নবীজী
অ্যালেক্সান্ডার ওয়েইন ও মোহাম্মাদ হাশিম কামালি
অনুবাদঃ সাজ্জাদুর রহমান
ছয়শত দশ খ্রিষ্টাব্দের
রমজান মাস,
মক্কার কাছে জাবালে
নূর বেয়ে একটি একাকী মূর্তিকে উঠতে দেখা গেল। পেছনে পড়ে থাকা ধূলোময় প্রান্তর রেখে
পাহাড়ের পাশ কেটে সে যাচ্ছিল হেরা গুহার দিকে, হাজারো বাধাবিপত্তিকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে তার যাত্রা
ছিল অসীমের পানে। সে ছিল মক্কার এক কুরাইশী ব্যবসায়ী, মানুষের লোভী, কটুপূর্ণ চোখ হতে তিনি নিজেকে দূরে রেখেছিলেন। দুনিয়া
তখন অনৈতিকতা এবং জুলুমে ছেয়ে গিয়েছিল। তিনি সেসব থেকে পানাহ চাইতেন, রবের পথ পাওয়ার ধ্যানে মগ্ন থাকতেন দিনের পর
দিন, নিরবিচ্ছিন্নভাবে। অবশেষে একদিন বিশেষ কিছু হল।
একদিন তিনি হেরা গুহায়
পৌঁছিয়ে অন্যান্য দিনগুলোর মত কাজে মনোনিবেশ করলেন এবং কাল পরিক্রমায় ঘুমের
রাজ্যে হারিয়ে গেলেন। তিনি স্বপ্নে দেখতে পেলেন দিগন্তের অপর উঁচু প্রান্তে আল্লাহর
দূত জিবরাঈল (আঃ) এসেছেন এবং তারই দিকে আগাচ্ছেন। অবশেষে মাত্র দুটি মানুষের রুকুরত
অবস্থার জায়গা পরিমাণ দূরত্বে এসে থামলেন। তার হাতে থাকা বস্তুর দিকে ঈঙ্গিত দিয়ে আদেশ
করলেন, “পড়ো!” ব্যক্তিটি আতঙ্কিত এবং বিস্ফারিত
চোখে জবাব দিল "আমি পড়তে জানি না!" জিবরাঈল তাঁকে চেপে ধরে রাখলেন যতক্ষণ না তার সহ্যক্ষমতা অতিক্রম হল! এভাবে দুইবার ঘটল। তারপর আদেশ ঘোষিত হল,
“পড়ো! তোমার প্রভুর নামে, যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন। তিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন দৃঢ়ভাবে আঁটকে থাকা বস্তু থেকে। পড়ো! এবং তোমার রব মহামহিম। যিনি কলম দিয়ে শিখিয়েছেন। তিনি তা শিখিয়েছেন যা মানুষ জানত না”।
মুসলিমমাত্রই জানে এটি ছিল ইতিহাসের মোড় ঘুরানো একটি ঘটনা। এই মক্কার ব্যবসায়ী যিনি জিবরাঈলকে উপস্থিত দেখলেন, প্রেরিত বানী শুনলেন এবং পড়লেন তিনি আর কেউ নন, মুহাম্মাদ (সাঃ)। প্রেরিত কথাগুলো ছিল প্রথম ওহী, যা এসেছিল মহান রব্বুল আ’লামীন থেকে। এগুলোই পৃথিবীতে আসা কুরআনের প্রথম পঙক্তি।
