লেখা তরজমা

আলী ইবনে আবু তালিব (রাঃ)

 



আলী ইবনে আবু তালিব (রাঃ) – আপনেযান আব্দুল্লাহ এবং সাজ্জাদুর রহমান

তার নাম এবং বংশধারা হচ্ছে, “আলী ইবনে আবু তালিব (আব্দুল মানাফ) ইবনে আব্দুল মুত্তালিব ইবনে হাশিম ইবনে আব্দুল মানাফ ইবনে কুসাই ইবনে কিলাব[1]। তিনি ছিলেন মুহাম্মাদ (সাঃ) এর আপন চাচাত ভাই এবং মেয়েজামাই। রাসূলের কনিষ্ঠা কন্যা ফাতিমা (রাঃ) কে বিয়ে করেছিলেন। তাদের ছিল দুইটি সন্তান, হাসান এবং হুসাইন (রাদিয়াল্লহু আনহুমা)[2]। তিনি রাসূল (সাঃ) এর বংশধর তথা আহলে বাইতদের পূর্বপুরুষ। চতুর্থ খলীফা হিসেবে তিনি ৩৫ হিজরী / ৬৫৬ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ৪০ হিজরী / ৬৬১ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত মুসলিম জাহান শাসন করেছেন। তার বীরত্বের জন্য তিনি সবার কাছেই বিশেষভাবে প্রসিদ্ধ। খন্দক এবং খায়বারের যুদ্ধে তার বীরত্ব, ধর্মভীরুতা এবং নৈতিকতার ঘটনাগুলো এখনো সবার মুখে মুখে ফিরে।

 আলী (রাঃ) এর জীবন

তার জীবনকে ভালোভাবে বুঝতে হলে আমাদেরকে তিন ভাগে ভাগ করতে হবে।

  1. জন্ম থেকে রাসূল (সাঃ) মৃত্যু পর্যন্ত, (৫৯৯ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ৬৩২ খ্রিষ্টাব্দ / ১০ হিজরী),
  2. রাসূল (সাঃ) এর মৃত্যু পরবর্তী সময় থেকে তৃতীয় খলীফা উসমান (রাঃ) এর মৃত্যু পর্যন্ত, (৬৩২ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ৬৫৬ খ্রিষ্টাব্দ / ৩২ হিজরি) এবং
  3. তার খেলাফতের শুরু থেকে তার মৃত্যু পর্যন্ত, (৬৫৬ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ৬৬১ খ্রিষ্টাব্দ / ৪০ হিজরী)[3]। প্রতিটি ধাপ নিয়ে নিচে আলাদাভাবে আলোচনা করা হবে।

 জীবনের প্রথম ধাপ - (৫৯৯ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ৬৩২ খ্রিষ্টাব্দ / ১০ হিজরী)

তিনি ছিলেন কুরাইশ বংশের অন্তর্গত হাশেমী গোত্রের। বাবা আবু তালিব কুরাইশদের নেতৃস্থানীয় এবং মা-ও ছিলেন এই হাশেমী গোত্রের ফাতিমা বিনতে আসাদ। তিনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন ক্বাবাচত্বরে, মুসলিমদের সবচেয়ে পবিত্র স্থান এবং কেবলায়[4]। তখন আবু তালিব ক্বাবা শরীফের সংরক্ষক হিলেন।

রাসূল (সাঃ) এর বাবা মারা গিয়েছিলেন তার জন্মের ছয় মাস আগেই। তিনি বড় হয়েছিলেন দাদা এবং মায়ের তত্ত্বাবধানে। অবশেষে মা আমিনা এবং দাদা আব্দুল মুত্তালিবও পরপারে পাড়ি জমালে তিনি একা হয়ে পড়েন। তখন আবু তালিব পুত্রস্নেহে তাকে নিজ পরিবারে নিয়েছিল। সেখান থেকেই আবু তালিবের পরিবারের সাথে রাসূলের ছিল গভীর সম্পর্ক, আবু তালিব তার অভিভাবকও ছিলেন। ৬০৪ খ্রিষ্টাব্দে মক্কায় যখন দূর্ভিক্ষ শুরু হয় তখন রাসূল এই আলীকে নিজের কাছে নিয়ে নেন। যেন আবু তালিবের বিশাল পরিবারের কিছুটা হলেও কষ্ট লাঘব হয়। তখন থেকেই আলী ছিল তার সার্বক্ষণিক সঙ্গী, বিশ্বস্ত বন্ধু এবং অন্তরঙ্গ একজন।

