লেখা তরজমা

আমাদের ভাষা


আমাদের ভাষা
সাজ্জাদুর রহমান 

“একাডেমী” শব্দটার সরল বাংলা অনুবাদ হচ্ছে “শিক্ষায়তন”। আরো উচ্চার্থে পণ্ডিতসভা কিংবা ভিন্নার্থে বিশ্ববিদ্যালয়ও বলা যায়। 

ছোটবেলায় ব্যকরণ পড়ার সময়ে দেখতাম বাংলা ভাষার মধ্যে কালের পরিক্রমায় এসে যাওয়া বিভিন্ন ভাষার শব্দকে আলাদা ভাবে চিহ্নিত করে রাখা হত। যেমন, এই শব্দগুলো পর্তুগীজ, এগুলো জাপানীজ কিংবা এসব হচ্ছে আরবী বা উর্দু অথবা ফারসী থেকে এসেছে। আমাদের সামনে এসবের বিকল্প বাংলা শব্দ উপস্থাপন করা হয়নি। যেমন, টেবিল কে আমরা কেউই চারপায়ী বলিনা। এতদিনে টেবিলের জন্য কোন খাঁটি বাংলা শব্দ তৈরি হয়েছে কিনা সেটাও আমার অজানা, হয়ত সবারই। চারপায়ী বলতে আমরা সাধারণত জন্তু-জানোয়ারদের বুঝিয়ে থাকি। 

শব্দ সৃষ্টি হয় বস্তুর উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে। যেমন, সাইকেল। বাংলা প্রতিরূপ হচ্ছে দ্বিচক্রযান। দুই চাকা থাকার কারণে দ্বিচক্র এবং যেহেতু এটি পরিবহনের কাজ করে অর্থাৎ এর উপর নির্ভর করে যাওয়া যায় তাই শেষে এসেছে “যান”, দুইয়ে মিলে “দ্বিচক্রযান”। তাহলে মোটর সাইকেলকে কি বলা হবে? “যন্ত্রচালিত দ্বিচক্রযান” অনেকটাই কাছাকাছি। এরকম শব্দের তো কমতি নেই। সবচেয়ে পরিচিত বোধহয় চেয়ার অর্থ কেদারা। এগুলো আমরা সচরাচর ব্যবহার করি না। কারণ শব্দগুলো এতটাই অপ্রচলিত যে তা ব্যবহার করলে ভাষার মূল উদ্দেশ্য সহজে ভাব প্রকাশ করা কাজটি কষ্টকর হয়ে যাবে। তবে যাইহোক ভাষা নদীর মত বহমান, সময়ে পথচলায় অনেক কিছু আপন করে নেয়, অনেক কিছু তীরে ছুড়ে ফেলে চলে যায়। 

আমাদের ভাষার শব্দভাণ্ডার হয়ত সবচেয়ে বৈচিত্র্যময়। আপনাকে যদি বলি “আপনি একজন ধুরন্ধর লোক” রাগ করবেন? বা “আপনি তো খয়ের খাঁ” কিংবা বললাম “আপনি সব জায়গায় কারচুপি করেন”। যতটুকু ধারণা করতে পারি এতগুলো শুদ্ধ বদনামীয় শব্দ শুনানোর পরে আমাকে আপনার কপালের ভাঁজ গুণার জন্য প্রস্তুত হতে হবে। চলুন, ঠিক পথে আসি। ধুরন্ধর এর শাব্দিক অর্থ ভারবাহী। ভার বলতে মালামাল বহন করা কিংবা ভারী কিছু। এসব ক্ষেত্রে গাধা, ঘোড়া কিংবা খচ্চর ধরণের প্রানীদের কথাই মনে আসে। শাব্দিক অর্থে তো সব বিবেচনা হবে না। আমরা সেটা করিও না। আমরা যাব প্রায়োগিক অর্থে। যেমন, গাধা; খুব সুন্দর ভাবেই ভার বহন করে স্থানান্তর করতে পারে, ঘোড়া চলাচলের জন্য আদর্শ বাহন। অর্থাৎ তারা তাদের কাজ খুব সুন্দর, যথার্থ এবং অসাধারণ দক্ষতার সাথে শেষ করতে পারে। এখান থেকেই ধুরন্ধর শব্দটির প্রায়োগিক অর্থ আসে। যে ব্যক্তি কোন কাজ অসামান্য দক্ষতা কিংবা শ্রেষ্ঠতার প্রমাণ দিয়ে কোন কাজ অনায়াসে শেষ করতে পারে তাকেই বলা হত ধুরন্ধর। যদি কেউ খুব বেশীই পারদর্শী হত তবে সে মহাধুরন্ধর। খারাপ তো নয়ই, বরং ধুরন্ধর শব্দটি দিয়ে মূলত প্রশংসাই করা যায় বা হত। দেশের গণ্যমান্য কাউকে আজ ধুরন্ধর বলে দেখুন না….(রহস্যময় শব্দসংসার – আবদুশ শাকুর, কালি ও কলম) 

