পরিবার নিয়ে অনিশ্চিত যাত্রায় নেমেছেন। তারা পথ রোধ করলেন। অনিশ্চিত পথে তারা তাদের মেয়েকে কোনভাবেই যেতে দিতে পারেন না বলে বাধা দিলেন এই পূণ্যবান সাহাবী পরিবারটিকে। হযরত আবু সালমা(রাঃ) বাধ্য হলেন তার স্ত্রীকে রেখে যেতে শ্বশুরকুলের কাছে। এবার তার শিশুপুত্রের পালা। দাদামশায় কেন সহ্য করবেন তার নাতির, বংশের প্রদীপের অনিশ্চিত পথচলা? তিনিও মায়ের থেকে ছিনিয়ে নিলেন আদরের নাতিকে। একাকী ক্লান্ত পথিক আবু সালমা(রাঃ) ভগ্ন হৃদয়ে মদীনার দিকে পা বাড়ালেন। নিঠুর এই ধরণীতে নির্মমতার অধ্যায়ে আরেকটি নতুন কাহিনী যুক্ত হল।

এভাবেই বছর কেটে গেল। উম্মে সালমা(রাঃ) স্বামী বিরহে কাতর হয়ে “আবত্তাহ” নামক স্থানে নিয়মিত যেতে থাকলেন যেখানে আবু সালমা(রাঃ) তাকে ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলেন এবং কেঁদে বুক ভাসাতে থাকলেন। ইতিমধ্যে তাঁর এক আত্মীয়ের মন গলল এবং সে তার বাবা-মাকে জোর দিল স্বামী-স্ত্রীর বিচ্ছেদ দূর করাতেআবার তাদের একত্রে সংসার করার সুযোগ দিতে। বাবা-মা রাজি হলেন। উম্মে সালমা(রাঃ) এর শ্বশুরালয় থেকে শিশু ছেলেকেও ফেরত পেলেন। তারপর, তারপর সেই আবার অনিশ্চয়তার পথেই যাত্রা। পথিমধ্যে উসমান ইবনে আবি তালহার সহযোগীতায় কুবা পর্যন্ত পৌছলেন এবং সেখানে স্বামীর সাক্ষাত পেলেন। কত মধুর সেই মিলন! যার বিচ্ছেদ হয়েছিল আল্লাহকে ভালোবাসার স্বার্থে এবং আল্লাহর অনুগ্রহেই যার মিলন হল!

এভাবেই এসে যায় হযরত সোহায়ব ইবনে রুমী(রাঃ) এর কথা। মক্কায় এসেছিলেন তিনি নিঃস্ব এবং কাঙ্গাল হয়ে। অচিরেই স্ববুদ্ধিমত্তায় সম্পদ অর্জন করলেনবিশিষ্টতা অর্জন করলেন। হিজরতের আদেশ পেয়ে রওনা দেবার সময় কাফেররা পথ আটকে দাঁড়াল। ঘোষিত হল আমাদের ধন-সম্পদ নিয়ে তুমি কোথাও যেতে পারবেনা। আপনি হলে কি করতেন? সাধনায় স্বোপার্জিত ধন-সম্পদ মুহূর্তেই ত্যাগ করতে পারতেন নাকি তাদের কথা মেনে নিয়ে সমঝোতায় বসতেন? কিন্তু তারা ছিলেন সাহাবা,  রাসূল(সাঃ) এর পার্শ্বচর,  যুদ্ধের সাথীইসলামের ইতিহাসের সবচেয়ে সৌভাগ্যবান কিছু মানুষ। সম্পদ পেলেই তাকে ছেড়ে দেবে এ কথা জানতে পেরে হযরত সোহায়ব(রাঃ) এক মুহূর্তও সময় নেন নি এ কথা বলতে “ঠিক আছে,তাই হোক। আমার যা কিছু সব রেখে গেলাম।” রাসূল(সাঃ) এ কথা জানতে পেরে বলেছিলেন,সোহায়ব লাভবান হয়েছে, সোহায়ব লাভবান হয়েছে।”

উমর ইবনে খাত্তাব (রাঃ) এর ইসলাম গ্রহণের ঘটনা মনে আছে? রাসূল(সাঃ) যার ইসলাম গ্রহণের জন্য সরাসরি দোয়া করেছিলেন। সেই সৌভাগ্যবান যিনি ফারুক অর্থাৎ সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারী উপাধি পেয়েছিলেন ইসলাম গ্রহণের পরেই? দূর্দান্ত সাহসী সেই উমর (রাঃ) হিজরতের জন্য পরিকল্পনা করলেন

আইয়াশ ইবনে আবি রাবিয়া (রাঃ) এবং হিশাম ইবনে আস (রাঃ) এর সাথে। মক্কার উপকন্ঠে তারা মিলিত হয়ে একত্রে যাত্রা করবেন বলে মনস্থির করেছিলেন। কিন্তু কি হল, হিশাম(রাঃ) পৌছতে পারলেন না,ধরা পরে গিয়েছিলেন কাফেরদের হাতে। বাকি দুজন রওনা দিয়ে কোবায় পৌছলেন। পিছুপিছু আবু জেহেলও তার সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে ছুটলেন আইয়াশ ইবনে আবি রাবিয়া(রাঃ) এর জন্য। কেননা তারা ছিলেন একই মায়ের পেটের সন্তান। প্রজ্ঞাবান উমর (রাঃ) তাদের  চক্রান্ত বুঝতে পেরেছিলেন কিন্তু মায়ের কথায় আক্রান্ত হয়ে আইয়াশ (রাঃ) গলে গেলেন। তার মা বলেছিল সে ফিরে না আসলে তিনি রোদ থেকে ছায়ায় যাবেন না এবং মাথায় চিরুনি দিবেন না। উমর (রাঃ) বলেছিলেন মাথায় উকুন আসলে চিরুনি দিতে বাধ্য হবেন এবং রোদে গা পুড়ে গেলে এমনিতেই ছায়ায় যাবেন। অতঃপর ধোকায় পড়লে যেন আইয়াশ(রাঃ) পালাতে পারেন তাই উমর (রাঃ) নিজের উট তাকে বাহন হিসেবে দিলেন যা ছিল দ্রুতগামী। বিধি বাম, ধূর্ত আবু জেহেলের ফাঁদে পড়ে আইয়াশ (রাঃ) বন্দী হয়ে মক্কায় ফিরেছিলেন।