ইতিহাস থেকে জানা যায়, প্রথম পুরুষ হিসেবে আলীই ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। তবে তখন তার বয়স ছিল মাত্র দশ বছর। এই বিবেচনায় তাকে সাবালক তথা পরিপূর্ণ পুরুষ বলা চলে না তবুও রাসূলের দেওয়া যেকোনো আদেশ পালনার্থে তিনি সর্বাগ্রে থাকতেন। কাজ না করার জন্য তিনি কখনোই অজুহাত খুঁজতেন না। সূরা শু’য়ারার ২১৪ নং আয়াত[5] নাযিল হলে ইসলামের সাথে পরিচয় করানোর জন্য রাসূল তার গোত্রের সবাইকে দাওয়াত দিয়েছিলেন। শুধুমাত্র তের বছর বয়স্ক আলীই সেই দাওয়াতে প্রদত্ত আহ্বানে সাড়া দিয়েছিল। এই ঘটনার পরেই তাকে নিয়ে রাসূল বলেছিলেন, “তার কথা শোনো এবং তার আনুগত্য করো”[6]

আল্লাহর কাছ থেকে হিজরতের আদেশ পেলে রাসূল (সাঃ) তার প্রস্তুতি নেন এবং আবু বকর (রাঃ) কে নিয়ে মদীনায় পৌছেন। তবে রাসূলের কাছে তখনো আগে আমানত রাখা মক্কার মানুষদের বিভিন্ন মূল্যবান জিনিসিপত্র ছিল। সেগুলোকে সুষ্ঠুভাবে ফিরিয়ে দিতে তিনি আলী (রাঃ) কে রেখে আসেন। এরও আগে যখন সাহাবারা একে একে মদীনায় পাড়ি জমাচ্ছিলেন তখন রাসূলকে সেখানে যেতে বাঁধা দেওয়ার কাফেররা তাকে হত্যার পরিকল্পনা সাজায়। হিজরতের রাতে মৃত্যু পরোয়ানা মাথায় নিয়েই আলী রাসূলের বিছানায় শুয়েছিলেন। রাসূল আল্লাহর সাহায্যে তার বাড়ির সামনে উপস্থিত যুবকদের চোখে ধুলো দিয়ে হিজরতে করেন।  আলী (রাঃ) রাসূলের কাছে রাখা আমানতগুলো প্রাপকদের হাতে দিয়ে মদীনায় যাত্রা করেন। মদীনায় রাসূলের কনিষ্ঠা কন্যা ফাতিমার সাথে তিনি বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। হিজরতের পর মদীনায় থাকা আনসার এবং মক্কা থেকে আসা মুহাজিরদের মাঝে ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ক স্থাপন করা হয়েছিল। তাদের সম্পর্কের দৃঢ়তা হয়েছিল সহোদরদের থেকেও শক্তিশালী![7]

ইসলামের প্রধান সব যুদ্ধে আলী (রাঃ) এর প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ ছিল। তিনি সবসময় বিজয়ী হতেন, এমনকি একাকী দ্বন্দ্বযুদ্ধেও! তার বীরত্বের কাহিনী কিংবদন্তী, তার শৌর্যের কথা এখনো সমান উদ্দীপনায় আলোড়িত। তিনি ছিলেন দক্ষতাসম্পন্ন একজন যোদ্ধ্বা। খায়বারের যুদ্ধে তার সাহসিকতা এবং প্রত্যুৎপন্নমতার কাহিনী এখনো প্রসিদ্ধ। এই বিজয়কে তার অন্যতম শ্রেষ্ঠ বলতে ঐতিহাসিকদের বাধ্য করেছে। সালামাহ (রাঃ) এর বর্ণনায় এসেছে,

“চোখে অসুখ থাকার কারণে আলী (রাঃ) খায়বার যুদ্ধে রাসূল (সাঃ) এর সাথে যেতে পারেননি। পরে তিনি তা বুঝতে পেরে বললেন, ‘আমি কিভাবে পিছে পড়ে থাকব যেখানে রাসূল (সাঃ) যুদ্ধে গিয়েছেন?’ তারপর তিনি এসে রাসূলের সাথে যোগ দিলেন। বিজয়ের আগের রাতে রাসূল (সাঃ) বলেছিলেন, ‘আগামীকাল ভোরে আমি এমন একজনকে পতাকা দেব যাকে আল্লাহ্‌ ভালোবাসেন এবং তার রাসূলও ভালোবাসে। তার হাতেই খায়বার বিজয় হবে’। সবাই নিজ ব্যাপারে আশাবাদী ছিল। কিন্তু রাসূল পতাকা আলীর হাতে তুলে দিলেন এবং আল্লাহ্‌ তার মাধ্যমেই আমাদের বিজয় দিলেন”[8]