একই ভাবে যদি “খয়ের খাঁ” তে যাই। খয়ের এসেছে আরবী “খইর” থেকে। যার অর্থ ভালো, শুভ। আবার “খাঁ” শব্দটি “খাহ” এর অপভ্রংশ। খাহ অর্থ চাওয়া। এর অর্থ দাঁড়ায় “শুভাকাঙ্খী” অর্থাৎ যিনি ভালো চান। কথা হচ্ছে এই শব্দগুলোর অর্থ পুরোপুরি বিপরীত হল কি করে? “খয়ের খাঁ” এর জন্য বলা যেতে পারে অনৈতিক শুভাকাঙ্খীদের সংখ্যা অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাওয়াতে হয়ত অর্থও ডিগবাজী দিয়েছে। শব্দ উচ্ছেন্নে গেছে। (প্রাগুক্ত; ১) 

কারচুপি এসেছে ফারসী “কারচোবি” থেকে। এর মৌলিক অর্থ হচ্ছে কাঠের উপর সূক্ষ্ণ নকশা করার কাজ কিংবা কাপড়ের ক্ষেত্রেও এরকম নকশার কাজের জন্য ব্যবহৃত হত। খুবই প্রশংসনীয় কাজ, বলা যায় এক ধরণের শিল্প। কিন্তু কি থেকে কি হল, গল্পের গরু আকাশে উড়ল! কারচুপি বলতে এখন আমরা সাধারণত বুঝি চক্রান্ত, বা এমন সূক্ষ্ণ চালাকী করা যেটা ধরা যায় না। (প্রাগুক্ত; ১) 

একই ভাবে কারসাজিও আসে। এটিকেও আমরা ধরে নিই লুকোচুরি করা বা গোপনে কিছু ঘটানো। যেমন, “তুই পিছনে কারসাজি করে আমার চাকরীতে উত্তরণ আটকাইছিস” । সর্বোপরি খারাপ উদ্দেশ্যেই যাচ্ছে। মূল ফারসীতে এর অর্থ হচ্ছে কাজ সম্পাদনকারী। উচ্চার্থে নির্মাতা। “কারসাজ” শব্দটি দ্বারা মূলত বুঝানো হয় সবচেয়ে বড় নির্মাতাকে। মানে হচ্ছে সৃষ্টিকর্তা। বলতে দ্বিধা নেই, শব্দই সবচেয়ে বড় বিশ্বাসঘাতক। এমনভাবে চাকরীও। বুঝানো হয় যা চাকরদের কাজ। অথচ আমরা এটাকে সবচেয়ে সম্মানজনক পেশা হিসেবেই নিচ্ছি। (প্রাগুক্ত; ১) 

