লেখা তরজমা

সভ্যতার আযান, তারিখ-ই-গোয়েবলস এবং আরবীয় বিজ্ঞান



সভ্যতার আযান, তারিখ-ই-গোয়েবলস এবং আরবীয় বিজ্ঞান
মূল: জিম আল-খলিলী 
ভাব-ভাষান্তর: সাজ্জাদুর রহমান 

সভ্যতার আযান 

খ্রীষ্টপূর্ব সপ্তম শতাব্দী হয়ত শুনতে অনেক প্রাচীন মনে হতে পারে ইউরোপীয়ানদের, হয়ত আমেরিকানদের কাছেও। তবে ইরাকী প্রত্নতাত্ত্বিক মাপদণ্ডে এটি ইউরোপীয়ানদের মধ্যযুগের মত। বলাই যায় ইরাকী মধ্যযুগ হচ্ছে নেবুচাদনেজারের শাসনামল। আমরা কি কল্পনাও করতে পারি আজকে যারা ইরাকে সাধারণ জীবনযাপন করতেও শত বাধা-বিপত্তির সম্মুখীন হচ্ছে তাদের ঐতিহ্যের শিকড় সাত হাজার বছর আগের পৃথিবীতে গেঁথে আছে! এই মাটিতেই জন্ম নিয়েছিল বিশ্বের প্রাচীন কিছু সভ্যতা! প্রত্নতাত্ত্বিকগণ দক্ষিণ ইরাকে ছয় সহস্রাব্দ বছর আগে শুরু হওয়া উবাইদ সংস্কৃতির সন্ধান পেয়েছেন। তারা আরো পেয়েছেন উরুক সভ্যতা, সেখানে হয়েছিল চাকা আবিষ্কার, পদার্থের সংযোজন এবং মাটির তৈজসপত্র তৈরির জন্য কুমোরের চাকাও। এমনকি সীলমোহর, ইটের ছাঁচ এবং মন্দিরের নকশাও, এসব হচ্ছে খ্রীষ্টপূর্ব ৪১০০ সালের কথা। উরুক সভ্যতার অবদান আরোও বড়। শুধু চাকাই নয়, এই সভ্যতা আমাদের দিয়েছিল অনুভূতির লেখ্যরূপ! 

অতঃপর তাদের ভাষাতেই বলতে হয়, ইতিহাসের শুরু হল। 

বর্তমান ইরাকের আরব দেশীয়দের বংশধারায় সবচেয়ে শক্তিশালী পূর্বপুরুষ ছিলেন সারগন। তিনি ছিলেন একজন সেমাইট রাজা, আক্কাদিয়ানদের অধিপতি। খ্রীষ্টপূর্ব ২৪ শতকে তিনি সুমেরিয়ানদের পরাজিত করেন। তার সম্পর্কে কমই জানা যায়। কথিত আছে যে, আজ বাগদাদের অদূরে আক্কাদে তিনি রাজধানী স্থাপন করেন। স্বল্প সময়ে তার রাজ্য বিস্তৃত হয় পশ্চিমে ভূমধ্যসাগর থেকে পূর্বে পারস্য (ইরান) পর্যন্ত। তাকে ডাকা হত “বিশ্বের চতুর্ভাগের রাজা”। 

আক্কাদিয়ানদের আগে উর রাজবংশের রাজত্ব ছিল। ধারণা করা হয় এটি ছিল দক্ষিণ ইরাকে খ্রীষ্টপূর্ব দুই হাজার বছর আগে। ৬০,০০০ জনসংখ্যা সমৃদ্ধ এই শহরটি তৎকালীন পৃথিবীতে ছিল সবচেয়ে বড়! ইবরাহীম (আঃ)-এর জন্মশহর থেকেই এর সূচনা হয়েছিল, তিনি হলেন পৃথিবীর বড় তিনটি একত্ববাদী ধর্ম ইসলাম, খ্রিষ্টধর্ম এবং ইহুদী ধর্মের পিতা। 

প্রথম ব্যাবিলনিয়ান সাম্রাজ্যের সূচনাও কাছাকাছি সময়ে হয়েছিল। আমরা মহান এবং ইরাকের প্রাচীন রাজাদের মাঝে শ্রেষ্ঠতর হাম্মুরাবী-র কথা জানি। তিনি ৪০ বছরেরও অধিক কাল রাজত্ব করেছিলেন, (১৭৯২-১৭৫০ খ্রীষ্টপূর্ব)। তার সময়েই দুনিয়া প্রথম স্কুলের ধারণা পেয়েছিল, একইসাথে পেয়েছিল প্রথম লিখিত আইন! এরপর হাজার বছর অতিক্রম হয়, অনেক রাজারা সিংহাসনে বসেন তবে কেউই হাম্মুরাবীর কাছে ঘেষতে পারেননি, অর্জন কিংবা কোনো দিক দিয়েই। অবশেষে বর্তমান উত্তর ইরাকের মসুলের কাছে বৃহৎ নিনেভেহ গ্রন্থাগারের প্রতিষ্ঠাতা অ্যাসিরিয়ান রাজা আশুরবানিপাল-এর মঞ্চে আগমন ঘটে। 