 

সপ্তম হিজরী, ৬২৯ খ্রিষ্টাব্দে মক্কা বিজয়ের পর রাসূল (সাঃ) তাকে দায়িত্ব দেন ক্বাবা থেকে সমস্ত মূর্তি উচ্ছেদের। নবম হিজরীর হজ্জ্বযাত্রায় তিনি সূরা তওবা তেলাওয়াতের আদেশ পেয়েছিলেন। যদিও সেই কাফেলার নেতৃত্বে ছিলেন আবু বকর (রাঃ)। দশম হিজরীতে যখন রাসূল (সাঃ) শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনিই তাকে গোসল করিয়েছিলেন এবং কবরে তার দেহ রেখেছিলেন[9]

 দ্বিতীয় ধাপ - (৬৩২ খ্রিষ্টাব্দ / ১০ হিজরী থেকে ৬৫৬ খ্রিষ্টাব্দ / ৩২ হিজরি)

রাসূল (সাঃ) এর মৃত্যু মুসলিম বিশ্বে ধর্মীয় এবং রাজনৈতিক সংকট নিয়ে এল। চারদিকে হৈচৈ পড়ে গেল পরবর্তী নেতা কে হবে তা নিয়ে। নেতৃত্ব নির্বাচনের জন্য মুহাজির এবং আনসার উভয় দলই বনু সাঈদের বৈঠকখানায় মিলিত হল, তখনো রাসূল (সাঃ) এর লাশের দাফন বাকি ছিল। সেখান থেকে সর্বসম্মতিক্রমেই আবু বকর (রাঃ) খলীফা হিসেবে দায়িত্ব পেলেন[10]

সবাই আবু বকর (রাঃ) এর হাতে বাইয়াত হল, আলী (রাঃ) ও করলেন। অন্যান্য বড় সাহাবাদের মত তিনিও খলীফার আনুগত্যকে ফরয মনে করতেন। প্রথম খলীফার ইন্তেকালের পর অসিয়ত অনুযায়ী উমর (রাঃ) দায়িত্ব পেলে তিনি তার হাতেও বাইয়াত করেন। এই খেলাফতকালে তিনি বেশকিছু দায়িত্ব পালন করেছিলেন। বিশেষ করে বিভিন্ন পরামর্শের ক্ষেত্রে উমর (রাঃ) তার মতামত নিতেন। বলা হয়ে থাকে, তাকে কাযী বা বিচারক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। যখন উমর (রাঃ) বড় বড় সাহাবীদের নিয়ে সিরিয়ায় গিয়েছিলেন তখন তিনিও সাথে ছিলেন এবং জাবিয়্যার ভাষণে উপস্থিত ছিলেন। এমনকি যখন তিনি “বায়তুল মাকদাস” এর উদ্দেশ্যে মদীনা ছেড়ে কুদসে সফর করেছিলেন তখন আলী (রাঃ) কে স্থলাভিষিক্ত করেছিলেন। আবু লুলু কর্তৃক আঘাতের ফলে খলীফা যখন অসুস্থ হলেন তখন একটি শূরা গঠন করেন যাদের দ্বারা পরবর্তী খলীফা নির্বাচিত হবে, সেখানে আলী (রাঃ) ও ছিলেন[11]। তবে মৃত্যুর আগে বলে গিয়েছিলেন, “লোকেরা যদি আলীকে খলীফা বানায়, তবে সে তাদেরকে সঠিক রাস্তায় পরিচালিত করবে”[12]। প্রাথমিক বাছাইয়ে তিনি এবং উসমান (রাঃ) থাকলেও পরে উসমান (রাঃ) কে খলীফা নির্বাচিত করা হয়।

