
বাগদাদী বাসাবাড়ী
জিম আল-খলিলী
ভাষান্তর - সাজ্জাদুর রহমান
বাগদাদের মহল এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক ভবনগুলো ছিল লম্বা এবং কয়েক তলা সম্পন্ন। কিছু দালানের উপরে বায়ুনির্দেশক যন্ত্রও দেখা যেত, ঘোড়সওয়ারের ভঙ্গিমায় এগুলোকে বানানো হত। এগুলো একইসাথে বাতাস কোনদিকে বইছে তা দেখাত এবং ঘোড়সওয়ারের আদল প্রকাশ করত খলীফার শক্তি ও মুসলিম বীরদের শৌর্যবীর্যের গল্প। প্রচলিত আছে যে, একবার এক চোর খলীফার বাসভবনে ঢুকেছিল। প্রাসাদরক্ষীরা সাথেসাথেই বুঝতে পেরে তাকে ধাওয়া করে। চোর নিজেকে বাঁচাতে জানালা দিয়ে লাফ দেয় এবং নয়তলা নিচে উঠোনে গিয়ে পড়ে! এই কাহিনী মূলত তৎকালীন দালান কাঠামোর ব্যাপকতা নিয়ে ধারণা দেয়।
উচ্চবিত্তদের বাসায় মার্বেল পাথরের আধিক্য দেখা যেত! ঘরের পিলার থেকে শুরু করে মেঝে, সিঁড়ির ধাপ, উঠোনের চারিপাশ এবং নদীর তীর ঘেঁষে হাঁটাপথেও মার্বেল পাথর বিছানো এবং সজ্জিত থাকত। দেয়ালের পলেস্তারায় থাকত সুচারু কারুকাজের অপরূপ উপাখ্যান, মেঝেতে মার্বেল পাথরের পাশাপাশি সিরামিকের টালিও ব্যবহৃত হত। তার উপরে শীতকালে বিছানো থাকত অপূর্ব সুন্দর কার্পেট, গরম আসলেই সেসব তুলে রাখা হত। মেঝেতে ছড়ানো থাকত অনিন্দ্য সব গদি, হাতের কারচূপিতে সেসবে গড়ে উঠত হাজারো নকশার আবাস। আহারাদি সাড়তে, খোশগল্প করতে কিংবা গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকেও পরিবারের সবাই গদিগুলোতে বসে কাজ সমাপন করত। নিচতলার ঘরগুলোর একপাশ উম্মুক্ত রাখা হত যেন সহজেই উঠোনের সাথে সংযোগ হয়। হয়ত সেখানে কোনো ছোট্ট ঝর্ণা আছে, ঘরে বসে পানির কলকল শব্দের মূর্ছনা কিংবা মধ্যদুপুরের রোদের সাথে পানির আড়ি সবই যেন এক স্বর্গীয় পরিবেশ বাগদাদের মাটিতে নামিয়ে আনত। রান্নাঘর সাধারণত মাটির নীচে থাকত তবে ছাদ থেকে উঠোনে ধাতুজাত ঝাঁঝরির সাহায্যে বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা রাখা হত। গরম থেকে বাঁচতে রাতে পরিবারের সবাই মিলে ছাদে থাকা হত এবং বৈকালিক আড্ডা-ভোজনের জন্য ভূগর্ভস্থ কামরার ঠাণ্ডা বাতাবরণকে বেঁছে নেওয়া হত।
অপরদিকে অল্পবিত্তদের আবাসস্থানও ছিল কয়েক তলা বিশিষ্ট, তবে জনসংখ্যা ভারাক্রান্ত। খেজুরগাছের কাণ্ড দিয়ে বানানো বীমের এখানের মেঝেগুলোকে বিভক্ত করত। অবশ্য মাটিপোড়া ইট দিয়ে বানানো দালানের চাইতে এসবই অধিক শক্ত-সমর্থ্য হত। বর্তমানের বাড়ীওয়ালাদের ভাড়াটিয়াদের নিয়ে অভিযোগের অন্ত নেই, ১৩০০ বছর আগের সেই স্বর্ণনগরী বাগদাদেও এর ব্যতিক্রম হত না! এক বর্ণনায় এসেছে,
“তারা ছাদে রান্নাবান্না করতে গেলে আমি আশঙ্কায় থাকি কখন না জানি বাড়িসুদ্ধ পুড়িয়ে ফেলে! আবর্জনা ফেলে নর্দমার জলস্রোত আটকে রাখে, এতে আমার সম্পত্তির সৌন্দর্য এবং মূল্য হ্রাস পায়। দরজায় অযথা ধাক্কাধাক্কি, তালা এবং কব্জা ভেঙে ফেলা তাদের নৈমিত্তিক কাজ! কাপড় পরিষ্কারের কাজ নির্দিষ্ট জায়গায় থাকা পাথরে না করে তারা মেঝেকেই উত্তম বিবেচনা করে! তাদের বাচ্চারা উঠোনজুড়ে গর্ত করে এবং দেয়ালে দাগিয়ে ভরে ফেলে। এমনকি কাঠের তাকগুলোও আস্ত না রাখতে তাদের পারঙ্গমতা প্রশংসনীয়! আর যখন তারা চলে যায় তখন যতটুকু নিতে পারবে সবই হস্তগত করে। মই এবং পানির পাত্রকেও তারা রেহাই দেয় না! ”
তবে সর্বোপরি বাগদাদ ছিল সুব্যবস্থাপূর্ণ একটি শহর। রাস্তা এবং পার্শ্ব বীথিকাগুলো ছিল চোখজুড়ানোকর পরিচ্ছন্ন, নিয়মিত ঝাড়ু দেওয়া হত। দজলা থেকে কেটে আনা খালগুলো একেবেকে শহরের বিভিন্ন প্রান্তে পানির পরিমিত প্রবাহ ধরে রাখত, শহর-বাসিন্দারা এর থেকে বহুভাবে উপকৃত হত। আঁচলিক এবং আগমিত মশলার জোর খুশবো বাতাসকে জীবন্ত করত, সুগন্ধির সৌরভে মানুষজন থাকত উৎফুল্ল। নদীর পাড় জুড়ে থাকা বিভিন্ন স্থানীয় খাবারঘর যেন এসবের পূর্ণতা দিত। স্থানিক রুচিকর ও সুস্বাদু খাবারের অমৃতরূপ সুগন্ধ কাউকেই খাওয়া থেকে ফিরিয়ে রাখতে পারত না! মিঠাপানির শাবাউত মাছপোড়ার কথা বাগদাদ আজও ভুলতে পারেনি!
দুঃখজনক হচ্ছে যে এই ঐতিহ্যপূর্ণ বাগদাদের অনেক স্থাপনাই এখন আর দাঁড়িয়ে নেই। যেখানে আমরা অন্যান্য ঐতিহাসিক শহরগুলোতে দারুণ সব নিদর্শন পেয়ে থাকি। তবুও বলতে হবেই, রোম, এথেনস কিংবা আলেকজান্দ্রিয়ার শ্রেষ্ঠতর সময়েও এতটা সমৃদ্ধি তারা কল্পনা করেনি বাগদাদ মাত্র চল্লিশ বছরেই যতটা অর্জন করেছিল!
0 মন্তব্যসমূহ