আসলে এরকম অসংখ্য শব্দ পাওয়া যাবে। বর্তমানে সাহিত্যের একটি শাখা সবার কাছে পরিচিতি পাচ্ছে। যদিও শাখাটি অনেক আগে থেকেই বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করে চলেছে। স্যাটায়ার বা ব্যাঙ্গধর্মী সাহিত্য। এখানে খেয়াল করা যায় কোনো নেতিবাচক জিনিসকে ইতিবাচকের মোড়কে পুরে পাঠকদের জন্য প্রকাশ করা। যা বিভিন্ন কৌতুকপূর্ণ, বিদ্রুপাত্মক কথাবার্তার মাধ্যমে হয়ে থাকে। অতিরঞ্জিতকরণ, উপহাস, বিড়ম্বনা সহ বিভিন্ন উপাদান দিয়ে পাঠকদেরকে হাসিখুশি অনুভূতির মধ্য দিয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু এতে সমাজ, রাষ্ট্র এবং সমসাময়িক বিষয়গুলো নিয়ে নির্মম সত্যও নিদারুণভাবে উঠে আসে। আবুল মনসুর আহমদ, সৈয়দ মুজতবা আলীদের থেকে অতীতেও আমরা পেয়েছি। বর্তমানেও অনেকেই রয়েছে।

উপরে ডিগবাজী দেওয়া শব্দগুলো হয়ত এরকম কোনো লেখকের পাল্লায় পড়ে বারংবার ব্যবহৃত হয়ে আজকের এই অর্থে নিজেকে অভিযোজিত করেছে। 

ভাষা হিসেবে বাংলার সমৃদ্ধি হয়েছিল ব্রিটিশ শাসনামলেও। তৎকালীন হিন্দি এবং উর্দুর তুলনায় ভাষা হিসেবে বাংলা হয়ে উঠেছিল উন্নত। তাই বাংলায় লেখা বইগুলো অন্যান্য ভাষাতেও অনূদিত হত। যেমন, বিষাদ সিন্ধু ১৯৩০ সালে হিন্দিতে অনূদিত হয়েছিল। জনসংখ্যার দিক দিয়েও বাঙালী বেড়েছিল, হিন্দির পরেই ছিল স্থান। তখন বাংলাতে উন্নতমানের গদ্য লেখা হত। মীর মোশাররফ হোসেন হচ্ছেন অগ্রগণ্য একজন। ব্যকরণের বিচারে উর্দু এবং হিন্দির মাঝে পার্থক্য নেই। মূল পার্থক্য দুটি। এক; উর্দুতে ফারসী এবং ফারসীর মাধ্যমে প্রাপ্ত আরবী শব্দ বেশী ব্যবহৃত হয় কিন্তু হিন্দিতে হয় সংস্কৃত। দুই; উর্দু লেখা হয় ফারসী-আরবী হরফে কিন্তু হিন্দি হয় নাগরি অক্ষরে। রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবার জন্য মূলত উর্দু এবং হিন্দিকে নিয়েই বিতর্ক হত। ভাষা আন্দোলন এখানে শুধুই ভাষাভিত্তিক ছিল না, তৎকালীন আর্থ-সামাজিক কারণও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। (আত্মপরিচয়ের সন্ধানে – এবনে গোলাম সামাদ) 

এই বিষয়গুলো ভালোভাবে বুঝার জন্য পরামর্শ থাকবে জনাব এবনে গোলাম সামাদ রচিত “আত্মপরিচয়ের সন্ধানে” বইটি পড়া। 

