স্বাধীনতার ৫০ বর্ষপূর্তি : আমাদের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি
সাজ্জাদুর রহমান
প্রাথমিক আলাপ
কোন বিষয়কে যৌক্তিকভাবে বুঝতে হলে প্রথমেই জানতে হবে শিরোনামটি আসলে কি উদ্দেশ্যে এসেছে। শিরোনাম থেকে আমরা তিনটি প্রধান শব্দ পাই। স্বাধীনতা, প্রত্যাশা এবং প্রাপ্তি। এগুলোর সংজ্ঞায়নের মাধ্যমেই পরবর্তী আলোচনা অগ্রসর হবে।
স্বাধীনতা শব্দটিকে ব্যাপক অর্থে প্রকাশ করা যায়। শিরোনাম থেকে আমরা বুঝতে পারি এখানে স্বাধীনতা বলতে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকে উদ্দেশ্য করা হয়েছে। যেখানে ২৬শে মার্চ প্রথম স্বাধীনতার ঘোষণা এসেছিল1। অতঃপর ২৭শে মার্চে তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমানের দৃপ্ত কন্ঠে উচ্চারিত হয়েছিল স্বাধীনতার ঘোষণা2। পরপর দুদিন দুটি ঘোষণাই স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত হল। কিন্তু পার্থক্য কী ছিল? প্রথম ঘোষণা এসেছিল চট্টগ্রাম জেলার আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এম এ হান্নান থেকে। তিনি ছিলেন বেসামরিক। কোনো রাজনৈতিক নেতাকেও তখন দেখা যায়নি এ ব্যাপারে বক্তব্য দিতে বা কোনো ঈঙ্গিত দিতে। তারা পালিয়েছিলেন3। অপরদিকে মেজর জিয়ার ঘোষণাটি এসেছিল সামরিক দিক থেকে। মানুষ হতাশায় নিমজ্জিত হয়ে যখন আশার পথ খুজছিল ঠিক সেই সময় দেশের সামরিক বাহিনীকে পাশে পাওয়ার মত ঈঙ্গিত সবাইকে সমরে ঝাপিয়ে পড়তে উদ্ধুদ্ধ করে। একইসাথে জনগণ সামরিক দিক-নির্দেশনাও পায়। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা বেলাল মোহাম্মদের ভাষ্যে, “আচ্ছা, মেজর সাহেব, আমরা তো সব ‘মাইনর’, আপনি ‘মেজর’ হিসেবে স্বকন্ঠে কিছু প্রচার করলে কেমন হয়”4। এখান থেকে আমরা একটি সংজ্ঞা পেতে পারি। আমরা দেখতে পাই সর্বোপরি এটি ছিল একটি সংগ্রামের ঘোষণা। যাতে মিশে ছিল জনগণের আবেগ, ভালোবাসা, উৎকণ্ঠা এবং সাহসের অপূর্ব সম্মিলন। তাই বলা যায়, “স্বাধীনতা হচ্ছে দীর্ঘ বিপ্লব বা সহিংসতার প্রশ্নে বিতর্ক বা যেভাবেই হোক, সার্বভৌমত্ব অর্জন5।
এখন আমরা আসি প্রত্যাশা এবং প্রাপ্তিতে। প্রত্যাশা দ্বারা এমন কিছু বুঝানো হয় যা সাধারণত আমরা চেয়ে থাকি বা নিজেদের প্রাপ্য বলে মনে করি। আশা, কামনা, সম্ভাবনা, অনুসন্ধানও অর্থতালিকায় যুক্ত হতে পারে। প্রাপ্তি বলতে আমরা যা পেয়ে থাকি বা পাওয়ার আশা রাখি এমন কিছুকে বুঝি কিংবা যা অর্জিত হওয়াকে নিজেদের অধিকার মনে করি তাকে। সবমিলিয়ে শিরোনাম থেকে বুঝা যায় যে, স্বাধীনতা প্রাপ্তির অর্ধশত বর্ষের পরিক্রমায় আমাদের আশার সাথে পাওয়ার মূল্যায়ন এখানে আলোচিত বিষয়।
ইতিহাসের অলিগলি ও আদর্শ রাষ্ট্র