ওহীপ্রাপ্ত হয়ে মুহাম্মাদ (সাঃ) নতুন পাওয়া ইসলাম প্রচারে মনোযোগ দিলেন। মক্কার মানুষকে আহ্বান জানালেন এক আল্লাহর পথে ফিরতে, খারাপ ছেড়ে ভালোর দিকে আগাতে, অন্যান্যদের জন্য স্বার্থত্যাগ করতে এবং সঠিক ও ন্যায়বিচারকে কখনোই ছেড়ে না দিতে। মক্কার মানুষেরা তাঁকে উপাধি দিয়েছিল “আল-আমীন”। অর্থ “বিশ্বস্ত”। আরবরা তার চারিত্রিক মাধুর্যে মুগ্ধ হয়েই দিয়েছিল এই অপূর্ব নাম। কিন্তু তারা দ্বীনের এই দাওয়াতের ময়দানে তাঁকে বিশ্বাস করল না! ইসলামে বিশ্বাসী নতুন সাথীদের নিয়ে তাঁকে হাজারো বাধার সামনে দাঁড়াতে হল। প্রথমদিকে মুসলিম হওয়া এই মানুষেরাই ৬২২ খ্রিষ্টাব্দে আল্লাহর আদেশে মদীনার উদ্দেশ্য পা বাড়ালেন, যাকে আমরা হিজরত বলে জানি।
মক্কা থেকে ৪১৮ কিলোমিটার
উত্তরে মদীনা শহরটি অবস্থিত। রাসূল (সাঃ) ও হিজরত করেছিলেন। এই হিজরত মুসলিম সমাজব্যবস্থার
সূচনা করেছিল। মক্কায় থাকাকালীন শত্রুতাপূর্ণ অন্যান্যদের ভিড়ে মুসলিমরা কেবলমাত্র
একটি ছোট দল হিসেবেই ছিল কিন্তু এখানে এসে তারা আর সেরকম রইল না। এখানে রাসূল (সাঃ)
এর নেতৃত্বে মুসলিমরা একটি আদর্শ সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করল। এই হিজরত অন্যান্য অনেক
কারণেই গুরুত্বপূর্ণ তবে সবচেয়ে বড় হচ্ছে এটি হিজরী সাল গণনা শুরু করিয়েছিল,
ইসলামিক দিনপঞ্জির যাত্রা
শুরু হয়েছিল।
মদীনায় পৌঁছিয়েও রাসূল
(সাঃ) তার দাওয়াতী কাজ অব্যাহত রাখেন। আরবের সবদিকেই ইসলামের মহান বাণী ছড়িয়ে দেন।
আরব ছাড়িয়ে বিশ্বের নানা প্রান্তেও এই সুমহান আদর্শের কথা ধ্বনিত হয়। তিনি বিশ্বকে
জানান, “ইসলাম হচ্ছে এমন একটি জীবনাদর্শ
যা সবার সমতা নিশ্চিত করে (সূরা বানী ইসরায়েলঃ ৭০, সূরা হুজুরাতঃ ১৩) । শুধু বলেই ক্ষান্ত হননি,
পুরো জীবনেই এর প্রতিফলনও
করেছেন। বিদায় হজ্জ্বের ভাষণেও এর উল্লেখ পাওয়া যায় যা মক্কার অদূরে আরাফাতের ময়দানে
৬৩২ খ্রিষ্টাব্দে দেওয়া হয়েছিল। বলা হয়েছিল,
“হে মানুষেরা! নিশ্চয়ই তোমাদের রব একজন, এবং তোমরা এক পিতার সন্তান। সবাইকে আদম (আঃ) থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে এবং তাঁকে সৃষ্টি করা হয়েছে মাটি থেকে। তোমাদের মাঝে আল্লাহর নিকট অধিক শ্রেষ্ঠ সেই যে সবচেয়ে বেশী তাকওয়াবান। কোনো অনারবের উপর আরবের শ্রেষ্ঠত্ব নেই কিংবা কালোর উপর সাদার, তাকওয়া ব্যতীত। জাহেলিয়্যাতের এই নিকৃষ্ট পার্থক্যব্যবস্থা আজ থেকে বাদ গেল”।
এই বক্তব্য থেকে বুঝা যায়,