কিংবা হযরত আলী ইবনে আবু তালিব (রাঃ)। যিনি জীবনের মায়া ত্যাগ করে রাসূল(সাঃ) বিছানায় শুয়েছিলেন এবং সবার আমানত ফেরত নিয়ে মদীনায় সর্বশেষ হিজরত করেছিলেন।

এভাবে অনেক কাহিনী এসে যাবে, সেই পূণ্যবান মানুষদের ত্যাগ ও তীতিক্ষার। যারা পিছু হটেনি রাসূল(সাঃ) এর পথ ছেড়ে চরম সংকট মুহূর্তেও। দৃঢ় ঈমানের অধিকারী সেইসব ব্যক্তিদের যারা ইসলামের জন্য সবকিছু সহ্য করেছিলেন।

তৎকালীন ইয়াসরিব তথা মদীনা ছিল সাহাবীদের নিকট অপরিচিত জায়গা। সেটা ছিল সেই যুগের কাহিনী যখন ছিল আইয়ামে জাহিলিয়্যাত, অর্থাৎ অন্ধকারাবৃত বছরগুলো। তুচ্ছ কারণেই তখন আরবের বিভিন্ন গোত্রের মাঝে বর্ষব্যাপী যুদ্ধে লেগে যেত এবং ইতিহাসের পাতাগুলো রক্তাক্ত হত। সেই সময়ে নিজ গোত্রের লোকদের চেয়ে আপন আর কেউ ছিল না। তখন এভাবে সবকিছু ছেড়ে ছুড়ে দিয়ে সাহাবীদের এরকম দুঃসাহসিক হিজরত,আপনজনকে ছেড়ে ভিনদেশে অপরিচিত লোকদের সাথে বসতি করা কিংবা ইয়াসরিবের মানুষদের মক্কার মুহাজিরদের এভাবে আশ্রয় দেয়া আলাদাভাবে অনেক কিছুই ভাবায়। এক দূর্দান্তসুন্দরবিরল এবং মোহনীয় ভ্রাতৃত্ব স্থাপিত হয়েছিল আনসার এবং মুহাজিরদের মাঝেযা ইতিহাসের গতিপথকে বিক্ষিপ্ত করে নতুন এক দিকে যাত্রা শুরু করতে বাধ্য করেছিল।

বাইয়াতে আকাবায়ে কোবরা সংঘটিত হবার পর সাহাবীরা হিজরত করে মদীনার দিকে যাত্রা শুরু করলেন। দুই থেকে আড়াই মাসের ভেতরে মক্কায় রাসূল(সাঃ)আলী(রাঃ) ও আবু বকর(রাঃ) এবং তার পরিবার ব্যতীত সকল সাহাবীই মদীনায় পৌছলেন। তবুও কিছু সাহাবী কাফেরদের হাতে বন্দী অবস্থায় ছিলেন। সময় আসল, আল্লাহ রাসূল(সাঃ) কেও হিজরতের নির্দেশ দিলেন।

প্রেক্ষাপট, কারণ এবং অন্যান্যঃ

যখন হিজরত সংঘটিত হয় তখনকার প্রেক্ষাপট ছিল এরকম যে মুসলিমগণ অত্যাচার, নির্যাতনের শিকার হয়ে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করছিল ঐশী সাহায্যের। যাতে কোনভাবেই হোক কাফেরদের সৃষ্টি করা এই জাহান্নাম থেকে আল্লাহ তাদের বের করে নেন। ঐ সময়ে বেশকিছু সংখ্যক মুসলিম আবিসিনিয়ায় বসবাস করতেন, তারা আগে হিজরত করে গিয়েছিলেন। সেখানকার শাসকও ছিলেন মুসলিমদের প্রতি সহনশীল, রহমদীল। চিন্তা করে দেখুন, চোখ বন্ধ করে নিজেকে একবার কল্পনা করুন ১৪০০ বছর আগের একজন মানুষ হিসেবে। ভাবুন, যদি আপনাকে অত্যাচার, নির্যাতনের ভয়ে কোন এলাকা ছেড়ে যেতেই হত, তাহলে কোথায় যেতেন? এমন কোনো জায়গায় যাবার কল্পনাও কি করতেন যেখানে আপনার পরিচিত কেউ নেই কিংবা যেখানে কিছুদিন আগেও গোত্রগত সংঘাতের কারণে যুদ্ধ-বিগ্রহ ছিল? আপনি করতেন না, সেরকম আমিও করতাম না। তাহলে রাসূল(সাঃ) কেন মদীনাকে বেছে নিয়েছিলেন যখন তার হাতে বেটার অপশন হিসেবে আবিসিনিয়া ছিল? যেখানে তখনই একটি মুসলিম সম্প্রদায়  ছিল সেখানে যাওয়াই কি উপযুক্ত ছিল না?

যেহেতু রাসূল(সাঃ) এরকম করেন নিতার মানে তিনি যা করেছিলেন তা ছিল আল্লাহর নির্দেশ। সহীহ বুখারীতে হযরত আয়েশা(রাঃ) হতে বর্ণিত একটি হাদীসে রাসূল(সাঃ) এর বক্তব্য পাওয়া যায়, “আমাকে তোমাদের হিজরতের স্থান দেখানো হয়েছে। এটি হচ্ছে দুই পাহাড়ের মধ্যবর্তী একটি এলাকা।” এছাড়াও মদীনার ভৌগলিক তাৎপর্য নিয়ে কিছু না বললেই নয়। লোহিত সাগরের উপকূল ঘেঁষে ইয়েমেন থেকে সিরিয়া যাবার যে বাণিজ্যপথ, তা ছিল মদীনার কাছাকাছি। মক্কার বাণিজ্যিক কাফেলা সেই পথ দিয়েই সিরিয়ায় যেত।  তৎকালীন হিসেবে সিরিয়া থেকে মক্কার বাৎসরিক আয় ছিল প্রায় আড়াই লক্ষ স্বর্নমুদ্রা! এ দিক দিয়ে মদীনার অবস্থান মক্কার কাছে

সামরিক এবং বাণিজ্যিক দিক দিয়ে অনেক বেশিই গুরুত্বপূর্ণ এবং স্পর্শকাতর ছিল। কারণবাণিজ্যিক কাফেলায় নিরাপত্তা একটা বড় ব্যাপার এবং সেই পথ যেহেতু মদীনার কাছাকাছি, অতএব মক্কাবাসীদের মদীনার সাথে স্বার্থরক্ষা করে চলতেই হত।

