লেখা তরজমা

এক্সোপ্ল্যানেটে ঘুরাঘুরি



এক্সোপ্ল্যানেটে ঘুরাঘুরি
সাজ্জাদুর রহমান

প্রারম্ভিকা

আচ্ছা, সৌরজগতকে কেন সৌরজগত বলা হয়? এককথায় বলা যায়, “সূর্যকে প্রদক্ষিণকারী মহাজাগতিক বস্তুগুলোর সমন্বয়ে একটি সুশৃঙ্খল ব্যবস্থা”। মনের ছোট্টকোণায় প্রশ্ন কি জাগে, তারকাকেন্দ্রিক কোনো জগতের অস্তিত্ব কি আছে? এ নিয়ে জানতেই আজকে আমাদের পথচলা।

বক্সিং কোর্ট। একপাশে সাতফুটি এক পালোয়ান আরেকপাশে হ্যাংলা-পাতলা এক চুনোপুটি। এখানে তো বলতেও হবে না লড়াইয়ে কে বিজয়ী হবে! এরকমটিই ঘটে যখন প্রবল মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রের অধিকারী বিশালকার তারকার অপরপাশে ক্ষুদ্রাকার, কম মহাকর্ষীয় শক্তির গ্রহ থাকে। ফলে গ্রহটি তারকাকে কেন্দ্র করে ঘূর্ণায়মান হয়। তারকারাজিকে কেন্দ্র করে এই ঘূর্ণায়মান গ্রহগুলোকে নিয়েই তারকাজগত গঠিত। এদেরকে এক্সট্রাসোলার প্ল্যানেট অথবা সৌর-বহিঃস্থ গ্রহও বলা হয়ে থাকে। ১৯১৭ সালে একটি এক্সোপ্ল্যানেটের সম্ভাব্য প্রমাণ পাওয়া গেলেও তার স্বীকৃতি আসতে আসতে হয়েছিল ১৯৯২ সাল। এর আগে ১৯৮৮ সালে ভিন্ন আরেকটি এক্সোপ্ল্যানেটের প্রমাণ নিশ্চিত হয়েছিল। ১৪ই সেপ্টেম্বর ২০২১ এর তথ্যানুযায়ী বর্তমানে ৩৫৭৪টি গ্রহমণ্ডলে ৪৮৩৬টি গ্রহ আছে এবং ৭৯৫টি গ্রহমণ্ডলে একাধিক গ্রহ রয়েছে।

এক্সোপ্ল্যানেট শনাক্তকরণের জন্য বিভিন্ন পন্থা রয়েছে। তন্মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত পাঁচটি নিয়েই আমরা গল্প করব। তাহলে শুরু করা যাক।

পাঁচ পদ্ধতির শনাক্তকরণ

  • প্রথমে এক নজরে সবগুলো দেখে নিই।
  • রেডিয়াল ভেলোসিটি বা রশ্মীয় গতিবেগ।  
  • ট্রানজিট বা গ্রহ-গমন।
  • ডিরেক্ট ইমেজিং বা স্পষ্ট ছবিকরণ।
  • গ্র্যাভিটেশনাল মাইক্রোলেন্সিং বা মহাকর্ষীয় মাইক্রোলেন্সিং।
  • এবং অ্যাস্ট্রোমেট্রি বা জ্যোতির্বিজ্ঞানীয় পরিমাপ।

রেডিয়াল ভেলোসিটি

এটি প্রথম দিককার সফল এবং এখন পর্যন্ত সবচেয়ে কার্যকরী পদ্ধতিগুলোর অন্যতম। অন্যান্য পদ্ধতিগুলোর মাধ্যমে আবিষ্কৃত গ্রহগুলোকেও এই পদ্ধতি দ্বারা যাচাই করা হয়।

তারকাজগতে থাকা গ্রহ তারাকে কক্ষপথে ঘুরাতে কারণের ভূমিকায় থাকে। অর্থাৎ গ্রহ তারাকে প্রদক্ষিণ করার সাথেই গ্রহের মাধ্যাকর্ষণের প্রভাবে তারাতেও আন্দোলন তৈরি হয়, বৃহস্পতির মত বড় গ্রহগুলো বৃহৎ প্রভাব ফেলে অন্যদিকে পৃথিবীর মত ছোটগুলো কম। যেহেতু গ্রহটি টলমলভাবে এদিক ওদিক চলতে থাকে ফলে হালকা তরঙ্গগুলো চেপে আসে এবং আবার বিস্তৃত হয়। এভাবেই আমরা দূর আকাশে যে আলোকচ্ছটা দেখি তা পরিবর্তন হয়।