তিন খলীফাকে সবসময় পরামর্শ দিয়ে সহায়তা করেছেন। প্রথম দুই খলীফার অধীনে মন্ত্রী এবং উপদেষ্টার ভূমিকায় ছিলেন। নাজুক পরিস্থিতিগুলোতে উসমান (রাঃ) সবসময় তার মতামতকে প্রাধান্য দিতেন। বিদ্রোহীদের দ্বারা উসমান (রাঃ) ঘেরাওয়ে পড়লে তার নিরাপত্তায় তিনি সর্বাত্মক ভূমিকা রাখেন। নিজ পুত্রদ্বয়কে উসমানের বাড়ির সম্মুখে অস্ত্রসমেত পাঠিয়ে দিয়েছিলেন যেন কেউ দরজা ভেঙে ভেতরে গিয়ে খলীফার কোনরূপ ক্ষতি না করতে পারে[13]। কিন্তু পাশের বাড়ি থেকে দেয়াল টপকিয়ে গিয়ে বিদ্রোহীরা খলিফাকে শহীদ করে।

৩৫ হিজরীর ১৮ই জিলহজ্জ্ব তারিখে উসমান (রাঃ) এর শাহাদাতের পরে জনতার পীড়াপীড়িতে তিনি আমিরুল মুমিনিন হিসেবে অভিষিক্ত হন[14]

 তৃতীয় ধাপ - (৬৫৬ খ্রিষ্টাব্দ / ৩৫ হিজরী থেকে ৬৬১ খ্রিষ্টাব্দ / ৪০ হিজরী)

তিনি খুবই কম সময় খেলাফতে আসীন ছিলেন, মাত্র পাঁচ বছর। শুরুতেই তিনি উসমান (রাঃ) এর সময়ে নিয়োগকৃত বেশকিছু প্রদেশের গভর্নরকে বহিষ্কার করেন। একইসাথে অন্যায়ভাবে হস্তগত থাকা বিভিন্ন জমিগুলোও কেড়ে নিয়ে সবার মাঝে সমানভাবে বিলিয়ে দেন। কিন্তু খেলাফতে তখন চলছিল একটিই ডাক, “উসমান (রাঃ) এর হত্যাকারীদের বিচার চাই”[15]

খলীফা হওয়ার পর তার প্রথম কাজই ছিল এই বিচার করা। চারদিক থেকেই চাপও আসছিল এই বর্বর ঘটনাটির বিচার চেয়ে। বিশৃঙ্খলার ভেতরে সদ্যই খলীফা হওয়া তার জন্য সবকিছুকে মূহুর্তেই আয়ত্বে আনা সহজ ছিল না। হত্যাকারীদের কেউই চিনত না। মুহাম্মাদ ইবনে আবু বকর হত্যার উদ্দেশ্যে গিয়েও উসমান (রাঃ) এর ক্ষোভোক্তির মুখে বোধোদয় পেয়ে ফিরে এসেছিলেন। উসমানের স্ত্রী নায়িলা-ও চিনতে পারেননি। মদীনাতে মৌমাছির মত বিদ্রোহীরা ছেয়ে আছে। তারা সেনাবাহিনীতেও ঢুকে পড়েছিল। এসবের মাঝেই সবাই উসমান হত্যার তাৎক্ষণিক বিচার চাইল! জীবিত থাকা বিখ্যাত সাহাবী তালহা, যোবায়ের (রাদিয়াল্লহু আনহুমা) সহ আয়িশা (রাঃ)-ও উসমানের শাহাদাতের বদলা নেওয়ার জন্য ঝাণ্ডা উঠালেন। ৩৬ হিজরীতে বসরায় দুটি দল মুখোমুখি দাঁড়াল, একপাশে ইসলামের পতাকাধারী খলীফা আলী (রাঃ), আরেকপাশেও একই পতাকাধারী আয়িশা (রাঃ)। মুসলিমরা প্রত্যক্ষ করল প্রথম গৃহযুদ্ধ, ইতিহাসে যাকে বলা হয় “উষ্ট্রের যুদ্ধ”।[16]

উভয় পক্ষেই ছিল সততা, নিষ্ঠা এবং সদুদ্দেশ্য। কথার মাধ্যমেই তাই উভয়পক্ষের মধ্যকার সমস্যাগুলো মিটে যায়। কিন্তু হাঙ্গামাকারীরা দুইপক্ষেই ছিল। রাতের অন্ধকারে তারা হামলা করলে উভয়পক্ষই ভাবে একজন অপরকে ধোঁকা দিয়েছে, পরিপূর্ণ যুদ্ধ হয়। আলী (রাঃ) বিজয়ী হন। আয়িশা (রাঃ) মদীনায় ফিরে আসেন। তবে ফেরার পথে একাকী নামাজরত অবস্থায় যোবায়ের (রাঃ)-কে পেছন থেকে আঘাত করে হত্যা করা হয়। তালহা (রাঃ) ও শাহাদাত বরণ করেন। এই ঘটনার পর রাজধানী মদীনা থেকে কুফায় নিয়ে আসা হয়। 

