লেখা তরজমা

আইন জালুত : ফিরে আসার প্রান্তর






[১]

ওয়া ইসলামাহ!  ওয়া ইসলামাহ! ওয়া ইসলামাহ!

বলে চিৎকার করতে করতে শিরস্ত্রাণ ফেলে দিয়ে উম্মুক্ত তরবারী হাতে নিয়ে ঘোড়ার লাগাম ধরে তীব্রগতিতে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে আক্রমণ চালালেন সুলতান কুতুজ। মুসলিম বাহিনীর লেফট ফ্ল্যাংক প্রায় ধ্বংসের পথে। কাভার না দিতে পারলে ঘিরে ফেলবে মোঙ্গলরা। এবং তাতে হয়ত দুনিয়া হতে মুছে যেতে পারত সাতশ বছর ধরে বিস্তৃতি পাওয়া মহিমান্বিত আদর্শ ইসলাম। 

১২৬০ সাল। চেঙ্গিস খান মৃত্যুবরণ করেছেন আরোও ৩৩ বছর আগে। তবুও মোঙ্গলদের জয়রথ থামেনি। বেশিদিন নয়, দুবছর আগের বাগদাদের ধ্বংসযজ্ঞ এখনো কেউই ভুলেনি। বায়তুল হিকমাহ এর বইপোড়া ছাইয়ে যখন ফোরাতের স্রোত থেমে গিয়েছিল তারও ক্রীড়নক ছিল এই হালাকু খানই। দেড়লাখ সৈন্য নিয়ে ঝাপিয়ে পড়েছিল সে স্বর্ণনগরী বাগদাদে। দশ লক্ষ লোককে মৃত্যুশয্যায় শায়িত করে থেমেছিল তার ঘোড়ার পদচতুষ্টয়। তাকে বলা হত শয়তানের ঘোড়সওয়ার বা ডেভিলস হর্সম্যান। 

পাঁচ বছরের প্রচেষ্টায় মঙ্গোলদের ইতিহাসের সর্ববৃহৎ বাহিনী তৈরি করেছিল সে। চেঙ্গিস খানের স্বপ্নপূরণের জন্য কাউকেই ছাড় দেয়া হবেনা নীতিতে বিশ্বাসী হালাকু খান পুরো দুনিয়াকে দেখতে চাইত মোঙ্গল পতাকার নিচে। আগে মুসলিমদের শেষ করি অতঃপর বাকিদের দিকে যাব নীতিতে ক্রুসেডারদের সাথে মৈত্রী হল তার। সিসিলিয়ান, আর্মেনিয়ান, জর্জিয়ান ক্রুসেডাররা পথ দেখাল মোঙ্গল বাহিনীকে আলেপ্পোতে আসার। তাদের সহযোগীতায় পতন হল সমৃদ্ধ নগরী আলেপ্পোর। বিশেষ সহযোগীতার জন্য পুরষ্কৃত হল প্রিন্স অব অ্যান্টিয়ক এবং প্রিন্স অব ত্রিপোলি।



[২]

“ হয় আত্মসমর্পণ করো নয়তো ভয়াবহ মৃত্যু!”

মামলুক সুলতান কুতুজের কাছে এরকমই এক পত্র পাঠাল হালাকু খান। মোঙ্গলদের ধ্বংসযজ্ঞ সম্পর্কে সবাই অবগত। রাজ দরবারের আমীর ওমরারা বলল যা চায় এই নরপিশাচরা তাই দিয়ে দিতে তাদের। কাপুরুষদের ইতিহাস কখনোই ক্ষমা করেনা। 

“যা চায় তাই দিয়ে দেয়া হোক, লুটপাট করে তারা চলে যাবে।” এই কথাতে বিশ্বাসী হয়েই ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল মুসলিমদের সমৃদ্ধ, সুন্দর, ইতিহাস বিধৌত সব নগরীগুলো। বাগদাদ, খোরাসান, মার্ভ, উরগঞ্জ(উজবেকিস্তান) এরকম কত নামই তো আসবে তালিকায়। ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল খাওয়ারিজম সাম্রাজ্য। ধ্বংস হয়েছিল সেলজুক সাম্রাজ্য, আব্বাসী খেলাফতও। 

