লেখা তরজমা

মাজিদ মাজিদী: সব্যসাচী বাজপাখি

কোনো মুভিতে রোমান্টিকতা মানে আপনি কি বুঝেন?

হয়তো বৃষ্টির দৃশ্য থাকবে,তারমাঝে নায়ক-নায়িকার কেমিষ্ট্রিও দেখা যাবে, পরিচালক বেশি রোমান্টিক আবহ আনতে চাইলে আরো গভীর দৃশ্যও নিয়ে আসতে পারেন। কিংবা নায়ক নায়িকার হাত ধরে হেটে যাবে সুদূরপানে, হয়তো তাদের সংলাপগুলো হয়ে যাবে তরুণ প্রজন্মের ভালোলাগার কিছু কথা, পরিচালকের নিপুণ পরিচালনার মতো পর্দার বাইরে অন্যান্যরাও স্বপ্ন দেখবে তাদের জীবনের সুন্দর পরিচালনার। এরকমই কিছু কি ভেসে উঠে মনের কোণে? আপনাদের কল্পনায়?

এরকমটাই তো হবার কথা। আমরা বিভিন্ন ইন্ডাষ্ট্রির রোমান্টিক ফিল্মগুলো দেখে থাকি, কাহিনীতো এভাবেই এগিয়ে যায় অধিকাংশ সময়েই। যদি এমনটাই ভেবে থাকেন তবে নিজেকে প্রস্তুত করুন রোমান্টিকতার সংজ্ঞা নতুন করে ভাবার জন্য, রোমান্টিকতাকে নতুন চোখে দেখার জন্য।

আচ্ছা, একটি রোমান্টিক ফিল্ম, অথচ তাতে নায়ক এবং নায়িকার কোনো সংলাপই নেই, ভাবা যায়?

আপনি বলেই বসতে পারেন এরকম যদি রোমান্টিক ফিল্ম হয় তবে সেটা চ্যাপলিন যুগের। চ্যাপলিনের মতো হয়তো তারাও অঙ্গভঙ্গি দিয়েই অভিনয় করেছেন। কিন্তু ফিল্মটি যদি হয় ২০০১ সালের!

কি? আশ্চর্য হচ্ছেন? তাই বলেছিলাম রোমান্টিকতাকে নতুন চোখে দেখুন। নতুন করে ভাবতে শিখুন।

এখানেও বৃষ্টি আছে, কিন্তু সেই বৃষ্টি নায়ক-নায়িকার জোড়া হাতের উপর বর্ষিত হয়নি, এই বৃষ্টি বর্ষিত হয়েছে মানুষের মনের সকল ধূলো-ময়লা ধুয়েমুছে সাফ করে দেবার জন্য, এই বৃষ্টি বর্ষিত হয়েছে পৃথিবীর উপর বিরক্তি নিয়ে, বর্ষিত হয়েছে মানুষের ভেতরের মানুষটিকে জাগিয়ে দেবার জন্য। এই বৃষ্টির নাম "বারান", একজন কিংবদন্তীর হাতের ছোঁয়ায় বর্ষিত হওয়া এক অঝোর বর্ষণ।

তারপর ধরুন একটি কনস্ট্রাকশন সাইট। সাধারণত আমরা যা কল্পনা করতে পারি কনস্ট্রাকশন সাইট নিয়ে, একটি অর্ধেক তৈরি হওয়া বিল্ডিং, কিছু কর্মী যারা এটি তৈরিতে সাহায্য করছে, সেইসাথে প্রয়োজনীয় ইট, বালি, সিমেন্ট ইত্যাদি ইত্যাদি। বিভিন্ন ফিল্মে এইসব সাইটে তৈরি করা হয় হয়তো ভিলেইনের আস্তানা কিংবা পরিত্যক্ত জায়গা যেখানে সব ধরণের খারাপ কাজ হয়। আরো ভয়ানক ভাবেও দেখানো হয় কোনোসময়। ফিল্মের একশন শেষ করতেও এইসব সাইটের ভূমিকা ব্যাপক দেখা যায়। এই সাইট থেকেই যে চিত্রিত হয়েছে অন্যতম ভালোবাসার একটি উপাখ্যান, সংলাপহীন এক রোমান্টিকতার গল্প কিংবা সেই বৃষ্টি যা আমাদের ভেতরকে জানতে, চিনে নিতে সহযোগীতা করে।