ইরাকের স্বাধীন শাসনের বিলুপ্তি ঘটে ঈসা (আঃ) এর জন্মের কয়েক শতাব্দী আগে। পারসিয়ান, গ্রীক, মোঙ্গল এবং তুর্কিদের অধীনে নিরবিচ্ছিন্ন পরাধীনতার মাধ্যমে ১৯১৭তে এসে ব্রিটিশদের হাতে উপনিবেশিত হয়। ১৯২১ সালে সেখান থেকে মুক্তি মেলে। এরপরেই বর্তমানের আধুনিক ইরাক রাষ্ট্রের জন্ম হয়। তবে ব্যতিক্রম রয়েছে। ৭৫০ সাল থেকে ১২৫৮ সাল পর্যন্ত আব্বাসী খেলাফতের অধীন সময়টাকে ঠিক উপনিবেশিক বা পরাধীনতা ধরণের কিছু বলা যাবে না। তবে এরপরে আব্বাসীরা অন্যান্য শাসকদের হাতের পুতুলে পরিণত হয়। বিশেষ করে দশম শতাব্দীতে পারস্যের বুয়িদ সাম্রাজ্য এবং একাদশ শতাব্দীতে সেলজুক সাম্রাজ্যের প্রভাব বেশ লক্ষ্যনীয় বলা যায়। 

ইরাকে পারসিয়ান শাসনের শুরু মেসোপোটেমিয়া নামে পরিচিত। যার অর্থ হচ্ছে দুই নদীর মধ্যবর্তী জায়গা। দুই নদী হচ্ছে এখানে ফোরাত এবং দজলা। এই সীমানা থেকেই আধুনিক ইরাকের উৎপত্তি। খ্রীষ্টপূর্ব ৩৩৩ সালে অ্যালেকজান্ডারের আক্রমণে এই শাসনের পরিসমাপ্তি হয়। তবে অ্যালেকজান্ডারের মৃত্যু হলে তার বিশাল ভয়ংকরী সেনাবাহিনী বিভিন্ন জেনারেলদের হাত ধরে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। টলেমি যান মিশরে গিয়ে আলেকজান্দ্রিয়া থেকে শাসন করতেন। উত্তর-পশ্চিম সিরিয়ার অ্যান্টিয়োকে নতুন রাজধানী স্থাপন করে সেল্যুকাসও এশিয়ায় রাজত্ব গাড়েন। এই অ্যান্টিয়োক পরবর্তীতে গ্রীকদের থেকে আরবদের জ্ঞান-বিজ্ঞান গ্রহণের প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। 

সপ্তম শতাব্দীর শুরুর দিকে ইসলামের আগমন ঘটে। আজকের মধ্যপ্রাচ্য তখন ছিল দুই সাম্রাজ্যের মাঝে বিভক্ত। পারস্য এবং বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য। আরব থেকে উদ্ভূত ইসলামের ছড়িয়ে পড়া নতুন কিছুর খবর বয়ে নিয়ে যায়। জন্ম নেয় শক্তিশালী আরেকটি শাসনব্যবস্থা যার শিকড় আগলে গড়ে উঠেছিল সমৃদ্ধ এক সভ্যতা এবং মহিমান্বিত কিছু সোনালী সময়। 

যতই পিছনে যাই না কেন ইরাকের ইতিহাস এতই বড় যে একটি ক্যানভাসে তা আঁকা যায় না। তারচেয়ে বরং কিছু নির্দিষ্ট সময়ের আলাপ করা যাক। ইসলাম আজকের মহান সভ্যতা হওয়ার গল্প। সম্মুখ যোদ্ধা হিসেবে বাগদাদ যেখানে রেখেছিল দুর্দান্ত অবদান। জ্ঞানের সাম্রাজ্যে রাজত্ব করার গল্পই আজকে শুনানো হবে, যখন বড় বড় মনিষীগণ এখানের পথ মাড়িয়েছিল। 


গোয়েবলসীয় সংস্করণ : কাঠগড়ায় আধুনিক বিজ্ঞান লিখন

আমাদেরকে শেখানো প্রাচীন গ্রীকদের পরিসমাপ্তির মাঝে দিয়ে পৃথিবী অন্ধকারে নিপতিত হয়। যার উত্তরণ হয়েছিল ইউরোপীয় রেনেসাঁর মাধ্যমে। এর মাঝে সবই নাকি অন্ধকার, মধ্যযুগীয় কিংবা বর্বর! বিজ্ঞানের তথাকথিত এই টাইমলাইন দেখায় এই দুটো ঘটনার মাঝে কোনো বৃহৎ আবিষ্কারই হয়নি! পুরো দুনিয়ায় কালো ছায়া ছিল। আমার সবসময় ইচ্ছা ছিল দুনিয়া-পরে সত্যি ঘটনাগুলো তুলে ধরার। পশ্চিমা সংস্কৃতি এবং ঐতিহাসিক কাঠামো আমাদের যা শেখায় তা থেকে মিথগুলোকে ভেঙে ফেলার। তারা আমাদের কাছে ঋণী, আমাদের হাজার বছরের সাধনার কাছে তারা ঋণী। 