অতঃপর তিনি নজর দেন সিরিয়ায়, মুয়াবিয়া (রাঃ) এর দিকে। উসমান হত্যার বিচার না হওয়া পর্যন্ত তিনি বাইয়াত করবেন না বলে ঘোষণা করেছিলেন। তাকে গভর্ণর পদ থেকে বরখাস্ত করা হলেও তিনি তা মানতে অস্বীকৃত হন। হিজরী ৩৭ সালেই আবারো দুটি মুসলিম বাহিনী সিফফীন প্রান্তরে মুখোমুখি হয়। এ ভ্রাতৃঘাতী রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে বিশিষ্ট সাহাবারাও শাহাদাত লাভ করেন। জয়ের দ্বারপ্রান্তে থাকা আলীর বাহিনীকে থামাতে মুয়াবিয়া বাহিনী চটুলতার আশ্রয় নেয়। তারা বর্শার মাথায় পবিত্র কুরআন গেঁথে বলে চলে, “এই কুরআন আমাদের দ্বন্দ্বের ফায়সালা করবে”। দুমাতুল জান্দালে সমাধানের জন্য বসা হয়। শেষে এই সালিশীও শান্তিপূর্ণ সমাধানে ব্যর্থ হয় কেননা এখানেও মুয়াবিয়ার পক্ষে আমর ইবনে আস (রাঃ) কুটিলতার আশ্রয় নেন। মুসলিম খেলাফত দু’ভাগে ভাগ হয় কিন্তু অনর্থক রক্তপাত বন্ধের জন্য সন্ধি করা হয়।

এখান থেকে খারেজীদেরও উত্থান হয়। তারা সিদ্ধান্ত নেয় মুসলিমদের মধ্যে এতসব কলহের জন্য দায়ী তিনজন, আলী, মুয়াবিয়া এবং আমর (রাঃ)। তারা এদেরকে হত্যার পরিকল্পনা করে। আব্দুর রহমান ইবনে মুলজিম নাম্নী নরাধম আলী (রাঃ) কে হত্যার দায়িত্ব নেয়। আলী (রাঃ) এর অভ্যাস ছিল ফজরের সময় “সালাত, সালাত” ডেকে মসজিদের দিকে যাওয়া। পাপাত্মা ইবনে মুলজিম ঠিক তখনি তার উপর বিষাক্ত তরবারী দিয়ে আঘাত হানে এবং আহত করতে সক্ষম হয়। প্রায় পাঁচ বছর খেলাফত পরিচালনা করে ৪০ হিজরীর ১৯ই রমজান / ২৭শে জানুয়ারী ৬৬১ খ্রিষ্টাব্দে তিনি আল্লাহর ডাকে সাড়া দেন।

গুণাবলী, প্রভাব এবং কর্মযজ্ঞ

তিনি ছিলেন আন্তরিকতাপূর্ণ, ওয়াদা রক্ষাকারী, আমানতদার, ধার্মিক এক নেতা। তিনি কোনো সিদ্ধান্ত নিলে তার উপর দৃঢ় থাকতেন। ইমাম আহমদ (রহ) বলেছেন, “আলী (রাঃ) এর মর্যাদা ও ফজিলত নিয়ে যত হাদীস পাওয়া সে সমপরিমাণ অন্য কারো সম্পর্কেই নেই”[17]। রাসূল (সাঃ) অসংখ্যবার তার এবং তার পরিবারের জন্য দোয়া করেছেন। তারা ছিলেন আহলে বাইত অর্থাৎ রাসূল (সাঃ) এর বংশধারা বয়ে নিয়ে এসেছেন আজপর্যন্ত।

তিনি একজন সুবক্তা এবং দূর্দান্ত কবি ছিলেন[18]। তিনি ফতোয়া প্রদানকারী সাহাবীদের অন্যতম ছিলেন[19]। “দিওয়ানে আলী” নামে তার একটি কবিতাসম্ভারও আছে। আরবী কাব্যজগতের বিশিষ্ট দিকপাল ছিলেন তিনি। এছাড়াও “নাহজুল বালাগাহ” নামে রয়েছে তার বক্তব্য সংকলন। যেখানে আছে তার অতুলনীয় বাগ্মীতায় সংবলিত মুখনিঃসৃত কথামালার তরঙ্গ[20]