হালাকু খানের পত্র 

সুলতান কুতুজ এই ইতিহাস জানতেন। একই যে ভুলটা মুসলিমরা বারবার করে আসছিল সেটিই তিনি চাইলেন শোধরাতে। তাছাড়া উপায়ও ছিলনা কোনো। ১২২১ সালে সিন্ধুনদের পাড়ে সুলতান জালালুদ্দীনের পরাজয়ে খাওয়ারিজম সাম্রাজ্যের পতন হল, ১২৪৩ এর কোসে দাগ যুদ্ধের মাধ্যমে সেলজুক সাম্রাজ্য চলে গিয়েছিল মোঙ্গল নিয়ন্ত্রণে, ১২৫৮ এর বাগদাদ আক্রমণে আব্বাসী খেলাফতও যখন বিলুপ্ত হল মুসলিম উম্মাহের শেষ আশ্রয় বলতে তখন টিকে ছিল মাত্র দুটি জায়গা। ১২৫০ সালে অভ্যন্তরীণ কোন্দলের জেরে ততদিনে মিশর-সিরিয়ায় টিকে থাকা আইয়ুবী সাম্রাজ্যও ভেঙে কয়েক টুকরো হয়েছিল। সেখান থেকেই জন্ম নিল নতুন এক সালতানাত, মামলুক সালতানাত। তাদেরই এক অংশ তখন দিল্লিতে বসে ভারতবর্ষকে শাসন করত।  মুসলিম উম্মাহের আশার বাতি হয়ে রইল শেষ পর্যন্ত এই মামলুকরাই, যারা একসময় আব্বাসী এবং পরবর্তীতে আইয়ুবীদের দাস ছিল। 

একজন মামলুককে কঠোর পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে যোগ্য হতে হত। তাদেরকে আলাদা ভাবে বাছাই করা হত সেনা বাহিনীতে এলিট ইউনিট বানাবার উদ্দেশ্যে। তাদের থেকেই বাছাই করে সুলতানের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা বাহিনী তৈরি করা হত। সেজন্য তাদের শিক্ষা-দীক্ষা সহ সবকিছুই হত অনেক বেশি উন্নতমানের। তীব্র নৈতিকতাবোধ সম্পন্ন হত তারা। শুধু যুদ্ধে নয়, বিচার-বুদ্ধিতেও তাদের দক্ষতা, যোগ্যতা হত ঈর্ষনীয়। যদি কোন মামলুক তার দক্ষতা, যোগ্যতা, উৎকর্ষতার প্রমাণ দেখাতে পারত তবে তার জন্য রাজদরবারে উপযুক্ত পদও পাওয়া যেত। আমীর ওমরা থেকে শুরু করে আরো উচ্চপদও পেত তারা। তারই ধারাবাহিকতায়, আইয়ুবীদের ক্রমবর্ধমান অযোগ্যতায় রাষ্ট্রক্ষমতা রক্তের মাধ্যমে হস্তান্তর হল মামলুকদের কাছে। মৃত্যুবরণ করতে হল শেষ আইয়ুবী সুলতানকেও। 



[৩]
সভাস্থলে সুলতান কুতুজ গর্জে উঠলেন, “মিশর এখন তার সুলতানকে যোদ্ধারূপে চায়। যদি কেউই না আসো, তবে আমি একাই যাব এবং তাতারদের সাথে লড়াই করব।”
যখন নেতা পাগল হয়ে যান, অনুসারীদেরকে আলাদাভাবে বলা লাগেনা যে তাদেরও পাগল হতে হবে। যদি প্রশ্নটা হয় ইসলামের অস্তিত্ব বাঁচানো তবে সেখানে অন্য কোন অপশন ভাবার সুযোগ কই? 

