বাকস্বাধীনতার প্যারাডক্স সাজ্জাদুর রহমান
"I know that I know nothing."
বাক্যটার অর্থ কি বলতে পারবেন? আমি জানি যে আমি কিছুই জানিনা। কিরকম না? একবার বলছেন আপনি জানেন না কিন্তু আপনি যে কিছুই জানেন না সেটি আবার জানেন। তারমানে আপনি কিছুই জানেন না , বক্তব্যটি মিথ্যা। আবার আপনি বলছেনই কিছুই জানেন না। কিরকম একটা পাগলাটে বাক্য। এখান থেকেই প্যারাডক্সের উৎপত্তি, বাক্যটি এরিস্টটলের। সত্য-মিথ্যার মাঝামাঝি এক অবস্থা যা আমাদের প্রকৃত রূপটি অবগত হওয়া থেকে বিরত রাখছে।
ছোটবেলায় আব্বু একটা মজার খেলা খেলত আমাদের সাথে। জিজ্ঞেস করতেন "I don't know" অর্থ কি। আমরা জানি এর অর্থ কি। আমি জানি না। কিন্তু যখন আপনি আমি জানি না বলছেন তখন স্বীকার করে নিচ্ছেন বাক্যটির অর্থ আপনি জানেন না, অথচ অর্থটিই হচ্ছে আমি জানি না।
বাক-স্বাধীনতায় ফিরে আসি। সংজ্ঞায় যাব না। বাস্তবিক কিছু উদাহরণ দিয়েই যাত্রায় ক্ষান্ত দিই।
[০১]
রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জুমার খুতবা দেবার জন্য মিম্বারে দাঁড়ালেন। তাঁর গায়ে নতুন সেলাই করা একটি জামা। নামাজের সারি থেকে এক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করলেন, কোষাগার থেকে আমরা সবাই মাত্র এক টুকরো করে কাপড় পেয়েছি যার দ্বারা এতবড় জামা বানানো সম্ভব নয়। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে তিনি কি কয়েক টুকরো বেশী নিয়েছেন? রাষ্ট্রপ্রধান নীরব রইলেন। তবে পক্ষে বক্তব্য নিয়ে আসলেন তাঁর ছেলে এবং গোলাম। দুজনেই স্বীকার করলেন রাষ্ট্রপ্রধানকে নিজেদের অংশই দিয়েছিলেন যেন সবগুলো একত্র করে তিনি একটি ভালো পোশাক বানাতে পারেন।
[০২]
বিচারকের এজলাসে একপাশে অর্ধ দুনিয়া বেষ্টিত এক রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট এবং অপরপাশে একজন ইহুদী ব্যক্তি। অভিযোগ, ইহুদী ব্যক্তিটি রাষ্ট্রপ্রধানের ঢাল চুরি করেছে। প্রেসিডেন্টের কাছে নিজ ছেলে এবং গোলাম ব্যতীত অন্য কোন সাক্ষী না থাকায় অভিযোগ খারিজ হয়ে গেল। ঢাল পেল ইহুদী ব্যক্তিটি।
[০৩]
রাষ্ট্রপ্রধানের শিকারের উদ্দেশ্যে ছোড়া তীরের আঘাতে অজান্তেই মৃত্যুর দুয়ারে পাড়ি দিলেন দেশের একজন সাধারণ নাগরিক। তার স্ত্রী বিচার নিয়ে উপস্থিত হলেন প্রধানের দরবারেই। প্রাণের বদলে প্রাণই যখন যাবে তখন প্রধান তাঁর স্ত্রীকে ডেকে আনলেন বিচারমঞ্চে। মহিলার হাতে তুলে দিলেন অস্ত্র, বললেন ন্যায়বিচার হবে এখানেই যে আপনিও আমাকে হত্যা করুন। তাহলে আমার স্ত্রীও একই বেদনা অনুভব করবে। ব্যর্থতা আমার। শাস্তির উপযুক্ত আমি। মহিলাটি মুগ্ধ হয়ে ক্ষমা করে দিলেন।
[০৪]
এইযে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র উদাহরণ গুলো শুধু একয়টিই নয়। অনেক অনেক রয়েছে। শুধু বাকই নয়, সব ধরণের স্বাধীনতাই সুরক্ষিত যে ছিল বুঝার বাকি থাকার কথা নয়। যদি বিচারের স্বাধীনতাটাই সুরক্ষিত থাকে, বাকিসব অনিরাপত্তায় ভুগবার কোন সম্ভাবনাই থাকবেনা। ন্যায়বিচার গুরুত্বপূর্ণ এ কারণেই। বর্তমানে স্বাধীনতা সুরক্ষা নিয়ে দাবীগুলো তোলা হয় বিশ্বমঞ্চে সবগুলোই আপনি বাঁচিলে বাপের নামের মত। আমি বাচা পর্যন্ত ঠিক আছে, বাকিসব গোল্লায় যাক।
