লেখা তরজমা

একজন পিরি রইস, মানচিত্রবিদ্যা এবং অন্যান্য পর্যালোচনা

 


একজন পিরি রইস, মানচিত্রবিদ্যা এবং অন্যান্য পর্যালোচনা
সাজ্জাদুর রহমান

পিডিএফে পড়তে এখানে ক্লিক করুন

মানচিত্র, মানচিত্রবিদ্যা ও ফিরে দেখা 

মানচিত্রের ইতিহাস প্রায় সাড়ে তিনহাজার বছর পুরনো। মানুষ আগ্রহের বশে দুনিয়ার নানা প্রান্তে যখন ছুটে বেড়াত তখন তারা বিভিন্ন স্থান, স্থাপনা সহ নানা জায়গা চিহ্নিত করেও আসত, তারা সেগুলো টুকে রাখত এবং যেন পরবর্তীতে আসা অভিযাত্রীদের জন্য এসব পথে চলা সহজ হয় তাই সবকিছু একত্রে লিপিবদ্ধ করত। আমরা সাধারণভাবে একেই ম্যাপ বা মানচিত্র বলে জানি। আধুনিক মানচিত্রের যাত্রা শুরু হয় ১৯৭৩ সালে। জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সিস্টেম-এর মাধ্যমে এই মানচিত্রের দুনিয়ায় বিপ্লব সাধিত হয়। তবে প্রথম কম্পিউটারাইজড ডিজিটাল ম্যাপ আসে ইংল্যাণ্ডে, ১৯৯৫ সালে। 

আজকে আমরা যে মানচিত্রগুলো দেখি সেগুলো হচ্ছে ইউরোপীয়ান স্টাইলের। এই স্টাইলের সূচনা মাত্র কয়েক শতাব্দী আগে হয়েছে। ম্যাপ পড়ার নিয়ম আমরা জানি যে তা উত্তর দিক বরাবর রাখতে হয়। এটিও ইউরোপীয় ধারনাপ্রসূত। তারা মূলত দিক নির্নয়ের জন্য পোলারিস (নর্থ স্টার) এবং ম্যাগনেটিক কম্পাসের প্রচলন শুরু করে। কারণ “নর্থ স্টার” সবসময় উত্তর দিক নির্দেশ করে থাকে। এর আগে ইউরোপীয় ম্যাপগুলোও “পূর্ব”-কে শীর্ষে রেখেই সাজানো হত। মধ্যযুগীয় ইউরোপে জেরুজালেমকে কেন্দ্রে অথবা শীর্ষে রাখা হত। কারণ এটি পবিত্র ভূমি হিসেবে বিবেচিত। অপরদিকে মুসলিমরা ম্যাপ তৈরি করত দখিনমুখী করে। দেখাই যাচ্ছে মুসলমান এবং ইউরোপীয়ানদের মাঝে এখানে বড় রকমের পার্থক্য বিদ্যমান। মুসলিমদের উত্তরোত্তর সমৃদ্ধি, জ্যোতির্বিদ্যায় সাফল্য এবং উন্নতি এবং গণিতের অসামান্য দক্ষতার কারণে মানচিত্রবিদ্যা বিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ শাখা হয়ে উঠেছিল। 

ইউরোপে আমরা দেখতে পাই, ১৫ শতক এবং ১৬ শতকে তাদের শ্রেষ্ঠ অভিযাত্রীরা পৃথিবীর রহস্য সন্ধানে ব্যাপৃত হয়। তবে মুসলিমদের ভ্রমণের ইতিহাস পাওয়া যায় সপ্তম শতাব্দী থেকে। বাণিজ্যিক প্রসার এবং ইসলাম প্রচারই ছিল এসবের মূল উদ্দেশ্য। তারা যাতায়াতের পথগুলো চিহ্নিত করে রাখত। যেন পরবর্তী চলাচলে সঠিক, নিরাপদ, সহজ পথে এবং কম সময়ে কাজ সমাপন করা যায়। প্রথমত এসব মুখে মুখে থাকলেও অষ্টম শতাব্দীতে বাগদাদে সর্বপ্রথম মানচিত্র অঙ্কণ করা হয়। আব্বাসী খেলাফতের সময় ডাকব্যবস্থায় ম্যাপগুলোর সমন্বয়ে “বুক অব রুটস” নামে বইও ছিল। এতে শুধুই রাস্তার বিবরণ থাকত না বরং একটি স্থান নিয়ে যত রকমের প্রয়োজনীয় তথ্য দরকার হত তার সবই পাওয়া যেত। এতে বাদ থাকত না কোনো এলাকার আয়তন, জনগণের সংখ্যা, তার উৎপাদনব্যবস্থা, বাণিজ্যের হালচাল সহ প্রয়োজনীয় সবকিছুই। (1)

এভাবে মানচিত্র এবং মানচিত্রবিদ্যার কথা আসলে কিছু মুসলিম মনীষীর নাম আমাদের চোখের এখনো প্রোজ্জ্বল থাকে। শতাব্দীপূর্বে রেখে যাওয়া তাদের অবদানগুলো এখনো গবেষণাজগতে রোশনি ছড়াচ্ছে সমুদ্রপকূলের বাতিঘরের মত। তেমনি একজন হচ্ছেন আজকের আলোচিত ব্যক্তি “আহমেদ মহিউদ্দিন পিরি”, যাকে আমরা “পিরি রইস” বলে জানি। 