সব বৈচিত্র্য মিলিয়েই আমাদের ভাষা। এতদসত্বেও আমাদের মাঝে এক ধরণের নীরব ভাষিক উপনিবেশবাদ বিদ্যমান। নদীর বহমানতায় এমনিতেই যা আসবে সেটাই ভাষার অংশ, জোর করে নিয়ে এসে সংযুক্ত করলে সেটা চরের মত ভেসে থাকবে, হয়ত গ্রহণযোগ্য হবে কিন্তু উৎকট দেখাবে। ভাষা শুধু মুখনিঃসৃত ধ্বনিমালা হিসেবেই নয় এখানে জড়িয়ে থাকে ইতিহাস, সংস্কৃতি সহ জাতিসত্ত্বার পরিচয়। সাতচল্লিশের দেশভাগের পর তার কিছু প্রভাব আমরা দেখেছিলাম। তখন কলকাতাভিত্তিক বাংলা ভাষা থেকে বেরিয়ে গিয়ে বাংলাদেশীয় (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) বাংলা সাহিত্যে মুসলমানীয় প্রভাব দেখা গিয়েছিল। তখনকার সাহিত্যিকদের রচনা পড়লেই আমরা স্পষ্টভাবে দেখতে পাব সবকিছু। কাজী নজরুল ইসলাম, ফররুখ আহমদদের সেই ধারা এখন সব পর্যায়েই ম্রিয়মান। এটাও মনে রাখতে হবে “বাংলা” শব্দটা আমাদের শুধু ভাষাভিত্তিক পরিচয় নয় বরং এখানে আমাদের ভৌগোলিক পরিচয়ও আছে। “বাংলা” শব্দটি প্রথমত ভৌগোলিক পরিচিতি হিসেবেই ব্যবহৃত হয়েছিল। “সুলতান শামস-উদ-দীন ইলিয়াস শাহ “শাহ-ই-বাঙালা” উপাধি নিয়ে শাসন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তখন বাংলা বলতে শুধু বাংলাদেশকে বুঝানো হত না, লখনৌতি, পূর্ব থেকে পশ্চিম বাংলা, বিহার সহ ঐতিহাসিক আবুল ফজল উদ্ধৃত পুরো বাংলাদেশকেই বুঝানো হত”। (বাংলার ইতিহাস : সুলতানী আমল – প্রফেসর আব্দুল করিম) 

একটি অভিজ্ঞতার কথা বলেই আজকে শেষ করি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নামটি বাংলাদেশের ইতিহাসের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাই এটি সম্পর্কে জানা, ঘুরে দেখা শখ ছিল ছোট থেকেই। ইচ্ছাপূরণ শুরু করি নবম-দশম শ্রেণী থাকাকালীন। তখন আসা হত বিভিন্ন কারণে, নীলক্ষেত, শাহবাগ কিংবা ঘুরাঘুরি। তখন রিকশাওয়ালাকে যদি বলতাম কলাভবন নিয়ে যান, হা করে তাকিয়ে থাকত! অপরপাশে আমরাও হা হতাম, আর্টস বিল্ডিং বলে পার পেতাম। একইভাবে বইমেলায় আসলে খুবই বিরক্তি লাগত বাংলা একাডেমী ফলকটা দেখে। শিক্ষায়তন শব্দটা দাঁড়িপাল্লায় একাডেমীর সাথে উঠে না কিংবা নতুন কোনো শব্দও হাজিরা দেওয়ার সুযোগ পায় না। যেটা বললাম ভাষিক উপনিবেশবাদ এবং সেটা আমরাই প্রতিনিয়ত ঘটাচ্ছি। বাংলা লেখ্যরূপ এখন কয়েক প্রকার। এছাড়াও মুখের ভাষাতেও আমাদের সাংস্কৃতিক শব্দগুলোর বদলে দেখা যায় কলকাতাকেন্দ্রিক প্রমিত বাংলার অধিক প্রচলন। অথচ তাদের বিপরীতে আমাদের বাংলাতেই সুন্দর, চমৎকার শব্দভাণ্ডার রয়েছে। বর্তমানে অনেকেই বাংলা শব্দের বাংলা উচ্চারণের বদলে ভিন্ন ভাষার উচ্চারণকে প্রাধান্য দিয়ে থাকেন। বাংলাকে বাংলা রূপেই থাকতে দিতে হবে। ভাষা নিয়েই আমাদের অনেক জানা বাকী, বছরের একদিনের জাগরণে তার কিয়দংশও পূর্ণ হয় না। সময় এসেছে ফের বাধা ডিঙানোর। প্রশ্নও থেকে যায়, আসলে ভাষাটা কারা কাইড়া নিতে চায়? 


____________________________________________

২১/০২/২০২১

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