তবে ঘটনাগুলো এতটাও সিম্পল নয়। শতবছর নয় বরং আমরা এবার ফিরব আরো আগে, কলোনিয়াল সময়েই গিয়ে দেখি। যখন মুসলিম অধ্যুষিত উপমহাদেশ কলোনিয়াল পিরিয়ডে প্রবেশ করল। শোষণ, নির্যাতনের পাশাপাশি এই বিশাল মুসলিম জনগোষ্ঠী বিরাট অস্ত্র হিসেবে রূপ নিল মুসলিম রাষ্ট্রের বিরুদ্ধেই। দুনিয়ার কোন প্রান্তে একজন মুসলিমও যদি অত্যাচারীত হয়, তার প্রতিবাদ করা সব মুসলিমের দায়িত্ব। অতএব উপমহাদেশের মত জনপদে বিশাল মুসলিম গোষ্ঠীকে নিপীড়ন করা শুধুমাত্র অর্থনৈতিক ভাবে বলবান হওয়াই উদ্দেশ্য ছিলনা বরং এতে আন্তর্জাতিক কুটনীতিতে মুসলিম রাষ্ট্রও চাপে থাকত। মুসলিম রাষ্ট্রকে ডিস্ট্রাক্ট রাখা, অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কাজে বাধা দেয়া সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রেই এই কলোনিয়াল মুসলিম জনপদ গিনিপিগ হয়েছিল ব্রিটিশ বেনিয়াদের হাতে। শুধু ব্রিটিশরাই নয়, একই কাজের অংশীদার হত রাশিয়ান, জার্মান, ফরাসী রাজন্যরাও। ককেশাস অঞ্চলে রাশানরাও মুসলিমদের ব্যবহার করত মুসলিম রাষ্ট্রকে চাপে রাখতে। যদি কোথাও মুসলিমরা সংখ্যালঘু থাকত, সেটা তবে তাদের জন্য হত সোনায় সোহাগা। এসব চাল নতুন কিছুতো নয়ই, বরং এখন কোন শক্তিশালী কেন্দ্র না থাকায় চক্রান্তগুলো বাধাহীন ভাবে ছড়াচ্ছে।
ফ্রান্সের বর্তমান কর্মকান্ড নিয়ে একটু পেছনে গেলেই বুঝা যায় কেন হঠাৎ এত তৎপরতা। তুরস্ক-ফ্রান্সের সাম্প্রতিক কার্যকলাপ, আর্মেনিয়া-আজারবাইজান যুদ্ধ, আফ্রিকায় ফ্রান্সের আধিপত্যবাদে হস্তক্ষেপ সহ বিভিন্ন কারণগুলোর জন্যই এই অপতৎপরতা। বিপর্যস্ত হয়ে সবসময় ধরে চলে আসা চালটাকেই আরেকটু বাড়ন্ত করা। আগুনে ঘি ঢালবার মত।
এসব ক্যাচাল প্যাচালো। চক্রান্তের পর চক্তান্ত দিয়ে বিরাট শিকল গেঁথে রয়েছে। মুসলিম বিশ্ব জবাব দিচ্ছে। যেভাবে দেবার সেভাবে হয়ত না, তবুও হচ্ছে কিছু। প্রকাশিত খবরগুলো থেকে জানাও যাচ্ছে হচ্ছে বা হতে যাচ্ছে কি। সবাই যার যার জায়গা থেকে পদক্ষেপ যদিও নিচ্ছে, প্রশংসনীয়, সময়োপযোগী হলেও রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপ সবচেয়ে জরুরী এবং গুরুত্বপূর্ণ। শতবছর আগের সেই আব্দুল হামিদ খান নেই। ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে সামনে এগুনোই প্রত্যাশা।
স্বাধীনতার প্যারাডক্স থেকে বের হয়ে মানদন্ড থাকাটাও জরুরী। মুসলিমদের জন্য রয়েছে। সেটা আল্লাহ প্রদত্ত। তবে মানবরচিত বিধানে ত্রুটি না থাকাটাই অস্বাভাবিক এবং ত্রুটি থেকে সুযোগ নিয়ে অপরপক্ষকে আঘাত না করাটা অসম্ভবের পর্যায়ে পড়ে। নীতি-নৈতিকতার যেখানে কোনো মাপকাঠি নেই সেখানে আইন শুধুমাত্রই ফুটো হয়ে যাওয়া জাল।

0 মন্তব্যসমূহ