যখন উদ্দেশ্য, লক্ষ্য, পথ এক থাকে সব শত্রুতা তখন কেবলমাত্র আল্লাহর জন্যই ভুলে থাকা যায়। এখানেই মুসলিমদের ইউনিটি, একতা। যেখানে একমাত্র সৃষ্টিকর্তার জন্যই ভালোবাসা এবং তার জন্যই শত্রুতা করা যায়। জাগতিক স্বার্থ এখানে তুচ্ছ। বিভাজন বহুদিক দিয়ে হলেও বিশ্বাসের ঐক্যটাই আমাদেরকে কাছে আনে, একত্রিত রাখে, সমৃদ্ধ করে। মামলুকদের মাঝেও জাতিগত বিভাজন খুব ভালোভাবেই ছিল। আইবাক মামলুকরা দেখতে পারত না বাহারিয়্যা মামলুকদের। একই কথা বাহারিয়্যারাও দেখতে পারত না আইবাকদের। সুলতান কুতুজ ছিলেন আইবাক ধারার অপরদিকে কমান্ডার বাইবার্স ছিলেন বাহারিয়্যা ধারার মামলুক। তবুও ইসলামের স্বার্থে সুলতান কুতুজের আমন্ত্রণে দামেস্ক থেকে ছুটে এলেন বাইবার্স। অভিজ্ঞ সেনা কমান্ডার, তীক্ষ্ণ সুবুদ্ধির অধিকারী, জিনিয়াস ওয়ার ট্যাক্টিশিয়ান এবং একজন গ্রেট লীডার। তবে এরজন্য আলেপ্পোর ক্ষমতা হারাতে হবে সুলতান কুতুজকে যদি তারা বিজয়ী হয়। আলেপ্পো দিয়ে দিতে হবে কমান্ডার বাইবার্সকে। সপ্তম ক্রুসেডে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করেছিলেন তারা দুজনেই। সাইফ আল দীন কুতুজ এবং রুকনুদ্দিন বাইবার্স। তখন ছিল ১২৫০ সাল। ফ্রান্স সম্রাট লুই দ্যা নাইন্থ বন্দী হয়েছিল তাদের কারিশমায়। ব্যাটল অব আল মানসুরাহতে তাদের কৃতিত্ব আজও ইতিহাসকে সমৃদ্ধ করছে।  

সব রাইভালিটি ভুলে গিয়ে একত্রে বসে যুদ্ধ পরিকল্পনা সাজালেন যেভাবে ক্রুসেডে খ্রীষ্টানদের পরাজিত করেছিলেন। পরিকল্পনা হল এবার শিকার হওয়া যাবেনা। বরং শিকারীকে শিকার করতে হবে। টোপ দেখিয়ে শিকারীকে মধ্য জঙ্গলে নিয়ে এসে ঝাপিয়ে পড়তে হবে আহত বাঘের মত। আহত বাঘের গর্জন যতটা না ভয়ংকর তার থাবা আরোও বেশি বিষাক্ত। মুসলিমরা তখন আহত বাঘের মত। দৌড়িয়ে যখন শিকার করাই যাবেনা তো শিকারকেই ডেকে আনা যাক নিজেদের ডেরায়। 

চব্বিশটি জেলা নিয়ে মিশর এবং সিরিয়ায় বিস্তৃত ছিল মামলুক সাম্রাজ্য। ফরমান জারী হল, প্রতি অংশ থেকেই কমপক্ষে এক হাজার করে সৈন্য দিতে হবে। যুদ্ধের ময়দানে কমান্ডারের আদেশ না শুনা মানে মৃত্যু। আগুনে ঝাপ দিতে বললে তাই করবে সৈন্যরা কারণ কমান্ডার না বুঝে সিদ্ধান্ত দিবেন না। মোট চব্বিশ হাজার সৈন্য তৈরি হয়ে গেল লড়াইয়ের জন্য। 

ওদিকে হালাকু খান তার ষাট হাজার পরীক্ষিত সৈন্য নিয়ে দূত পাঠিয়ে অপেক্ষা করছিলেন আলেপ্পোয়। স্বপ্ন দেখছিলেন মিশর ধ্বংস করে উত্তর আফ্রিকা প্রবেশ করে জিব্রাল্টার প্রণালী দিয়ে ঢুকে সহজেই ইউরোপকে কবজা করে চেঙ্গিস খানের স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য বহুধাপ এগিয়ে যাবেন তিনি। এই বিপদ সম্পর্কে খ্রীষ্টানরাও অবগত হল। যদিও তারা চেয়েছিল মুসলিমদেরকে ধ্বংস করে দেবার এই সুবর্ণ সুযোগকে হাতছাড়া না করতে কিন্তু পোপের আদেশে একটি বড় অংশকেই নিষ্ক্রিয় থাকতে হল। কারণ এটা বুঝতে বাকি ছিলনা যে মুসলিমদের পরেই মোঙ্গলদের কালো হাত ক্রুসেডারদেরই গলায় শিকল পরাবে। 

তবে হালাকু খান খবর পেল তার দূতদের দ্বিখন্ডিত করে কায়রোর প্রধান ফটকে ঝুলানো হয়েছে। আগে একবার মোঙ্গল দূত হত্যা করেছিলেন খাওয়ারিজম সাম্রাজ্যের সুলতান আলাউদ্দীন শাহের এক অবিবেচক গভর্নর। যার মূল্য দিতে হয়েছিল তাকে সাম্রাজ্য হারিয়ে। তার ছেলে সুলতান জালালুদ্দিন মোঙ্গলদের বহুদিন প্রতিরোধ করেছিলেন। তবে তিনিও কাজ অসমাপ্ত রেখেই চলে গিয়েছিলেন। দূত হত্যা মানে যুদ্ধ অনিবার্য। 