চলুন ভাই-বোনের গল্প বলি এবার। ভাই-বোন ও এক জোড়া জুতার গল্প। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ রোমান্টিসিজম বোধহয় ভাই-বোনের মাঝেই তৈরী হয়। নইলে এক জোড়া জুতা নিয়ে দুজনেই কিভাবে পার করে দিতে পারে অনেক দিন? বোন স্কুল থেকে এসে জুতোজোড়া দিলেই ভাইটি তা পড়ে কেবল স্কুলে যেতে পারে। অনেক সময় যে লেইট হয়ে যায় না, তেমনটা না। লেইট হবার কারণে স্যারের বকাও শুনতে হয়। কিন্তু ভাইটি কি করবে, সেই যে হারিয়েছে প্রিয় বোনের ছোট্ট জুতোজোড়াটা। তাই তাকে ম্যানেজ করে নিতে হয়। কিন্তু তাই বলে কতোদিন, ওই জুতোজোড়াটাও তো ফেটে যায়, পড়ার অযোগ্য হয়,  কিন্তু; ভাইটি তাও চালাতে পারবে তবে বোনের জন্য যে চাই নতুন একজুড়ো জুতো। এরমধ্যেই বলা হলো স্কুলের দৌড় প্রতিযোগীতায় ৩য় হলেই পাওয়া যাবে নতুন একজুড়ো জুতো। এতো সুন্দর সুযোগ কেই বা হাতছাড়া করবে, বলুন। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম নাকি সুন্দর পরিহাস ভাইটি হয়ে গেলো প্রথম, তাই জুতোটাও পাওয়া হলোনা।

বোনের জন্য নতুন জুতো, সেটা যে ভাইটি নিয়ে যেতে পারলোনা। তখন তার কান্নাটা আপনাকে কাঁদাবে যতটা তারথেকেও বেশি ভাবাবে। আপনার মস্তিষ্ক একঝাঁক মুগ্ধতায় স্তব্ধ হয়ে ঝিম মেরে থাকবে।

চলুন কিছু সময় নিয়ে একজন অন্ধ ছেলে থেকেও ঘুরে আসি। অন্ধকে নিয়ে কি আর গল্প করা যায় বরং তাকে সমবেদনা জানানোই সোজা, সেটা সহজেই করা যায়। তাকে নিয়ে গল্প লিখতে, ফিল্ম বানাতে সাহসের ব্যাপার আছে বৈকি, তার গল্প বলতে দরকার আছে কিছু সময়ের। তার অন্ধত্ব তো অভিশাপের নয়, এটাও তো জানানোর বাকি। সেও মানুষ, তাকে মানুষই মনে করুন। অন্ধ তো তার পরের পরিচয়।

আচ্ছা, বলুন তো উপরের গল্পগুলো কি খুব অসাধারণ, বা এমন কোনো গল্প যা কখনওই শুনিনি? এমন তো নয়, তবে কি জানেন এগুলো হচ্ছে একেকটি মাষ্টারপিস ফিল্ম। এই সাদামাটা কাহিনী নিয়ে যিনি আমাদের কিছু অসাধারণ কাজ উপহার দিয়েছেন তিনি হচ্ছেন মাজিদ মাজিদী। একজন স্বপ্নভূক, একজন পথিকৃৎ।

মধ্যপ্রাচ্যের ইরানের তেহরানে জন্ম নেওয়া এক স্বপ্নভূক। ১৭ ই এপ্রিল, ১৯৫৯ সালে তার শুভ পদার্পণ  ঘটে পৃথিবীতে, সেদিনই কি এতোগুলো স্বপ্ন তার বুকে গাঁথা ছিলো?