সা’দ ইবনে আবু ওয়াক্কাস (রাঃ) এর বর্ণনায় এসেছে, “তাবুক যুদ্ধে যাওয়ার প্রাক্কালে রাসূল আলীকে স্থলাভিষিক্ত করেন মদীনার রক্ষণাবেক্ষণের জন্য। তখন অনুযোগের সুরে সে বলেছিল, ‘আপনি আমাকে মহিলা ও শিশুদের উপর খলীফা নিয়োগ করে ছেড়ে যাচ্ছেন, হে আল্লাহর রাসূল?’ তখন রাসূল জবাব দিলেন, ‘মূসা (আঃ) যেভাবে হারুণ (আঃ) কে দায়িত্ব দিয়েছিলেন সেভাবে আমিও তোমাকে দিচ্ছি, তুমি কি এতে সন্তুষ্ট নও? পার্থক্য একটিই যে আমার পরে আর নবী আসবে না’”[21]। রাসূল (সাঃ) আলীর পরিবারের সবাইকে ডেকে দোয়া করেন, “হে আল্লাহ্‌! তারাই আমার পরিবারের লোক।” আরো এসেছে, “রাসূল বলেছেন, ’হে আল্লাহ্‌! আমি যার বন্ধু আলীও তার বন্ধু। যে ব্যক্তি আলীর সাথে শত্রুতা রাখে আপনিও তার সাথে শত্রুতার সম্পর্ক রাখুন এবং যে আলীর সাথে ভালোবাসায় আবদ্ধ হয় আপনিও তাকে ভালোবাসুন’”। রাসূল আরোও বলেছেন, ‘আমি জ্ঞানের শহর এবং আলী তার দরজা’। উমর (রাঃ) বলেছেন, ‘যেকোনো বিষয় বুঝার ক্ষেত্রে আলী এগিয়ে ছিলেন’। আয়িশা (রাঃ) বলেছেন, ‘আলীর চাইতে সুন্নত বেশী বুঝে এমন লোক বেঁচে নেই’। আলীর শাহাদাতের পরে মুয়াবিয়া (রাঃ)-ও তার গুণাবলী শুনে কেঁদেছিলেন । খায়বার, খন্দকের যুদ্ধে তার বীরত্ব আজও আমাদের জন্য প্রেরণাদায়ক[22]

হিজরতের পর আনসার-মুহাজিরদের ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ক স্থাপিত হয়। তখন রাসূল (সাঃ) আলীর ঘাড়ে হাত রেখে বলেছিলেন, “আলী দুনিয়া ও আখিরাতে তুমি আমার ভাই। তুমি হবে আমার এবং আমি হব তোমার উত্তরসুরী”। পরে আলী এবং সাহল ইবনে হুনাইফের মাঝে মুয়াখাত বা দ্বীনী ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা হয়[23]

দশম হিজরীতে খালিদ বিন ওয়ালিদ (রাঃ)-কে ইয়েমেনে ইসলাম প্রচারের জন্য পাঠানো হয়। ছ’মাস বহু চেষ্টার পরেও সাফল্য না পেয়ে তিনি ফিরে আসেন। তখন রাসূলে আকরাম আলীকে পাঠানোর কথা ঘোষণা করলেন। উৎকণ্ঠিত আলী বিচলিত হয়ে রাসূলকে বললেন, “আমাকে এমন লোকদের কাছে পাঠাচ্ছেন যেখানে আমার কোনোই অভিজ্ঞতা নেই অথচ সেখানে নতুন-নতুন ঘটনা ঘটবে!” নবীজি তার মাথায় পাগড়ী বেঁধে দোয়া করলেন, “আল্লাহ্‌ তোমাকে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা ও অন্তরে অপরিসীম শক্তি দান করবেন”। তারপর তিনি আর কোনো পরিস্থিতিতেই দ্বিধাগ্রস্ত হননি। ইয়েমেনবাসীকে অল্পদিনেই ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট করেন এবং হামাদান গোত্রের সকলেই ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আসে। তিনিও কুরবানীর পশুসহ বিদায় হজ্জ্বের সময় রাসূলের সান্নিধ্যে ফিরে আসেন[24]

