জীবনোদ্দেশ্য এবং পথহারাদের মোটিভেশন সাজ্জাদুর রহমান
নিচের কথাগুলো মূলত আমাদের পারপাজ অব লাইফের অনেকটুকু কাভার করে। প্রচলিত ক্যারিয়ারিস্টিক প্রডাক্টিভ লাইফের বয়ান আমাদেরকে তৈরি করে আত্মকেন্দ্রিক হতে। বিশেষ করে যখন আমরা বিভিন্ন মোটিভেশনাল বইগুলো খুলি, দেখা যায় শুধু কাজের পর কাজ করে কিভাবে বড় হওয়া যায় তার ফর্মুলা দেওয়া। দিনশেষে আমরা ব্যর্থ হই আমাদের আসল উদ্দেশ্যকে চিহ্নিত করতে। লেখাপড়া শেষে ব্যবসা বা চাকুরী কিন্তু তারপর কি? আল্লাহর মনোনীত খলীফা হিসেবে আমাদের দায়িত্বের ব্যাপ্তি কত? আমাদের কাজের ক্ষেত্রে মোটিভেশন কী? ব্যক্তি মানে শুধু ব্যক্তি নয়, ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে পরিবার, পরিবার থেকে সমাজ, সমাজ থেকে রাষ্ট্র গঠন হয়। সবগুলোর আগে আদর্শ, মূল্যবোধ এবং নৈতিকতা যোগ করলে ফলাফলে ভালোকিছু সম্ভব।
ব্যক্তিকেন্দ্রিক চিন্তাপদ্ধতি আমাদের ঠিক এখানেই আটকে দেয়। আমাদের খলীফা হতে বাধা দেয়। হাদীস থেকেই আমরা জানি যে, প্রতি কাজই নিয়ত্রত উপর নির্ভর করে। দেখুন, এখানে উম্মাহ, সমাজের জন্য কাজ করা মানে এটা নয় যে চ্যারিটি করা কিংবা সবাইকে নিয়ে সম্মিলিত কিছু করা। এসব অবশ্যই একটা অংশ। অন্তত ব্যক্তি কাজ করবে নিজের জন্য, নিজেকে যোগ্য করতে কিংবা এই প্রতিযোগীতাময় বিশ্বে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতেই। কিন্তু এখানে তার নিয়ত বা পার্সপেক্টিভটা ম্যাটার করবে। তার কাজগুলোর উদ্দেশ্যটা এখানে মূখ্য। নিজের ক্ষমতাপ্রাপ্তি, প্রশংসা পাওয়া, ভক্তকূল তৈরি হওয়া, ইত্যাদি উদ্দেশ্য হবে না। এসব বাইপ্রোডাক্ট। এতে করে যখন কেউ শুধুমাত্র নিজের জন্যই কাজ করবে কিন্তু তার ভালো উদ্দেশ্যের ফলে সেসব দ্বারা সমাজও প্রভাবিত হবে।
যেমন, কোনো দম্পতি যদি একটি আদর্শ, মূল্যবোধসম্পন্ন, নৈতিক বিবাহিত জীবন কাটায় তবে সেখানে লাভটা বাহ্যিকভাবে তাদেরই। কিন্তু এর ফলাফল হবে অনেক বেশী কার্যকর। একেতো তাদের সন্তানসহ পরিবারের পরিপার্শ্ব এই মূল্যবোধের ছায়ায় বেড়ে উঠবে, এই ফলাফল পরবর্তী জেনারেশনগুলোতেও বহমান থাকবে। দ্বিতীয়ত, সমাজের তাদের একটি আদর্শিক অবস্থান তৈরি হবে, তাদের যথার্থ মূল্যায়ন হবে। আরো কিছু মানুষ তাদেরকে ফলো করে জীবনকে রাঙাবে।
একই কথা জীবনের প্রতিটি স্তরেই সত্য হবে। এখানে আমাদের শুধুমাত্র নিয়তটা পরিবর্তন করতে হবে। কারণ আমরা দুনিয়াতে এসেছি খলীফা হিসেবে। খলীফারা যখন তাদের উদ্দেশ্যকে সীমিত করে ফেলে তখনই শুরু হয় অরাজকতা। যখন আমাদের নিয়তটা বৃহৎ হবে তখন আমাদের কাজের পদ্ধতিও পরিবর্তন হবে। কাজের গুরুত্ব বাড়বে, প্রডাক্টিভ কিছু বের হবে।
