দাস্তান-ই-বাওবাব - সাজ্জাদুর রহমান
০১
মানুষের ধর্মই কিনা শিকড় গেড়ে বসা।
ধীরে ধীরে উপরে বাড়া, মায়া জন্মানো, দৃষ্টিচুরি, সবশেষে ছেড়ে যাওয়া। প্রশ্ন তো থেকেই যায় আসলে মানুষকে মানুষ হতে কে শেখাল? মানুষ যে এভাবেই হতে হবে এটাই বা কে বলল? অদ্ভুত ব্যাপার হচ্ছে মায়া জন্মানো। কারো চোখ দেখে মায়া
জন্মায়,
কারো মন পড়ে। মায়া জন্মানোর মূলত কোনো ভিত্তিমূলক
স্বতঃসিদ্ধ উপায় নাই, এইটা একা একাই হয়ে
যায়! আপনাদের হয়ত বিশ্বাস হবে না, তবে আমি কতক গল্প
জানি,
মায়ার গল্প, ভালোবাসার গল্প, নিস্তব্ধতার গল্প, নিঃশেষের গল্প, এবং জীবনের গল্প।
মানুষের ইতিহাসের শুরুটা কি মনে আছে? রহমদীল খোদা আদমকে সৃষ্টি করলেন, প্রাণ দিলেন, স্বাধীনতা দিলেন, ইচ্ছা দিলেন। তাও
তো কিছুর কমতি ছিল। বিষণ্ণ আদমের জন্য সবচাইতে আকাঙ্ক্ষিত কি অন্যকিছু ছিল না? আপনি মায়াকে ঠিক এই জায়গাটা থেকেই সংজ্ঞায়ন করতে পারবেন।
তার অভাব ছিল মায়ার। আবার সেই ধ্রুপদী বিতর্ক সামনে চলে আসবে। কারণ, মায়া মানে তো বন্দীত্বকে ভালোবেসে আগলে রাখা, স্বাধীনতাকে মুহূর্তের ভালো লাগায় আটকে ফেলা। আদমের তাহলে
কি মায়ারই অভাব ছিল এতকিছু পাবার পরেও যে তিনি হাওয়াকেই চাইলেন?
প্রশ্নের উত্তর হয় না। স্বাধীন নাকি
বন্দী জীবন, এই প্রশ্নের কোনো সহজ উত্তর হবে না।
কারণ,
আমরা উত্তর খুঁজতে তো প্রশ্নটা করি না। এখানেও কেউ জিগেস
করবে প্রশ্নের মর্মকথা কি তাহলে? আমাদের প্রশ্ন নিজ
চিন্তাকে পরিশুদ্ধ করার উপায় ব্যতীত অন্যকিছু তো না। আমরা প্রশ্নের মাধ্যমে স্বীয়
কাজের গুরুত্ব বুঝাতে চাই, কাজকে ভিত্তি দিতে
চাই,
প্রকাশ করতে চাই, উদ্দেশ্য দিতে চাই। মায়া আমাদের জীবনের সেরকম একটি উদ্দেশ্য এনে দেয়, বাঁচার মর্ম শেখায়, ভালোবাসা বুঝায়, নীরবতার শব্দ
চেনায়। পৃথিবীর প্রথম মানুষটা কি এতকিছু বুঝেই চারিপাশে হাওয়াকে খুঁজত?
আদম আমাদের কাছে সবকিছুর শুরু।
উত্তর পেতে হলে আমাদের সেখানেই হাতড়াতে হবে। আমরা খুঁজে বের করতে পারব কিনা আদম
ঠিক কিভাবে মায়াকে সংজ্ঞায়ন করেছিল, অভাবটা সে কিভাবে টের পেয়েছিল। খোদা তাকে তো কিছুরই অভাব দেন নাই। তাহলে
মায়া-কে কি অভাবজনিত উপায়ে অর্জন করা মনুষ্যজাতির প্রথম দক্ষতা হিসেবে আখ্যায়িত
করা যাবে?