কে জানে, হয়তো ছিলো। সেই কারণেই কিনা মাত্র ১৪ বৎসর বয়সে অনিয়মিতভাবে থিয়েটার করা শুরু করলেন। সেটা ছিলো ১৯৮১ সাল। যেনো এক স্বপ্নবাজের ছোট ছোট পায়ে নতুন পথচলা।

বাজপাখি কি মাটিতে বসে থেকে কখনো শিকার করে বা করতে দেখেছেন কখনো? আকাশে ঘুরেঘুরে শিকার ধরাই তো তার কাজ। দূরের কঠিন লক্ষ্যকে নিতান্তই সহজ মনে করে সে যথেচ্ছা শিকার করে। এতেই তো তার সার্থকতা। তেমনি যার জন্ম হয়েছে আকাশে উড়বার জন্য তাকে কি অনিয়মিত থিয়েটারে মানায়? তাইতো ১৯৮৫ সালেই তার হয়ে গেলো বড় পর্দায় অভিষেক। নতুন বাজপাখির যাত্রা শুরু হলো বাজপাখিদের রাহবারের হাতে।

মোহসেন মাসমালবাফের পরিচালনায় "বয়কট (Boycott)” দিয়েই হলো নতুন এ পথিকের উড়ন্ত পথচলা।

এর আগেই তিনি ইন্সটিটিউট অব ড্রামাটিক আর্টস থেকে পড়াশোনার পাট চুকিয়ে ফেললেন। এ যেনো প্রস্তুতি নিয়েই ঝাপিয়ে পড়া সেরা শিকারকে ধরার জন্য, যেনো তিনি জানেনই সেরা শিকারটি তার হাতের মুঠোয় আসবেই।

আত্মবিশ্বাস মানুষকে ঠকায় না যদি না সেটা অতিরিক্ত হয়। সাধ্যের মধ্যে যা সেটা আমরা চেষ্টা করলেই পেয়ে যাই। কিন্তু যা আমরা সাধ্যের মধ্যে দেখিনা কিংবা পাইনা, সেগুলোর জন্য দরকার অধ্যবসায়। "Children of heaven" নামটা কি খুব পরিচিত লাগছে? ওই যে সেই ভাইবোনের কাহিনী।  ভাই-বোন এবং একজুড়া জুতোর গল্প। সেই অত্যন্ত সাদামাটা গল্পটা নিয়ে নাকি সিনেমাও হলো আবার সেটা অ্যাকাডেমী এওয়ার্ডের জন্য নমিনেশনও পেলো! অথচ নেপথ্যে কাহিনী কি জানেন?

প্রযোজকরা এই ফিল্মটি প্রযোজনা করতে চাননি। কাহিনী শুনে তারা বলেছিলেন, এই কাহিনী দিয়ে সর্বোচ্চ শর্টফিল্ম সম্ভব, পূর্ণ্যদৈর্ঘ্য ছবি অসম্ভব। অথচ সেটি কিনা অস্কার পেতেও পারতো বেস্ট ফরেইন ল্যাংগুয়েজ মুভি হিসেবে! রবার্তো বেনিগনির "life is beautiful” মুভিটার কাছে হেরে গেলেও জয় হলো ইরানী চলচিত্রের। জয়টা হলো এক বাজপাখির।

দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানো যেমন তেমনি সেই বছরই মুভিটি পেলো "Montreal International Film Festival" এ সেরা চলচিত্রের পুরষ্কার। তখন ছিলো ১৯৯৮ সাল। বাজপাখির আকাশে রাজত্ব করবার উপাখ্যান মাত্র শুরু হলো।

১৯৯৯-২০০০ এর মধ্যেই এসে গেলো তার ৩য় ফিল্মটি। ওইযে অন্ধ ছেলেটা, যে দেড়ঘন্টা সবাইকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিলো, ওই ছেলেটা যাকে তার বাবা অভিশাপ মনে করেছিলো, সেই অন্ধ ছেলেটার কাহিনী নিয়েই এলো "The color of paradise"। মজার ব্যাপার কি জানেন এটিও প্রথম ছবিটির মতো মন্ট্রিলের ফিল্ম ফেস্টিভালে সেরা ছবির পুরষ্কার পেলো। একজন পরিচালকের আর কিইবা চাই তখন, পরপর দুটি ছবি বিশ্বের তাবত সমালোচকদের প্রশংসা কুড়িয়ে নিলো। বাজের ক্ষুধা কি তবু থেমে থাকে, যত সামনে এগোয় তত ভালো কিছু হয়তো চোখে পড়ে যায়। তাই কাজও শুরু হয়।