সত্য বলতে প্রাত সাতশত কিংবা এর অধিক কাল জুড়েই বিজ্ঞানের ভাষা ছিল আরবী। এটি পবিত্র কুরআনের ভাষা, যেটি মুসলিমদের ধর্মীয় গ্রন্থ এবং সমগ্র মানবজাতির জন্য সংবিধান। একইসাথে আরবী ছিল অর্ধবিশ্বজুড়ে বিস্তৃত ইসলামী খেলাফতের রাষ্ট্রীয় ভাষাও যা অষ্টম শতকের শুরুতে ছড়িয়েছিল হিন্দুস্তান থেকে স্পেন পর্যন্ত। 

“ইসলাম” শব্দের প্রতি অমুসলিমদের নেতিবাচক ধারণা বিশ্বজুড়েই বিদ্যমান। বর্তমানের তথাকথিত পশ্চিমা সেক্যুলার, সুশীল, উদারপন্থী এবং আলোকিত গোষ্ঠীর সাথে ইসলামী মূল্যবোধের ভালো রকমের সংঘর্ষ রয়েছে। তাদের এই প্রচলিত ধারণার অন্ধকারে ডুবে থাকে হাজার বছর আগেও তাদের অবস্থা এরকমই ছিল কিংবা আরোও খারাপ থাকার ইতিহাস! বৃত্তের বাইরে গিয়ে তারা ইসলামের রাজনৈতিক চালকীয় ভূমিকাকে স্বীকৃতি দিতে পারে না। ক্রুসেডের কথায় আসি; তখন কোন পক্ষটি বেশী সভ্য ছিল কিংবা বেশী গুছানো অথবা ভালোদের দলে? শিক্ষিত পশ্চিমাদেরও এ ব্যাপারে পক্ষপাতমূলক আচরণ করতে দেখা যায়। পৃথিবীর জ্ঞান-বিজ্ঞানের ইতিহাসে মুসলিমদের অবদান সম্পর্কে সম্যক অবগত থাকার পরেও তাদের দেখা যায় সবকিছুকে গ্রীকদের আনুকূল্যে টানতে। তারা বলে মুসলিমরা গ্রীক জ্ঞানকেই একটু অনুবাদ, আধটু মৌলিক এবং আরেকটু আরবীয় পদ্ধতি দিয়ে সাজিয়েছে মাত্র! যেমন খাবারের স্বাদ বাড়াতে মশলা লাগে! পিছনে ফিরলেই ১৪-১৫ শতকের ইউরোপীয় রেনেসাঁয় আমরা দেখতে পাই কিভাবে তারা এই মুসলিম ঐতিহ্যকে উপজীব্য করে আলোর পথে হেঁটেছিল! 

একজন বিজ্ঞানী এবং মানবতাবাদী হিসেবে বলতে পারি, “বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি” এবং যুক্তি আমাদেরকে নির্দেশ করে পৃথিবীকে একক দৃষ্টিতে না দেখতে। অর্থাৎ সবকিছুরই কয়েকটি উল্লেখ্য কারণ কিংবা প্রেক্ষাপট থাকতে পারে। এটাকে আমি মনে-প্রাণে বিশ্বাস করি। কোনোকিছুকে যৌক্তিকতা এবং কারণের বিচারে দেখাটাই হচ্ছে ভালো কিছুর সংজ্ঞায়ন। জ্ঞান এবং বোধ অজ্ঞতার চেয়ে হাজারগুণে শ্রেষ্ঠ। ইরাকী স্কুলগুলো আমাকে বাল্যবয়সেই ইবনে সিনা, আল-কিন্দী কিংবা ইবনে হাইছামের মত প্রসিদ্ধ চিন্তাবিদদের সাথে পরিচিত করিয়েছে। আমরা জেনেছি তারা ইতিহাসের অনন্য ব্যক্তিত্বই শুধু নন বরং আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক পূর্বপুরুষ। বিখ্যাত তাত্ত্বিক যেমন ইবনে সিনা কিংবা ইবনে রুশদ-এর কথা পশ্চিমারা জেনেছে তবে আড়ালে পড়ে আছে এরকম হাজারো নাম, কালের যাতাকলে তাদের অবস্থান হয়ত ভুলে যাওয়া হয়েছে। ইরাকেও আমি এতসব বড় বড় বিজ্ঞানীদের কথা জেনেছি ইতিহাসের ক্লাসে গিয়ে, বিজ্ঞানের ক্লাসে তাদের নিয়ে আলোচনা কমই হয়েছে। বর্তমানে মুসলিম বিশ্বের বিজ্ঞান চর্চা পশ্চিমা মডেলকেই অনুসরণ করে। অতএব এখানে আশ্চর্যান্বিত হওয়ার কিছুই নেই যে পশ্চিমা বাচ্চাদের শেখানো হবে জ্যোতির্বিজ্ঞানের গুরুরা ছিলেন কোপার্নিকাস, গ্যালিলিও অথবা কেপলার এবং তাদের আগে এ সম্পর্কিত কিছুই ছিল না! তবে হতাশা এখানেই যে মুসলিম বিশ্বেও এটাই করা হচ্ছে, তাদের ভুলিয়ে দেওয়া হচ্ছে পূর্বপুরুষদের! তারা হয়ত জানে না কিংবা ভাবতেও পারবে না রাতে দীপ্তি ছড়ানো দূর মহাকাশের অধিকাংশ তারকার নাম আরবীতে! উদাহরণ দিয়েই তবে বুঝাতে হয়; উরসা মেজর / গ্রেট বিয়ার অথবা বাংলাতে সপ্তর্ষিমণ্ডল নামে পরিচিত, অনেকেই বলে ঋক্ষমমণ্ডল বা লাঙ্গল- এদের সাতটির মাঝে পাঁচটির নামই কিন্তু আরবী মূলের! সেগুলো হচ্ছে, ডুবহে (আলফা ইউ এমএ), মেগরেয (ডেল্টা ইউ এমএ), অ্যালিয়োথ (এপসিলন ইউ এমএ), মিযার (যেটা ইউ এমএ), এবং অ্যালক্যাইড (ইটা ইউ এমএ)। 