মোঙ্গলদের সাথে এই প্রথমবার মুসলিমরা একমত হল, “মানবজাতির পথ একটাই, যুদ্ধ।”



[৪]
“খানই খাকান মংকে খান মৃত্যুবরণ করেছেন।” 

এরকম চিঠি পেয়ে আলেপ্পো থেকে দ্রুত কারাকোরামের দিকে ছুটতে হল হালাকু খানকে। কারণ নতুন খান নির্বাচন হবে। চেঙ্গিস খানের সব জীবিত বংশধরকে সেখানে অবশ্যই উপস্থিত থাকতে হবে। বিশ্বস্ত সেনাপতি কিতবুকার অধীনে দুই টুমেন সৈন্য অর্থাৎ বিশ হাজার সৈন্য দিয়ে মতান্তরে এক টুমেন (দশ হাজার) সৈন্য দিয়ে বাকিদেরকে নিয়ে কারাকোরামের দিকে ছুটলেন হালাকু খান। মোঙ্গল বংশেও ততদিনে ইসলাম প্রবেশ করেছে। হালাকু খান না গেলে বারকে খানের প্রভাবে হয়ত নতুন খান নির্বাচিত হবে এবং তাতে ভাগ্য খারাপ হবে হালাকু খানের। বারকে খান ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন এবং শপথ করেছিলেন বাগদাদ ধ্বংসের অপরাধে হালাকু খানকে কখনোই স্বস্তি দিবেন না তিনি। 

এই সুযোগকে সবচেয়ে কার্যকর ভাবে কিভাবে কাজে লাগানো যায় তার পরিকল্পনা করেই ফরওয়ার্ড মার্চ করলেন সুলতান কুতুজ। মিশরে রিয়ারগার্ড হিসেবে রেখে গেলেন চব্বিশ হাজারের মধ্যে দশ হাজারকে। ক্রুসেডারদের থেকে শহরকে রক্ষার জন্য। চৌদ্দ হাজার গঠিত হয়েছিল এলিট মামলুক, বেদুইন, তুর্কমেন, লিবিয়ান হাওয়ারাহ এবং মঙ্গোলিয়ান যাযাবরদের দ্বারা। ভ্যানগার্ড হিসেবে বাইবার্স কিছু সৈন্য নিয়ে অগ্রসর হলেন জর্ডান নদীর অববাহিকার দিকে। আর সুলতান কুতুজ বাকিদের নিয়ে চললেন বর্তমান ফিলিস্তিনের গাজার অদূরে অবস্থিত আইন জালুত প্রান্তরে। 

আইন জালুত উপত্যকাটি বিখ্যাত ছিল আরোও একটি কারণে। এই ময়দানেই মুখোমুখি হয়েছিলেন তালুত এবং জালুত। জালুতকে ইউরোপীয়রা গোলিয়াথ বলে। তালুতের বাহিনীতেই একজন সাধারণ সৈন্য হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন বালক দাউদ(আঃ)। জালুতের দ্বন্দ্ব আহবানে সেই বালক দাউদ(আঃ) এগিয়ে এসেছিলেন এবং আল্লাহর কুদরতে একটি ছোট্ট পাথরের আঘাতে তাকে হত্যা করেছিলেন। এটিই সেই প্রান্তর। যেন ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হবে আবার। আবারো একই ময়দানে সত্য মিথ্যার দুইটি পক্ষ। ফলাফল আল্লাহর হাতে কিন্তু চেষ্টা আমাদেরকেই করতে হবে।