“মুহাম্মাদ (সাঃ) কখনোই নিজ সিদ্ধান্তকে ওহীর উপর প্রাধান্য দেননি। অন্যভাবে বলা যায়, তিনি বিশ্বাস রাখতেন আল্লাহ্ তার আগেও বহু নবী-রাসূল পাঠিয়েছিলেন। যেমন, আদম, নূহ, ইদ্রিস, ইবরাহীম, মূসা, দাঊদ, ঈসা সর্ব আলাইহিস সালাম সহ আরো অনেককেই। এইদিক বিবেচনায় মুহাম্মাদ (সাঃ) নিজেকে একজন পুনর্জ্জীবিতকারী অথবা পুনরুদ্ধারকারী হিসেবে দেখতেন। তার দায়িত্ব ছিল বিকৃতি এবং বিস্মৃতির গহ্বরে হারিয়ে যাওয়া মহান রব্বুল আ’লামীনের পরম সত্য বাণীকে বাঁচিয়ে তোলা। অবশ্যই তিনি আল্লাহর দেওয়া আইন যা ছিল অবশ্যমান্য তার থেকে নিজেকে ব্যতিক্রম করতেন না, বরং তিনি এসব পালনের ক্ষেত্রে ছিলেন আদর্শ। তিনি ইসলামকে সবচেয়ে সুন্দরভাবে মেনে চলতেন। নিয়মিত নামাজ-রোযা আদায় করা, বেশী বেশী সদকা করা সহ যাবতীয় কাজে তিনি ছিলেন সবার জন্য ভূমিকা, অগ্রগণ্য এবং আদর্শ। তবুও তিনি একজন বিশ্বাসীর বাহ্যিক আচরণের চাইতে মানসিক অবস্থা এবং সুস্থ মননের প্রতি বেশী গুরুত্বারোপ করতেন। তিনি আবু বকর (রাঃ) কে প্রায়ই বলতেন, “সে তোমাকে তার অধিক রোযা এবং নামাজের আমল দ্বারা ছাড়িয়ে যায়নি বরং দৃঢ় সংকল্প দ্বারা গিয়েছে”।
আগেকার নবীদের প্রচার
করা সত্য বাণী ততদিনে মিথ্যার অধিকারে চলে গিয়েছিল তবুও মুহাম্মাদ (সাঃ) পূর্ববর্তী
সেসব কিতাবগুলোর অনুসারীদের যথেষ্ট সম্মান করতেন, তাদেরকে বলা হত আহলে কিতাব (কিতাবের অনুসারী)। বিশেষত
এরা ছিল খ্রিষ্টান এবং ইহুদী সম্প্রদায়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ইয়েমেনের নাজরান থেকে ৬০ সদস্যের নেস্টোরিয়ান খ্রিষ্টানদের
একটি দল তার সাথে চুক্তি সম্পন্ন করতে আসে। তখন তিনি সেই দলকে মসজিদে নববীতে আমন্ত্রণ
জানিয়েছিলেন, তাদের কথামালা এবং
ধর্মীয় বাণীও ভালোভাবে শুনেছিলেন। যখন তাদের ইবাদতের সময় এসেছিল তখন তাদেরকে মসজিদেই
আদায় করার সুযোগ দিয়েছিলেন যদিও তাদের কেবলা ছিল পূর্বদিকে। তাদের ফিরে যাবার আগে উভয়
পক্ষের অনুকূলে চুক্তি হয় যেখানে বলা ছিল জিযিয়া দেওয়ার বিনিময়ে তারা পাবে ইসলামী রাষ্ট্রের
পূর্ণ নিরাপত্তা।
নবী মুহাম্মাদ (সাঃ)
ছিলেন ন্যায়বিচারক এবং সহানুভূতিশীল। নিজ শত্রুর জন্যও তিনি আল্লাহর কাছে হেদায়াত চেয়েছেন