বিভিন্ন সভ্যতার মাঝে আন্তঃসম্পর্ক বৃদ্ধির ক্ষেত্রে বিজ্ঞানের তথ্য বিস্তার সবসময় বড় ভূমিকা রেখেছে। ঐতিহাসিকদের মতে বাহ্যিক প্রমাণযোগ্য বিজ্ঞান হচ্ছে গণিত এবং জ্যোতির্বিজ্ঞান। বিশেষ করে এ দুটির অবদান আন্তঃসম্পর্ক বর্ণনার জন্য উল্লেখযোগ্য। জীবনব্যবস্থা এবং দর্শনের মত বিষয়গুলোও এক সভ্যতা থেকে অন্যটিতে বিস্তার পেয়েছে তবে খুবই ধীরে, সবশেষে একটি অপরটির সাথে মিশে যেত। এছাড়াও একইভাবে অন্যান্য প্রভাব এবং নির্দিষ্ট সাংস্কৃতিক দিকগুলোও বিস্তৃত হত। তবে প্রমাণযোগ্য বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে দরকার হত একদম সঠিক ও যথাযথ জ্ঞানের, যা লেখা হয়েছে হুবহু তাই প্রয়োজন হত পরবর্তী পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানোর জন্য। একজন ঐতিহাসিকের মতই আমার উদ্দেশ্য হচ্ছে আরবীয় বিজ্ঞানের একটি পূর্ণাঙ্গ ছবি আঁকা। সব টুকরোগুলোকে জোড়া দিয়ে এক ক্যানভাসে নিয়ে আসা। আমার লেখা থাকবে এর উদ্ভব এবং কিভাবে বিকাশ হল তা নিয়ে। এটিই আমার প্রধানতম লক্ষ্য। এ কারণেই বিজ্ঞান গ্রীক বা মুসলিম অথবা খ্রীষ্টান কিংবা ইহুদী যাদের দ্বারাই সমৃদ্ধ হোক এই লেখাতে সেটা ধর্তব্য হবে না। তবে এখানে একটি অধ্যায় থাকবে কিভাবে অন্যান্য সভ্যতার জ্ঞানকে উত্তরাধিকার হিসেবে নিয়ে ইসলামী সভ্যতা সঠিক ভাবে কাজে লাগিয়েছে তা নিয়ে। পড়তে পড়তে সবাই দেখতে পাবে কিভাবে প্রাকৃতিক বিজ্ঞান, ঔষধ, দর্শন এবং গণিতশাস্ত্রে মধ্যযুগীয় ইসলাম উচ্চতায় পৌঁছেছিল এবং পরিপক্ক হয়েছিল!

একজন তাত্ত্বিক পদার্থবিদ হিসেবে আমি পরমাণুর ভেতরকার অবস্থার সাথে বেশী পরিচিত। কিভাবে নিউক্লিয়াসে নিউট্রন, প্রোটন কাজ করে কিংবা কক্ষপথে ইলেক্ট্রন ঘুরে বেড়ায় এসবই আমাকে বেশী টানে। এই বইটি লেখা আমার জন্য ছিল সতেজতা এবং উদ্দীপনাপূর্ণ একটি সফরের মত। পূর্ব-তাত্ত্বিকদের অনেকেই যেসব বিষয়কে নেড়েচেড়ে দেখেননি কিংবা মনে করেননি যেসবকে বৃহৎ পর্যায়ে উপস্থাপন করা যায় সেসবকেও এর ছায়াতলে আনতে পেরে আমি তৃপ্ত। 


"আরবীয় বিজ্ঞান"-এর পথচলা 

পুরো বইজুড়েই “আরবীয় বিজ্ঞান” কথাটি আমি বৃহতার্থে ব্যবহার করেছি। এখানে আরবীয় দিয়ে আরব রক্তধারী লোকেদের বিজ্ঞান চর্চাকে বুঝানো হয়নি। যদি “আরব বিজ্ঞান” পরিভাষা ব্যবহার করতাম তবে সেটাকে আরব উপদ্বীপে বসবাসকারী ব্যক্তিদের বুঝাতো অর্থাৎ বর্তমান সৌদী আরব, দক্ষিণ সিরিয়া এবং মেসোপোট্যামিয়া অঞ্চলের অধিবাসীদের ও শহরের বাইরে মরুতে থাকা বেদুইনদের। এখানে “আরবীয়” বলতে রাজনৈতিকভাবে আব্বাসীদের শাসনে থাকা বুঝানো হয়েছে, যাদের রাষ্ট্রভাষা ছিল আরবী। যারা বিজ্ঞানকে আরবী ভাষায় শেখাত, শিখত, পড়ত, লিখত এবং বুঝত। মোদ্দাকথা মধ্যযুগীয় বিশ্বে বিজ্ঞানের লিঙ্গুয়া ফ্রাংকা অর্থাৎ আন্তর্জাতিক ভাষা ছিল আরবী। বর্তমান ইরাকের বসরা, কুফা এবং বাগদাদ নগরীতে নবম-দশম শতকের দিকে বিজ্ঞানের উত্তরোত্তর সমৃদ্ধি হয়েছিল। এখানে বাগদাদের ভূমিকা ছিল সর্বাধিক।