এই নড়বড়ে বা আন্দোলনরত তারাগুলো চিহ্নিত করতে “ডপলার শিফট” একটি কার্যকরী পদ্ধতি। দেড়শত বছর আগে পদার্থবিদ ডপলার এটি গবেষণা করে পেয়েছিলেন। আচ্ছা, আমরা তো পথেঘাটে কতই অ্যাম্বুলেন্স দেখি। যখন কাছাকাছি আসে তখন এর সাইরেন খুব জোরে কানে লাগে। আবার যখন ধীরে ধীরে দূরে যেতে থাকে তখন সাইরেনের আওয়াজও কমতে থাকে। এভাবেই যখন জ্বলমান তারাগুলো কাছাকাছি চলে আসে তখন তরঙ্গগুলো একত্রিত হয়ে চেপে আসে। আবার যখন তারাগুলো দূরে সরে যায় তখন তরঙ্গগুলোও ছড়িয়ে পড়ে। এভাবে যখন কোনো দৃশ্যমান আলোর তরঙ্গমালা ছড়িয়ে পড়ে তখন তা দেখতে খানিক লালচে লাগে। বিজ্ঞানীরা এটি ব্যবহার করে মহাকাশের চলমান বস্তুগুলোকে পর্যবেক্ষণ করেন।

এই পদ্ধতি বিশ্বের অধিকাংশ জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের দ্বারা এবং টেলিস্কোপে এক্সোপ্ল্যানেট শনাক্তকরণে ব্যবহৃত হয়, বিশেষত হাওয়াইয়ের “দ্যা কেক টেলিস্কোপ” এবং চিলির “লা সিলা মানমন্দির”-এ। এটি ব্যবহার করে এখন পর্যন্ত ৮৭৮টি গ্রহ শনাক্ত করা হয়েছে।

ট্রানজিট মেথড

বিশ্বজগতের অন্যতম সুন্দর ঘটনা কি? কারো কি সূর্যগ্রহণের কথা মনে আসছে? যখন চাঁদ সরাসরি সূর্যের সম্মুখ দিয়ে অতিক্রম করতে গিয়ে এর আলোকে আটকে দেয় তখনি সূর্যগ্রহণ ঘটে। ট্রানজিট মেথডটাও অনেকটা এরকমই।

যখন একটি গ্রহ কোনো পর্যবেক্ষক এবং তারার মধ্য দিয়ে যায় তখন এটি তারার আলোকে কিছুটা ঝিমিয়ে দেয়। আসলে তখন খানিক সময়ের জন্য তারাটি ম্লান হয়ে থাকে। এটি অল্প সময়ের জন্য হলেও জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের কাছে এক্সোপ্ল্যানেটের অস্তিত্ব জানতে কিছুমাত্র বাকী থাকে না।

যে গ্রহ দ্বারা তারাটি স্তিমিত হয় তার আকারের উপর নির্ভর করে বেশকিছু জিনিস জানা যায়। যত বড় গ্রহ তত বেশী আলো আটকে রাখতে পারে। এর ফলে গভীরতর আলোর বক্ররেখা সৃষ্টি হয়। যখন একাধিক গ্রহ একটি তারার দিকে ছুটে তখন এই বক্ররেখাগুলো জটিলতর হয়। এক বা একাধিক গ্রহের মাধ্যমে তৈরি হওয়া বক্ররেখাগুলো একই ধরণের তথ্য নিয়ে আসে।