এবার ২০০১ সাল। এবার এলো সেই প্রতীক্ষিত বৃষ্টি। আসলে "Baran" শব্দের আসল অর্থই হচ্ছে বৃষ্টি। যে বৃষ্টি বর্ষিত হলো মানুষের হৃদয়ে, যা মানুষকে অন্য রূপে পরিবির্তন করে দিলো। জন্ম নিয়েছিলো সংলাপহীন রোমান্টিকতার এক অমর সৃষ্টি। পেলাম রোমান্টিকতার নতুন সংজ্ঞা, নতুন ভাবে আবিষ্কার করলাম আবার। আশ্চর্য কি জানেন, এটি শুধু ২৫তম মন্ট্রিল ফিল্ম ফেস্টিভালে সেরা ছবিই নির্বাচিত হলো না সেই সাথে পেয়ে গেলো "European Academy Award" এর সেরা ফিল্মের পুরষ্কার। আর কি চাই একজনের, ৩ টি ছবিই যদি সেরা হয়ে যায় তখন ক্ষুধাটা আরো বেড়ে যায়, আগ্রহটাও তীব্রভাবে বৃদ্ধি পেতে থাকে। মানুষটিও আরো বড় হতে থাকে।

১৯৯৬ এ মুক্তি পেলো "Father",  ২০০৫ এ মুক্তি পেলো "The willow tree" এবং ২০০৮ এ আমরা পেলাম "The song of sparrows"।  এতোগুলো ভালো মুভির ভীড়ে যখন দর্শকরা যখন ক্লান্ত হয়েও আনন্দিত তখনি  মুহাম্মদ(সাঃ) এর জীবনী নিয়ে তৈরিকৃত একটি ফিল্ম প্রকাশিত হবার ঘোষণাও এল। তখন ছিল ২০১৫।  যেটি আবার ইরানের জন্য সবচেয়ে ব্যয়বহুল সিনেমা হিসেবে পরিচিত হলো। সবশেষে ২০১৭ তেই পেলাম আমরা "Beyond  the clouds" নামক মুভিতে কিছু অসাধারণ চরিত্র সম্বলিত এক ব্রিলিয়ান্ট পরিচালকের সাক্ষাত। নতুনদের নিয়ে ছবি করতে তিনি ভালোবাসেন। মজার ব্যাপার কি জানেন,এই "Beyond the clouds" হচ্ছে মাজিদ মাজিদীর প্রথম ডিজিটাল ছবি। আগের এতো এতো এওয়ার্ড প্রাপ্ত মুভিগুলো শুধুই ছিলো নেগেটিভ ফিল্ম এর সাহায্যে তৈরি। এর থেকেই সাক্ষাত পাওয়া যায় একজন স্বপ্নবাজ, ডেডিকেটেড পরিচালকের যিনি ক্যামেরা দিয়ে ক্যানভাসে স্বপ্ন সাজিয়ে রাখেন।

তার ছবিগুলো রিমেক হতেও শুরু করলো। "Children of heaven" এর অফিসিয়াল রিমেক হচ্ছে বলিউডের "Bumm Bumm Bole"।  মুভিটি  ২০১০ সালে মুক্তি পায়। আমার দূর্ভাগ্য নাকি সৌভাগ্য বলবো আমি আগে রিমেকটা দেখেছি, তারপর মূল মুভিটা দেখা হয়েছে।

২০০৮ এ মুক্তি পাওয়া "The song of sparrows" মুভিটি ছিলো "Visakhapatnam International Film Festival" এর ওপেনিং ফিল্ম। তবে হ্যাঁ তার প্রথম ফিচার ফিল্ম হিসেবে মুক্তি পেয়েছিলো "Baduk", তাও সেটা ১৯৯২ সালে। ২০০৮ সালেই বেইজিং সরকার তাকে সহ বিশ্ব থেকে আরো ০৪ জন পরিচালককে আমন্ত্রণ জানান বেইজিং নিয়ে ডকুমেন্টারি নির্মাণের জন্যে, যার নাম ছিলো "Vision Beijing"। এ ডকুমেন্টারিটি সামার অলিম্পিকের ওপেনিং এর জন্য নির্মিত হয়েছিলো।

