লেখা তরজমা

দাওয়াম - নাজমুদ্দিন এরবাকান (সংক্ষিপ্ত রিভিউ)

 



দাওয়াম - নাজমুদ্দিন এরবাকান (সংক্ষিপ্ত রিভিউ) 

সাজ্জাদুর রহমান  



কোনকিছুর বিশালতা বুঝাতে গেলে সাধারণত আমরা সাগর কিংবা আকাশের উদাহরণ দিই। আকাশটাই বিশাল, সীমানা দেখা যায় না। কিন্তু সাগরের শেষ তো পাওয়া যায়। হঠাৎ দিগন্তে তাকালে মনে হয় এই আকাশ এবং সাগর যেখানে গিয়ে এক বিন্দুতে মিলিত হয়েছে তার মাহাত্ম্যতা কতইনা সুন্দর, তৃপ্তিকর হবে!


একজন ব্যক্তি এবং তার কাজের পরিধি পরিমাপ করবার জন্যই এই আকাশ, সাগরের উপমা নিয়ে আসা। ব্যক্তিটি যদি সুদূর বিস্তৃত আকাশ হয় তাঁর কর্মকে সীমানাবেষ্টিত সাগর বললে অত্যুক্তি হবে না। এখানে কর্মের নাম হচ্ছে “দাওয়াম” এবং ব্যক্তিটি হচ্ছেন, “প্রফেসর ড. নাজমুদ্দিন এরবাকান।”


শিক্ষকগণ সম্মান দিয়ে তাকে ডাকতেন ”দেরিয়া নাজমুদ্দিন” নামে। যার অর্থ জ্ঞানের সাগর। তাঁরই চিন্তা-ভাবনার সুন্দর সমষ্টি নিয়েই লিখেছেন “দাওয়াম বা আমার সংগ্রাম” বইটি।


কয়েকটি অধ্যায়ে বিভক্ত বইটি। তাঁর সংক্ষিপ্ত জীবনি সহ মোট এগারোটি অধ্যায় রয়েছে। প্রতিটি অধ্যায়েই রয়েছে চিন্তার খোরাক, আমাদের হারিয়ে যাওয়া পরিচয় উদ্ভাসন করবার তাড়না। এক নতুন পৃথিবী গড়ে তুলবার কথা, একটি মুসলিম শাসিত পৃথিবী গড়বার স্বপ্নের কথা এখানে পৃষ্ঠার ভাজে ভাজে আলোকিত হয়েছে।


মুসলিমদের একটি কমন মার্কেট থাকবে। বাণিজ্যের জন্য একক মুদ্রাব্যবস্থাও থাকবে। আজকের নব্য সাম্রাজ্যবাদীদের সামনে ঝুকে পড়া বিশ্ব শাসনব্যবস্থা, অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, সামাজিক কাঠামোর বিপরীতে আবারো প্রতিষ্ঠিত হবে ইসলামের সুমহান আদর্শ। ফিরিয়ে আনতে হবে সোনালি সেদিন গুলো যখন আমাদের বায়তুল হিকমাহ ছিল, যখন আমরা জ্ঞান-বিজ্ঞানে বিশ্বে নেতৃত্বের আসনে সমাসীন ছিলাম। মুসলিমরা প্রযুক্তিতে অগ্রসর হবে, মুসলিম দেশগুলোতে ভারী শিল্পায়ন হবে, মুসলিমদের নিজস্ব জাতিসংঘ থাকবে, এগুলো হচ্ছে তাঁর বিশাল স্বপ্নের টুকরো টুকরো কিছু অংশ।


বইটিতে উঠে এসেছে প্রফেসর নাজমুদ্দিনের জীবনের অনেক কথাও। তুরস্কের ক্ষমতায় ছিলেন দুবার। কোয়ালিশন সরকারে ছিলেন ১৯৭৪-১৯৭৮, এই চার বছর। উপ-প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। এ সময়ে প্রায় ২৭০ টি ভারী শিল্প কারখানা প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। এখানে বিমান তৈরির কারখানাও ছিল। এমনকি তুরস্কের প্রথম ইঞ্জিন তৈরির কারখানা তাঁর হাত ধরেই প্রতিষ্টা লাভ করেছিল।