এই পদ্ধতি শুধু শনাক্তকরণের জন্যই প্রয়োজনীয় নয় বরং এটি দিয়ে গ্রহের তাপমাত্রা ও আবহাওয়া সম্পর্কেও জানা যায়। এক্সোপ্ল্যানেট আবিষ্কারে এটি অবিশ্বাস্যরকম সফল। ৩৪১২টি গ্রহ এর মাধ্যমে খুঁজে পাওয়া গিয়েছে। নাসার কেপলার মিশন এই পদ্ধতি ব্যবহার করেই ২০০৯-২০১৩ মধ্যকার সময়ে হাজারো এক্সোপ্ল্যানেটের সম্ভাব্য প্রমাণ পেয়েছিল। গবেষকদের ছায়াপথে এক্সোপ্ল্যানেটের বিন্যাস নিয়ে মূল্যবান ও প্রয়োজনীয় তথ্যাবলী দিয়ে বহুবিধ সাহায্য করেছিল।

 ডিরেক্ট ইমেজিং

আকাশের তারকাগুলো অনেক উজ্জ্বল লাগে তবে এক্সোপ্ল্যানেটগুলো এরচেয়েও বহুগুণে ম্লান থাকে। তাই বৃহস্পতি কিংবা বুধ গ্রহের ছবি যেভাবে সহজে তোলা যায় এখানে সেভাবে সম্ভব নয়।

বিজ্ঞানীগণ বলেছেন, সরাসরি ছবি তুলতে না পারার জন্য প্রধান সমস্যা হচ্ছে তারাটি প্রদক্ষিণরত গ্রহের চেয়ে উজ্জ্বলতর হয়। এক্সোপ্ল্যানেট থেকে প্রতিফলিত আলো কিংবা বিকিরিত তাপ নিজেই তারা থেকে আসা উচ্চ বিপুল বিকিরণে হারিয়ে যায়। তবে দুইটি পদ্ধতি ব্যবহার সরাসরি ছবিও তোলা যায়।

প্রখর রোদে বাইরে যাওয়ার সময়ে আমরা আগে রোদচশমাটা চোখে লাগিয়ে নিই। এখানের কাজটিও এরকম। বিভিন্ন পদ্ধতি এবং ব্যবস্থার মাধ্যমে তারা থেকে বিকিরিত আলোকে স্তিমিত করা হয় এবং এর ফলে তারার পার্শ্ববর্তী বস্তুগুলোর দিকে সুন্দর দৃষ্টি পাওয়া যায়। সেগুলো হয়ত এক্সোপ্ল্যানেটও হতে পারে!

প্রথম পদ্ধতি হচ্ছে করনোগ্রাফি। এই পদ্ধতিতে টেলিস্কোপের ভেতরে আলোকে আটকানোর জন্য একটি এক ধরণের যন্ত্র ব্যবহার করতে হয়। এতে করে তারা থেকে আগত আলো টেলিস্কোপের শনাক্তকারী জায়গায় আসার আগেই ঝিমিয়ে যায়। এই করনোগ্রাফ সাধারণত টেলিস্কোপে দেওয়া থাকে। ভূ-মানমন্দিরগুলো থেকে এক্সোপ্ল্যানেটের ছবি তুলতে এই পদ্ধতি বর্তমান।  

আরেকটি ব্যবস্থা হচ্ছে “ছায়াতারকা” ব্যবহার করা। তারা থেকে আগত শক্তিশালী রশ্মিকে আটকাতে এটির শুরু হয়েছে। এটিকে ডিজাইন করা হয় যেন সঠিক দূরত্ব এবং কোণে থেকে পর্যবেক্ষণীয় তারকা থেকে আগত তারকার আলোকে আটকাতে পারে।  

এটি এখনো উন্নতির পর্যায়ে রয়েছে। ৫৪টি গ্রহ এই পদ্ধতি ব্যবহার করে আবিষ্কৃত হয়েছে। আশা করা যাচ্ছে এর শীঘ্র উন্নয়ন হবে এবং ভবিষ্যতে এক্সোপ্ল্যানেটের আবহাওয়া বিন্যাস, সাগর কিংবা মহাদেশের অস্তিত্ব আছে কিনা নির্ণয়ে ব্যবহৃত হবে।