শুধু ভালো মুভিই নয়, মাজিদীর হাত থেকে আমরা পেয়েছি কিছু অসাধারণ ডকুমেন্টারিও। তন্মধ্যে একটি হচ্ছে "Barefoot to Herat"।  ২০০১ সালের যুদ্ধবিধ্বস্ত রিফিউজি ক্যাম্প নিয়ে হৃদয়গ্রাহী এক ডকুমেন্টারি এটি। বিশ্বের বিভিন্ন দেশেই এটি দর্শকনন্দিত হয়, সমালোচকদের প্রশংসা কুড়ায়।

মাজিদীর চলচিত্র, ডকুমেন্টারি যেটাই বলি, সবগুলোরই রয়েছে একটি বিশেষ দিক। মাজিদীর কাজগুলো আপনাকে নৈতিকতার শিক্ষা দিবে, মানুষকে আরো গভীরে গিয়ে নিজকে চিনতে সাহায্য করবে। আপনাকে প্রতিবেশীর হক পালন করা শিখাবে, শিখাবে সহযোগীতার পাঠ, দেখাবে সাধারণকে কি করে অসাধারণ করে তুলতে হয়, বুঝিয়ে দিবে জীবনের পরিচয়।

মাজিদীর চলচিত্রগুলোর কাহিনী খুবই সাদামাটা, খুবই সাধারণ হয়। তিনি চলচ্চিত্রে জীবনকে ঘনিষ্ঠ করে তুলেন। আপনি কি ভাবতে পারেন রিফিউজিদের নিয়ে চলচ্চিত্র হতে পারে? কিংবা কিছু কারিগর যারা কনস্ট্রাকশন সাইটে সাধারণ কাজ করে তারাও কি কোনো ছবির মূল উপজীব্য হতে পারে? তাদের মাঝেও কি থাকতে পারে প্রেম নাকি শুধুই বাস্তবতার রূঢ়ধ্বনিই তাদের সর্বক্ষণের সঙ্গী? বা ধরুন কেউ মোটর সাইকেল চালিয়ে জীবিকা উপার্জন করে সেও কি ছবির মূলে থাকতে পারে? এরকম কত প্রশ্নই আসতে পারে। কিন্তু জানেন মাজিদী এসব চরিত্রেই সোনা ফলিয়েছেন, এদেরকেই রূপ দিয়েছেন, গড়ে তুলেছেন সেলুলয়েডের রূপালী  পর্দার জন্য।

সাধারণত মাজিদী আনকোরা, একেবারেই নতুনদের নিয়ে কাজ করতে ভালোবাসেন। আশ্চর্য কথা নয় কি, একেবারেই নতুনরা কিভাবে এসেই তার চলচিত্রে বাজিমাত করে!

মাজিদী তার ফিল্ম তৈরির ক্ষেত্রে রিয়েলিটির উপর জোর দেন বেশি। স্টুডিওতে বানানো সেটের উপর তার রয়েছে অগাধ অস্বস্তি। তিনি মনে করেন চলচিত্রের ক্ষেত্রে স্থানটাও একটা ক্যারেক্টার।  অন্যান্য জীবিত ক্যারেক্টারের মতোই এটিও জীবিত থাকাই উচিত। যেখানে জীবন চলমান সেখানেই তো পাওয়া যাবে জীবনের গল্পের অজস্র উপাদান,যাকে আমরা সিনেমা বলে চালিয়ে দিই।

তার অন্যতম  একটি বিখ্যাত মুভি হচ্ছে "Beyond the Clouds"। এখানে তিনি মাত্র একটি দৃশ্য সেট তৈরী করে শ্যুট করেছেন। বাকি পুরো ফিল্মটাই শ্যুট হয়েছে মুম্বাইয়ের অলিতে গলিতে। মজার ব্যাপার হচ্ছে এটিই তার প্রথম ডিজিটাল ফিল্ম এবং এটিই হচ্ছে তার পরিচালনায় প্রথম বলিউড ফিল্ম।

