লেখা তরজমা

দ্যা লাস্ট গার্ডিয়ান

দ্যা লাস্ট ডিফেন্ডার
সাজ্জাদুর রহমান
 

সেদিন ছিল ভ্রমণের চতুর্থ দিন। আল আকসার সিঁড়িগুলি আমাদেরকে তার ইতিহাস ধাপে ধাপে শুনাচ্ছিল, জানাচ্ছিল তার ঐতিহ্যের কথা। প্রতিটি পদক্ষেপে আমি নতুন করে উত্তেজনায় ভুগছিলাম, মনে হচ্ছিল হৃদয়ের খুব খুউব কাছে চলে এসেছি। উপরের চত্বরকে বলা হয় “বারহাজার ঝাড়বাতির চত্বর”। ইয়াভুজ সুলতান সেলিম খান এই চত্বরে বারহাজার মোমবাতি জ্বালিয়ে সব সৈন্যসমেত ইশার নামাজ পড়েছিলেন। এই নাম এখনো সেই ইতিহাসকে আবারো অ্যামাদের সামনে নিয়ে আসল। অদূরে এক অপলক বৃদ্ধ আমাকে ভাবনা থেকে তার দিকে নজর দেয়াতে বাধ্য করল। 

বাতাসে তার শুভ্র দাঁড়িগুলো কাপছিল। আল আকসার সোনালী গম্বুজের দিকে ছিল তার শ্যোনদৃষ্টি। বহু দায়িত্ব বয়ে চলা পিতার কাঁধ যেমন বাঁকানো হয় তেমনি ছিল তারও। তীব্র মনোবল এবং দায়িত্ব-নিষ্ঠা তবুও তার চোখ থেকে দ্যুতি ছড়াচ্ছিল তবে চেহারায় ছিল পোড় খাওয়া এক সৈনিকের প্রতিচ্ছবি। আল আকসার উঠোন থেকে এই বুড়ো মানুষটির দিকেই বারবার চোখ ফিরছিল ইলহান বারদাকজির। অধিকৃত এই জায়গায় এভাবে একজন বৃদ্ধের দাঁড়িয়ে থাকার মানে তাকে ভাবাচ্ছিল। তারা এখানে এসেছে ইসরায়েলে একটি সৌজন্য ভ্রমণের উদ্দেশ্যে। সাথে রয়েছে তুরস্কের কিছু সরকারী ব্যক্তি এবং ব্যবসায়ী। পথ দেখিয়ে নিতে থাকা ইসরায়েলীটিও তেমন কিছু বলতে পারল না বারদাকজিকে বুড়ো লোকটি সম্পর্কে। সাংবাদিকসুলভ প্রবৃত্তি তাকে লোকটির দিকে টেনে নিয়ে গেল। 

দৃপ্তকন্ঠে সদ্য দায়িত্বপ্রাপ্ত সেনার মত বলে উঠল, ‘আমি ২০তম কর্পোরেশন, ৩৬তম ব্যাটালিয়ন, অষ্টম স্কোয়াড্রন ভারী মেশিন গান টিম থেকে কর্পোরাল হাসান’। একটু যেন হকচকিয়ে গেল বারদাকজি। এত তেজ, নিষ্ঠাপূর্ণ ভাষা সে আশা করেনি অশীতিপর নব্বই বছর বয়স্ক এক বুড়ো থেকে। সালাম দিয়ে পরিচয় জিজ্ঞেস করতেই তড়িৎ এই পরিচয় বের হল যেন লোকটি তার কমান্ডারকে উপস্থিতি জানান দিচ্ছে। তবে সে থামল না, সাদা দাঁড়ির ভেতর থেকে মুক্তোদানার মত দাঁতগুলোর ফাঁক গলে ততক্ষণে আরোও কথা উপচে বের হচ্ছিল। 

বেশিকিছু করতে হল না, সৈনিক যেভাবে কমান্ডারকে সব পরিস্থিতি অবগত করায় সেভাবেই যেন লোকটি শুরু করেছিল। 