বইটির যাত্রাপথেই আমরা অনেক বিজ্ঞানীদের পাব যাদের মনোভাব ছিল আরব বিরোধী। যেমন, ইবনে সিনা কিংবা আল-বিরুনী; উভয়েই পারসিয়ান ছিলেন এবং মনোভাবগত দিক থেকে ছিলেন প্রতি-আরবীক। কিন্তু তারা বিজ্ঞানকে আরবী ভাষাতে প্রচার করেছেন, পারসিয়ান ভাষাতে নয়। তাদের হাত ধরে বিজ্ঞানের অগ্রগতি ঘটেছে আরবী ভাষার মাধ্যমে। এরকমও নয় যে স্বর্ণযুগে জ্ঞান বা বৈজ্ঞানিক সব উৎকর্ষতাই শুধুমাত্র মুসলিমদের হাত ধরে এসেছে। তবে অস্বীকার করার উপায় নেই যে ইসলামের দ্রুত প্রসার ছাড়া বৈজ্ঞানিক সৃজনশীলতার এত তড়িৎ বিস্তার হত না। তখন বেশকিছু আবিষ্কার, অংশগ্রহণ ও সহযোগীতা খ্রিষ্টান এবং ইহুদীদের থেকেও ছিল। বিশেষ করে আব্বাসী খেলাফতের শুরুর দিকে যখন গ্রীক থেকে বিভিন্ন জ্ঞান-বিজ্ঞানের বই অনুবাদের মহাযজ্ঞ শুরু হয়। তখন সেসব অমুসলিমগণ মুসলিম সম্প্রদায়ের সাথে প্রচলিত সংস্কৃতিরই অংশ হত। তাদের রীতি-নীতি, চিন্তাপদ্ধতি, শিক্ষা এবং ভাষাগত দক্ষতা মুসলিম সংস্কৃতি দ্বারাই বেষ্টিত থাকত।

এখানে “আরবীয়” বিজ্ঞানী বলতে বুঝানো হবে এমন সবদের যারা আরবী ভাষাকে বিজ্ঞান চর্চার জন্য আপন করে নিয়েছিল। এরকম নয় যে তাদের আরব উপদ্বীপের অধিবাসী বা বর্তমানের আরবী ভাষা প্রধান দেশ অথবা আরব জাতীয়তা সম্পন্ন কিংবা আরবে জন্মগ্রহণকারী হতে হবে। আরবী ভাষাকে বিজ্ঞান চর্চার ভাষা হিসেবে রেখে যারা এর অগ্রগতি এবং উৎকর্ষতায় নিজেদেরকে নিয়োজিত রেখেছিল তারাই এখানে আলোচিত।

অনেকেই পারস্য অঞ্চলে জন্মগ্রহণকারী বিখ্যাত বিজ্ঞানী; যেমন, ইবনে সিনা, আল-বিরুনীদের আরবীয় বিজ্ঞানের অন্তর্ভূক্ত করেন না! আসলেই কি এরকম সঠিক? এর বিপরীতে দারুণ একটি উদাহরণ আছে। মিশরীয় আলেকজান্দ্রিয়ান জ্যোতির্বিদ টলেমি-কে সবাই চিনি। তিনি খ্রীষ্টপূর্ব ১৫০ সালে জ্যোতির্বিজ্ঞানের ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রচনাটি লিখেছিলেন। তিনি “দ্যা আলমাগেস্ট” এর লেখক। গ্রীক বিজ্ঞানের ইতিহাসে এর দূর্দান্ত সুনাম রয়েছে। রয়েছে বৈশ্বিক স্বীকৃতি পাওয়া এর সমৃদ্ধ ইতিহাস। একজন মিশরীয় হওয়া সত্ত্বেও টলেমির বিভিন্ন কাজগুলোকে গ্রীক বিজ্ঞান বহির্ভূত কিছু ধরা হয় না। এরিস্টটল, আর্কিমিডিস কিংবা ইউক্লিডের মত টলেমিও গ্রীক বিজ্ঞানে সমান গুরুত্ব রাখে। অতএব, কেনো তবে আরবীয় বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে উল্টোটা হবে?