এতো গেল স্বার্থরক্ষার বিষয়। মক্কার সোজা উত্তরে অবস্থিত এই জনপদ ছিল দুইদিকে পাহাড় বেষ্টিত এবং আরেক পাশ দিয়ে ছিল খেজুর বাগানের সারি। শত্রুর মোকাবেলায় প্রাকৃতিক দূর্গ হিসেবে মদীনার অবস্থান ছিল ঈর্ষনীয়। খেজুর সারা বছরের খাদ্যের নিশ্চয়তা দিত এবং ছিল মাটির নিচে ছিল সুমিষ্ট পানির উৎস। মদীনায় অবস্থিত আওস এবং খাযরায গোত্রের ছিল আরব জুড়েই লড়াই কৌশলের সুখ্যাতি এবং সাফল্যের গল্প। তারা রাসূল(সাঃ) কে বাহ্যিক নিরাপত্তা প্রদানের জন্য উপযুক্ত ছিল। বহিঃআক্রমণ থেকে মদীনাকে রক্ষা করার প্রাকৃতিক সুরক্ষা ব্যবস্থার কার্যকারীতা খায়বার যুদ্ধের সময় খুব ভালোভাবেই বুঝা গিয়েছিল। সবমিলিয়ে দেখা যাচ্ছে বাহ্যিক ভাবে দেখলেও মদীনা এমন একটি জনপদ ছিল সেখানে একজন দূরদর্শী রাষ্ট্রনায়ক মাত্রই চাইবে তাঁর আদর্শসমাজ ব্যবস্থা এবং আল্লাহর পক্ষ হতে পাওয়া জীবনবিধানের বিস্তার ঘটাতে। যেখানে নিরাপত্তা ছিল জীবনের, নিরাপত্তা ছিল খাদ্য এবং পানীয়ের, মানুষেরা ছিল দুঃসাহসিক ভাবে সাহায্যকারী এবং তারা প্রস্তুত ছিল রাসূল(সাঃ) এবং ইসলামের জন্য যেকোন মুহূর্তে অস্ত্রধারণের। এসব দিক বিবেচনায় মদীনায় হিজরত এবং ইসলামী রাষ্ট্র হিসেবে মদীনার কার্যকারীতা নিয়ে আর কোন প্রশ্নই থাকেনা।

রাসূল(সাঃ) এর হিজরতঃ

এবার আসা যাক রাসূল(সাঃ) এর হিজরতের গল্পে। 

এটা শুধু কোন গল্পই নয় বরং আমাদের খুব গুরুত্বপূর্ণ কিছু শিক্ষাও দিয়ে যায়। জীবনে চলার পথে বিপদ মোকাবেলার শিক্ষাপরিকল্পনা করে আগানোর শিক্ষাতাওয়াক্কুল বা আল্লাহর উপর ভরসা করার আসল উপায় কিংবা জীবনে একজন ভালো, সৎ, বুদ্ধিমান, প্রত্যুৎপন্নমতি এবং দায়িত্ববান বন্ধু থাকার উপকারীতাও জানা এবং বুঝা যায়। চলুন তবে দেরি না করে আমরাও নেমে পড়ি সেই রাস্তায়, যে রাস্তা দিয়ে আরবের মরু পার হয়ে রাসূল(সাঃ) পৌছিয়ে গিয়েছিলেন মদীনার তৃপ্তিকর খেজুর বাগানে।

হিজরতের জন্য আদেশপ্রাপ্ত হয়ে রাসূল(সাঃ) আবু বকর (রাঃ) কে জানাতে তার বাসায় উপস্থিত হলেন। রাসূল (সাঃ) চাদর মুড়ি দিয়ে লুকিয়ে এসেছিলেন যাতে কেউ তাকে চিনতে না পারে। হিজরতের সুসংবাদ পেয়ে আবু বকর(রাঃ) উল্লসিত হলেন ও জানালেন গত চারমাস ধরেই তিনি এরজন্য অপেক্ষা করছিলেন এবং তিনি দুইটি উটনীকেও এই কয়েকদিনে খাইয়ে দাইয়ে প্রস্তুত করে রেখেছেন। কারণ রাসূল(সাঃ) তাকে আরো আগেই জানিয়েছিলেন, আল্লাহ যদি তাঁকে হিজরতের অনুমতি দেন তবে আবু বকর(রাঃ) হয়ত তাঁর সঙ্গী হবে। তখন হযরত আয়েশা(রাঃ) রাসূল(সাঃ) এর বাগদত্তা ছিলেন।

এদিকে আবার মক্কার সংসদ খ্যাত দারুন নাদওয়ায় শুরু হল কুটকৌশলের প্রদর্শন। মুসলিমদের ক্রমাগত গৃহত্যাগ করে মদীনায় যাত্রা তাদেরকে করে তুলেছিল আতঙ্কিত এবং ভীত-সন্ত্রস্ত। এই যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাবার উদ্দেশ্যে আলোচনার জন্য তারা পরস্পর মিলিত হল এই কুচক্রীদের কারখানায়। তারা ভালোভাবেই জানত মুহাম্মদ(সাঃ) এর মাঝে কি বিপুল পরিমাণের নেতৃত্ব ও পথ নির্দেশের যোগ্যতা এবং প্রভাব সৃষ্টিকারী শক্তি রয়েছে। তাঁর সাহাবাদের আত্মত্যাগের প্রেরণাগল্প কিংবা সাহসিকতার যে ঘটনা সেটাও এসব পৌত্তলিকদের অজানা ছিলনা। তারা এই  ভেবে ভয় পেতে লাগল যে কোনভাবে যদি রাসূল(সাঃ) মদীনায় গিয়ে তার সাহাবাদের সাথে মিলিত হয়ে যান তাহলে না আবার তাদের বাণিজ্য কাফেলা বিপদে পড়ে। যেহেতু সব সাহাবা মদীনায় চলে গিয়েছিলেন অল্প কিছু বাদে,  এই সুযোগ তারা হাতছাড়া করতে চাইল না। কিছু একটা করে যদি মুহাম্মদ(সাঃ) কে আটকানো যায় তাহলে উভয় কুলই রক্ষা পায়।