সুয়েজ দখল করা পুরো যুদ্ধের যেকোনো পক্ষের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। বৃটিশ অধিকৃত এই খালটি ছিল মূলত ইউরোপের সাথে ভারত মহাসাগর এবং পশ্চিম উপকূলীয় প্যাসিফিক সাগরের কাছাকাছি দেশসমূহের যোগাযোগের সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত নৌপথ। আরো স্পষ্ট করলে হবে, বৃটেনের সাথে তার উপনিবেশ রাষ্ট্রগুলোর যোগাযোগের সংক্ষিপ্ত পথ। জোর প্রস্তুতির পরেও আহমেদ পাশার নেতৃত্বে সেই অভিযান ব্যর্থ হল। একে একে পূর্বপুরুষদের অধ্যুষিত আমাদের মাটিগুলো শত্রুদের পায়ের নিচে পিষ্ট হতে থাকল। আমরা সবকিছু হারাতে থাকলাম। অবশেষে একদিন কুদসের সময়ও এল।

শুনো, আমরা ৪০১ বছরের বেশী সময় ধরে এই কুদসকে রক্ষা করেছি। ১৯১৭ সালের সেইদিনে আমাদের কোনো উপায় ছিল না। বৃটিশ কামানগুলো পবিত্র কুদসের দরজাকে লক্ষ্য করে দাগানো হচ্ছিল। পবিত্র এই মাটিতে পা ফেলেছিল নরাধমরা। আমাদের কিছুই করার ছিল না অস্ত্র জমা দেওয়া ছাড়া। আমাদের ২৫,০০০ ভাই শহীদ হয়েছিল। ঈজ্জত পাশা লিখেছিলেন, “তোমাদের এই তীব্র অবরোধ এবং কামান থেকে বের হওয়া ভারী গুলির শব্দে এ পবিত্র শহরের শান্তি বিনষ্ট হচ্ছে। আমি ভয় পাচ্ছি তোমাদের এই ধ্বংসাত্মক বোমাগুলো এই পবিত্র স্থাপনাকে মাটিতে মিশিয়ে দিবে। তাই আমরা এই শহরকে তোমাদের হাতে তুলে দিচ্ছি”। এডমান্ড অ্যালেনবাই যখন শহরে পা ফেলেছিল তখন আমাদের হৃদয় চিড়ে চৌচির হচ্ছিল। সবাই চলে গেলেও আমাদের থাকতে হল। আমরা ৫৩ জন। 

সত্ত্বরই আমাদেরকেও নিরস্ত্র করা হল। তবুও রয়ে যেতে হল মুসলিমদের কথা ভেবেই, যাতে তারা আতঙ্কিত না হয়। রয়ে গেলাম কিন্তু ইস্তাম্বুল ডাক দিল ফিরে যাওয়ার। যাওয়ার প্রাক্কালে লেফট্যানেন্ট মুখোমুখি দাঁড়ালেন। তার চোখ হতে ক্রিস্টালের মত কান্নার ফোটাগুলো ঝরতে থাকল। বললেন, “আমাদের মহান সেনাবাহিনীকে ফেরার আদেশ দেওয়া হয়েছে। আমাকে ফিরতে হবে নচেৎ তা হবে আদেশের বরখেলাপ। আমার ভাইরা, আমাদের দেশ আজ দুর্দশায়। তোমরা যারা আমার সাথে ফিরতে চাও তারা মুক্ত। তবে আমার একটি অনুরোধ আছে”। 

তখন আমরা সবাই সতর্ক হলাম। হয়ত এটাই কমান্ডারের শেষ আদেশ। হয়ত আসবে শেষ কোনো আক্রমণের ঘোষণা যার মাধ্যমে কুদস মুক্তির সানন্দাবাদ আবারো বিশ্ব জানবে, কুদস আবারো আমাদের হবে। 