যেভাবে শুরু হল 

১৯২৯ সাল। 

তোপকাপি প্রাসাদকে নতুন ভাবে মিউজিয়ামে রূপদানের প্রক্রিয়া জোরেশোরে চলছে। সুলতান মুহাম্মাদ আল ফাতিহের স্মৃতিবিজড়িত এই প্রাসাদ প্রতিযথশা কতই না খলীফা এবং সুলতানদের তার ছাদের নিচে বসিয়েছে! ১৪৭৮ সালে তার যাত্রা শুরু হয়েছিল। শাসনের মূল কেন্দ্র এবং সুলতান পরিবারের বাসস্থান হিসেবে ১৮৫৬ সাল পর্যন্ত এটি ব্যবহৃত হয়েছে (2)।  ধারণ করে রেখেছে এক বিজয়ী সালতানাতের নির্যাস, দিগ্বিজয়ী শাসকদের পদধ্বনি এবং এক অনুপম সভ্যতার শেষ আলোরেখা। ত্রিশজন উসমানী সুলতান এবং খলীফাদের সব কার্যক্রমের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এই অপরূপ প্রাসাদ অবশেষে জাদুঘরে রূপান্তরের সিদ্ধান্ত হল, ১৯২৪ সালের খেলাফতের পতনের পরে। ইসলাম এবং উসমানীদের গৌরবান্বিত নিদর্শনগুলোকে সেক্যুলার প্রজেক্টের মুখোমুখি করে তুরস্ককে নতুনভাবে গড়ে তোলা হল। 

তোপকাপি প্রাসাদের কাঠামোও চমৎকার। শুধু সুলতানদের আবাসস্থল হিসেবেই নয়, এর সমৃদ্ধ লাইব্রেরী, ইতিহাসবিধৌত অবস্থান, আশ্চর্যকর সব সংগ্রহগুলো গবেষকদের আকৃষ্ট করেছিল এখানে ছুটে আসতে। কালে কালে সেখান থেকে আশ্চর্য সব রত্ন উদ্ধার পেতে থাকল। তেমনি কোনো এক দিনে সদ্য জন্মানো তোপকাপি প্রাসাদ জাদুঘরের ডিরেক্টর জেনারেল খলিল ইসিম বে (Bey Halil Ethem) একটি অর্ধক্ষত ম্যাপ খুঁজে পেলেন। অভিজ্ঞ চোখজোড়া মুহূর্তেই বুঝতে পারল জিনিসটা কি হতে পারে! তাই রহস্য উদঘাটনের জন্য ম্যাপটি নিয়ে সত্ত্বর পৌছলেন জার্মান গবেষক প্রফেসর এডলফ ডেইসমানের কাছে, যিনি সেখানেই গ্রীক এবং লাতিন পাণ্ডুলিপিগুলো নিয়ে সময় কাটাচ্ছিলেন। তিনি সেগুলো পৌঁছে দিলেন ডক্টর পল কাহ’ল এর কাছে। যিনি ইতোমধ্যেই “কিতাবুল বাহরিয়্যা” নিয়ে একটি অসম্পূর্ণ কাজ করেছেন। ম্যাপটির গুরুত্ব তারচেয়ে বেশী কেউই বুঝবে না, কারণ ম্যাপটি “পিরি রইস” এর (3)।  

পল কাহ’ল “কিতাবুল বাহরিয়্যা” এর একটি অসম্পূর্ণ পাণ্ডুলিপি পেয়েছিলেন এবং অনুবাদ করেছিলেন। এই বইটি “পিরি রইস” এর এক অমর সৃষ্টি। ডক্টর কাহ’ল ম্যাপটি নিয়ে বিস্তর পড়াশোনা করেন এবং সেখান থেকে প্রাপ্ত বিভিন্ন তথ্যাবলী ০৯ সেপ্টেম্বর, ১৯৩১ সালে অনুষ্ঠিত ১৮তম “ইন্টারন্যাশনাল কংগ্রেস অব অরিয়েন্টালিস্টস” এ প্রকাশ করেন। তারপর এর উপরে বিভিন্ন প্রবন্ধ এবং বই রচিত হয় (3)। 

পিরি রইস 

ঐতিহাসিকরা তার অবদান লিখতে গিয়ে জন্মসালের কথা হয়ত ভুলে গিয়েছিল। তাই আমাদের কাছে এসেছে একটি ব্যাপ্তি। ১৪৬৫ – ১৪৭০ সালের কোনো এক সময়ে উসমানী সালতানাতের এক কোণে গ্যালিবুলুর হাজী মুহাম্মদের (Haci Mehmet) ঘর আলো করে এক শিশু জন্ম নিল (3)। আজকের গ্যালিপলি, পশ্চিমে ইজিয়ান সাগর বিধৌত অপূর্ব সুন্দর এক জনপদ যার পূর্ব পাশে রয়েছে দার্দানেলস প্রণালী। তুরস্কের ইউরোপিয়ান অংশে থাকা এই উপদ্বীপটির নাম গ্রীক ভাষায় বললে দাঁড়ায় “সুন্দর শহর”। 