কোনো কিছু করা মানে ভালো কিছু করা যে তাদের উদ্দেশ্য ছিল না সেটা বুঝা যায় যখন আবু লাহাবের মত কুচক্রীকেও দারুন নাদওয়ার বৈঠকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। কেননা আবু লাহাব ছিলেন রাসূল(সাঃ) এর চাচা, বনু হাশিম গোত্রের। যদিও তিনি দ্বীন হিসেবে ইসলামের বিরোধিতায় ছিলেন কিন্তু নিজের ভ্রাতুষ্পুত্রের বিরুদ্ধে কোন ধরণের খারাপ, ভয়ংকর এবং গোপন ষড়যন্ত্র তিনি মেনে নিতেন না। আরবদের ছিল তীব্র জাতীয়তাবোধ কিংবা বংশীয় মর্যাদাবোধ। এক ফোটা রক্ত ঝরালেও তারা যুদ্ধ ঘোষণা করতে দ্বীধাবোধ করতো না রক্ত ঝরানো সেই গোত্রের বিরুদ্ধে। যদি আবু লাহাব দারুন নাদওয়ার সেই গোপন পরিকল্পনায় থাকত,  পুরো আরবে তার নামের উপর কালিমা লেপন হত। সেরকমই ঐ বৈঠকে ছিলেন না অন্যতম বিশিষ্ট ব্যক্তি মুতঈম ইবনে আদী। কারণ সে ছিল রাসূল(সাঃ) এর আশ্রয়দাতা। তায়েফে যে নৃশংসতার শিকার হয়েছিলেন প্রিয় নবী(সাঃ) তারপর মক্কায় প্রবেশের জন্য তাকে আশ্রয় দিয়েছিলেন মুতঈম ইবনে আদী।

সেটা ছিল রুদ্ধদ্বার বৈঠক। উপস্থিত স্বল্পসংখ্যক বিশিষ্ট জনেরা ছাড়া আর কেউই তা জানত না। কিন্তু ইবলিশের কি তাতে মন ভরে? যথাসময়ে বৃদ্ধের ছদ্মবেশে ঠিকই যে উপস্থিত হল মন্ত্রণাসভার দরজায় যেরকম কৌশল সে আগেও প্রয়োগ করেছিল বাইয়াতে আকাবায়ে কোবরার সময়ে। বিভিন্ন প্রস্তাব আসল, কেউ বলল ঘরে বদ্ধ করে রাখা হোক। কিন্তু উত্তর আসল বদ্ধ ঘরে থাকলেও মুহাম্মদের(সাঃ) এর বার্তা মানুষের নিকট কোন না কোন ভাবে ঠিকই পৌছবে। এতে করে মদীনায় থাকা তার সাথীরা জানতে পেরে তোমাদের উপর আক্রমণ করে বসবে এবং তাকে মুক্ত করবে। প্রস্তাবে ভেটো দিল ইবলিশ। আবার প্রস্তাব আসল মুহাম্মদ(সাঃ) কে নির্বাসনে পাঠানো হোক। এবারেও ভেটো আসল সেই বৃদ্ধ থেকেই যে ছদ্মবেশে ছিল,ইবলিশ। বলল,তাহলে মুহাম্মদ(সাঃ) অন্য কোন জনপদে গিয়ে লোকেদের একত্রিত করে ঠিকই তার দ্বীন প্রচার করবেসাথীদের সাথে মিলিত হবে। আবু জেহেল চুপ ছিল,পারতপক্ষে সবাই চুপ ছিল। একটি প্রস্তাব যেটি সবাই চাচ্ছিল কিন্তু উচ্চারণের  সাহস ছিলনা কারোই। রাসূল(সাঃ) কে হত্যা করা। কিন্তু সমস্যা হল যে বা যারা মুহাম্মদ(সাঃ) কে হত্যা করবে, পরবর্তী প্রতিক্রিয়ায় বনু হাশিম তাদের ধুলোয় মিশিয়ে দিবে। সেইসাথে মদীনায় সাহাবারা তো ছিলেনই। নতুন করে যুদ্ধ শুরু হোক কারোরই কাম্য ছিলনা।

কুটকৌশল তবুও থেমে থাকে না। পথ বের হয়ে যায় কোনো না কোন ভাবে। আবু জেহেল কুচক্রী হলেও ছিল জ্ঞানী। তার আসল নাম জানা যায় আবুল হাকাম, অর্থাৎ জ্ঞানের পিতা। তীক্ষ্ণ, সূক্ষ্ম শয়তানী বুদ্ধিটাও তার অসৎ উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা মাথা থেকেই আসল। বনু হাশিম তো পুরো মক্কার সাথে যুদ্ধ করতে পারবেনা, তো মক্কার সব গোত্র থেকে তাগড়া, সবল জোয়ান একজন করে যাবে ধারালো, তীক্ষ্ম তরবারি হাতে এবং তারা একযোগে আক্রমণ করে দুনিয়া থেকে রাতের অন্ধকারে নিশ্চিহ্ন করে দিবে মানবতার মুক্তির দূত রাসূল(সাঃ) কে। জানেন সূরা আনফালের ৩০ নং আয়াতে আল্লাহ কি বলেছেন? 

তারা যেমন পরিকল্পনা করত তেমনি আল্লাহও পরিকল্পনা  করতেন। বস্তুতঃ আল্লাহর পরিকল্পনা সর্বোত্তম।” 

আল্লাহ এভাবেই তার প্রিয় বান্দাকে সবকিছু জানিয়ে দিলেন।

দিনের শেষ রাত ঘনিয়ে আসল। রাতের গুমোট অন্ধকারের মত ষড়যন্ত্রীরাও জড়ো হল রাসূল(সাঃ) এর বাসভবন সম্মুখে, ঘিরে ফেলল চারিদিক। খোলা জানালা দিয়ে দেখা গেল কেউ একজন চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছে, হয়ত মুহাম্মদ(সাঃ)। আল্লাহ কি পরিকল্পনা করেছিলেন তাঁর প্রিয় বান্দার জন্য এই কঠিন পরিস্থিতিতে? চলুন তবে জেনে আসি কুরআনের ভাষাতেই।

সূরা ইয়াসীনের ০৯ নম্বর আয়াতে আল্লাহ দারুণ ভাবে বর্ণনা করেছেন কিভাবে তিনি ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করেছিলেন। আলী(রাঃ) তখন ছিলেন কিশোর বয়সী। মক্কার মানুষেরা ইসলামের বিরোধীতা করলেও তাদের দেয়া “আল-আমিন” অর্থাৎ বিশ্বাসী উপাধিটাকে তখনো ভুলেনি। তখনো অনেকের আমানত রাসূল(সাঃ) এর কাছে গচ্ছিত ছিল। রাসূল(সাঃ) কিশোর আলীর(রাঃ) হাতে আমানত প্রত্যাবর্তনের দায়িত্ব অর্পণ করলেন এবং সেইসাথে দিলেন সৌভাগ্যময় কঠিন আরেকটি কাজ। আলী(রাঃ) কে শুয়ে থাকতে হল রাসূল(সাঃ) এর চাদর মুড়ি দিয়ে তারই বিছানায় এবং রাসূল(সাঃ) বের হয়ে গেলেন আল্লাহর আদেশ পালন করতে হিজরতের উদ্দেশ্যে।