প্রখ্যাত সাংবাদিক রাজিভ মাসান্দ এর একটি ইন্টারভিউতে মাজিদী এরকম কিছু বিষয় তুলে ধরেছেন। মাজিদী ইন্টারভিউতে এটাও বলেছেন যে তিনি সত্যজিৎ রায়ের "পথের পাঁচালী" ফিল্মটি ৩০ বারের বেশি দেখেছেন এবং প্রতিবারই তার এটি নতুন মনে হয়েছে। আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে আমরা যারা বাঙালী, তারা কজনই "পথের পাঁচালী" ফিল্মটি দেখেছি? কজনই বা জানি এই ফিল্মটি অস্কার পেয়েছিলো?

সত্যজিৎ রায় হচ্ছেন মাজিদীর অনুপ্রেরণা। সত্যজিৎ রায়ের ফিল্ম সম্পর্কে মাজিদীর ভাষ্য হচ্ছে,

“সত্যজিৎ রায়ের সিনেমা ভীষণ হৃদয়গ্রাহী, কোমল, সাধারণ, এবং আকর্ষী। এই সাধারণত্ব মানে এই না যে এইটা নরমাল কিছু বরং এইটা জীবন থেকে উঠে আসা কিছু। এইটা হচ্ছে জীবনের খেলাঘরের খোলা জানালার মত, সেই জানালা দিয়া জীবনের বাস্তবতা দেখা যায়। এইটারে জীবনই লাগে, সিনেমা না”।সত্যজিত রায়ের ক্ষেত্রে এ ভাষ্য যেমন সত্য, ঠিক তেমনি সঠিক মাজিদ মাজিদীর ক্ষেত্রেও। ব্যাপারটা এরকম আমরা মাজিদীকে বলতে পারবো "সত্যজিৎ অব আরব ওয়ার্ল্ড"। দুজনের কাজের প্রকৃতি একই রকম, উপাদানের অপ্রাচুর্যতা থাকলেও তাদের ডেডিকেশনের কাছে তা নিতান্তই মূল্যহীন। 

মাজিদীর ফিল্মগুলোতে সবচেয়ে কমন ধরা যায় যে বিষয়টিকে সেটি হচ্ছে শেষটা সুখের হবেনা, কোন একটা অপূর্ণতা অবশ্যই থাকবে। নইলে দেখুন "Children of heaven" এ ছেলেটা তো ৩য় হতেও পারতো দৌড় প্রতিযোগিতায় আর বোনের জন্য জুতাটাও নিয়ে যেতে পারতো। ছেলেটা প্রথম হয়ে গেলো, তার সফলতা দেখা গেলেও ফিল্মের মূল বিষয়ের অপূর্ণতা কিন্তু হয়েই গেলো। সেভাবেই "The song of sparrows" ফিল্মে কেনো নায়ক যখনই মাত্র উপার্জন শুরু করলো তখনি তার পা'টা ভেঙে গেলো? কেমন যেনো একটা অপূর্ণতা থেকেই যাচ্ছে সবসময়।

চিন্তা করুন, গভীরে গিয়ে দেখুন তো আপনার জীবনটাও এরকম কিনা, সবকিছুতেই কি পরিপূর্ণতা পাচ্ছেন নাকি শেষে এসে অপূর্ণতা গ্রাস করেছে? আপনার উত্তরটা হ্যাঁ হওয়াটাই সমীচীন। আপনার জীবন আর মাজিদীর ফিল্মকে তো এখন এক সুতাতেই গেঁথে নিতে পারেন।