তার চাচা আহমেদ কামালুদ্দিন ছিলেন উসমানী নৌ বাহিনীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ একজন কমান্ডার। এই চাচার হাত ধরেই মাত্র বার বছর বয়সে সমুদ্রের ঢেউয়ের সাথে যুঝতে থাকা শিখে গেলেন। সাম্পানের কাঁপনের তালে নিজের স্বপ্নের পালেও হাওয়া লাগিয়েছিলেন কিনা সেটা কেউ বলে যায়নি। সমুদ্রের সাথে সখ্যতা করে ঘুরলেন উত্তর আফ্রিকা উপকূল, ইতালি, স্পেন, ভূমধ্যসাগরের পশ্চিমাংশের দ্বীপগুলো সহ বিস্তৃত জায়গা। অবশ্য এসব সম্পন্ন হয় মাত্র ছয় বছরে, ১৪৮৭ – ১৪৯৩ সালের মাঝে (3)। ১৪৯৫ সালে চাচা কামাল সুলতান দ্বিতীয় বায়েজীদ থেকে আমন্ত্রিত হয়ে উসমানী নৌ বাহিনীতে যোগ দিলে তিনিও সঙ্গী হলেন। তখনি আহমেদ কামালুদ্দিন হয়ে গেলেন “কামাল রইস” (4)। বিশ্ব এখনো যাকে “গাজী কামাল রইস” নামে স্মরণ করে থাকে। 

তার লেখা চিঠি থেকেই সে সময় নিয়ে জানা যায়। পরবর্তীতে এক চিঠিতে তিনি বর্ণনা করেন, “আমরা ভূমধ্যসাগরে জাহাজের পাল উড়িয়েছি এবং দ্বীনের শত্রুদের সাথে ভয়ংকরভাবে যুদ্ধ করেছি” (5)। এরমাত্র কয়েক দশক আগেই ১৪৫৩ সালে কনস্ট্যান্টিনোপল বিজয় হয়েছিল সুলতান ফাতিহ মুহাম্মাদের হাত ধরে, যেখানে উসমানী নৌ বাহিনীর অস্বাভাবিক দৃঢ়তা এবং মনোবলের এক চরম পরাকাষ্ঠা প্রদর্শিত হয়েছিল। এরপর থেকে উসমানীদের নৌ ক্ষমতা উত্তরোত্তর বেড়েই চলেছিল। ততদিনে কৃষ্ণ সাগরে উসমানীদের আধিপত্য বিরাজমান ছিল। ভেনিসীয়, জেনোস এবং আইবেরিয়ান রাষ্ট্রগুলোর সাথে পাল্লা দিয়ে ভূমধ্যসাগরেও তারা উন্নতির ছাপ ফেলছিল। 

আন্দালুসের ক্রান্তিকালে গ্রানাডার পতনের পর সেখান থেকে মুসলিম এবং ইহুদীদের সরিয়ে উত্তর আফ্রিকায় নিয়ে যেতে পিরি রইসের অবদান উল্লেখযোগ্য। চাচার সাথে কাঁধ মিলিয়ে বিভিন্ন যুদ্ধেও সগৌরবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। স্মরণীয় কিছু হচ্ছে, ভ্যালেন্সিয়া, সিসিলি, সারদিনিয়া এবং ক্রোসিকার যুদ্ধের অবদান (3)। ১৪৯৯ সালে সংঘটিত ফার্স্ট ব্যাটল অব লেপান্ট (ব্যাটল অব জোঙ্কিও) এবং ১৫০০ সালের সেকেন্ড ব্যাটল অব লেপান্ট (ব্যাটল অব মডন) হচ্ছে উল্লেখযোগ্য (6) (7)। এই যুদ্ধগুলোতে (উসমানী–ভেনিসীয় যুদ্ধ) বিশেষ করে ১৪৯৯ এবং ১৫০২ সালের যুদ্ধে তিনি নিজেই ক্যাপ্টেন হিসেবে জাহাজ পরিচালনা করেছেন, যখন তার চাচা এডমিরাল অব দ্যা ফ্লীট হিসেবে ছিলেন (3)।  

১৫১০ সালে তার চাচা মারা যাওয়ার পরে তিনি জন্মস্থান গ্যালিপলিতে ফিরে আসেন। এখান থেকে বলা যায় যে তার জীবনের দ্বিতীয় ধাপ শুরু হল এবং এটি অবশ্যই সবচেয়ে স্মরণীয় ধাপ। ১৫১৩ সালে তিনি তার প্রথম বিশ্বের মানচিত্রটি আঁকেন। তবে আবার চিরাচরিত নাবিক পেশায় ফিরে যান চার বছর পরেই। ১৫১৭ সালেই আলেকজান্দ্রিয়া অভিযানে একজন কমাণ্ডার হিসেবে যোগ দেন। আলেকজান্দ্রিয়া বিজয় করে মিশরকে উসমানী খেলাফতের অংশ করা হয় (8)। এরপর গ্যালিপলিতে ফেরত এসে 1517 সালেই আঁকা প্রথম ম্যাপটি সুলতান প্রথম সেলিমের সামনে পেশ করেন (6)। এ সময় এবং পরবর্তীতে তিনি খায়রুদ্দিন বারবারোসার নেতৃত্বে বেশকিছু যুদ্ধে যোগ দেন। 