[৫]
মুসলিম বাহিনীর ফরওয়ার্ড মার্চের খবর পেয়ে কিতবুকাও রওনা হলেন প্রতিরোধের উদ্দেশ্যে। হালাকু খানের বিশ্বস্ত পার্শ্বচর কিতবুকা ছিলেন যতটা অভিজ্ঞ ততটাই বেশি ওয়ার ট্যাকটিক্সেও পারদর্শী। সে চাইল পিছন থেকে গিয়ে সুলতান কুতুজের বাহিনীকে বিভক্ত করতে। তাই লেক টাইবেরিয়াসের পূর্ব তীর ঘেষে এগিয়ে গিয়ে জর্ডান নদীর পার হয়ে ওপারে পৌঁছে পশ্চিমে যেতে চাইলেন তিনি। যাতে মুসলিম বাহিনীকে পেছন থেকে চেপে ধরতে পারেন। আবার অন্যদিকে ল্যাটিন ক্রুসেডাররা সুলতান কুতুজের চিঠি পেয়ে তাদের করিডোর মুসলিম বাহিনীর জন্য উম্মুক্ত করে দিল। যাতে করে মুসলিমরা সহজেই তাদের মালামাল, সৈন্য স্থানান্তর করতে পারল মোঙ্গলদের দৃষ্টির আড়ালেই। কারণ তারা মোঙ্গলদের বেশি বিপদজনক ভেবেছিল মুসলিমদের থেকে। 

মোঙ্গলদের যুদ্ধ ট্যাকটিক্স ছিল সমতল ময়দানের জন্য পারফেক্ট। সেখানে তাদের বিভিন্ন ট্যাকটিক্স গুলো দারুণ ভাবে কাজ করত। যেমন, ফেইন্ড রিট্রিট অর্থাৎ পালানোর ভান করে হঠাৎ ঘুরে দাঁড়ানো, আবার পার্থিয়ান শট অর্থাৎ ঘোড়ায় চড়া অবস্থাতেই হঠাৎ নিচু হয়ে কিংবা পিছনে ঘুরে তীর নিক্ষেপ, ঘোড়াকেই ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা, এসব সহ আরো কিছু ট্যাকটিক্স যেগুলো সাধারণত সমতল ময়দানের জন্য ছিল যথেষ্ট ভয়ংকর। মোঙ্গল ঘোড়াগুলোও আকারে হত মাঝারী গড়নের তবে তাদের জীবনিশক্তি থাকত প্রচুর। অল্প ঘাস খেয়েই অনেকদিন বেঁচে থাকত পারত একটি মোঙ্গল ঘোড়া। আর যুদ্ধে লাইন ফরমেশনের ক্ষেত্রে যথাসম্ভব কম লাইনে দাঁড়াত মোঙ্গলিয়ানরা। কেননা তারা চাইত একযোগে যত বেশি এলাকা কাভার করে আক্রমণ করা যায় এবং তাতে সুবিধা হয় যে শত্রুকে ঘিরেও ফেলা যায়। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজটি ছিল মোঙ্গলদের শত্রুকে তাদের পছন্দনীয় জায়গায় নিয়ে এসে আক্রমণ করা। এতে করে যুদ্ধজয় নিয়ে কোন সমস্যাই হতনা। তাই বলা হত মোঙ্গলরা কখনোই যুদ্ধে অবতীর্ণ হবেনা যে যুদ্ধজয় সম্পর্কে তারা নিশ্চিত নয়। 

এসব ভাবনাগুলো সুলতান কুতুজ এবং বাইবার্সের পরিকল্পনাতেও ছিল। তাই তারা চেয়েছিল এবার মোঙ্গলদেরকে তাদের পছন্দনীয় জায়গায় মুসলিমদের নিয়ে গিয়ে আক্রমণ করতে দেয়া যাবেনা বরং তাদেরকেই মুসলিমদের সাজানো প্লটে নিয়ে এসে আক্রমণের মুখে ফেলতে হবে। আহত বাঘের সম্মুখে পড়লে আর আস্ত থাকতে হবেনা তাহলে। 

সুলতান কুতুজ আইন জালুতে গিয়ে ঘাটি গাড়লেন জাযরিল ভ্যালিতে। যার একপাশে ছিল মাউন্ট গিলবোয়া অন্যপাশে গ্যালিলি পাহাড়শ্রেণী। পর্যাপ্ত গাছে ঢাকা এই উপত্যকা কমান্ডো ট্যাকটিক্স কিংবা লুকিয়ে থেকে হঠাৎ আক্রমণের জন্য যথেষ্ট উপযোগী ছিল। তাই সুলতান কুতুজ তার বাহিনীকে সহজেই লুকিয়ে রাখতে পারলেন গাছপালার ফাকে। উৎ পেতে রইলেন হিংস্র শিকারী বাঘের মত।