খুব স্বল্প সময়ের জন্য খেলাফত পরিচালনা করলেও তিনি ছিলেন ন্যায়পরায়ণ। এক ইহুদীর কাছে হারিয়ে যাওয়া নিজ বর্ম দেখেও আদালতে গিয়েছিলেন এবং উপযুক্ত সাক্ষীর অভাবে লড়াইও হেরেছিলেন। ইনসাফ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে কখনোই পিছপা হননি। সিফফীনের যুদ্ধের ভয়ংকরতম সময়েও রেখেছেন নিজের কল্যাণমূলক মনোভাবের পরিচয়। উটের যুদ্ধেও একইরকম ছিল। আহত কাউকে হত্যা করা নিষিদ্ধ ছিল, কেউ পালিয়ে গেলে তাকে ধাওয়া করে বন্দী করাও ছিল নিষিদ্ধ। এছাড়াও মৃতদেহকে বিকৃত না করা, কারো লজ্জাস্থান উম্মুক্ত না করা, কোনো নারীকে আক্রমণ ও অপমান না করা, কোনো বাড়িতে বিনানুমতিতে না ঢুকা, বিদ্রোহীদের সম্পদ হস্তগত না করা সহ আরো অনেককিছুই নির্দেশনায় ছিল। মুয়াবিয়ার সৈনিকেরা পানির উৎস দখলের যুদ্ধে হেরে পিছু হটলেও তিনি সবার জন্য পুনরায় তা মুক্ত রাখেন, সবাই পানির সমান অধিকার পায়। এ বিষয়গুলকেই আমরা আধুনিক মানবতাবাদে অনুপস্থিত দেখতে পাই অথচ এসব কতই না উত্তম ছিল! এ ধরণের বিষয়গুলোই মুসলিম মানবতাবাদের ভিত্তিপ্রস্তর।   

তিনি সবার নিকট ছিলেন সম্মানীয়, শ্রদ্ধেয় এবং প্রিয় রাসূলেরও অতিপ্রিয়ভাজন। কিছু বিপথগামী লোকের ফিতনার সুযোগে আমরা হারিয়েছিলাম প্রজ্ঞাবান, যুবকদের মাঝে প্রথম ইসলামগ্রহণকারী এই মনীষীকে। জীবনের কোনো ময়দানেই হার না মানা এই মহাবীর আমাদের ক্বলবের মণিকোঠায় চিরস্থায়ী হয়ে আছেন।

 টীকা 


[1] আলি, মুহাম্মাদ সাল্লাবি, আলী ইবনে আবু তালিব, ভলিউমঃ ১, অনুবাদঃ নাসিরুদ্দিন খাত্তাব, রিয়াদঃ ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক পাবলিশিং হাউজ, ২০০৮

[2] হাসান এবনহ হুসাইন (রাঃ) এর মর্যাদা নিয়ে হাদীসে বর্ণনা রয়েছে। একটি হচ্ছে, “রাসূল বলেন, ‘যে হাসান এবং হুসাইনকে ভালোবাসে সে আমাকেও ভালোবাসে, যে তাদেরকে ঘৃণা করে সে আমাকেও ঘৃণা করে’”। আরো দেখতে, সুনান ইবনে মাজাহ, প্রথম খন্ড, প্রথম অধ্যায়, হাদীসঃ ১৪৩।

[4] আলি সাল্লাবি, আলী (রাঃ)।

[5] “আর তুমি তোমার নিকটাত্মীয়দের সতর্ক করো”। (২৬, ২১৪)।

[6] আলি সাল্লাবি, আলী (রাঃ)।

[7] প্রাগুক্ত।

[8] সহীহ বুখারী, ৩৭০২।

[9] এনসাইক্লোপিডিয়া অব রিলিজিয়ন; আলী ইবনে আবু তালিব।

[10] আর্মস্ট্রং, কারেন। “ইসলামঃ আ শর্ট হিস্ট্রি”, নিউ ইয়র্কঃ মডার্ন লাইব্রেরী এডিশন, ২০০০।

[11] “আমীরুল মু’মিনীন আলী ইবন আবূ তালিব (রা)-এর খিলাফাত”, হাফিজ ইবনে কাসীর দামেশকী (রহঃ), আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭ম খণ্ড।

[12] ডঃ ত্বাহা হুসাইন, আল ফিতনাতুল কুবরা। মুহাম্মদ আব্দুল মা’বুদ, “আলী ইবন আবী তালিব (রা)”, আসহাবে রাসূলের জীবনকথা, ১ম খণ্ড।