পুরো নৌ বাহিনীতে থাকাবস্থাতেই তিনি বিভিন্ন চার্টস, স্কেচ, ম্যাপ সংগ্রহ করেছেন এবং যেখানেই গিয়েছেন সবসময় নোট নিয়ে রেখেছেন। আলেকজান্দ্রিয়া অভিযান থেকে ফিরেই তিনি সবগুলোকে একত্র করা শুরু করেন। যার সমাপ্তি হয় ১৫২১ সালে। তখন সেটিকে “কিতাবুল বাহরিয়্যা” নামকরণ করা হয়। যা ছিল মূলত বইটির প্রথম সংস্করণ। এ বছরই সেন্ট জনের নাইটসদের বিরুদ্ধে রোডস অবরোধে অংশ নেন। ১৫২২ সালের ২৫শে ডিসেম্বর রোডস দ্বীপ থেকে নাইটসদের চিরদিনের জন্য বিতাড়িত হওয়ার মাধ্যমে এই অভিযানের সমাপ্তি হয় (6)। ১৫২০ সালে সুলতান এবং খলীফা প্রথম সেলিমের ইন্তেকালের পর সুলতান সোলায়মান ক্ষমতাপ্রাপ্ত হন। ১৫২৪ সালে তৎকালীন উজির ইবরাহীম পাশার নেতৃত্বে মিশর অভিযানের জন্য ক্যাপ্টেন হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হন। যাত্রাপথেই ইবরাহীম পাশা “কিতাবুল বাহরিয়্য্যা” নিয়ে জানতে পারেন এবং গুরুত্ব উপলব্ধি করতে পেরে এটিকে পুনরায় সাজাতে বলেন যেন তা সুলতানের সামনে উপস্থাপন করা যায়। এতে করে এটি অন্যান্য নাবিক এবং অনুসন্ধিৎসুদেরও কাজে লাগবে। ১৫২৫ সালে তিনি দ্বিতীয় সংস্করণের এই কাজটি শেষ করেন (6)। ১৫২৬ সালে নতুন সংস্করণটি সুলতান সোলায়মানকে দেওয়া হয় এবং একই সাথে দক্ষিণের সাগরগুলোর এডমিরাল হিসেবে নিয়োগ পান (8)। 

১৫২৮ সালে পিরি রইস তার দ্বিতীয় ম্যাপটি আঁকেন। সেটিও সুলতানের সামনে উপস্থাপন করা হয় (3)। তবে ১৯২৯ সালে পাওয়া ম্যাপটি ছিল ১৫১৩ সালে অঙ্কিত ম্যাপের একাংশ।  ১৫৪৭ সাল পর্যন্ত তিনি ভারত মহাসাগরে উসমানী বহরের এডমিরাল হিসেবে ছিলেন। সুয়েজে অবস্থিত উসমানী কেন্দ্র থেকে লোহিত এবং আরব সাগরের দায়িত্বও তার হাতে ছিল। ২৬শে ফেব্রুয়ারী, ১৫৪৮ সালে পর্তুগীজদের দখলকৃত এডেনকে আবার মুক্ত করেন। সেই ধারাবাহিকতায় ১৫০৭ সালে পর্তুগীজদের হাতে চলে যাওয়া মাস্কাটকেও ১৫৫২ সালে উদ্ধার করেন এবং একইসাথে গুরুত্বপূর্ণ কিশ দ্বীপও শত্রুমুক্ত হয়। পিরি রইস তার জাহাজের পাল আরো পূর্বে নিয়ে যান। হরমুজ প্রণালীর হরমুজ দ্বীপও বিজয় করে নেন, যেটি ছিল পারস্য উপসাগরে ঢুকবার পথ। যখন পর্তুগীজরা দখলদারিত্ব বাড়ানোর জন্য আরব উপসাগরের দিকে মনোযোগ দিল তখন তিনি কাতার উপদ্বীপ এবং বাহরাইন দ্বীপ দখল করে নিলেন। এতে করে পর্তুগীজরা আরব উপকূলে ভালো কোনো অবস্থান তৈরী করতে ব্যর্থ হয়েছিল (6)। 

১৫৫৪ সালে যখন তার বয়স ৯0 এর কাছাকাছি (৮৫-৯০) তখন উসমানী কোর্ট থেকে সমন পান। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আসে পর্তুগীজদের সাথে যুদ্ধের সময় তিনি যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়েছিলেন। উসমানী সালতানাতের মিশর সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলরা সুলতানকে জানায় পিরি নিজেকে এবং তার সম্পদ রক্ষার্থে যুদ্ধে পৃষ্ঠপ্রদর্শন করেছেন। ধারণা করা হয়, পুরো নৌ ক্যারিয়ারে সে এবং তার চাচা মিলে যত সম্পদ অর্জন করেছিলেন সেসব রক্ষা করতেই তার এই পলায়ন। সুলতানের আদেশে তার মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেওয়া হয় (5)। 

তার মস্তককে দেহ থেকে আলাদা করার পরে যাবতীয় সম্পদও তোপকাপি প্রাসাদে নিয়ে যাওয়া হয়। 