এখানে একটি প্রশ্ন থেকেই যায় কেন তবে একে আমরা “মুসলিম বিজ্ঞান” নাম দিচ্ছি না? “আরবীয়” এর চেয়ে “মুসলিম” শব্দটাই বেশী যুক্তিযুক্ত হত কেননা আরবী প্রধানত মুসলিমদেরই ভাষা। এখানে এর বিপরীত করার তিনটি কারণ বলব। প্রথমটি ইতোমধ্যে বলেছি, শুধু মুসলিমদের থেকেই নয় অনেক অমুসলিমদের থেকেও সেসময়ে দূর্দান্ত সব কাজ এবং সহযোগীতা এসেছিল। সপ্তম শতাব্দীতে তাকালে আমরা দেখি ইসলাম তখনো এতটা সম্প্রসারিত হয়নি। তখন মধ্যপ্রাচ্যে খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের বেশসংখ্যক জনবল বাস করত। তাদের মাঝে দুটি অংশ ছিল। এক; নেস্টোরিয়ান, যারা দক্ষিণ ইরাকের হিরা ও এডেসা এবং উত্তর সিরিয়ার অ্যান্টিয়োকে বাস করত। দুই; মনোফাইজাইটস, যারা পুরো সিরিয়া, আনাতোলিয়া এবং মিশর জুড়ে বিস্তৃত ছিল। ইসলাম আসার আগে এই অঞ্চলগুলোতে মাযদীন এবং জোরোয়াস্ট্রিয়ান ধর্মেরও ব্যাপক প্রচলন ছিল। এমনকি বৌদ্ধ ধর্মের অস্তিত্ত্বও জানা যায়। অতএব বুঝাই যাচ্ছে আরবীয় বিজ্ঞানের স্বর্ণযুগে শুধু মুসলিমরাই অগ্রপথিক ছিল না, কিছু বিশিষ্ট নাম অন্যান্য ধর্মেরও ছিল।

বাগদাদের বিখ্যাত অনুবাদক, হুনায়ন ইবনে ইসহাক ছিলেন একজন নেস্টোরিয়ান। তিনি ইসলাম গ্রহণ করেননি। নবম শতাব্দীর বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী ইয়াহিয়া ইবনে আবু মানসূর (পরবর্তীতে ইসলামে দীক্ষিত হয়েছিলেন), পদার্থবিজ্ঞানী জিবরিল ইবনে বখতিয়াশু এবং ইবনে মাসাওয়্যাহ খ্রীষ্টান ধর্মানুসারী ছিলেন। এমনিভাবে বিভিন্ন ইহুদী দার্শনিক এবং বিজ্ঞানীদের আনাগোনাও ছিল। যেমন, অনুবাদল সাহল আল-তাবারী, চিকিৎসক ইসহাক ইবনে আমরান এবং জ্যোতির্বিদ মাশায়াল্লাহ। তৎকালীন বাগদাদীয় বুদ্ধিবৃত্তিক সংস্কৃতিতে তাদের প্রত্যেকেরই গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল। একইভাবে অষ্টম থেকে একাদশ শতাব্দীর মাঝে আন্দালুসিয়ায় বিভিন্ন ইহুদী তাত্ত্বিকদের কাজগুলোকেও হিসাবের বাইরে রাখা যাবে না। এর পরবর্তীতেও যারা এই পথ ধরে হেঁটেছিল তারাও অন্তর্ভূক্ত হবে। মধ্যযুগীয় বিখ্যাত ইহুদী দার্শনিক এবং চিকিৎসক মাইমোনাইডস এরকম অন্যতম একজন ব্যক্তিত্ব, যিনি কর্ডোভায় জন্ম নিয়েছিলেন তবে জ্ঞানসাধনায় মিশরেই জীবন অতিবাহিত করেছেন।

আরবীয় বিজ্ঞানকে ভালোভাবে দেখতে হলে অবশ্যই ইসলামকে যথার্থভাবে জানতে এবং বুঝতে হবে। কিভাবে ইসলাম বৈজ্ঞানিক এবং দার্শনিক চিন্তাপদ্ধতিতে প্রভাব ফেলেছিল তা দেখতে হবে। স্বর্ণযুগের পুরোটা জুড়েই এটি ইসলামের সাথে অবিচ্ছিন্নভাবে সংযুক্ত ছিল। মূলত কুরআনকে আরো ভালোভাবে ব্যাখ্যা করতে গিয়েই প্রাথমিক যুগীয় তাত্ত্বিকরা এর প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। এছাড়াও আব্বাসী খেলাফতের শুরুতে এর অধিকাংশ রাজনৈতিক বিষয়াবলী “মু’তাযিলা”-দের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হত। তারা “কারণ ও যুক্তি”-র উপর ভিত্তি করে ইসলামকে দেখত এবং প্রচার করত। অষ্টম থেকে দশম শতাব্দীতে বসরা ও বাগদাদে তাদের প্রাধান্য ছিল। যেহেতু বিজ্ঞান কি ও কেন এর উত্তরই দেয় অর্থাৎ কারণ ও যুক্তির প্রেক্ষিতে সমাধানে পৌঁছায়, তাই তাদের মাধ্যমে বিজ্ঞান চর্চা ব্যাপক প্রসার পেয়েছিল।