মাজিদীর ফিল্মের আরেকটি গভীর দিক হচ্ছে হার না মানা মানসিকতা। তার গল্পের নায়করা একেবারে শেষটা দেখেই ছাড়ে, হার মেনে নেওয়া তাদের অভিধানেই নেই। মাজিদী তার সাক্ষাৎকারে এ বিষয়টিকে হাইলাইট করেছেন। নৈতিক শিক্ষা দেওয়া, হার না মানা মানসিকতা তৈরি, মানুষকে জীবন সম্পর্কে শিখানো এগুলোই তার ফিল্মের মূল উপজীব্য হয়ে থাকে। "Children of heaven" মুভিটাতে এরকমই কিছু দেখতে পাই আমরা। ছোট্ট আলি দৌড়ে যখন ৩য় হবার জন্য লড়াই করেও বারবার পিছিয়ে যাচ্ছে তখন তার সেই হার না মানা মানসিকতা তাকে আবার জাগিয়ে তুলছে, এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে সামনে। অবশেষে সে কিনা প্রথমই হয়ে গেলো। এটাই মাজিদীর বিশেষত্ব। তার পরিচালিত মুভি দেখে আপনি শুধু ড্রামা কিংবা ফ্যান্টাসির মজাই পাবেন না সেই সাথে ফ্রি হিসেবে আপনার জীবন গড়ার উপাদানও পাচ্ছেন। এক ঢিলে দুই পাখি মারা আনন্দের, কিন্তু তাতে যদি কয়েকটি পাখি মরে যায়, তবে?

মাজিদীকে বুঝতে হলে তার চলচ্চিত্র আপনাকে বুঝতে হবে। তার চলচ্চিত্রের ভাবনা, সিনেমাটোগ্রাফি, স্থান, ক্যারেক্টার এগুলো সব দেখলেই মনে হয় যেনো তিনি কারো জীবনকেই গোপনে ক্যামেরায় ধারণ করছেন প্রতিনিয়ত। "Baran" চলচিত্রের কথায় যদি আসি, রোমান্টিক ফিল্ম হলেও এটি সম্পূর্ণ আলাদা ধরণের। কিন্তু কোন বিষয়টি এটাকে রোমান্টিকতার মর্যাদা দিলো?

যেখানে সাধারণভাবে রোমান্টিকতা বলতে আমারা যা বুঝি তা এখানে অনুপস্থিত। এখানেই রয়েছে মাজিদীর অসাধারণ সিনেমাটোগ্রাফির কাজ। মুভিতে নায়ক লতীফ এবং নায়িকা বারানে'র কিছু ক্লোজআপ শট আছে, যেগুলো অনেক না বলা কথা বলে দেয়। মাজিদীর তীক্ষ্ণতার প্রমাণ এখানে ভালোভাবেই পাওয়া যায়।

আপনার কাজগুলো তখনি সুন্দর হয়, তখনি ভালো হয় যখন আপনি কিছু সুন্দর এবং ভালো ভাবনা নিজমনে ভাবতে পারেন এবং সর্বোচ্চ চেষ্টা করেন সেগুলো বাস্তবায়নের। মাজিদীর ভাবনাগুলো তার চলচিত্রের থেকেও সুন্দর।
মাজিদীর একটি এক্সক্লুসিভ ইন্টারভিউতে তাকে ইরানী চলচিত্রের বিশ্বব্যাপী সাফল্য নিয়ে প্রশ্ন করা হয়েছিলো। চলুন তার উত্তরটা জেনে আসি।

আমার মতে, কেউ যদি মানুষকে পড়তে চায় বা তার মূল্যবোধকে দেখতে চায় সেটা যেকোনো কালচারেই হোক, চাই ইরানীয়ান বা অন্য, শেষমেষ সে সীমানার বাধাকে আর গুণে না। মানুষের মাঝে অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক কিংবা প্রযুক্তিগত পার্থক্য থাকবেই তবে মানবিক বোধের কাছে সবই গৌণ, এইটা বৈশ্বিক। কারণ, মানুষকে খোদা নিজে বানাইছেন, সবকিছুই সবাইরে সমান দিছেন, সেটা প্রেম, ভালোবাসা, বীরত্ব, বন্ধুত্ব যাই হোক না কেন। আর শিল্প এভাবেই মানুষকে কাছে নিয়ে আসে, এর ভাষা একটা সাধারণ মানবিকতা তৈয়ার করে, এখানে জাতিগত, বর্ণগত কিংবা সাংস্কৃতিক যতই গোলযোগ থাকুক। আমি মনে করি, ইরানী সিনেমা এই জায়গাটাতেই নিজেরে খুঁজে পাইছে। এই বিশ্ব এখন ভালোবাসার জন্য তৃষ্ণার্ত, বন্ধুত্বের জন্য ভুভুক্ষ, এইসব এমনিতেও বুঝা যায়।