গ্র্যাভিটেশনাল মাইক্রোলেন্সিং

কোনো কোনো তারকা বা গ্রহের মাধ্যাকর্ষণ আরো দূরবর্তী অন্য কোনো তারকার আলোর দিকে ফোকাস করে। এই ফোকাসের কারণে সেটি সাময়িকভাবে উজ্জ্বল হয়। মোদ্দাকথা লেন্সিং হল দূরবর্তী কোনো তারকার মাস বা মাসাধিক কাল জুড়ে ক্রমান্বয়ে উজ্জ্বলতার দিকে যাওয়ার গল্প। তারপর এটি বিবর্ণ হয়ে যায়। কোনো গ্রহকে লেন্স করা হলে সেটি দেখতে একটি ছোট্ট আলোর ঝলকানির মত হয় যেটি এই উজ্জ্বল হওয়া এবং স্তিমিত হওয়ার সময় ঘটে।

গ্রহে লেন্স করা হলে আলোর মাত্রা হ্রাস পায় তবে তারকার ক্রমাগত লেন্সিং কার্যক্রমের কারণে এটি বাড়তে থাকে। লেন্সিং তারকাটি যখন সর্বোচ্চ অবস্থানে পৌঁছে তখন দূরবর্তী তারকাটির উজ্জ্বলতা হ্রাস পায়। তবে এত-সব-কিছু নির্ণয় করা সহজ কাজ নয়, তাই বিজ্ঞানীদের বহু সময় ব্যয় করে আকাশের বৃহদাংশ নজরে রাখতে হয়। কারণ কখন কোন অংশে লেন্সিং ঘটবে তা বুঝা দুঃসাধ্য। যখন তারা দেখতে পায় কোনো তারকা উজ্জ্বল হল এবং লেন্সিং বস্তুর প্যাটার্ণ অনুযায়ী বিবর্ণও হল তখন সেই তথ্যাবলী বিশ্লেষণ করে তার আনুমানিক আকার সম্বন্ধে জানা যায়। এই মাধ্যমে ১১৪টি এক্সোপ্ল্যানেট আবিষ্কৃত হয়েছে।

অ্যাস্ট্রোমেট্রি

ডপলার শিফট ছাড়াও বিজ্ঞানীগণ মহাকাশে ঘুরে বেড়ানো তারকারাজির অবস্থান শনাক্ত করতে পারেন। অ্যাস্ট্রোমেট্রি এরকমই একটি পদ্ধতি। তারকাগুলো খুবই কম দূরত্বে একে অপরের সাথে অবস্থান করে ফলে ছোট আকারের গ্রহগুলো যথার্থভাবে শনাক্ত করা সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়।

এই কাজটি করার জন্য বিজ্ঞানীরা একটি তারার ধারাবাহিক ছবি তুলেন এবং একই সাথে পার্শ্ববর্তী অন্যান্য তারাগুলোরও ধারাবাহিক ছবি তুলেন। প্রতিটি ছবিতেই তারা নির্বাচিত তারার (এক্সোপ্ল্যানেট আছে এরকম সন্দেহযুক্ত) সাথে পার্শ্ববর্তী তারাগুলোর দূরত্ব তুলনা করেন। যদি নির্বাচিত তারাটি অন্যান্য তারাগুলোর সাথে সম্পর্কিত হয় তবে তারা এক্সোপ্ল্যানেটের লক্ষণ বুঝার জন্য তা বিশ্লেষণ করেন।

এই পদ্ধতিতে একটি গ্রহ আবিষ্কৃত হয়েছে। এটি একটি জটিল প্রক্রিয়া। এর জন্য প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট অপটিক্স। বিশেষ করে পৃথিবীপৃষ্ঠে থেকে এই পরীক্ষণ কঠিনই বটে কেননা আমাদের বায়ুমণ্ডল আলোকে বিকৃত করে এবং বাঁকিয়ে দেয়।

সমাপ্তি

এক্সোপ্ল্যানেটের ধারণা আমাদের ভবিষ্যতের নতুন অনেক সম্ভাবনাকে উসকে দেয়। বিশেষ করে বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক গল্প, উপন্যাসের জন্য এটি জনপ্রিয় একটি বিষয়। অনেকেই তো বলেও থাকে, তাহলে হয়ত এলিয়েনও পাওয়া যাবে! সে যাইহোক, আমরা মহাকাশের এই রোমাঞ্চকর পথে উড়তে নিজেদের রকেটে শান দিতে থাকি।

মেথডগুলোর ভিডিও দেখতে ক্লিক করুন

১৫ই সেপ্টেম্বর, ২০২১।


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