লেখা তরজমা

খোয়াবনামা : মৃত্যু, দেশভাগ এবং অন্যান্য

খোয়াবনামা : মৃত্যু, দেশভাগ এবং অন্যান্য
সাজ্জাদুর রহমান

পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন, বেদনাদায়ক অনুভূতি সম্পর্কে কাউকে জিজ্ঞেস করা হলে উত্তর কি আসবে? বা আপনি কি উত্তর দিবেন?

প্রিয় মানুষকে মৃত অবস্থায় দেখা। আপনার প্রিয় মানুষটিকে আপনি আর কখনোই দেখতে পারবেন না,তাকে চলতে দেখবেন না, তাকে কথা বলতে দেখবেন না,তার হাতে হাত মেলাতে পারবেন না,তার পায়ে পা মিলিয়ে চলতে পারবেন না, এরচেয়েও বেশি কষ্ট হবে তখন যখন মনে হবে আপনি আপনার দুঃখকষ্ট গুলো ভাগ করে নেবার মত কাউকে পাবেন না। মৃত্যু সুন্দর, মৃত্যু ভয়ংকর, মৃত্যু ভয়ংকর সুন্দর। ভয়ংকর সুন্দরতম মৃত্যুর কিছু গল্প দিয়ে সাজানো “খোয়াবনামায়” ডুব দিয়ে আসি, চলুন।

আখতারুজ্জামান ইলিয়াস। বাংলা সাহিত্যে তাঁর অবদান নিয়ে নতুন করে বলার কিছুই নেই। তাঁর রচিত যে শিল্পগুলো বাংলা সাহিত্যকে বহুগুণে সমৃদ্ধ করেছে তন্মধ্যে অন্যতম হল “খোয়াবনামা”।

১৯৪৭ সালের দেশ বিভাগের প্রেক্ষাপটে তৎকালীন গ্রামীণ পটভূমিতে রচিত এক মহা উপাখ্যান। উঠে এসেছে ফকির মজনু শাহ থেকে শুরু করে ভবানী পাঠক, তেভাগা আন্দোলন সহ জমিদার, নায়েবদের অত্যাচারের কথা। পরবর্তীতে দেশি সায়েবদের নব্য জমিদারী স্বভাবের কথাও বাদ যায়নি। 

যদি আপনাকে প্রশ্ন করি ১৯৪৭ এর দেশভাগের প্রেক্ষাপট কি ছিল? ধর্মের ভিত্তিতে নাকি রাজনৈতিক? কিংবা মানুষ কেন স্বপ্ন দেখে? কেনই বা আবার স্বপ্নের ব্যাখাও খোঁজে? মুনসি বয়তুল্লা শাহ্( বয়াতুল্লাহ শাহ্) এর নাম শুনেছেন? কাৎলাহার বিলের ধারের পাকুড় গাছে বসে যে বিল শাসন করত? ফকির মজনু শাহের সাথী যে সর্দার টেলরের গুলিতে প্রাণ হারিয়েছিল? কিংবা ভবানী পাঠক? খোয়াবনামার শুরু এখান থেকেই। এরপর চেরাগ আলী, বৈকুন্ঠনাথ গিরী, তমিজের বাপ, কুলসুম,তমিজ, ফুলজান, কেরামত আলিরা আসতে থাকে খোয়াবনামাকে আলোকিত করতে। এরা সবাই পরলোক গমন করে খোয়াবনামাকে পরিণত করে গিয়েছে।  

কিন্তু খোয়াবনামার স্বার্থকতা হারিয়ে যায়নি।  

এই ফাঁকে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কেও এখানে টেনে আনতে হয়। তার সাহিত্য বিশ্লেষণ করি চলুন। আনন্দমঠ পড়েছেন কেউ? ঐতিহাসিক উপন্যাসে ইতিহাসের সে কি দুঃসহ বিকৃতি! জবাব কেউ দিয়েছিল কি? জবাব পেতে হলে পড়ে ফেলুন না এই খোয়াবনামা। বঙ্কিমের কঠোর সাম্প্রদায়িকতার বিপরীতে ইলিয়াসের এই মধুর সুখপাঠ্য, সাম্প্রদায়িক দিক বিন্যাসের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষতা সর্বোপরি বাংলার গ্রামীণ সমাজের প্রেক্ষাপটে ইতিহাসের অপূর্ব উপস্থাপন। এখানেই অন্তর্নিবিষ্ট খোয়াবনামার স্বার্থকতা।

এখানেও সামাজিক সংঘাত আছে,তুচ্ছ কারণে মারামারি আছে,সাম্প্রদায়িক দ্বন্দ্ব কিংবা খাঁটি ভালোবাসা সবই আছে। এসবের মাঝেই খোয়াবনামা এগিয়ে চলে কাৎলাহার বিলের ধার দিয়ে। 

কখনো মনে হবে নিখাদ ঐতিহাসিক উপন্যাস কখনো রাজনৈতিক উপাখ্যান। আবার মনে হতেও পারে ইতিহাসে আটকে থাকা কিছু মিথ্যার জবাব কিংবা দেশ ভেঙ্গে দুটি রাষ্ট্র হবার গল্প। যাই মনে করে পড়া শুরু করুন,মুগ্ধ হোন এবং প্রেমে পড়ুন আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের অনবদ্য শিল্পের, কলমের কালিতে যা রচিত হয়েছিল। 



একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