সবসময়। তায়েফের ময়দানেও তিনি বলেছেন আল্লাহকে তার শত্রুদের ক্ষমা করে দিতে,
তাদের ভুলগুলো মাফ করে দিতে।
পবিত্র কুরআনে তাই তাঁকে বলা হয়েছে মহান নবী, মহিমান্বিত চরিত্রের অধিকারী, ওয়াদা পালনে বিশ্বাসী এবং বন্ধু ও সঙ্গীদের কাছে
বিশ্বস্ত।
কিছু সাহাবাদের সাথে
তার সম্পর্ক বেশ গভীর ছিল। কিছু সাহাবার ছিল তার প্রতি প্রকৃষ্ঠ সমর্থন এবং সন্দেহাতীত
আনুগত্য। এখানে মেরাজের ঘটনায় আবু বকর (রাঃ) এর বিশ্বাস এবং আনুগত্যের কথা উল্লেখযোগ্য।
কুরাইশদের মধ্যে অন্যতম মেধাবী একজন যুবক ছিলেন উমর ইবনে খাত্তাব। প্রথম জীবনে তিনি
রাসূলের শত্রুতায় তার সময় ব্যয় করেন। সাহাবারা রাসূলকে এতটাই শ্রদ্ধা করত যে দেখা যেত
তার ব্যক্তিগত জীবনকেও অনুসরণীয় করে নিয়েছেন। যেমন, তার ধরণের কাপড় পরা, তার মতই খাবার খাওয়া, একইভাবে বসা, চুলদাড়ি একইভাবে রাখা সহ আরো অনেককিছুই। সাহাবাদের
ব্যাপারে নবীর ছিল উচ্চধারণা। মক্কা বিজয়ের দিন মুসলিমদের এক বাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন
বিখ্যাত কমান্ডার খালিদ বিন ওয়ালিদ (রাঃ)। তিনি তাকে আব্দুর রহমান ইবনে আউফ (রাঃ) এর
সাথে রাগান্বিত উচ্চস্বরে কথা বলতে দেখলেন। তখন তিনি শান্তভাবে খালিদকে ডেকে বলেছিলেন,
“যদি তুমি পুরো উহুদ পাহাড়কেও
স্বর্ণে মুড়িয়ে আল্লাহর পথে বিলিয়ে দাও তবুও তুমি তার সমান মর্যাদার অধিকারী হবে না”।
প্রসঙ্গত, আব্দুর রহমান ইবনে
আউফ (রাঃ) দুনিয়াতেই জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত দশজন সাহাবীর একজন, তাদেরকে বলা হয় “আশারায়ে মুবাশশারাহ”।
শত্রুকে ক্ষমা করে
দেওয়া ছিল তার অন্যতম মহোত্তম গুণ। শুধু ক্ষমাই নয়, প্রয়োজনে তিনি হতেন সবচেয়ে সাহসী, বিপদে থাকতেন অটল। মার্টিং লিংস তার বিখ্যাত সীরাত
“মুহাম্মাদঃ হিজ লাইফ বেজড অন দ্যা আরলিয়েস্ট সোর্স” এ উহুদ যুদ্ধের বর্ণনায় একটি দারুণ
কাহিনী লিখেছেন। যুদ্ধটি হয়েছিল ৬২৪ খ্রিষ্টাব্দে, তৃতীয় হিজরীতে মদীনার বাইরে উহুদ প্রান্তরে। মুসলিমদের
মুখোমুখি হয়েছিল মক্কার অধিবাসীরা। যুদ্ধের এক পর্যায়ে উবাই নাম্নী এক ব্যক্তি ঘোড়ার
পিঠে বসে প্রতিশোধস্পৃহায় ওয়াদা করে ভাই উমাইয়ার রক্তের বদলা হিসেবে সে রাসূলকে হত্যা
করবে! যে কিনা কিছুক্ষণ আগেই নিহত হয়েছিল। সাহাবাবেষ্টিতাবস্থায় রাসূলের কানেও এ কথা