অনেকেই বলে থাকে, মুসলিম বিশ্বের বৈজ্ঞানিক উৎকর্ষতা ছিল আকালিক কারণ ইসলামী সমাজের ধর্মীয় শিক্ষার সাথে এর দ্বন্দ্ব হয়েছিল। বিশেষত এখানে ইমাম আল-গাযালীর নাম এসে যায়। তার কারণেই ইসলামী বিশ্বের বৈজ্ঞানিক অগ্রযাত্রা থেমে গিয়েছিল! আসলে এটা সর্বৈব ভুল। তার পরবর্তীতেও আরবীয় বিজ্ঞান; বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখা, গণিত, ঔষধ এবং জ্যোতির্বিজ্ঞানে প্রভূত উন্নতি সাধন করেছিল।

আমাদের আশেপাশে এখন বেশসংখ্যক অ-বিজ্ঞানমনষ্ক মুসলিমের দেখা পাওয়া যায়। অথচ বিজ্ঞান নিষিদ্ধ কিছু নয়। “ইসলামী বিজ্ঞান” শব্দজোড়াটা ব্যবহার করলে আমি বেশী তৃপ্ত হতাম তবে এই কিছু সংখ্যকের জন্য এই লোভ সংবরণ করতে হল। এটি হতাশাকর যে কিছু মুসলিম তাত্ত্বিক পূর্ববর্তীদের অনুসন্ধিৎসু মস্তিষ্কের উত্তরাধিকার থেকে নিজেদের বঞ্চিত রেখেছে। অথচ প্রাথমিক যুগে আমরা স্পষ্ট দেখতে পাই সেখানে ইসলাম এবং বিজ্ঞানের মাঝে কোনো দ্বন্দ্বের লেশমাত্রও ছিল না! বলা যায়, প্রাথমিক তাত্ত্বিকগণ তাদের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য সম্পর্কে স্বচ্ছ ছিলেন। যেমন, কুরআন আল্লাহর সৃষ্টি নিয়ে গবেষণায় উদ্ধুদ্ধ করে, বলে আসমান এবং যমিনের মাঝে বিশ্বাসের প্রমাণ আছে, মুমিনদের শুধু একজন উৎসুকের চোখে তাকাতে হবে। রাসূল (সাঃ) বলে গিয়েছেন দোলনা হতে কবর পর্যন্ত জ্ঞানার্জনে লিপ্ত থাকতে। আরোও বলেছেন, “যে জ্ঞানান্বেষণে সফর করে, সে জান্নাতের পথেও এগিয়ে যায়”, এভাবেই তিনি সাহাবাদের উৎসাহ দিয়েছেন। তিনি নিজে শিক্ষা দিয়েছেন, যুদ্ধবন্দীদের দ্বারা শিখিয়েছেন। যদিও তৎকালীন অবস্থান ও পারিপার্শ্বিকতা অনুযায়ী এখানে মূলত ইসলাম সম্পর্কে জ্ঞানার্জনকেই উদ্দেশ্য করা হয়েছে। তবে ইসলাম কখনোই কোনো প্রকার জ্ঞানার্জনকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখেনি। প্রাথমিক যুগে ইসলাম ধর্মীয় এবং অন্যান্য জ্ঞানার্জনের মাঝে কোনোই পার্থক্য করেনি। এক্ষেত্রে বিভিন্ন সাহাবাদের ভাষা শিক্ষা একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ।

আব্বাসী খেলাফতে ফিরে যাই। তখন ইসলাম এবং বিজ্ঞানের মাঝে এক ধরণের তৃপ্তিকর সামঞ্জস্যতা ছিল। ধর্ম এবং বিজ্ঞানকে প্রতিপক্ষ রেখে এখন যেরকম সংঘাতময় এবং উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি করা হয় তার কোনোকিছুই তখন ছিল না! স্বর্ণযুগের গোড়ার দিকে এসব কিছুই ছিল না। তৎকালীন বিজ্ঞানকে হয়ত নানাভাবে প্রশ্ন করা যাবে, কুসংস্কারপূর্ণ ছিল, মেটাফিজিক্স (অধিবিদ্যা) এবং লোকগল্পের মিশ্রণ ছিল। বিভিন্ন ধর্মীয় মতবাদের সাথে বৈজ্ঞানিক তত্ত্বগুলোকেও মিশিয়ে ফেলা হত। পুরাণ-প্রাধান্য জ্ঞানকে প্রচার করা হত। গ্রীক বিজ্ঞানে এরকমটিই বেশী দেখা গিয়েছে। আরবীয় বিজ্ঞানে এখানেই পার্থক্য সূচিত হয়েছিল! আধুনিক বিজ্ঞান চর্চার কাছাকাছি পদ্ধতিতে তারা কাজ করত। আধুনিক বিজ্ঞান চর্চা তিনটি বিষয়ের উপর প্রতিষ্ঠিত। পরীক্ষা, পর্যবেক্ষণ এবং চল-প্রতিরূপ (সিমুলেশন)। হাজার বছর আগের আরবীয় বিজ্ঞানেও আমরা এরকম পদ্ধতিগুলোর দেখা পাই। আধুনিক পদ্ধতির খুব কাছাকাছি কিছুই তারা কায়েম করতে পেরেছিল। কোনোকিছু প্রমাণে তারা স্পষ্ট গবেষণামূলক তথ্য, পরিক্ষালব্ধ ফলাফল এবং তত্ত্বের সাথে পরীক্ষালব্ধ ফলাফলের যৌক্তিকতাকে পেশ করত। উদাহরণস্বরূপ, অনেকেই জ্যোতিষবিদ্যা এবং আলকেমি বা কিমিয়াকে বাস্তবিক বিজ্ঞানের শাখা হিসেবে নাকচ করেছিল। জ্যোতির্বিজ্ঞান এবং রসায়নশাস্ত্রের সাথে উপরোক্ত দুটির যথাযথ পার্থক্য তারা দেখিয়েছিল।