কি কঠিন! এমন কি হতে পারতনা সকালে কাফেররা এসে প্রথম বারেই বিছানায় থাকা অবস্থাতেই আলী(রাঃ) এর মাথা ঘাড় থেকে আলাদা করে ফেলতে কিংবা তাকে টুকরো টুকরো করে ফেলতে? আল্লাহর ভালোবাসার নিঃসীম আত্মত্যাগের এই মহড়া যুগ যুগ ধরে তাদেরকে করে রেখেছে জীবন্ত। জীবনের ঝুঁকি ছিল, হয়ত সেটা জীবনের শেষ ঘুমও হতে পারত কিংবা আর কখনোই দেখতে পেতেন না পৃথিবীর আলো। রাসূলের(সাঃ) চাদর গায়ে দিয়ে তাঁর বিছানায় শোবার সৌভাগ্য কজনের হয়? আল্লাহর চেয়ে উত্তম হেফাজতকারী কে আছে?

বাহিরে দাঁড়ানো যুবকদের উদ্দেশ্যে আল্লাহর আদেশে রাসূল(সাঃ) একমুঠো ধুলো ছিটিয়ে দিয়েছিলেন। তারপর, তারপর আল্লাহর অসীম রহমতে কোন রকম বাঁধা ছাড়াই তিনি পৌছে গিয়েছিলেন আবু বকর(রাঃ) এর ঘরে। আবু বকর(রাঃ) ছিলেন বিশিষ্ট ব্যবসায়ী। ইসলাম গ্রহণের সময় তার সম্পদ ছিল প্রায় ৪০,০০০ দিরহাম। মক্কার অন্যতম ধনী ব্যক্তি ছিলেন এই সাদাসিধে বুদ্ধিমান মানুষটি। হিজরতের সময় তার হাতে অবশিষ্ট ছিল মাত্র ৫,০০০ দিরহাম। বাকি সব দিরহাম তিনি খরচ করেছিলেন ইসলামের জন্য, যেসব দাস-দাসী ইসলাম গ্রহণের অপরাধে নির্যাতিত হত তাদের মুক্তির জন্য, আল্লাহর ভালোবাসার জন্য। কি অপরিসীম নির্মোহ সম্পদের প্রতি ঠিক ততটাই অমূল্য ভালোবাসা আল্লাহর প্রতি। ইতিহাসের পাতা থেকে যদি তিনি উঠে আসতেন, হয়ত সেই স্বর্ণালি রোদের আবির মাথা মুগ্ধ সকালগুলো আবার দেখতে পেতাম।

তারা রওনা দিলেন মদীনার উদ্দেশ্যে। মদীনা, মক্কা থেকে সোজা উত্তর দিকে। একেবারে নাক বরাবর। তারা মদীনার দিকে পিঠ দিয়ে চললেন। উল্টো পথে। দক্ষিণ দিকে। আশ্চর্য হচ্ছেন? এটাকে বলা যায় স্ট্র‍্যাটেজিক্যাল সল্যুশন। তখনকার সময়েও মক্কা থেকে মদীনায় যাবার জন্য হাইওয়ে ছিল। যেটা ছিল নিরাপদ, লোকচক্ষুর সম্মুখে। যদি ওই রাস্তা তারা অনুসরণ করতেন তাহলে প্রথমেই ধরা পড়ে যেতেন। সেজন্যই এরকম ব্যবস্থা করে রেখেছিলেন আবু বকর(রাঃ)। একজন বুদ্ধিমান, প্রত্যুৎপন্নমতি বন্ধু এবং একজন মাষ্টার প্ল্যানার।

হিজরতের প্রতিটা পদক্ষেপকে ছকে বেঁধে ফেলেছিলেন তিনি। মক্কা থেকে বের হয়ে সওর গুহায় তিনদিনের জন্য আত্মগোপনে রইলেন। অন্যদিকে মক্কার অবস্থা হযবরল। চোখের সামনে দিয়ে এভাবে কেউ পালিয়ে যেতে পারে কারোই বিশ্বাস হচ্ছিল না। পৌত্তলিকরা মদীনার রাস্তায় অনুসন্ধান চালাল, ফলাফল শূণ্য। অতঃপর পুরষ্কার ঘোষণা করে দিয়ে প্রাইভেট ডিটেকটিভও কাজে লাগাল। পদছাপ বিশেষজ্ঞ। হাল আমলের প্রাইভেট ডিটেকটিভ। পুরষ্কার ঘোষণা হল শত উট, জীবিত অথবা মৃত যেভাবেই হোক ধরে আনতে হবে দুজনকে। তখনকার একটি উট মানে এখন আমরা একটা গাড়ির সাথে তার তুলনা করতে পারি। আবার দেখুন, হিজরতের সময় রাসূল(সাঃ) কিন্তু নিজস্ব উট ছিলনা। আবু বকর(রাঃ) থেকে তিনি উট কিনে নিয়েছিলেন। এতেও বুঝা যায় উট কতটা দামী প্রাণী ছিল, সবাই উট ব্যবহার করতে পারত না বা থাকত না সবার কাছেই। আত্মগোপনের সময়ে নিরাপদ থাকার জন্য এসব তথ্য জানাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল মুহাম্মদ(সাঃ) ও আবু বকর(রাঃ) এর জন্য। মাষ্টার প্ল্যানার আবু বকর(রাঃ) এখানেই তার কারিশমা দেখালেন।

আবু বকর(রাঃ) তিনজন ব্যক্তিকে কাজে লাগালেন। তার বড় ছেলে আব্দুল্লাহ ইবনে আবু বকর(রাঃ), যদিও তিনি কিশোর ছিলেন। তার মুক্ত গোলাম আমের ইবনে ফুহায়রা এবং পথপ্রদর্শক হিসেবে বেদুইন আব্দুল্লাহ ইবনে উরাইকিত। এদের কাজ কি ছিল? আব্দুল্লাহ(রাঃ) প্রতিদিন সকালে বাজারে চলে যেতেন এবং খেলাচ্ছলে বাজার থেকে বিভিন্ন তথ্যাদি সংগ্রহ করে সওর গুহায় পৌছিয়ে দিতেন। এরপর চিত্রপটে আমের ইবনে ফুহায়রার আগমন ঘটত। বকরীর পাল নিয়ে আসতেন তিনি গুহার কাছে। তাদেরকে দুধ পান করাতেন এবং যাবার সময় বকরীর পালের সাহায্যে তার ও আব্দুল্লাহ(রাঃ) এর পায়ের ছাপ মুছে দিয়ে যেতেন।

