সমাজ গঠনে মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সাঃ)সাজ্জাদুর রহমান
প্রারম্ভ
মানবতার মুক্তির মহান দূত হিসেবে প্রেরিত হয়েছিলেন মুহাম্মদ (সাঃ)।
তার উপর অর্পিত দায়িত্ব পূর্ণতা পেয়েছিল মদীনায় ইসলামী রাষ্ট্র গঠন হওয়ার মাধ্যমে।
ইয়াসরিবে গড়ে উঠা এই নতুন মদীনাতুর রাসূল আমাদেরকে শুধু একটি রাষ্ট্রেরই রূপরেখা দেখায়
না বরং এটি দৃষ্টান্ত একটি আদর্শ, সুশৃঙ্খল, সুগঠিত এবং যথার্থ সমাজব্যবস্থারও। আমাদের
আলোচনা এতদকেন্দ্রিকই এগিয়ে যাবে।
রাসূল (সাঃ) এর সমাজ
রাসূল (সাঃ) এর সমাজ গঠন বলতে আমরা বুঝি মদীনায় ইসলামী রাষ্ট্র
প্রতিষ্ঠা হওয়ার পরবর্তী পর্যায়কে। কারণ, রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা হওয়া কেবল শুরুর কথকতা,
সমাজব্যবস্থাই তাকে চিরস্থায়ী করে তোলে। সমাজ মানুষের সামনে একটি আদর্শ সংস্কৃতি হাজির
করে, যার মাধ্যমে ভিত তৈরি হয় সুস্থ, সাম্য এবং ন্যায়ভিত্তিক রাজনীতির। মদীনাতেও ঠিক
এরকমই একটি ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল। এই নয়াব্যবস্থায় বেশকিছু অনিন্দ্য সুন্দর পদ্ধতি
এবং বৈশিষ্ট্য ছিল। বিশেষ করে মুহাজির এবং আনসারদের মধ্যকার ভ্রাতৃত্ববোধ, তারা অপরকে
নিজের উপর প্রাধান্য দিয়েছেন, পরিস্থিতি যেমনই হোক না কেন। এমনকি কোনো আনসার সাহাবী
নিজ স্ত্রীকেও তালাক দিয়েছিলেন যেন তার সাথে ভাই সম্পর্কে থাকা মুহাজির সাহাবীটি স্ত্রীহীন
হয়ে বিষাদে না থাকে!
তাছাড়া এই ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল মহান আল্লাহর উপর বিশ্বাসকে
কেন্দ্র করে। সমতা এবং ন্যায়বিচার ছিল এই সমাজের খুঁটি। কাজের ক্ষেত্রে পরামর্শ নেওয়া
ছিল একটি অপরিহার্য অংশ যেমনটি আমরা বদর যুদ্ধের সময়ে দেখেছি। তবে এখানে ইসলামের প্রশ্নে
ছিল না কোনো আপসরফা, সৎ কাজের আদেশ ওবং অসৎ কাজে বাধা প্রদান মূলনীতিতে সমৃদ্ধ হয়েছিল
সেই নয়া ব্যবস্থা। মানুষকে দেওয়া হয়েছিল মানবিক মর্যাদা, দাসে কিংবা স্বাধীনে ছিল না
ভেদাভেদ, ছিল না নারী-পুরুষেও কোনো কম-বেশী! প্রচলিত কুসংস্কার, নিয়ম-কানুনকে উপড়ে
ফেলে আল্লাহর দেওয়া নিয়ম অনুযায়ী গড়ে উঠেছিল এই মহান কার্যক্রম।
রাসূল (সাঃ) প্রতিষ্ঠিত সমাজব্যবস্থার গঠন ও বৈশিষ্ট্য
রাসূল (সাঃ) এর সমাজ গঠন ছিল কুরআনের অনুরূপ। কুরআনের আলোকের এই
সমাজব্যবস্থার বৈশিষ্ট্যাবলী নিয়ে আলাপ করা যাক। নিম্নোক্ত বৈশিষ্ট্যাবলী ছিল তার প্রতিষ্ঠিত