জর্ডান নদী পার হয়ে এপারে আসতেই মুহুর্মুহু তীরের আক্রমণের শিকার হল কিতবুকার অপ্রস্তুত বাহিনী। তবে ধকলটা গেল সিসিলিয়ান হেভি আর্মাড ক্যাভালরি এবং ফ্রাংকিশ ক্রুসেডারদের উপর দিয়ে। কারণ তারা ভ্যানগার্ড হিসেবে আগে আগে চলে পথ দেখাচ্ছিল। নদী পার হয়ে বাহিনী গুছাতে গুছাতে কিতবুকা খেয়াল করল আশেপাশে আর কোন মুসলিম বাহিনী নেই শুধু এই ছোট্ট দলটি ছাড়া। মনে মনে খুশি হয়ে কিছু সৈন্য ক্রুসেডারদের সাহায্যে পাঠিয়ে বাকিদেরকে রিজার্ভ রাখল। 

এখানে মুসলিম বাহিনীর নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন রুকনুদ্দিন বাইবার্স। রণক্ষেত্রের চিতা বলে ডাকা হত তাকে। মুসলিম বাহিনীর কিয়দংশ নিয়ে এখানে এসেছিলেন তিনি মোঙ্গলদেরকে টোপ দিতে। কিতবুকা যখন দেখতে পেল আর কোন মুসলিম বাহিনী নেই, তখন একটি বড় ভুল করে বসল। তার বাহিনীকে অল আউট এটাকের জন্য প্রস্তুত করে ফরমেশন সাজাল। আর অন্যদিকে কমান্ডার বাইবার্স খুবই ধীরে ধীরে পিছুতে থাকলেন আইন জালুতের ফাঁদের দিকে। 

কমান্ডার বাইবার্স মূলত হিট এন্ড রান ট্যাকটিক্স প্রয়োগ করছিলেন। হঠাৎ করে সামনে এসে পড়তেন, হালকা ক্ষয়ক্ষতি করেই আবার উধাও হয়ে যেতেন। মোঙ্গলদের মাঝারী গড়নের সমতল উপযোগী ঘোড়াগুলোর এরকম পাহাড়ী পথে চলার অভ্যাস তো ছিলই না তার উপর আরবী ঘোড়ার তেজের সাথে তাদের পেরে উঠার কথাও না। তাই কমান্ডার বাইবার্সের হিট এন্ড রান ট্যাকটিক্স ভালোই কাজে দিচ্ছিল এবং মোঙ্গল বাহিনীও এসব ক্ষয়ক্ষতির সমুচিত জবাব দিতে না পেরে বাইবার্সের পিছু নিয়েই যাচ্ছিল। 

ক্ষয়ক্ষতির প্রতিশোধ এবং প্রতিশোধ নিতে না পারলে মোঙ্গল ক্রোধ থামবেনা, গর্ব কমে যাবে এসবের তাড়নাতেই কিনা কিতবুকাও অন্ধভাবে পিছু করেই যাচ্ছিল। তবে অবশ্যই আল্লাহ উত্তম পরিকল্পনাবিদ। অবশেষে আইন জালুতের কাছে এসে বুঝতে পারল এতদিনের শিকারি আজ শিকারে পরিণত হতে যাচ্ছে। 



[৬]
কিতবুকার ভুল ভাঙতে ভাঙতেই দেখল ইতোমধ্যে তিনদিক থেকে সে অবরুদ্ধ হয়ে গিয়েছে। সুলতান কুতুজের নির্দেশে মুসলিম রাইট ফ্ল্যাংক বাইবার্সের সাহায্যে এগিয়ে আসল। সেন্টারে দাঁড়িয়ে গেলেন সিংহপুরুষ কমান্ডার বাইবার্স। পিছনে রিজার্ভ নিয়ে সুলতান কুতুজ নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন এবং লেফট ফ্ল্যাংক তখনো নিজ অবস্থানে জোরদার ভাবে দাঁড়িয়ে রইল। সাথে থাকল আধুনিক হ্যান্ড কামানের আদলে এক ধরণের যন্ত্র দিয়ে গড়া মিদফা ইউনিট। 

কিতবুকা সাহসী এবং যোগ্য কমান্ডার ছিলেন। তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তে আদেশ দিলেন ফেইন্ড রিট্রিটের। কিন্তু মুসলিমরা সেই ফাঁদ সম্পর্কে আগেই অবগত থাকায় তাকে আশাহত হতে হল। তখন ময়দানে দাঁড়িয়ে শেষ রক্তবিন্দু পর্যন্ত লড়াই করা ছাড়া আর কোন পথই মুক্ত থাকলনা তার কাছে। একজন যোগ্য কমান্ডার কখনোই তার সৈন্যদের একা রেখে যুদ্ধের ময়দান ছাড়েন না যদি সৈন্য মৃতও হয়। কিতবুকা তার প্রমাণ রাখলেন। 