জীবনের বাঁকে বাঁকে 

পিরি রইসের জীবন অনেক ঘটনাবহুল। কালের পরিক্রমায় ইতিহাস বইগুলোতে তার কমই এখন উল্লেখ রয়েছে। তবে মোটাদাগে তার পুরো জীবনকে আমরা তিন ভাগে ভাগ করতে পারি। 

  • প্রাথমিক জীবনঃ চাচার হাত ধরে সমুদ্রে অবগাহনের শুরু থেকে চাচার মৃত্যু অর্থাৎ ১৫১০ পর্যন্ত। 
  • মধ্যবর্তী জীবনঃ ১৫১১ সাল থেকে ১৫২৮ সাল পর্যন্ত। এ সময়ে তিনি সবচেয়ে স্মরনীয় কাজগুলো করেছেন। তার বিখ্যাত দুটি ম্যাপ এবং বিখ্যাত বইটি এই সময়েই লেখা। 
  • শেষ জীবনঃ খায়রুদ্দীন বারবারোসার অধীনে আবার নৌ বাহিনীতে ফেরা, এডমিরাল হিসেবে ভারত মহাসাগর এবং লোহিত সাগরের জীবন এবং মৃত্যু। 

১৫১০ সাল পর্যন্ত ছিল তার গড়ে উঠার সময়কাল। এ সময় তিনি কামাল রইস থেকে হাতে কলমে সব শিখেছেন, তার সাথেই ঘুরে বেড়িয়েছেন এ প্রান্ত থেকে সে প্রান্ত। সংগ্রহ করেছেন বিস্তর চার্টস, ম্যাপসহ অনেককিছুই। সেসবকে কাজে লাগিয়েছেন ১৫১১ পরবর্তী সময়ে। ধারাবাহিকতায় 15১৩ সালে তার প্রথম বিশ্বম্যাপটি অঙ্কণ করেন যেটি ১৫১৭ সালে সুলতান প্রথম সেলিমের কাছে দেওয়া হয়। দ্বিতীয় ম্যাপটি আঁকেন ১৫২৮ সালে। ১৯২৯ সালে তার আঁকা প্রথম ম্যাপটিরই কিয়দংশ তোপকাপি প্রাসাদ জাদুঘরে পাওয়া যায়। 

পিরি রইসের আঁকা এই ম্যাপগুলো সবদিক থেকেই ছিল অনন্যা। যদি বৈশিষ্ট্যগুলো লেখা হয় তবেই বুঝা যাবে। সাধারণভাবে বললে এগুলো শুধুই ম্যাপ ছিল না, এগুলো ছিল একটি জনপদ সম্পর্কে বিস্তারিত সবকিছুরই তথ্যসমৃদ্ধ। তবে জেনে আসা যাক এসব নিয়েই। 

মানচিত্রগাঁথা

খলীল ইসিম বে যে ম্যাপটি পেয়েছিলেন তা ছিল আদতে একটি বড় ম্যাপের তিনভাগের একভাগ, নির্দিষ্ট করে বললে শুধু পশ্চিম অংশ। বাকি অংশগুলো তখনো অজ্ঞাত। বেঁচে থাকা অংশটুকুর মাপ ছিল ৯০ সেন্টিমিটার x ৬৫ সেন্টিমিটার। এখানে ভালোভাবেই আটলান্টিক মহাসাগরকে চিহ্নিত করা ছিল, সেইসাথে সেখানে থাকা দ্বীপগুলোকেও। বিভিন্ন উপকূলের বর্ণনার সাথে ম্যাপটিতে মানুষ, জাহাজ, পশুপাখিসহ বিচিত্র ছবিতে ভরপুর ছিল এবং এসব নিয়ে ছিল বিভিন্ন মন্তব্যও। মন্তব্যগুলো অধিকাংশ ছিল আরবী হরফে লিখিত উসমানী তুর্কি ভাষায়, শুধুমাত্র একটি ব্যতিক্রম ছিল। 

ম্যাপটির ডান পাশে ফ্রান্সের ব্রিট্যানি উপদ্বীপ স্পষ্টভাবেই ছিল। আইবেরিয়ান উপদ্বীপ, পশ্চিম আফ্রিকার প্রবৃদ্ধ অংশ, অ্যাজোরেস, মাদেইরা, ক্যানারী দ্বীপপুঞ্জ এবং ভার্দে অন্তরীপ দ্বীপপুঞ্জও এর ডানপার্শ্বে অঙ্কিত ছিল। বামপাশে তাকালে দেখা যাবে দক্ষিণ আমেরিকা উপকূল এবং এর প্রবৃদ্ধ অংশ, এন্টিলসের ক্ষুদ্রাকার কিছু অংশ, পুয়ের্তো রিকো। একইসাথে এখানে হিস্পানিয়োলা, কিউবা, বাহামার উপস্থিতি নিয়ে কিছুটা অস্পষ্টতা থেকে যায়। মধ্য আমেরিকাকে পাওয়া যায় একদম উত্তর-পশ্চিম কোণে। তবে একেবারে নিচে প্রকাণ্ড মহাদেশীয় ভূখণ্ড চোখে পড়ে যেটি দক্ষিণ আমেরিকার সাথে সংযুক্ত। ধারণা করা হয় ম্যাপটির হারানো অংশ বা পূর্ব অংশটুকু আফ্রিকা থেকে শুরু হয়ে ইউরোপ ছাড়িয়ে চীন পেড়িয়ে এশিয়ার পূর্ব উপকূলে গিয়ে শেষ হয়েছিল। এদিকে ব্রিটিশ দ্বীপগুলো না থাকা, একইসাথে গ্রিনল্যান্ড, আইসল্যান্ড এবং নতুন খুঁজে পাওয়া ভূমি না থাকাটা প্রমাণ করে এর উত্তরস্থ প্রান্তটিও খোয়া গিয়েছে। এখানে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে ম্যাপটির উপরিপ্রান্তে এক ধরণের কালো দাগ থাকা যেখানে বুঝা যায় আরেকটি খন্ড যুক্ত ছিল, এটিও আগের বক্তব্যটিকে সমর্থন দেয়। 