তবুও কিনা শেষ রক্ষা হল না। একদিন সকালে কাফেররা পৌছিয়েই গেল সওর গুহার দ্বারপ্রান্তে। পবিত্র কুরআনের সূরা তাওবার ০৯ নং আয়াতে আল্লাহ বর্ণনা করেছেন এই সুন্দর ঘটনাটি। রাসূল(সাঃ) বলেছিলেন,“হতাশ হয়োনা, নিশ্চয়ই তিনি আমাদের সাথে আছেন।” বিভিন্ন বক্তব্যে এসেছে এরকম অবস্থা ছিল, উমাইয়া ইবনে খালফ যদি একটু নিচে তাকাতেন, তবেই দেখতে পেতেন গুহার ভেতরে দুজন লোক আছে। গুহাটাও খুব প্রশস্ত ছিলনা। আল্লাহ উত্তম হেফাজতকারী। তিনি সবসময় সাথেই ছিলেন। তিনি মুমিনদের সর্বাবস্থায় সাহায্য করেন।

অতঃপর তিনদিন পর মদীনার উদ্দেশ্যে যাত্রা। পথটা ছিল মক্কা থেকে জেদ্দাহ এবং জেদ্দাহ থেকে মদীনা। বর্তমানে এই পথটি তরীকুল হিজরাহ(হিজরতের রাস্তা) নামে পরিচিত এবং হাইওয়েও হয়েছে। এটাও দেখা গিয়েছে তখনকার যে হাইওয়ে ছিল সেটার চেয়ে বর্তমান অর্থাৎ তরীকুল হিজরাহই হচ্ছে মক্কা হতে মদীনা যাবার সহজতম পথ।

পথের বাঁকে বাঁকে বিপদ উৎ পেতে থাকে। হঠাৎ করে হানা দেয় সামনে। শত উট পুরষ্কারের ঘোষণা চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছিল। তেমনি এই খবরটা গোত্র সর্দার সুরাকা ইবনে মালিকের(রাঃ) এর কানেও পৌছেছিল। তখন তিনি সাহাবী ছিলেন না। পুরষ্কারের লোভে তার চোখ স্বর্ণের মত চকচক করে উঠল। শত উট,  স্বর্ণের চেয়ে কোন অংশেই কম নয়।

অস্ত্র, শিরস্ত্রাণ ধারণ করে ঘোড়া বাগিয়ে দ্রুতগতিতে ছুটলেন শত উটের নেশায়। একদল যখন সব সম্পদ ছেড়ে দিয়ে নতুন স্বপ্নের আশায় ছুটছিল,অপরদিকে কিছু মানুষ সেগুলো হাত করার জন্য ছুটে চলছিল শরাব পান করে। সুরাকা(রাঃ) ছুটতে ছুটতে পেয়েও গেলেন মুহাম্মদ(সাঃ) ও আবু বকর(রাঃ) কে। কিন্তু তাদের কাছে যেতে পারছিলেন না, তার ঘোড়া বারবার বালুতে বসে যাচ্ছিল এবং তাকে ফেলে দিচ্ছিল মরুর তপ্ত জমিনে। অবশেষে কথা বলা দূরত্বে কোনমতে পৌছতে পেরে চিৎকার দিয়ে বললেন কথা বলতে এসেছেন, হত্যার জন্য নয়। অতঃপর তিনি কাছে গেলেন এবং রাসূল(সাঃ) এর কাছে নিরাপত্তা চাইলেন। যাকে হত্যা করতে এতদূর ছুটে এলেন তার কাছেই কেন আবার নিরাপত্তা চাইলেন? এ কেমন দুমুখো আচরণ?

সুরাকা(রাঃ) এর সুস্থ, সবল ঘোড়া যখন বারংবার বালুতে গড়াগড়ি খাচ্ছিল কোন কারণ ছাড়াই, হাজার চেষ্টা সত্ত্বেও হত্যা করার উদ্দেশ্য নিয়ে  সামনে এগুতে পারছিলেন না তখন তার সামনে সত্য উম্মোচিত হল। তিনি ইসলামকে ঐশী জীবনবিধান এবং বিজয়ী হিসেবে চিনতে পারলেন। রাসূল(সাঃ) তাকে নিরাপত্তার সনদ দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে রাসূল(সাঃ) ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন সুরাকা(রাঃ) কে। বলেছিলেন, কিসরার হাতবন্ধনী(ব্রেসলেট) পরতে কিরকম লাগবে! কিসরা ছিল মহাপ্রতাপশালী পারস্য সাম্রাজ্যের সম্রাট। উমর(রাঃ) শাসনামলে মুসলিম বীরগণ পারস্য সাম্রাজ্যকে ইসলামের ছায়াতলে নিয়ে এলেন এবং ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী কিসরার হাতবন্ধনী উমর(রাঃ) সুরাকা(রাঃ) কে পরিয়ে দিয়েছিলেন। রাসূল(সাঃ) এর ভবিষ্যদ্বাণী সত্যি হয়েছিল।

এরকমই পথিমধ্যে তাবু দেখে বিশ্রামের জন্য দাঁড়িয়েছিলেন তারা আবার। উম্মে মাবাদ(রাঃ), পরবর্তীতে সাহাবী, নাম্নী এক মহিলা ও তার স্বামীর তাবু ছিল সেটি। তিনি ছিলেন সুন্দর চরিত্র এবং আরবদের চিরায়ত মেহমানদারীর স্বভাবজাত গুণসম্পন্ন একজন মহিলা। মরুভূমির পথে চলা কাফেলাগুলোকে সাধ্যমত আপ্যায়ন করতেন। কিন্তু যখন রাসূল(সাঃ) যাত্রা বিরতি করলেন সেখানে, তখন একটি মাত্র দূর্বল বকরী ছাড়া উম্মে মাবাদ(রাঃ) এর কাছে আর কিছুই ছিলনা। বকরীটি এতই দূর্বল ছিল যে তার দুধ দোহন করা যেত না, হাটতে গেলে সবার পিছনে পড়ে থাকত। রাসূল(সাঃ) সেটিই নিয়ে আসতে বললেন। আল্লাহর অপূর্ব নিদর্শন, বকরীর ওলানে হাত রাখার সাথে সাথে তা দুধে পরিপূর্ণ হল এবং সবাই তৃপ্তি সহকারে পান করেও অবশিষ্ট থেকে গেল।