মোঙ্গলদের হার না মানা মানসিকতা যেন আরেকবার জয়ের দিকেই নিয়ে যাচ্ছিল তাদের। রাইট ফ্ল্যাংক এবং সেন্টারে বিপর্যস্ত হলেও লেফট ফ্ল্যাংককে ক্ষতির সম্মুখীন করাতে পারল তারা। লেফট ফ্ল্যাংক গঠিত হয়েছিল বেদুইন এবং সদ্য আলেপ্পো হারানো সিরীয় সেনাদের দ্বারা। সিরীয় সেনারা সম্মুখভাগে থাকায় মোঙ্গলদের নিয়ে পূর্বভীতির কারণে ঘাবড়িয়ে পিছু হটতে গেলে তড়িৎ সিদ্ধান্তে কিতবুকা চাইল লেফট ফ্ল্যাংক গুড়িয়ে দিয়ে পাহাড় অতিক্রম করে পেছন দিক থেকে মুসলিম বাহিনীকে ঘিরে ফেলবেন। এরজন্য সে তার সম্পূর্ণ রিজার্ভ ফোর্স মুসলিম লেফট ফ্ল্যাংকে লেলিয়ে দিল। যাকে বলে এনভেলপ ট্যাকটিক্স। এরপর হবে শুধু কচুকাটা। তবে এর মাধ্যমে দ্বিতীয় ভুলটি করে বসল সে। এতে করে তার নিজের অবস্থান উম্মুক্ত হয়ে গেল কমান্ডার বাইবার্সের সামনে।

পাহাড়ের উপর থেকে এসব সবই লক্ষ্য রাখছিলেন সুলতান কুতুজ। লেফট ফ্ল্যাংককে বিধ্বস্ত হতে দেখে নিজেকে আর দূরে রাখতে পারলেন না যুদ্ধ থেকে। ওয়া ইসলামাহ! ওয়া ইসলামাহ! ওয়া ইসলামাহ! চিৎকার করতে করতে শিরস্ত্রাণ ফেলে দিয়ে নিজেকে উম্মুক্ত করে সৈন্যদের কাতারে নিয়ে এলেন। সুলতানকে চিনতে পেরে এবং নিজেদের কাতারে দেখে সৈন্যদের স্পৃহা হাজার গুণে বৃদ্ধি পেয়ে গেল। মোঙ্গলিয়ান রিজার্ভ ফোর্সকে সামলাতে সুলতানের তেজী আক্রমণ যথেষ্ট হচ্ছিল না। তবে তখনো মুসলিমদের ট্রাম্পকার্ড প্রদর্শিত হয়নি। 

আধুনিক হ্যান্ড কামানের আদি পুরুষ “মিদফা।” যুদ্ধের আগেই পরিকল্পনা ছিল, মোঙ্গলদের শুধুমাত্র সৈন্যসংখ্যা, ট্যাকটিক্স দিয়ে থামানো যাবেনা বরং এমন কিছু লাগবে যা পৃথিবী আগে দেখেনি। একেবারেই নতুন কিছু। সেখান থেকেই উৎপত্তি হল মিদফার। মিশরীয় ইঞ্জিনিয়াররা এটার ডেভেলপ করে তৎকালীন বিবেচনায় সর্বাধুনিক অস্ত্র হিসেবে উপস্থিত করলেন। যা হাতেই বহন করা যেত এবং গোলার সাথে বিকট আওয়াজও বের হত। 

সুলতান চারহাজার মামলুককে এই দিনের জন্যই বিশেষভাবে প্রস্তুত করেছিলেন। তাদের বলা হত মামলুক এলিট ফোর্স। মিদফার বিকট আওয়াজে মাসের পর মাস তারা অনুশীলন করেছেন যুদ্ধের। তাই মামলুক ঘোড়াগুলো অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিল মিদফার তীব্র আওয়াজের সাথে। কিন্তু এই তীব্র, বিকট আওয়াজের সাথে মোঙ্গল ঘোড়াগুলো মানিয়ে নিতে পারলনা। ঘোড়াগুলো মুখ ঘুরিয়ে বিপরীত দিকে উর্ধশ্বাসে দৌড়াতে থাকল, পালাতে থাকল। মুহূর্তেই পাশার দান উলটে গিয়ে ময়দান মুসলিমদের হাতের তালুতে চলে আসল। 