 তার অন্যতম শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র এবং সবচেয়ে ব্যয়বহুল ইরানী চলচ্চিত্র "Muhammad  the messenger of God" নিয়ে প্রথমত প্রচুর সমালোচনা হয়েছিলো। মুহাম্মাদ(সাঃ) এর জীবন নিয়ে সিনেমা, এ অসম্ভব! এরকম কিছু ভাষ্য মাজিদীকে চারপাশ থেকে ঘিরে ধরেছিলো। মাজিদীর বক্তব্য শুনে আসি চলুন, 

“এটা নতুন কিছুর সূচনা করবে, মুসলিম সিনেমাজগতের জন্য এটি হবে একধাপ এগিয়ে যাওয়া। মুসলিম সিনেমার অগ্রগতির জন্য এটি একটি বিনিয়োগ”।

 মাজিদী তার ফিল্মের মাধ্যমে যেমন নৈতিকতার শিক্ষা দেন তেমনি তিনি নিজেও এর উপর অটল থাকেন। ডেনমার্কের আন্তর্জাতিক ফিল্ম ফেস্টিভালে তাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিলো, রাসূল(সাঃ) কে বিদ্রূপ করে সেবছর ডেনমার্কে কার্টুন নির্মিত হয়েছিলো। এতে মুসলিমরা তাদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত পেয়েছিলো। কারো ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত এক ধরণের মানবিক অপরাধ। মাজিদী সেই কারণে তার নাম প্রত্যাহার করে নিলেন। তার বক্তব্য ছিলো নিম্নরূপ, 

“আমি আল্লাহকে বিশ্বাস করি। আমি তার দেওয়া জীবনে বিশ্বাস করি এবং এই বিশ্বাস নিয়েই প্রতি মুহূর্ত কাটাই। আমার জীবনবিধানের বিপরীতে আসা সকল বাধা-বিপত্তিকে আমি এভাবেই মোকাবেলা করি। এই কারণেই এই অনুষ্ঠান থেকে আমার সিনেমাটিকে সরিয়ে নিয়েছি”।

 মাজিদী শুধু তথাকথিত ফিল্ম বানাননি, তিনি চেয়েছেন সমাজকে পরিবর্তন করতে। মানুষকে স্বপ্ন দেখাতে, চেয়েছেন নৈতিকভাবে মানুষদের দৃঢ় করে তুলতে। তিনি পেরেছেন জীবনকে ফিল্মে প্রবেশ করাতে, মানুষের জীবনকে রূপালী পর্দায় প্রতিফলিত করাতে। মাজিদীকে শুধু একজন পরিচালক, প্রডিউসার কিংবা স্ক্রিনরাইটার বললেই পোষাবে না তিনি একজন দার্শনিক। জীবনকে এতো সুন্দর ভাবে রূপালী পর্দায় কতজনই বা ফুটিয়ে তুলতে পারবে, বলুন?

তাকে বলতে পারেন সত্যজিৎ অব আরব ওয়ার্ল্ড কিংবা বলতে ক্যামেরা হাতে ছুটে চলা সক্রেটিস কিংবা ক্যামেরায় শটের পর শট বুনে জীবনের গল্প তৈরি করা চাঁদের বুড়ি। তার সিনেমা দর্শন আমাদের ভাবতে শেখায়, নূতনভাবে দেখতে শেখায়, শেখায় জীবনকে অন্যভাবে উপলব্ধি করতে এবং সবশেষে একঝাঁক মুগ্ধতায় ঝিম মেরে বসে থাকা ছাড়া কিছুই করার থাকেনা। এটা একটা উপযুক্ত সময় হতেই পারে তার সিনেমার দর্শনকে নূতন মোড়কে উপস্থাপন করা এবং শিক্ষা নেওয়া। মাজিদীর সাথে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মিল পাওয়া যায় কবিগুরুর একটি ছোট্ট লাইনেই,

           “ শেষ হয়েও হইলোনা শেষ”

ওইযে ঝিম মারা মাথা স্তব্ধ করা অনুভূতিটা ঠিক এরকমই,শেষ হয়েও শেষ হয়না।





একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