যখন তার স্বামী আবু মাবাদ(রাঃ) ঘরে ফিরে এলেন, দেখতে পেলেন ঘটি ভর্তি দুধ অথচ ঘরে দুধ দেবার মত কোন বকরী ছিলনা। আশ্চর্যান্বিত হলেন এবং উম্মে মাবাদ(রাঃ) থেকে সবকিছু জানতে পারলেন। তখন উম্মে মাবাদ(রাঃ) রাসূল(সাঃ) বাহ্যিক রূপ বর্ণনা করেছিলেন। সেটি উল্লেখ করার লোভ সামলাতে পারছিনা।

পবিত্র ও প্রশস্ত মুখমন্ডল, প্রিয় স্বভাব, পেট উঁচু নয়, মাথায় টাক নেই, সুদর্শন, সুন্দর, কালো ও ডাগর ডাগর চোখ, লম্বা ঘন চুল, গুরুগম্ভীর কণ্ঠস্বর। উঁচু ঘাড়, সুরমা যুক্ত চোখ, চিকন ও জোড়া ভ্রু, কালো কোকড়ানো চুল। নীরব গাম্ভীর্য,আন্তরিক, দূর থেকে দেখলে সুন্দর ও চিত্তাকর্ষক। নিকট থেকে দেখলে অত্যন্ত মিষ্ট ও সুন্দর। মিষ্ট ভাষী, স্পষ্টভাষী, নিস্প্রয়োজন শব্দের ছড়াছড়ি থেকে মুক্ত কথাবার্তা। সমস্ত কথাবার্তা মুক্তার হারের মত পরস্পরের সাথে যুক্ত। মধ্যম ধরনের লম্বা, ফলে কেউ তাকে ঘৃণাও করেনা, তাচ্ছিল্যও করেনা। সুদর্শন, তরুণ, সর্বক্ষণ সাহচর্য দানকারীদের প্রিয়জন। যখন সে কিছু বলে সবাই নীরবে শোনে, যখন সে কোন নির্দেশ দেয়, তৎক্ষণাত সবাই তা পালন করতে ছুটে যায়। সকলের সেবা লাভকারী, সকলের আনুগত্য লাভকারী, প্রয়োজনের চেয়ে স্বল্পভাষীও নয়; অমিতভাষীও নয়।”

এরচেয়ে সাবলীল,সুন্দর,মুগ্ধকর এবং পরিপূর্ণ বর্ণনা আর কোন বক্তব্যে কিংবা কথায় উঠে আসেনি।

আবু বকর(রাঃ) এর প্রত্যুৎপন্নমতিতার পরিচয় পাওয়া হিজরতের বিশেষ একটি ঘটনায়। আবু বকর(রাঃ) আরবের প্রসিদ্ধ ব্যবসায়ী ছিলেন। যদিও তারা দুজনেই সমবয়সী ছিলেন কিন্তু আবু বকর(রাঃ) কে কিঞ্চিৎ বয়স্ক লাগত দেখতে। হিজরতের চলার পথে প্রতি মুহূর্তে তিনি উৎকণ্ঠিত থাকতেন এই না বুঝি কেউ আক্রমণ করে বসে ভেবে। সারাক্ষণ সামনে পিছে, ডানে কিংবা বামে ছুটোছুটি করতেন। অধিকাংশ সময় পেছনেই থাকতেন। এতে এরকম বুঝা যেত যে রাসূল(সাঃ) মরুর পথে আবু বকর(রাঃ) পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। পথিমধ্যে লোকেদের সাথে দেখা হলে আবু বকর(রাঃ) বলতেন, এ আমার পথ প্রদর্শক।” আবু বকর(রাঃ) কি মিথ্যা বলতেন? তাও আবার নবীজীর(সাঃ) সম্মুখেই? অবশ্যই না। কথাটি মেটাফোর। রাসূল(সাঃ) তাকে পথ দেখিয়েছিলেন, হেদায়াতের পথ, আলোর পথ। সে হিসেবে রাসূল(সাঃ) তো পথ প্রদর্শকই ছিলেন। প্রত্যুৎপন্নমতিতার কি সুদারুণ কীর্তি!

মরুর আঁকাবাঁকা পথে কম বিপদে পড়তে হয়নি তাদের। পুরষ্কারের লোভে সুরাকা ইবনে মালিক(রাঃ) এর মত ছুটে এসেছিলেন বেদুইন সর্দার বুরাইদা আসলামিও। তবে একা নয়, সাথে ৭০ জন। খ্রীষ্টপূর্ব সময়ে গল, বর্তমানে যেটি সম্পূর্ণ পশ্চিম ইউরোপ বিজেতা বিখ্যাত রোমান সম্রাট জুলিয়াস সিজারের একটি উক্তি আছে। ভেনি, ভিদি, ভিচি। এলাম, দেখলাম, জয় করলাম। সেভাবেই বুরাইদা(রাঃ) তার দল নিয়ে এসেছিলেন,রাসূল(সাঃ) কে দেখলেন,তাঁর বাণী শুনলেন এবং মাথার পাগড়ি খুলে পতাকা বানিয়ে নিরাপত্তা দিয়ে এগিয়ে দিলেন। এলেন,দেখলেন, মুগ্ধ হয়ে ফিরে গেলেন, ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় নিলেন।

এদিকে মদীনায় সাহাবারা প্রতিদিন অপেক্ষায় থাকত কখন তাদের প্রিয় রাসূল(সাঃ) পা রাখবেন তাদের মাটিতে। তারা ঘর থেকে বের হয়ে মদীনার বাইরে, কেউবা ছাদের উপরে উঠে দাঁড়িয়ে থাকতেন কেউবা উঁচু টিলার উপরে। এ যেন প্রতিযোগীতা ছিল রাসূল(সাঃ) এর নূরানী মুখ কে সবার আগে দর্শন করবে! সেদিনও এরকম একটি দিন ছিল। দিনশেষে ক্লান্ত হয়ে সবাই যার যার ঘরে ফিরেও গিয়েছিলেন। একজন ইয়াহুদী ব্যক্তি কি মনে করে যেন টিলায় চড়েছিলেন এবং সৌভাগ্য অর্জন করে ফেলেছিলেন রাসূল(সাঃ) কে সর্বপ্রথম দেখবার। খবর ছড়াতে বেশিকিছু করতে হল না। সবাই অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে বের হয়ে এল প্রিয় মানুষটিকে অভ্যর্থনা দিবে বলে। তাকে বরণ করে নিল দুঃসাহসিক ভালোবাসায়। রাসূল(সাঃ) কুবার অবতরণ করলেন। সেখানে কিছুদিন অবস্থান করলেন।