এরপর ১৯৯৬-১৯৯৭ সেশনে এসেছিলেন একক ক্ষমতায়। মাত্র ১১ মাস ক্ষমতায় ছিলেন। শুধুই এগারোটি মাস। এরমধ্যেই মুসলিম দেশগুলোকে নিয়ে কমন মার্কেট প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, D-8 নামক একটি সংস্থারও ভিত গড়েছিলেন G-8 এর প্রতিদ্বন্দ্বিতায়। G-8 হচ্ছে পৃথিবীর প্রভাবশালী ০৮ টি দেশকে নিয়ে একটি সংস্থা। এতসব ভালো কাজ কাদের সহ্য হবে বলুন, প্রোপাগান্ডা চালিয়ে ক্ষমতায় হস্তক্ষেপ করতে প্ররোচিত করা হয় সেনাবাহিনীকে। প্রফেসর এখানে বাধ সাধেন। ক্ষমতা থেকে নিজেই সরে দাড়ান। বিনিময়ে তিনি এবং তাঁর পার্টি পায় সম্পূর্ণ রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা। উন্নয়নের পথে হাটবার, একতার স্বপ্ন দেখবার এই ছিল বিড়ম্বনা!


বইটিতে ক্ষমতায় থাকাকালীন সাইপ্রাস যুদ্ধ, উপসাগরীয় যুদ্ধ নিয়ে দারুণ কিছু না জানা কথাও উদ্ধৃত হয়েছে। সেগুলো জানতে হলে অবশ্যই অধ্যায়গুলোতে হাতে কলম নিয়ে ঢুঁ মারতে হবে। বইয়ের শেষে ন্যায়ভিত্তিক সমাজব্যবস্থার আদলে একটি নিউ ওয়ার্ল্ড অর্ডারেরও প্রস্তাবনা রয়েছে। ইসলামী কানুন অনুসারে পৃথিবীকে সাজালে তা কিরকম হতে পারে তার সুন্দর দৃশ্যও অঙ্কিত হয়েছে। আমাদের সভ্যতা, ইতিহাস, ঐতিহ্য, শিক্ষাব্যবস্থা, শিল্পায়ন সর্বোপরি এগুলো অতীতে কিরকম ছিল এবং বর্তমানে যদি আবার আগের সোনালী দরোজায় করাঘাত করতে চাই তাহলে কিভাবে আগাতে পারি তা নিয়েও আলোচনা করেছেন তিনি।


বইটি আমাদের জন্য সুন্দর একটি গাইডলাইন। আমাদের চোখকে বর্তমানের বিভীষিকা থেকে ফিরিয়ে নিয়ে দেখাবে ইতিহাসে ঝাপটানো ফিনিক্স পাখির ডানা। ফিনিক্স পাখির অশ্রুতে যেকোন আঘাত মুহূর্তেই সুস্থ হয়ে যায়, পুরাণ এই কথা বলে। আমরা ইতিহাস, সভ্যতা, ঐতিহ্যকে ফিনিক্স পাখির সাথেই না হয় তুলনা করি। এই ফিনিক্স পাখির অশ্রুতে শুধু নিরাময়ই থাকবে না, জ্বলন্ত আগুনও থাকবে। আমাদেরকে উজ্জীবিত করবে, অন্ধকার এই বর্তমানের পথকে দীপ্তিময় করবে এবং প্ল্যাটফর্ম গঠন করে দেবে ভবিষ্যতকে আরো সুন্দর, কার্যকরী, মুগ্ধকর এবং আলোকোজ্জ্বল করবার। সেই সুদিনে প্রতীক্ষাতেই চেষ্টা এবং জ্ঞানার্জনের মাধ্যমে দিন গুজরান করতেই হবে।


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