এটি ছিল পোর্টোলান ধরণের একটি ম্যাপ। ১৩ শতাব্দী পরবর্তী সময়ে পোর্টোলান স্টাইল ভূমধ্যসাগরীয় উপকূল অঞ্চলের ম্যাপ হিসেবে খুবই প্রসিদ্ধি পায়, একইসাথে এজিয়ান এবং কৃষ্ণ সাগরের ম্যাপ হিসেবেও। ভেনিসীয়রা এ স্টাইলের উন্নতি শুরু করলে জেনোসীয়রাও শুরু করে। ধারাবাহিকতায় কাতালুনিয়ান এবং মাজোর্কানরাও যোগ দেয় (3)। তবে এভাবে পশ্চিম ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে আসার আগেই ইতালির শহরগুলোতে পোর্টোলান স্টাইলের অগ্রযাত্রা শুরু হয়েছিল (9)। 

পোর্টোলান স্টাইলের মূলনীতি তো বুঝা গেল, এবার যাব পিরি রইসের ম্যাপটিতে এর প্রয়োগ কিভাবে ছিল। বর্তমানের প্রচলিত মানচিত্রগুলোর মত এতে ছিল না অক্ষাংশ কিংবা দ্রাঘিমাংশ। তবে নিরক্ষীয়, উত্তরায়ন, দক্ষিণায়ন, উত্তর মেরু এবং দক্ষিণ মেরু অঞ্চলগুলো চিহ্নিত ছিল যেহেতু এই মানচিত্রে গ্রীষ্মাঞ্চলীয় এবং শীতপ্রধান জায়গাগুলোও বিস্তৃত ছিল। এখানে মোট দুটি বড় বায়ু-গোলাপ এবং তিনটি ছোট বায়ু-গোলাপ ছিল। পিরি রইস বায়ু-গোলাপে একটি দূর্দান্ত কাজ করেছিলেন। বায়ু-গোলাপ থেকে উৎপন্ন রেখাগুলো আঁকতে তিনি রঙিন বস্তু ব্যবহার করেছিলেন। অর্ধক্ষত পাওয়া এই ম্যাপটিতে থাকা বায়ু-গোলাপের অবস্থান থেকে বুঝা যায় যে এখানে এটি ১৬টির মত ছিল। তৎকালীন অধিকাংশ পোর্টোলান ম্যাপে এই ডিজাইন ব্যবহার করা হত। 

ম্যাপটিতে বিভিন্ন ছোট ছোট নোট ছিল যেগুলোতে তিনি কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়ে রেখেছিলেন। সেসব থেকেই জানা যায় যে, ম্যাপটি আঁকা হয়েছিল ৯১৯ হিজরীর মুহাররম মাসে, অর্থাৎ ১৫১৩ খ্রিষ্টাব্দের ৯ই মার্চ কিংবা ৭ই এপ্রিলের যেকোনো একটি দিন। একইভাবে জানা যায় এটি তৈরি করতে তিনি ২০টির মত ম্যাপের সাহায্য নিয়েছিলেন। সেসবের মধ্যে ইসকান্দার যূল-কারনাইন (অ্যালেকজান্ডার) থেকে শুরু করে সদ্য পথ হারিয়ে আমেরিকায় উপস্থিত হওয়া ক্রিস্টোফার কলম্বাসের ম্যাপও ছিল। তিনি এখানে সাত সাগরের কথাও উল্লেখ করেছিলেন। ম্যাপটির মতে সেগুলো হচ্ছে, “চীন সাগর, ভারত মহাসাগর, পারস্য উপসাগর, কৃষ্ণ সাগর (পূর্ব আফ্রিকার জাঞ্জিবার দ্বীপ অন্তর্গত), কাস্পিয়ান সাগর, পশ্চিম সাগর (আটলান্টিক মহাসাগর), এবং লোহিত সাগর। 