বাস্তবিক ভাবে “ইসলামিক বিজ্ঞান” কিংবা “মুসলিম বিজ্ঞান” পরিভাষাগুলো যৌক্তিক নয়। বিজ্ঞানকে কোনো অঞ্চলীয় মানদণ্ডে কিংবা কোনো একটি নির্দিষ্ট সময়ে কারা চর্চা করেছে এর মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা যাবে না। ১৯৩০ এর দিকে জার্মানীও আইনস্টাইন এবং তার আবিষ্কারকে অসম্মান করে “ইহুদী বিজ্ঞান” উপাধি দিয়েছিল। আমরা যদি এখন “ইসলামিক অথবা মুসলিম বিজ্ঞান” পরিচয়ে নিজেদের আখ্যায়িত করি তবে অনেকটা ওরকমই হয়ে যায়। সর্বোপরি এর গুরুত্ব সীমাবদ্ধ হয়। যেমন ভাবে ইহুদী বিজ্ঞান, খ্রিষ্টীয় বিজ্ঞান থাকতে পারে না একই ভাবে ইসলামিক বিজ্ঞান নামক পরিভাষারও অস্তিত্ব থাকা উচিত নয়। বিজ্ঞান এখানে শুধুই “বিজ্ঞান”।

আমি মনে করি “আরবীয় বিজ্ঞান” শব্দজোড় ব্যবহার করাটাও ভুলের অংশ। একেতো এটি সবার মাঝেই খুবই স্বল্পমাত্রায় পরিচিত, তাই সহজেই কেউ বুঝবে না কি বুঝানো হচ্ছে। “আরবীয়” বললে প্রথম দফায় আরবের লোকই বুঝা স্বাভাবিক। বিশেষ করে ইরান, উজবেকিস্তান এবং তুর্কমিনিস্তানের লোকেদের জন্য এটি কিছুটা নেতিবাচক শুনায়, তারা ইসলামের বিভিন্ন পর্যায়ে বাঘা বাঘা সব তাত্ত্বিকদের জন্ম দিয়েছিল। তাই দেখাই যাচ্ছে অঞ্চল্ভিত্তিক কিংবা ভাষাভিত্তিক বিজ্ঞানের কোনো নির্দিষ্ট যুগের নামকরণ করলে সমস্যা থেকেই যাবে। ইউরোপীয় রেনেসাঁর সময় বিজ্ঞান যে গতি পেয়েছিল তাকেও কিন্তু আমরা “ল্যাটিন বিজ্ঞান” বলি না। আধুনিক কালে ইংরেজী যখন বিজ্ঞানের লিঙ্গুয়া ফ্রাংকা হয়ে উঠেছে একেও “ইংলিশ বিজ্ঞান” নামক পরিভাষা দিয়ে বর্ণনা করা হচ্ছে না। তবে “ইসলামিক” শব্দটার চেয়ে ইসলামী স্বর্ণযুগের বিজ্ঞান চর্চাকে “আরবীয়” নামে অভিহিত করাটা অনেকটাই নিরাপদ। মূলত বিজ্ঞানের প্রসারতা একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে হয়ে আসছে। গ্রীকদের থেকে যদি শুরু হয় ভারতে এসে সেটা পেয়েছিল কিছুটা অগ্রগতি, চীনেও হয়েছিল বহুল উন্নতি, মুসলিমদের হাতে পড়ে আরবী ভাষার মাধ্যমে করেছে নিজস্ব রেনেসাঁর সূচনা, দিয়েছে একটি প্রমাণ পদ্ধতি এবং সুগর্বপূর্ণ ইতিহাস, অবশেষে ইউরোপীয় রেনেসাঁ উত্তর যুগে এটি ইংরেজীর মাধ্যমে বিস্তৃত হচ্ছে। এইযে এতগুলো ভাষা কিংবা অঞ্চল পেরিয়ে বিজ্ঞান এগিয়েছে তাতে জ্ঞানের কোনো তারতম্য হয়নি। এদের মাঝে কোনো বিশেষ পার্থক্য দেখা যায় না। শুধু উৎকর্ষতা পেয়েছে। তাই এইসব সময়কে বা অঞ্চলভিত্তিক চর্চা অথবা ভাষাভিত্তিক চর্চাকে আলাদা নামে ডাকাটা হবে অতিরিক্ত বিশেষায়ন। তবে “ইসলামী স্বর্ণযুগীয় তাত্ত্বিকদের দ্বারা চর্চিত বিজ্ঞান” নামে পরিচিতি করাতে কারোরই দ্বিমত হওয়া উচিত নয়, এটা শুনতেও বেশ ভালো এবং উদ্দেশ্যও পরিষ্কার ভাবে ফুটে উঠে। 

চলবে.....

 



একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