আমাদের স্বাধীনতার পথ পরিক্রমার সুনিদারুণ এক ইতিহাস রয়েছে। এখানে সুনিদারুণ মানে এই ইতিহাস কখনোই সরল সোজা পথ দিয়ে আগায়নি বরং সবসময় বন্ধুর পথ মাড়িয়েছে। ৭১ এর পর দেশের অস্থিরতা, স্বাধীনতামন্দতা ভেদ করতে করতে দেশ যখন এগিয়ে চলতে লাগল তখনি ৭৫ এর ঘটনা, ঘড়ির কাঁটা ঘুরে দেশ যখন কিছুটা সমৃদ্ধির পথে পা বাড়াল ঠিক তখনি ৮১ এর ভয়াবহতা। এভাবে ৯০, ৯৬, ২০০৮, ১৩ পেড়িয়ে দেশ আজ এক মহাকালের সন্ধিক্ষণে। এসব হচ্ছে কিপয়েন্ট ইভেন্টগুলো। মাঝখানে আমরা অতিক্রম করে এসেছি ভয়াবহ, নৃশংস আরো অনেক অধ্যায়। কিছু আছে গৌরবের। ক্ষতির পাল্লা এতটাই ভারী যে অর্জন পরিমাপ করতে গেলে দাঁড়িপাল্লা উলটে যায়। আমরা কী অর্জন করলাম এবং কী প্রত্যাশা করেছিলাম তা নিয়েই চলুন এবার সামনে আগাই।
প্রত্যাশা ব্যাপারটা পুরোটাই আপেক্ষিক। একজনের সাথে অপরজনের প্রত্যাশা মিলবে এমনটা আশা করাটা নির্ঘাত দুর্বুদ্ধিতা। এজন্যই আমাদের দেশের প্রতি প্রত্যাশা পরিমাপ করতে একটি সাধারণ প্যারামিটার লাগবে। এক্ষেত্রে আমরা প্রথমেই একটি আদর্শ রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্য কি হওয়া উচিত তা দেখব। পরবর্তীতে সেই বৈশিষ্ট্যগুলোর প্রেক্ষিতে আমাদের বর্তমান অবস্থানের তুলনায় একটি সঠিকের কাছাকাছি মানদণ্ড পাব যার মাধ্যমে প্রত্যাশা এবং প্রাপ্তি পরিমাপ করা যাবে।
প্লেটোর8 মতে, তার “রিপাবলিক” গ্রন্থ হতে; একটি আদর্শ রাষ্ট্রের চারটি বৈশিষ্ট্য এবং তিনটি অংশ থাকতে হবে। বৈশিষ্ট্যগুলো হচ্ছে, প্রজ্ঞা, সাহসিকতা, শৃঙ্খলা এবং ন্যায়বিচার9। তিনটি অংশ হচ্ছে প্রজ্ঞাবান শাসক, কারিগর এবং সহায়ক। এখানে হয় প্রজ্ঞাবান ব্যক্তিকে শাসক হতে হবে নয়ত শাসককে প্রজ্ঞার অধিকারী হতে হবে। কেননা, প্রজ্ঞাবান একজন ব্যক্তির জ্ঞানের গভীরতা অনেক বেশী যেটি রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ10।
আবু নছর আল ফারাবীর11 কথাতে আসি। তিনি তার ম্যাগনাস ওপাম “আল মাদীনাতুল ফাদ্বীলাহ” গ্রন্থে কয়েক প্রকার রাষ্ট্র নিয়ে আলোচনা করেছেন। তন্মধ্যে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র নিয়েও বলা হয়েছে। যেহেতু আমরা সাংবিধানিকভাবে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের নাগরিক তাই সেই পরিচয়টিই দেখব। তিনি বলেন, “একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নাগরিকগণ যা চায় তা করতে পারে। একটি মূর্খ রাষ্ট্রের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যাবলী এই রাষ্ট্রে প্রবলভাবে দেখা যায়। লোকেদের জন্য এই ধরণের ব্যবস্থা সবচেয়ে আনন্দদায়ক এবং সুখকর। সবাই এখানে বাস করতে ভালোবাসে কেননা এখানে তারা তাদের সব ধরণের ইচ্ছা-আকাঙ্ক্ষা পূর্ণ করতে পারে। এখানে সাহসী, প্রজ্ঞাবান ব্যক্তিদের সাথে মূর্খরাও পাশাপাশি বসবাস করে”12।