সমাপনী 

পিরি রইসের অঙ্কিত ১৯২৯ সালে এই অর্ধক্ষত ম্যাপটি পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীন ম্যাপ যেখানে আমেরিকা চিহ্নিত রয়েছে। এমনকি এখানে দক্ষিণ গোলার্ধের এন্টার্ক্টিক অঞ্চলও দৃশ্যমান। তৎকালীন প্রেক্ষাপটে এন্টার্ক্টিক অঞ্চল নিজে গিয়ে উদঘাটন করা সম্ভব ছিল না তাই এখানেই পাওয়া যায় তার মানচিত্র সংক্রান্ত জ্ঞানের পরিধি। তার গবেষণার প্রেরণা এবংঅনাবিষ্কৃতকে মুঠোয় নেওয়ার তাড়না এই কাজগুলো থেকে আমরা ভালোভাবেই বুঝতে পারি। মূলত এটুকু ছিল তার ঘটনাবহুল জীবনের কিয়দংশ। পিরি রইসের দুনিয়ায় হাটতে হলে যেতে হবে আন্দালুসের আল হাকাম লাইব্রেরি থেকে ইস্তাম্বুলের তোপকাপি প্রাসাদ লাইব্রেরিতে, মাঝে মিশরের আলেকজান্দ্রিয়া লাইব্রেরিতে ঢুঁ মেরে যাওয়া কখনোই আগ্রহের কমতি করবে না। স্বাগতম! পিরি রইসের দুনিয়ায়!



গ্রন্থপঞ্জী 

1. Al-Hassani, Salim T S. Maps. 1001 Inventions: Muslim Heritage in Our World. Manchester, Great Britain: Foundation for Science Technology and Civilisation, 2006, pp. 252-255.

2. Zelazko, Alicja. Topkapı Palace Museum. Britannica. [Online] March 05, 2020. https://www.britannica.com/topic/Topkapi-Palace-Museum.

3. Mclntosh, Gregory C. The Life of Piri Reis, Description of the Map. The Piri Reis Map of 1513. Athens, Georgia: The University of Georgia Press, Athens & London, 2000, pp. 01-18.

4. Hamilton, Curry E. Sea-Wolves of the Mediterranean: The Grand Period of the Muslem Corsairs. London: Thomas Nelson & Sons, 1910.

5. Afetinan, Ayse. Life and Works of Piri Reis: The Oldest Map of America. Ankara: Turkish Historical Association, 1975.

6. Zaimeche, Salah. Piri Reis: A Genius 16th-Century Ottoman Cartographer and Navigator. Muslim Heritage. [Online] February 13, 2010. https://muslimheritage.com/piri-reis-16th-c-cartographer-navigator/.

7. Foundations of Venetian Naval Strategy from Pietro II Orseolo to the Battle of Zonchio (1000 - 1500). Dotson, John E. California: Center for Medieval and Renaissance Studies of the University of California, Los Angeles, 2001, Vol. 32.

8. Gillispie, Charles Coulson. Piri Rais. Dictionary of Scientific Biography, Volume 10. New York: Charles Scribner's Sons, 1970-1980, pp. 616-619.

9. Campbell, Tony. Portolan Charts from the Late Thirteenth Century to 1500. [ed.] J. B. Harley & David Woodward. The History of Cartography: Cartography in Prehistoric, Ancient, and Medieval Europe and the Mediterranean. Chicago: The University of Chicago Press, 1987, Vol. 1, 19, pp. 371-463.

10. ARSLANBENZER, HAKAN. Halil Ethem Eldem: Educated geologist, voluntary art manager. Daily Sabah. [Online] June 21, 2020. https://www.dailysabah.com/arts/portrait/halil-ethem-eldem-educated-geologist-voluntary-art-manager.

11. Oxford. Adolf Deissmann. Oxford Reference. [Online] 2021. https://www.oxfordreference.com/view/10.1093/oi/authority.20110803095707817.

12. The Paul Kahle Fonds. BIOGRAPHY OF PAUL ERNST KAHLE. Fondo Paul Kahle. [Online] 2008. http://www.paulkahle.unito.it/index.php/About/biography_kahle.

13. Ghobrial, John-Paul. Early Ottoman Printing: Istanbul and the Provinces. [book auth.] Gabor Agoston and Bruce Masters. Encyclopedia of the Ottoman Empire. New York: Facts on File, Inc., 2009, p. 471.

14. TÜFEKÇİ, ALİ. Maps of Piri Reis: Harmony of art and science. Daily Sabah. [Online] September 02, 2020. https://www.dailysabah.com/arts/maps-of-piri-reis-harmony-of-art-and-science/news.

15. TASCI, UFUK NECAT. Piri Reis: Admiral extraordinaire, the champion of Ottoman cartography. TRT World. [Online] December 10, 2020. https://www.trtworld.com/magazine/piri-reis-admiral-extraordinaire-the-champion-of-ottoman-cartography-42239.

16. The Evolution of the Ottoman Seaborne Empire in the Age of the Oceanic Discoveries, 1453-1525. Hess, Andrew C. 07, s.l. : The American Historical Review, 1970, Vol. 75, pp. 1892-1919. 00207020.

17. Ottoman Response to the Discovery of America and the New Route to India. Hamdani, Abbas. 03, s.l. : Journal of the American Oriental Society, 1981, Vol. 101, pp. 323-330.

18. Looking at the Kitab-i Bahriye of Piri Reis. Fortunato Lepore, Marco Piccardi, Leonardo Rombai. 02, s.l. : e-Perimetron, 2013, Vol. 08, pp. 85-94.