কমান্ডার মাথা তুলে সোনালী গম্বুজ পানে তাকালেন, ধুলো উড়া বাতাসের সাথে তার কথামালাও আমাদের কানে স্থায়ীভাবে গেঁথে যেতে থাকল। “এই কুদস আমাদের কাছে সুলতান সেলিম খানের উত্তরাধিকার। সবাই এর রক্ষায় নিয়োজিত থাকো। কাউকে ভাবতে দিও না উসমানীরা তাদের ছেড়ে গিয়েছে, তাদেরকে নিরাশায় ফেল না। বৃটিশরা চেষ্টা করবে আমাদের নবীর এই প্রথম কিবলাকে অপদস্থ করতে। তাদেরকে সুযোগ দিও না আমাদের এই ঐতিহ্যকে, আমাদের এই সম্মানকে, আমাদের এই গর্বকে ধূলিস্যাত করতে”। তখন আমরা শুনেছিলাম এবং মেনে নিয়েছিলাম। আজকের বাতাসে উড়ে যাওয়া বালুকণাগুলোও এখনো আমাকে সেই অঙ্গীকারের কথা মনে করিয়ে দেয়। 

আমরা রয়ে গেলাম ব্রিটিশ অধ্যুষিত এই পবিত্র ভূমিতে। একে একে আমার সব ভাইরাও আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে দায়িত্ব আঞ্জাম দিল। এখন শুধু আমিই আছি। আমি কর্পোরাল হাসান, মহান কুদসের পাহারাদার। তুমি কি আমার একটা কথা রাখতে পারবে? যখন তুমি আনাতোলিয়ায় পৌঁছুবে, তোকাত জেলার পাশ দিয়ে যদি কখনো যাও তবে আমার কমান্ডার লেফটেন্যান্ট মুস্তফার হাতে চুম্বন করে তাকে জানিয়ে দিও, “১১তম মেশিন গান টিম থেকে ই’দির প্রদেশের কর্পোরাল হাসান এখনো তার দায়িত্বপালনরত, যাকে আপনি কুদস আমানত দিয়ে এসেছিলেন। সে তার দায়িত্বে অবহেলা করেনি এবং আপনার দোয়াপ্রার্থী”। 

বারদাকজির চোখ ঘন হয়ে আসল। হাতে চুমু খেতে খেতে অশ্রুধারায় কর্পোরাল হাসানকে সিক্ত করে দিলেন। মনে হল যেন আল আকসার এমন এক মিনারকে তিনি ধরে রেখেছেন যার উচ্চতা আকাশ ফুড়ে পৌঁছেছে মহান রবের নিকট আরশে আজীমে।

দায়িত্বজ্ঞানসমৃদ্ধ এমন কয়েকজন হাসানের অপেক্ষাতেই কি-না আমরা আজও পথ চেয়ে আছি। সে পথ বেয়ে নতুনের অপেক্ষায় না থেকে অন্তত আমরা একেকজন সালাহুদ্দীন না হতে পারি, কর্পোরাল হাসান যেন হই। 

(১৯৭২ সালের ২১শে মে এর কাহিনী এটি। সাংবাদিক ইলহান বারদাকজি এবং সাঈদ তেরজিও’লু সেখানে উপস্থিত ছিলেন। ১৯১৭ সালের ০৯ই ডিসেম্বর উসমানী বাহিনীকে কুদস ছেড়ে চলে যেতে হয়। ঠি এর দু’দিন পর ১১ তারিখে বৃটিশ বাহিনী কুদসে প্রবেশ করে। কর্পোরাল হাসান ১৯৮২ সালে মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর আগপর্যন্ত অর্পিত দায়িত্ব তিনি পরম নিষ্ঠার সাথে পালন করেছিলেন যার ব্যাপ্তি ছিল ৬৫ বছর। সাংবাদিক ইলহান বারদাকজি লেফটেন্যান্ট মুস্তফাকে খুঁজেছিলেন মিলিটারী আর্কাইভের সাহায্য নিয়ে, মাত্র ক’বছর আগেই তিনিও ইন্তেকাল করেছিলেন।) 

#FreeQuds #SavePalestine #WestandwithPalestine #bangladeshstandswithpalestine

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