সমাজব্যবস্থার মূল চালিকাশক্তি।
- 1. আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস (০৩:১০২)
- 2. সমতা এবং ন্যায়বিচার (০২:১৪৩)
- 3. ভ্রাতৃত্ববোধ (২৩:৫২)
- 4. পরামর্শভিত্তিক কার্যক্রম পরিচালন (৪২:৩৮)
- 5. ইসলাম সম্পর্কে আপোসহীনতা (০২:১৫৬)
- 6. সৎ কাজের আদেশ প্রদান (০৩:১১০)
- 7. অসৎ কাজে বাধা প্রদান (০৩:১১০)
- 8. সার্বজনীন সম্প্রীতি (০৮:৪৬)
- 9. আল্লাহর দেওয়া সীমাবদ্ধতা পালন (০২:১৯০)
- 10. মানুষকে মানুষ হিসেবে মর্যাদা প্রদান (০৪:১২৪)
রাসূল (সাঃ) এর সমাজ গঠন পদ্ধতি
মক্কায় অযাচিত নির্যাতন,
অরাজকতার মাঝে আল্লাহর আদেশ আসল হিজরতের। একে একে সাহাবীরা চলে গেলেন মদীনায়। অবশেষে
রাসূল (সাঃ)ও মদীনায় পা রাখলেন। সেখানে একটি বিদ্রোহপূর্ণ সমাজ বিদ্যমান ছিল। আউস,
খাযরায গোত্রের বিরোধ ছিল চিরন্তন। তারাও এসব নশ্বর সমস্যাগুলোর সমাধান খুঁজছিল, এবং
ইসলামকে পেয়েছিল আলোকবর্তিকারূপে। পাশাপাশি ছিল ইহুদীদের বসবাস। সবমিলিয়ে বলা যায় সেখানে
এক ধরণের মিশ্র, বিরোধপূর্ণ সমাজব্যবস্থা চলমান ছিল।
হিজরতের পরেই রাসূল প্রথম কাজটি শুরু করেছিলেন একটি মসজিদ নির্মাণ
করে, যা একইসাথে সদ্য প্রতিষ্ঠিত ইসলামী রাষ্ট্রের সংসদ এবং বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবেও
কাজ করেছে। এরপরেই তিনি মুহাজির এবং আনসারদের মাঝে এক বিরল ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ক স্থাপন
করে দিলেন। সবাই যেন একপ্রকার সহযোগীতার প্রতিযোগীতায় মেতে উঠল। তারপর মদীনা সনদ স্বাক্ষরিত
হল, যা ছিল তৎকালীন বৈ আধুনিক দুনিয়ার জন্যও একটি অত্যন্ত কার্যকর সম্প্রীতি এবং সহাবস্থানের
উদাহরণ সংবলিত সনদ।
রাসূল (সাঃ) মদীনায় গিয়ে কোনো প্রতিষ্ঠিত সমাজব্যবস্থার হাল ধরেননি
বরং সেখানে তাকে একদম নতুন একদল মানুষকে নতুন ধরণের সংস্কৃতি, কৃষ্টি এবং আচার-আচরণে
সমৃদ্ধ করেছেন। ইহুদীরা প্রাচীন থেকেই শেষনবীর বিরোধী ছিল, পার্শ্বশত্রু হিসেবে ছিল
আরবে শক্তিধর মক্কা অঞ্চল, মদীনার অভ্যন্তরে আব্দুল্লাহ ইবনে উবাইদের মত মুনাফিকরা
এবং আন্তর্জাতিক শত্রু হিসেবে রোমান সাম্রাজ্যও এগিয়ে এসেছিল। এতসব প্রতিকূলতার মাঝে
থেকে একটি সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা যা এই দেড়হাজার বছর পরে এসেও সমান প্রাসঙ্গিক,
সত্যিই অকল্পনীয়!