19. Piri Reis and Ottoman Discovery of the Great Discoveries. Soucek, Svat. s.l. : Maisonneuve & Larose, Studia Islamica, 1994, Vol. 79, pp. 121-142.

20. Piri Reis and the Ottoman Response to the Voyages of Discovery. Hess, Andrew C. 01, s.l. : Terrae Incognitae, 1974, Vol. 06, pp. 19-37. 00822884.

21. PIRI REIS: His uniqueness among cartographers and hydrographers of the Renaissance. Soucek, Svat. New Jersey: s.n.

22. Sezgin, Fuat. Navigation. The Istanbul Museum for the History of Science and Technology in Islam, Volume III. Frankfurt : Institut für Geschichte der Arabisch–Islamischen Wissenschaften an der Johann Wolfgang Goethe-Universität Frankfurt am Main, 2010, pp. 33-82.

23. —. 10th/16th century. The Istanbul Museum for the History of Science and Technology in Islam, Volume I. Frankfurt : Institut für Geschichte der Arabisch–Islamischen Wissenschaften an der Johann Wolfgang Goethe-Universität Frankfurt am Main, 2010, pp. 70-76.

24. Better Direction at Sea: The Piri Reis Innovation. Goodrich, Prof. Thomas D. [ed.] Prof. Mohamed El-Gomati. Manchester: Foundation for Science Technology and Civilisation, 2007.

25. Edney, Matthew H. Cartography's Idealized Preconceptions, Pictorialness. Cartography: The Ideal and Its History. Chicago: The University of Chicago Press, 2019, pp. 61-62.

26. Reis, Piri. Chart of the Ocean Sea. Gallipoli: s.n., 1513 .

27. From Alexander von Humboldt to Fuat Sezgin on the Discovery of America — A Comparative Historiography. Quintern, Detlev. Istanbul: Istanbul University Press, 2019.

28. Searchin’ his eyes, lookin’ for traces: Piri Reis’ World Map of 1513 & its Islamic Iconographic Connections (A Reading Through Bağdat 334 and Proust). Pinto, Karen. [ed.] Gottfried Hagen & Baki Tezcan. s.l. : Journal of Ottoman Studies / Osmanlı Araştırmaları, 2012 .

29. The Map of America. Tekeli, Sevim. [ed.] Lamaan Ball. Manchester: Foundation for Science Technology and Civilisation, 2005.

30. Piri Reis : World Maps and Kitab I-Bahriye (The Book of Sea Lore). Zaimeche, Salah. [ed.] Prof. Salim Al-Hassani. Manchester: Foundation for Science Technology and Civilisation, July 2002.

31. The Kitab-ı Bahriye (Book of Navigation) of Piri Reis. Yilmaz, Ibrahim. 3, s.l. : The British Cartographic Society, 2010, The Cartographic Journal, Vol. 47, pp. 278-283.

32. The Piri Reis Map of 1513 is Important Because …. McIntosh, Gregory C. [ed.] Osman Gümüşçü. Istanbul : Uluslararası Piri Reis ve Türk Denizcilik Tarihi Sempozyumu: 500 yılın ardından Piri Reis ve eserleri bildiriler, 26-29 Eylül 2013, 2014, Ankara: Türk Tarih Kurumu, 2014 , Vol. 6.

33. Piri Reis: Admiral Extraordinary. Cotter, Charles H. 2, Cambridge: The Royal Institute of Navigation, Cambridge University Press (Online), 1972, 2010 (Online), The Journal of Navigation, Vol. 25, pp. 247-249.

34. Karamustafa, Ahmet T. Introduction to Ottoman Cartography, Military, Administrative, and Scholarly Maps and Plans. [ed.] J. B. Harley & David Woodward. The History of Cartography: Cartography in the Traditional Islamic and South Asian Societies. Chicago: The University of Chicago Press, 1992, Vol. 02, 10, pp. 206-227.

35. —. Introduction to Islamic Maps. [ed.] J. B. Harley & David Woodward. The History of Cartography: Cartography in the Traditional Islamic and South Asian Societies. Chicago: The University of Chicago Press, 1992, Vol. 02, 1, pp. 3-11.

36. Soucek, Svat. Islamic Charting in the Mediterranean. [ed.] J. B. Harley & David Woodward. The History of Cartography: Cartography in the Traditional Islamic and South Asian Societies. Chicago: The University of Chicago Press, 1992, Vol. 02, 14, pp. 263-292.

37. Rogers, J. M. Itineraries and Town Views in Ottoman Histories. [ed.] J. B. Harley & David Woodward. The History of Cartography: Cartography in the Traditional Islamic and South Asian Societies. Chicago: The University of Chicago Press, 1992, Vol. 02, 12, pp. 228-255.

38. Tibbetts, Gerald R. The Role of Charts in Islamic Navigation in the Indian Ocean. [ed.] J. B. Harley & David Woodward. The History of Cartography: Cartography in the Traditional Islamic and South Asian Societies. Chicago: The University of Chicago Press, 1992, Vol. 02, 13, pp. 256-262.

39. Shaw, Stanford Jay. History of the Ottoman Empire and Modern Turkey, Volume 1: Empire of the Ghazis: The Rise and Decline of the Ottoman Empire, 1280 - 1808. New York: Cambridge University Press, 1976. Vol. 1.


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