এই দুটো আলোচনা থেকে আমরা একটি সাধারণ ধারণা পেয়ে যাই একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে আমাদের সার্বিক প্রত্যাশাগুলো কি হবে। আমরা উপরোক্ত বৈশিষ্ট্যাবলী থেকে প্রাপ্ত আলোচনার সাথে আমাদের দেশের বর্তমান অবস্থার তুলনায় প্রত্যাশার সাথে প্রাপ্তির পরিমাপ করে দেখাব।
প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি
প্লেটো এবং ফারাবী থেকে প্রাপ্ত বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যগুলোই আমাদের প্রত্যাশা হিসেবে সামনে আসবে। যেমন, আমরা দেখব এই রাষ্ট্রটি প্রজ্ঞাবান কি-না, এর শাসক প্রজ্ঞাবান কি-না, এই রাষ্ট্রের সাহসিকতা, শৃঙ্খলা কিংবা ন্যায়বিচারের অবস্থা কিরূপ। আবার ফারাবীর ভাষ্য থেকে দেখব, এই রাষ্ট্র জনগণকে খুশী রাখতে পারছে কি-না, এখানে বসবাস স্বস্তিদায়ক এবং ভালো কি-না, এখানে জনগণ তাদের ইচ্ছাগুলো পূরণ করতে পারছে কি-না কিংবা এখানে সবার মাঝে সহাবস্থান রয়েছে কি-না। একে একে সবগুলো পয়েন্ট ধরে প্রত্যাশা এবং প্রাপ্তির সম্মিলন ঘটানো যাক।
এখন আমরা নিজেদের দেশের দিকে মুখ ফেরাব। কয়েক বাক্যে বর্তমান পরিস্থিতি বর্ণনা করতে হলে বলা যায়, “শাসকের প্রতিনিয়ত মিথ্যাচার, তীব্র অরাজনৈতিক অবস্থা বিদ্যমান, জনগণ সুখ কিংবা স্বস্তির চেয়ে ভয় এবং আতঙ্কে থাকে বেশী, মূর্খরা এখানে জ্ঞানীদেরকে হটিয়েছে অথবা জ্ঞানীরা উপরে উঠতে গিয়ে মূর্খদের সাথে তাল মিলিয়েছে, ন্যায়বিচারের স্বপ্ন দেখা এখানে সবচেয়ে বড় অন্যায়, বিচারব্যবস্থায় প্রচণ্ড অস্থিতিশীলতা, ইত্যাদি”। এসব আমরা জানতে পারি একদিনের খবরের কাগজ পড়লেই কিংবা কোনো সোশ্যাল মিডিয়ার নিউজফিড ঘুরলেই। কিছু জিনিস তো পরিষ্কার হয়েই যায় অন্তত এই রাষ্ট্রের বর্তমান পরিস্থিতি জনগণের নিরাপত্তা, সুখনিবাস নিশ্চিত করার জন্য যথেষ্ট হুমকিদায়ক। এখানে প্রত্যাশা এবং প্রাপ্তির বিরাট ফারাক বড় আকারেই লক্ষণীয়।
এক্ষেত্রে শ্রদ্ধেয় এবনে গোলাম সামাদের কিছু বক্তব্য উল্লেখযোগ্য। তিনি লিখেছেন, “বিপ্লব মানে শুধু ভাঙ্গা নয়, গড়ে তোলাও। এরজন্য প্রয়োজন চিন্তাশীল নেতৃত্ব। ক্ষমতা দখল করার পর কিভাবে জাতিকে গড়ে তুলতে হবে এ নিয়ে তাদের কোনো চিন্তা-ভাবনা ছিল না। ফলে রাজনৈতিক সঙ্কটের সাথে সিদ্ধান্তহীনতা দেখা যায়”13।
কথামালা থেকে বুঝা যায় সমস্যা আসলে গোড়া থেকেই ছিল। প্রত্যাশা-প্রাপ্তির এই ব্যবধান আমাদের শুরু থেকেই ছিল। দিন দিন যার পরিমাণ বেড়েই চলেছে। একটি সমৃদ্ধ জাতি হিসেবে আমাদের আত্মপ্রকাশ এজন্যই বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে যেখানে আমাদের পেছনেই কয়েকশত বছরের সমৃদ্ধ ইতিহাস নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে বখতিয়ার খিলজী, শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ সহ অনেকেই।