রাসূল (সাঃ) এর এই পদ্ধতিতে কোমলতার সাথে কঠোরতাও ছিল। এখানে অত্যাচারিতদের
আশ্রয় দেওয়া, অনাহারীকে খাবার দেওয়া হত একইভাবে রক্ষা করা হত বিভিন্ন চুক্তি এবং সনদের
মান। এই কারণেই হুদায়বিয়া থেকে শৃঙ্খলিত আবু জান্দাল (রাঃ) কেও তিনি মদীনায় নিয়ে আসেননি।
আবার ওইদিনই উসমান (রাঃ) এর নিরাপত্তার জন্য যুদ্ধেরও শপথ নিয়েছিলেন! এই ব্যবস্থা হাজির
করেছিল তৎকালীন শ্রেনী বিভাজিত সমাজের বিপরীতে শ্রেষ্ঠতর এক সভ্যতার আযান।
তৎকালীন প্রচলিত
সমাজব্যবস্থা বনাম রাসূল (সাঃ) এর সমাজব্যবস্থা
প্রচলিত সমাজব্যবস্থা বলতে এখানে রোমান, পারস্য এবং আরবের সমাজব্যবস্থাগুলোকে
দেখা যেতে পারে। প্রথমত, এই তিনধরণের সমাজেই মানুষের মাঝে ব্যাপক শ্রেনী বিভাজন ছিল।
দাসদের মর্যাদা ছিল সর্বনিম্নে, মেয়েদেরকেও দেওয়া হত না যথাযোগ্য সম্মান। অনেক ক্ষেত্রে
এই দুই শ্রেনীকে দেওয়া হত না মানুষ হিসেবে মানবিক মর্যাদাটাও! বিশেষ করে আরবে মেয়ে
সন্তানকে দূর্বলতা ভাবা হত! আরবের বাইরে মেয়েদেরকে নিছক ভোগ্যপণ্য হিসেবে ব্যবহার করা
হত। অবাধ যৌনতা, নৈতিকতা বিচ্ছিন্নতা, অন্ধবিশ্বাস এবং শ্রেনী বিভাজন তাদেরকে নিয়ে
গিয়েছিল সভ্যতা থেকে বহুদূরে। পান থেকে চুন খসলেই যুদ্ধ-বিগ্রহের কথা তো বলাই যাবে।
এসব অনিশ্চয়তা, অরাজকতা এবং বেহায়াপনা যখন এসব সমাজের প্রতিটি স্তরে জেকে বসেছিল ঠিক
তখনি রাসূলের প্রতিষ্ঠিত, আদর্শবান এই নতুন ব্যবস্থা বিশ্বের সামনে ছিল আলোর ঝলকানির
মত। ঠিক যেন উত্তরাকাশের তারকা, যার নির্দেশনায় সবাই আঁধারে পথের দিশা পায়।
শিক্ষা বিস্তারে ইসলামী সমাজের ভূমিকা
তৎকালীন যুগে পেশীবল কিংবা
বংশীয় মাহাত্ম্য যতটা না প্রয়োজনীয় ছিল শিক্ষাকে ততটা তাৎপর্যপূর্ণ ভাবা হত না। যারা
শুধু নামটাই স্বাক্ষর করতে পারত তারাও পেত সীমাহীন মর্যাদা! কিয়দংশই এই ব্যবস্থা থেকে
উতড়ে নিজেদেরকে এগিয়ে নিয়ে যেত। যদিও এদের সবারই একটি সমৃদ্ধ শিক্ষা-সংস্কৃতি ছিল,
কালের পরিক্রমায় তা হয়েছিল স্তিমিত।
শিক্ষার জগতে ইসলামী সমাজ বিপ্লব সাধন করল। বদর যুদ্ধের কথা প্রথমেই
আসবে, যুদ্ধবন্দীদের মুক্তিপণই ছিল দশজন করে শিশুকে শিক্ষাদান! কি দারুণ মুক্তিপণ!
অজ্ঞতা থেকে কিংবা বন্দীত্ব!
শিক্ষা সবসময়ই এই বিশ্বে চালকীয় আসনে বসেছে। শিক্ষা থাকা মানেই
হাতে তথ্য থাকা বা তথ্যের উৎস সম্পর্কে জানা। আর যার কাছে যতবেশী তথ্য সে ততবেশী এই
বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে, সঠিকভাবে কাজে লাগানোর মাধ্যমে। তথ্যই হচ্ছে প্রধান
সম্পদ। রাসূলের আমলে শিক্ষা সবার মাঝেই ছড়িয়েছিল। এখান থেকেই মুসলিমরা পেয়েছিল তাদের
সমৃদ্ধি শিক্ষা-সংস্কৃতির চারাগাছ, যা পরবর্তীতে বাগদাদ, আলেকজান্দ্রিয়া, কর্ডোভা,
আন্দালুসিয়া, আনাতোলিয়া, ইস্তাম্বুল, দিল্লী কিংবা আমাদের এই বাংলায় ব্যাপকহারে বিস্তার
পেয়েছিল।
সমাপনী
আধুনিক সমাজব্যবস্থা যেখানে প্রতিনিয়ত ব্যর্থতার গল্প শুনাচ্ছে,
দেখাচ্ছে সমাজে ন্যায় ও সাম্য প্রতিষ্ঠায় তাদের না পারার আত্মকথা, সেখানে আমাদেরকে
ইসলামী আদর্শেই মাথা ঠ্যাকাতে হবে, ফিরতে হবে রাসূল (সাঃ) এর পথ ধরেই। তবেই হয়ত আবার
ফিরবে মদীনা, বসরা, বাগদাদ, আন্দালুসিয়া, আনাতোলিয়া, ইস্তাম্বুল, খোরাসান, দিল্লী কিংবা
বাঙলার ইতিহাসের সোনালী দিনগুলি।

0 মন্তব্যসমূহ