আমরা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই জীবনে উত্তরণের জন্য ছোট ছোট সময়সীমার কিছু টার্গেট সেট করে রাখি। কাজের ধারাবাহিকতায় এভাবে একের পর এক ছোট ছোট উদ্দেশ্যগুলো সেট হয়ে যায়। যেমন, পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট, ভালো রেজাল্ট হলে ভালো ভার্সিটিতে চান্স কিংবা স্কলারশিপ, ভার্সিটিতে ভর্তি হলে ভালো রেজাল্ট, ভালো রেজাল্ট থেকে ভালো চাকুরী বা ব্যবসা, সুখ ও শান্তিময় একটি বিয়ে, তারপর সন্তান মানুষ করা, কাজে সাফল্য, অনাবদ্ধ বৃদ্ধজীবন, মৃত্যু এভাবেই জীবনচক্র ঘুরছে সবার মাঝেই। এসব একেবারেই অর্ডিনারী না হলেও একসময় গিয়ে মনে হয় "আমি কি যন্ত্র?" কেন এসব করছি আমি? উত্তর আসে না। একই কাজগুলো যদি শুধুই ব্যক্তিউদ্দেশ্যে না হয়ে নিয়তটা হত সার্বিক, তাহলে মোটিভেশনের জন্য অন্য কিছুই লাগত না।
আসল কথা হচ্ছে এটাই যে, মানুষের জন্য কাজ করা, নিজেকে বিলিয়ে দেওয়ার মানে এটা নয় যে নিজের জন্য কিছুই না করা। বরং নিজের কাজগুলো করার মাধ্যমেই মানুষের জন্য নিজেকে আদর্শররূপে পেশ করা যায়, তাদের জন্য কাজ করা যায়, নিজেকে বিলিয়ে দেওয়া যায়। এখানে নিয়ত মূখ্য।
এখানে বড় একটা সমস্যা হচ্ছে যখন আমাদের এই ছোট ছোট টার্গেটগুলোর মধ্যে একটা ব্যর্থতায় রূপ নেয় তখন আমরা ভেবে বসি জীবনের সব উদ্দেশ্যই নাই হয়ে গেল। যেমন, ভার্সিটিতে চান্স না পাওয়া, পরীক্ষায় ভালো না করা। এখানে পরিপার্শ্বের চাপ, তাদের নিরন্তর অসহযোগীতা, সমাজ থেকে আসা সার্বক্ষণিক ডিমোটিভেশনগুলো এই ভাবনাগুলোকে শক্তিশালী করে। বাচার উপায় কী?
প্রথম উপায় হতে পারে, যাই কিছু হোক জীবনের প্রধান উদ্দেশ্য থেকে চ্যুত না হওয়া। আমাদের প্রধান উদ্দেশ্য কী? খলীফা হিসেবে পৃথিবীতে আল্লাহর দেওয়া দায়িত্ব আঞ্জাম দেওয়া। আমরা চেষ্টা করতে গিয়ে এক জিনিসের উপর খুব বেশী স্বপ্নের পারদ ছড়ায়ে দিই। তখন মনে হয় এই পথ ছাড়া আমার উপায় নেই আর। কিছুই হবে না আমার দ্বারা এইসব অনেক কিছুই। আমাদের স্বপ্নগুলো বিস্তৃত, আমাদের ভাবনার চেয়েও। আমি এর সমাধান দেওয়ার মত উপযুক্ত কেউ না, শুধু অভিজ্ঞতাটুকু বলতে পারি। আমার কাছে ব্যর্থতা, ডিপ্রেশন, ফ্রাস্টেশন সহ যাবতীয় এসব থেকে বের হয়ে আসার একমাত্র পথ হচ্ছে নিজ চিন্তার সংকীর্ণতা থেকে বের হয়ে আসা। সাফল্য না পেয়ে থেমে গেলে আপনি নিজে একাই ডুবে গেলেন, যদি থেমে না যান, কাজ চালিয়ে যেতে থাকেন আপনার ছায়ায় সবাই দাঁড়াবে সময়ের ধারাবাহিকতায়। আমি মানে শুধু আমিই না, আজকে আমি নিষ্ক্রিয় হলে আমার উম্মাহর একটি কোষ নিষ্ক্রিয় হল। এভাবে যদি কয়েক লক্ষ কোষ চায় আমিতে বদ্ধ থাকতে তাহলে দেখা যাবে একটি - দুটি অঙ্গ অচল হয়ে যাবে। উঠে দাঁড়ানো মানেই স্বপ্ন জীবিত থাকা। তবে অবশ্যই সব স্বপ্ন এক জায়গায় বিনিয়োগ করব না আমরা, নিজেদের উত্তরণের জন্য অন্য ভাবনার পথও রাখতে হবে।
এই "সময়ের ধারাবাহিকতা" কথাটি বেশ চমৎকার। আমরা একে অপরের সাথে বদ্ধ থাকি কিছু না কিছুর প্রয়োজনেই। এই সময়ের ধারাবাহিকতা ডিফাইন করে এই প্রয়োজনীয়তাটা কখন কতটুকু লাগে। সময়ের ধারাবাহিকতায় সবার সুদিন আসুক। সবার প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকুক সেই সাথে মহান রবের কাছে প্রার্থনাও।

0 মন্তব্যসমূহ