পৌঁছুল। উবাইকে ঠেকাতে সাহাবারা আগাতে চাইলেও তিনি নিষেধ করলেন। হারিস ইবনে সিম্মাহ
(রাঃ) থেকে একটি বর্শা নিয়ে তিনি নিজেই মোকাবেলায় আগালেন। থমথমে পরিস্থিতিতে যেন ময়দানে
বয়ে যাওয়া বাতাসও দাঁড়িয়ে রইল! এক সাহাবীর বর্ণনায়, “যখন রাসূল স্বেচ্ছায় এগিয়ে গেলেন, তার দৃঢ়তা, ব্যগ্রতার সাথে তুলনা করা যায় এমন কিছুই ছিল না”।
নাঙ্গা তলোয়ারধারী উবাই ঘোড়ায় থেকেই চক্কর দিয়ে সামনে বাড়তে থাকল। রাসূলের তীক্ষ্ণ
দৃষ্টি এবং তড়িৎ হাতের কারিশমায় বর্শার আঘাত লাগল উবাইয়ের ঘাড়ে! ঘোড়া থেকে পড়তে পড়তেও
উবাই নিজেকে বাঁচাল, ভয় পেয়ে গজরাতে থাকা
ষাঁড়ের মত উর্ধ্বশ্বাসে মক্কার পানে ছুটল। সে চিৎকার করতে থাকল, “মুহাম্মাদ! আমাকে খুন করেছে! , মুহাম্মাদ! আমাকে খুন করেছে!” লোকে দেখে হাস কারণ
ঘাড়ের আঘাতটি ছিল একদমই অল্প, মৃত্যু হওয়ার মত যথেষ্ট
নয়। কিন্তু অবশেষে উবাই পরপারে পাড়ি জমাল।
যখন তিনি জীবনের শেষে
পৌঁছুলেন, ইসলামকে দেখলেন বিজয়ী
শক্তি হিসেবে। দিকে দিকে ইসলামে শক্তি বৃদ্ধি পাচ্ছিল। মহিমান্বিত মক্কা বিজয়ের কথা
বলতে হয়, যারা তাঁকে মাতৃভূমি
ছাড়তে বাধ্য করেছিল সেই তাদেরকেই তিনি ক্ষমা করে দিয়েছিলেন! আট বছর পর বিজয়ীরূপে মাতৃভূমিকে
বরণ করে নিয়েছিলেন। মৃত্যুর আগে দেখে গিয়েছেন ইসলাম ছড়িয়েছে জাযিরাতুল আরব জুড়েই। বিচ্ছিন্ন,
অবহেলিত থাকা বিভিন্ন গোত্রগুলো
একত্রিত হয়েছে এক পতাকার নিচে। তাদের নাম হয়েছে “মুসলিম উম্মাহ”।
তারপর এল খোলাফায়ে
রাশেদার যুগ। রাসূল (সাঃ) এর চারজন খলীফা। আবু বকর, উমর, উসমান এবং আলী (রাদিয়াল্লহু আনহুমা)। ইসলাম আরোও বিস্তৃত হল। মধ্যপ্রাচ্য,
পূর্বে পারস্য সাম্রাজ্য,
পশ্চিমে বাঈজেন্টাইন সাম্রাজ্য
ছাড়িয়ে এটি ছড়িয়ে পড়ল অর্ধবিশ্বে। ইসলাম শুধু আর ধর্মতে সীমাবদ্ধ রইল না, এর আসল পরিচয় ততদিনে প্রকাশ পেয়ে গেল। একে শুধু
ধার্মিক ব্যবস্থা বলার সুযোগ তো কখনোই ছিল না! ইসলাম তৎকালীন বিশ্বের সবচেয়ে বড় সভ্যতা
হিসেবে আবির্ভূত হল! মক্কার ধুলোবালি মাড়ানো, নিজভূম থেকে বিতাড়িত এবং অত্যাচারিত একজন সৎ ব্যবসায়ী
মানব ইতিহাসের ভিত্তিকে নতুন ভাবে দাঁড় করালেন।
পরবর্তী এক হাজার
বছরে ইসলাম ডালপালা মেলল নানাদিকে। মধ্যপ্রাচ্যের গরমকে পরম না ভেবে আফ্রিকার কাঠফাটা