রাসূল(সাঃ) এর মাতৃবংশ ছিল মদীনার বনু নাজ্জার গোত্রের। তাদেরকে খবর দেয়া হল। অস্ত্রে,শিরস্ত্রাণে সজ্জিত হয়ে বের হয়ে এলেন তারা প্রিয় ভাগিনাকে সঙ্গ দিয়ে মদীনায় পৌঁছিয়ে দিতে।

মদীনার উপচে পড়া ভীড় ঠেলে রাসূল(সাঃ) এর উটনীর এগোতেই কষ্ট হচ্ছিল। প্রিয় মানুষ,প্রিয় নেতাকে দেখার তাড়না সবাইকে নিয়ে এসেছিল মদীনার সংকীর্ণ রাস্তায়। সবার চোখেমুখে আনন্দের বর্ণচ্ছটা এবং দফের তালে তালে ধ্বনিত হচ্ছিল,

পূর্ণিমার চাঁদ আমাদের কাছে এসেছে

ওয়াদা উপত্যকা থেকে।

তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ আমাদের কর্তব্য

যতদিন কেউ আল্লাহর নাম ডাকবে।”

অবশেষে ইয়াসরিব হয়ে উঠল মদীনাতুর রাসূল(সাঃ)। সেখানে গঠিত হয়েছিল জাহিলিয়্যাতের অন্ধকার চিড়ে এক ঐশী সভ্যতার। পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতা লালিত হয়েছিল সেই মাটিতে। কাব্য রচিত হয়েছিল সাহসিকতার, ঈমানদারীতার, মূল্যবোধের এবং একটি সাম্রাজ্যের গোড়াপত্তন হয়েছিল। 

শিক্ষাঃ

এতো গেল হিজরতের বিশদ বর্ণনা। তো, আমরা কি শিক্ষা পাব এখান থেকে? চলুন তবে জেনে আসি।

প্রথমেই যদি আসি, আবু তালিব এবং খাদীজা(রাঃ) এর মৃত্যুর পরেও রাসূল(সাঃ) তাঁর চেষ্টা থামাননি বরং জোরদার করেছিলেন। নতুন উদ্যমে সামনে এগিয়েছিলেন। আমাদেরও শিক্ষা নিতে হবে দাওয়াহ এবং জীবনের ক্ষেত্রেও। দাওয়াহর ক্ষেত্রে যেরকম হতাশ হয়ে হাল ছেড়ে দেয়া যাবেনা, নতুন পন্থায় নতুন সুযোগ খুঁজতে হবে সেরকমই জীবনেও ঘুরে দাঁড়াতে হবে।

মিনার পাহাড়ের সেই ছোট্ট দলটির কথা খেয়াল আছে? আচ্ছা যদি রাসূল(সাঃ) তাদেরকে পাত্তা না দিয়ে এড়িয়ে যেতেন তবে কি এত কাহিনী ঘটত? দেখুন, এখান থেকে একটা শিক্ষাই পাওয়া যায় সুযোগ যত ছোটই হোক, হেলা করা যাবেনা। সবক্ষেত্রেই। প্রবাদে তো আছেই, “ছোট ছোট বালুকণা, বিন্দু বিন্দু জল। গড়ে তুলে মহাদেশ, সাগর অতল।”

সওর গুহায় থাকা সময়ের ঘটনা মনে আছে? উৎকন্ঠা কিংবা আতঙ্কে আবু বকর(রাঃ) এর মত  শান্ত,স্থির এবং সৌম্য মানুষটিও যখন অস্থির হয়েছিলেন? রাসূল(সাঃ) কিন্তু স্থির ছিলেন। বিপদের মুহূর্তে এটাই আমাদের জন্য পথ। শান্ত থাকা এবং আল্লাহর উপর ভরসা রাখা।

মাষ্টার প্ল্যানার আবু বকর(রাঃ) হিজরতের পথের নিরাপত্তার জন্য কত রকমের পরিকল্পনা রেখেছিলেন, মনে আছে? এরথেকে কি বুঝা যায় না জীবনে চলার পথে আমাদের প্রতিটি কাজের হিসাব রাখতে হবে, পরিকল্পনা করে কাজ করতে হবে? হিজরতের সময় এতসব পরিকল্পনা করেই কিন্তু তারা আল্লাহর উপর ভরসা রেখেছিলেন। এভাবেই রাসূল(সাঃ) বাস্তব জীবনে বিভিন্ন উপায়ে আমাদেরকে এসব শিক্ষাগুলো দিয়ে গিয়েছেন।

শিক্ষাগুলো এতটুকুতেই সীমাবদ্ধ না। প্রতিটি ঘটনাই একেকটি প্র‍্যাক্টিক্যাল লাইফ লেসন। চিন্তার সুযোগ আছে, ভিন্নভাবে দেখবারও সুযোগ রয়েছে।

সীরাত অধ্যয়ন করতে গেলে প্রতিবারেই নতুন কিছু না কিছুর দুয়ার উম্মোচিত হয়। ভাবনার নতুন উপাদান পাওয়া যায় কিংবা মনকে প্রতিবার ভিন্নভাবে নাড়া দেয়। সীরাত অধ্যয়নের পরিধি আমাদের সমাজে আরো বিস্তৃত হওয়া উচিত। আমাদের সবাইকে স্ব স্ব অবস্থান থেকে এ বিষয়ে অবশ্যই এগিয়ে আসতে হবে।

 

তথ্যসূত্রঃ

1.           আর রাহিকুল মাখতুম
2.           সীরাহ লেকচার সিরিজ - ড: শায়খ ইয়াসির ক্বাজি
3.           সীরাহ - রেইনড্রপস মিডিয়া
4.           বেস্ট ইন ইসলাম - ড: বিলাল ফিলিপস





একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

1 মন্তব্যসমূহ