এতো গেল বৃহৎ আকারে প্রত্যাশা-প্রাপ্তির পার্থক্য। যদি বলা হয় একটি রাষ্ট্র থেকে আপনার একমাত্র প্রত্যাশা কী হবে? সন্দেহাতীতভাবেই উত্তর আসবে ন্যায়বিচার বা আদালত। এই বৈশিষ্ট্য যদি কোনো রাষ্ট্র অক্ষুণ্ণ রাখতে পারে বাকি সবকিছু স্বয়ংক্রিয়ভাবেই নিশ্চিত হওয়ার পথে থাকে। তাই যদি আজকে বলতেই হয় আমাদের একমাত্র প্রত্যাশা কি হবে তবে নির্বিঘ্নেই আত্মবিশ্বাসের সাথে উত্তর যাবে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা। এই প্রাপ্তি অর্জন করার জন্যই আমাদের লড়াই জারী রাখতে হবে।
সমাপিকা
একটি রাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হচ্ছে এর জনগণ। জনগণের আস্থা, স্বস্তি, সুখ, ভালোবাসা, প্রত্যাশা সহ সবকিছুই রাষ্ট্রের সাথে জড়িয়ে থাকে। সবকিছুই শুধুমাত্র একটি পদক্ষেপে নিশ্চিত করা যায় এবং সেটি হচ্ছে আদালত প্রতিষ্ঠা করা অর্থাৎ ন্যায়বিচার। তাই আমাদের প্রত্যাশা এবং প্রাপ্তির বাসনা গড়ে উঠুক ন্যায়বিচারকে কেন্দ্র করেই। চিন্তাশীল, প্রজ্ঞাবান নেতৃত্বের হাত ধরে আমাদের প্রত্যাশা এবং প্রাপ্তির মিলন ঘটুক ইতিহাসমৃদ্ধ এই বাংলায়।
টীকা
1 পৃষ্ঠা ৩০, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র, বেলাল মোহাম্মদ
2 পৃষ্ঠা ৪০-৪১, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র, বেলাল মোহাম্মদ
3 প্রাগুক্ত
4 প্রাগুক্ত
5 Walter Benjamin: Selected Writings, Volume 1: 1913-1926। Cambridge: Harvard University Press
8 প্লেটো বিশ্ববিখ্যাত গ্রিক দার্শনিক। তিনি দার্শনিক সক্রেটিসের ছাত্র ছিলেন এবং দার্শনিক এরিস্টটল তার ছাত্র ছিলেন। এ হিসেবে প্রাচীন গ্রিসের সবচেয়ে প্রভাবশালী তিনজন দার্শনিকের মধ্যে প্লেটো দ্বিতীয়। প্রথম সক্রেটিস এবং শেষ এরিস্টটল। এরাই পশ্চিমা দর্শনের ভিত রচনা করেছেন বলা যায়।
9 An Evaluation of Plato's Ideal State, Oluwafemi Bolarfinwa
10 Plato’s Argument for Rule by Philosopher Kings, Giulia Matassa
11 আবু নসর মুহম্মদ বিন মুহম্মদ আল ফারাবী, একজন প্রখ্যাত মুসলিম দার্শনিক ও বিজ্ঞানী। এছাড়াও তিনি একজন মহাবিশ্বতত্ত্ববিদ, যুক্তিবিদ এবং সুরকার ছিলেন। পদার্থ বিজ্ঞান, সমাজ বিজ্ঞান, দর্শন, যুক্তিশাস্ত্র, গণিতশাস্ত্র, চিকিৎসাবিজ্ঞান প্রভৃতিতে তার অবদান উল্লেখযোগ্য।
12 The ideal State/Society of Plato and al-Farabi : A comparative analysis, Muhammad Rafiqul Islam
13 পৃষ্ঠা ১৭৭, আত্মপরিচয়ের সন্ধানে, এবনে গোলাম সামাদ
0 মন্তব্যসমূহ