রোদকেও ভাই ডাকল, পারস্য সাম্রাজ্যের
আলোকিত অধ্যায়ে মুখ না লুকিয়ে ইউরোপের অন্ধকারকেও তার নিচে আনল, মধ্য এশিয়ার তুর্কীরাও এর ছায়াতলে পোষ মানল,
বহুজাতিক ভারতীয় উপমহাদেশ
কিংবা দখিন-পূর্ব এশিয়াও শান্তি খুঁজে পেল ইসলামের বার্তায়। একই পথ ধরে চীনও লাগাম
ঘুরাল এই সভ্যতাকে বরণ করে নিতে। প্রাচীন চীনের সং (৯৬০-১২৭৯), ইউয়ান (১২৭১-১৩৬৮), এবং মিং (১৩৬৮-১৬৪৪) রাজবংশগুলোর সময়ে ইসলামী জনগোষ্ঠী
সংখ্যালঘু হিসেবেও তাদের রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক এবং অর্থনৈতিক
ব্যাপারগুলোতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত। সপ্তম শতাব্দি থেকে সপ্তদশ শতাব্দী পর্যন্ত
এই গৌরবময় যাত্রা অব্যাহত থাকল।
ইসলামের এরকম অগ্রগতির
পেছনে সংস্কৃতির ভূমিকাকে সর্বাগ্রে রাখতে হবেই। সভ্যতা সংস্কৃতির মাধ্যমেই স্থায়ীরূপ
লাভ করে। প্রথম অহী নাযিলের সময়েই আমরা দেখতে পাই যে সেখানে শিক্ষার একটি ভূমিকা বলা
হয়েছিল। সেখানে পড়ার কথা ছিল, যা আমাদেরকে জানায়
ইসলামী সভ্যতায় পড়ালেখার গুরুত্ব ঠিক কতটা। প্রথম সহস্রাব্দে আমরা দেখতে পাই,
ইসলাম তার সম্পদ এবং ক্ষমতা
উভয় দিয়েই ধর্মীয়, দার্শনিক,
বৈজ্ঞানিক এবং শৈল্পিক বিভিন্ন
কার্যক্রম এবং চিন্তাকে সবসময় এগিয়ে নিয়েছে। সংক্ষেপে, ইসলাম পুরো বিশ্বে সাংস্কৃতিকভাবে সবচেয়ে উন্নত
সভ্যতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল! তখনকার মহাচীন কেবলমাত্র একে টেক্কা দেওয়ার সাহস
হয়ত রাখতে পারত!
পনের শতকের শেষভাগে পর্তুগাল এবং স্পেনের মাধ্যমে ইউরোপে রেনেসাঁর সূচনা হয়। তারা “আবিষ্কারের যুগে” প্রবেশ করে। তারা সমুদ্রপথে বিস্তীর্ণ মুসলিম ভূখণ্ডগুলো খুঁজে পায়, সেখান দিয়েই তারা জাহাজ বেয়ে নিয়ে যায়। তারা দেখতে পায় যখন ইউরোপীয় জীর্ণ এবং পিছিয়ে পড়া খ্রিস্টীয় সংস্কৃতি তাদের বড় অংশকে অন্ধকারে আবদ্ধ রেখেছিল সেখানে মুসলিমরা যখন মরক্কো থেকে সমুদ্রপথে যাত্রা করত, পশ্চিমে ইন্দোনশিয়া কিংবা পূর্বে যেতো সবখানেই তারা সমৃদ্ধ এবং বুদ্ধিবৃত্তিক স্বয়ংসম্পন্ন জনপদের দেখা পেত, যারা মেনে চলত মুহাম্মাদ (সাঃ) এর বাণী এবং ইসলামকে করেছিল জীবনাদর্শ রূপে গ্রহণ।

0 মন্তব্যসমূহ