“আমাদের এখানেই মরতে হব, খান দীর্ঘজীবী এবং সুখী হোক” বলে কিতবুকা অল আউট এটাকের ডাক দিলেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই কমান্ডার বাইবার্সের বাহিনীর হাতে ধরাশায়ী হলেন কিতবুকা এবং মারা গেলেন। 

পতাকা অথবা কমান্ডার, যেকোন একটি পড়ে গেলেই যুদ্ধে পরাজয় নিশ্চিত। নিজেদের কমান্ডারকে মৃত দেখে দিশাহারা মোঙ্গলরা কিছুই না ভেবে পালাতে থাকল। কমান্ডার বাইবার্স তাদের পিছু নিলেন। একাধারে ছয়শত মাইল পর্যন্ত পিছু ধাওয়া করলেন। এবং আলেপ্পো, সিরিয়া, মিশরের সীমানা থেকে দূরে তাড়িয়ে দিলেন মোঙ্গলদের। 

রক্তে বিধৌত বিজয়ী সুলতান সাইফ আল দীন কুতুজ রক্তভেজা ময়দানেই সেজদায় পড়ে রইলেন, কৃতজ্ঞতায়। 



[৭]
অবশেষে বিজয়ী হিসেবে সুলতান কুতুজ মাথা তুললেন। আল্লাহ ইসলামকে বিজয়ী করেছেন। তিনি ইসলামের শেষ আশ্রয়স্থলকে ধ্বংস হতে দেননি। এ যেন ছিল আরেকটি বদর প্রান্তর। যদি মুসলিমরা হেরে যেত তবে ইসলামের নাম নেবার লোক হয়ত পাওয়া যেত না যেরকমটা বদর যুদ্ধের পরিস্থিতি ছিল। তবে বিশ্বাসীরা সবশেষে বিজয়ী হয়। আল্লাহ তাঁর কৃত ওয়াদা কখনোই অপূর্ণ রাখেন না। 

মোঙ্গলরা যে অপরাজেয় নয় তা এই যুদ্ধের মাধ্যমেই প্রমাণিত হল। তাদেরকে তুমুলভাবে বিপর্যস্ত করা যায় তা মানুষের মনে ঢুকে গেল। সংগ্রামের নতুন দুয়ার উম্মোচিত হল। 

এদিকে মোঙ্গল ইলখানাত বা গোল্ডেন হর্ণ অংশে যে মোঙ্গল সাম্রাজ্য ছিল তাতে ইসলাম প্রবেশ করেছিল। বারকে খান পরবর্তীতে সুলতান বাইবার্সকে আশ্বস্ত করেছিলেন যে, হালাকু খানকে তিনিই প্রতিরোধ করবেন। তাই হালাকু খানের প্রতিশোধের তীব্র আকাঙ্ক্ষা থাকা সত্ত্বেও বারকে খানের মোকাবেলায় তা যথেষ্ট হয়নি। 

সুলতান কুতুজকে হত্যা করা হয়েছিল বিজয়ী হয়ে ফেরার পথেই। স্বাভাবিক ভাবেই এবং যোগ্যতায় অগ্রগামীতার কারণে কমান্ডার রুকনুদ্দিন বাইবার্স পরবর্তী সুলতান হলেন। তিনি একদিকে ক্রুসেডারদের দমন করছিলেন অপরদিকে বারকে খান মোঙ্গলদের ঠেকাচ্ছিলেন। এভাবেই ইসলামের সর্বশেষ স্ট্রংহোল্ড রক্ষা পেয়েছিল মোঙ্গল ধ্বংসযজ্ঞ থেকে। 

এই পথ পরিক্রমাতেই ১২৯৯ সালে উসমানী খেলাফতের সূচনা হল। যা অবশিষ্ট ছিল ১৯২৪ সাল পর্যন্ত। 

মুসলিম ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনায় এই যুদ্ধ সেরা দশে চোখ বন্ধ করেই থাকবে। এ যুদ্ধ মুসলিমদের বিশ্বাস ফিরিয়েছিল, নিজেদেরকে নতুন করে চিনিয়েছিল এবং মোঙ্গল সাম্রাজ্যে শুরু করে দিয়েছিল বিভক্তি। 
আইন জালুত যুদ্ধ আমাদের এক প্রেরণার নাম। আমাদেরকে স্বরূপে আবার উদ্ভাসিত হবার একটি বড়সড় টোটকা। 


আইন জালুত ম্যাপ 










আইন জালুত : ফিরে আসার প্রান্তর
সাজ্জাদুর রহমান

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