[13] মুহাম্মদ আব্দুল মা’বুদ। “আলী ইবন আবী তালিব (রা)”, আসহাবে রাসূলের জীবনকথা, ১ম খণ্ড।

[14] আলী (রাঃ), ইবনে কাসীর (রহঃ), আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭ম খণ্ড।

[15] আর্মস্ট্রং, ইসলামঃ আ শর্ট হিস্ট্রি।

[16] আব্দুল মা’বুদ, আলী (রাঃ), আসহাবে রাসূলের জীবনকথা, ১ম খণ্ড।

[17] আল ইসাবাঃ ২/৫০৮

[18] কিতাবুল উমদাঃ ইবনে রশীক, ১/২১

[19] তাবাকাতঃ ৪/১৬৭, ১৭৫

[20] তারীখুল আ’দাব আল-আরাবী, ডঃ উমর ফাররুখ, ১/৩০৯

[21] তাবাকাত, ৩/২৪

[22] আকবর শাহ খান নজিরাবাদী, ইসলামের ইতিহাস, ১ম খণ্ড, অনুবাদঃ ইসলামিক ফাউণ্ডেশন বাংলাদেশ, ২০০৩

[23] তাবাকাত, ৩/২২-২৩

[24] জান্নাতী ২০ সাহাবী, পিস পাবলিকেশন্স, ৭০-৭১  


গ্রন্থপঞ্জী

1.    বুখারী, মুহাম্মাদ ইবনে ঈসমাইল, সহীহ বুখারী, অনুবাদঃ মুহাম্মাদ মুহসিন খান, রিয়াদঃ দারুসসালাম, ১৯৯৭

2.     মুসলিম ইবনে হাজ্জাজ, সহীহ মুসলিম, অনুবাদঃ নাসিরুদ্দিন খাত্তাব, রিয়াদঃ দারুসসালাম, ২০০৭

3.     তাবারী, আবু জাফর, দ্যা হিস্ট্রি অব তাবারী, অনুবাদঃ অ্যাড্রিয়ান ব্রোকেট, নিউ ইয়র্কঃ স্টেট ইউনিভার্সিটি প্রেস, ১৯৯৬

4.      তিরমিজি, আবু ঈসা মুহাম্মাদ, জামে আত-তিরমিজি

5.     ইবনে মাজাহ, সুনানে ইবনে মাজাহ

6.     হাফিজ ইবনে কাসীর, আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭ম ও ৮ম খণ্ড, অনুবাদঃ ইসলামিক ফাউণ্ডেশন বাংলাদেশ, ২০০৫

7.      আকবর শাহ খান নজিরাবাদী, ইসলামের ইতিহাস, ১ম খণ্ড, অনুবাদঃ ইসলামিক ফাউণ্ডেশন বাংলাদেশ, ২০০৩

8.  ইবনে ইসহাক, দ্যা লাইফ অব মুহাম্মাদ, অনুবাদ; অনুবাদঃ অ্যালফ্রেড গিলিয়াম, লন্ডনঃ অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস, ১৯৬৮

9.     আলী মুহাম্মাদ সাল্লাবি, আলী ইবনে আবু তালিব (রাঃ), রিয়াদঃ ইন্টারন্যশনাল ইসলামিক পাবলিশিং হাউজ, ২০০৮

10.   মুহাম্মদ আবদুল মা’বুদ, আসহাবে রাসূলের জীবনকথা, ১ম খণ্ড

11.   কারেন আর্মস্ট্রং, “ইসলামঃ আ শর্ট হিস্ট্রি”নিউ ইয়র্কঃ মডার্ন লাইব্রেরী এডিশন২০০০

12.   ফ্রাঞ্জ রোজেনথাল, দ্যা হিস্ট্রি অব তাবারী, আলবানী, নিউ ইয়র্কঃ ইউনিভার্সিটি অব নিউ ইয়র্ক প্রেস, ১৯৮৯

13.  এম এম আইয়ুব, দ্যা ক্রাইসিস অব মুসলিম হিস্ট্রি, ম্যানচেস্টারঃ ওয়ানওয়ার্ল্ড পাবলিকেশনস, ২০০৬

14.   জান্নাতী ২০ সাহাবী, পিস পাবলিকেশন্স, ২০১১

15.   এফ এম ডোনার, মুহাম্মাদ এন্ড দ্যা বিলিভারসঃ এট দ্যা অরিজিন অব ইসলাম, লন্ডনঃ হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস, ২০১০

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