এটাও কি ধরা যায় না যে মায়া-ই আমাদেরকে সবার থেকে আলাদা
মর্যাদা দিয়েছে, মানুষ করেছে। এইযে একটা নিভু নিভু
অভাববোধ,
মনভ্যন্তরে খোঁচা খোঁচা ব্যথা, বুকে তীরবিদ্ধ যন্ত্রণার মত দুঃশ্চিন্তা এইসব কি পারে
মায়াকে ধারণ করতে?
আদমের কাছে যাই। তার প্রথম দিনগুলো
কল্পনায় এঁকে অনুভবের চেষ্টায় নামলে একটা প্রচন্ড শূণ্যতা কি মাথাচাড়া দেয়? সব থেকেও কি যেন নাই, সব পেয়েও কিসে মন হারায়! এইটাকে অনেকেই বলবে সব পেয়েও হারানোর সুখ। সব পাওয়াতে
আসলেই সুখ আছে কিনা এইটা নিয়ে তো ব্যাপক বিতর্ক করা যাবে। তবে আমাদের শুরুতো
এখানেই ছিল। আদি, আসল, খাঁটি। শূণ্যতা আমাদের উদ্দেশ্য দেয়, সামনে এগিয়ে নিয়ে যায়, মায়া শেখায়। দুনিয়ার সব আপনার, সবই আপনার আদেশ মেনে চলে, চাইলেই আপনি সব
পাচ্ছেন,
আপনাকে শ্রেষ্ঠ স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে তারপরেও কেন অপ্রাপ্তি
হানা দিবে? অদ্ভুত না? মানুষের মন-জটিলতা কি এখানেই থেমে যায় কিনা তা নিয়েও হয়ত
তর্ক করা যাবে। মানুষ স্বভাবতই জটিল নাকি প্রয়োজনে এটাও তো গুরুত্বপূর্ণ আলাপ হবার
ইরাদা রেখে যাচ্ছে।
আদম কি আসলেই পেরেছিল নিজের মায়া-কে
বুঝতে?
তাকে কি সে সম্পর্কিত জ্ঞান দেওয়া হয়েছিল? এখানে আরেকটা নির্মম চক্র তৈরী হতেই পারে। খোদা জানতেন তার
কি লাগবে কিন্তু তিনি সেটা আদমের অভাববোধজনিত তাড়নার মাধ্যমেই দিলেন। মানুষকে
শিক্ষা দিলেন, জানালেন খোদার মাহাত্ম্য, তাদের অসম্পূর্ণতা, অপারগতা, মুখাপেক্ষীতা। সবকিছুর পরে গিয়েও
আদমের জন্য হাওয়া আসল। এখানেই আপনি আরোও কতক প্রশ্ন নিয়ে আসতে পারছেন।
সর্বপ্রদানশীল খোদা যখন সবই দিচ্ছিলেন তাহলে কেনই বা তার আদেশকে অগ্রাহ্য করতে হল?
বলুন তো এখন দৃশ্যচক্রে কে প্রবেশ
করবে?
আমাদের মানবজীবনকে আপনি চাইলে কতগুলো স্বন্দ্ব দিয়ে চিনতে
পারবেন। মোটাদাগে সর্বপ্রধান দ্বন্দ্বটি হচ্ছে আশরাফ-আতরাফ দ্বন্দ্ব। কে সেরা, কে শূদ্র, কে বীর, কে ভদ্র এইসব নিয়ে ঝগড়াঝাটি তো বহু পুরনোই। খোদা তার বানানো
অমূল্য দুনিয়াকে খালি রাখেন নাই। মানুষের আগেও এখানে ফুলে-ফলে ভরা ছিল, গান ছিল, বাতাস ছিল, মায়া ছিল, ভালোবাসা ছিল, ছিল ক্ষমতা। ক্ষমতার প্রশ্ন আসলেই আশরাফ শব্দটা বারংবার
সামনে চলে আসবে কারণ দুইটা সমার্থক।
এইখানে এসে আপনি চাইলে এইটা বলতে
পারবেন যে সব দ্বন্দ্বের মূলবিন্দু হচ্ছে ক্ষমতা। হানাহানি-কাটাকাটি সবই চলে আসে, হাতছানি এই একটি কারণেই। ক্ষমতার তোপে কেউ যখন আশরাফ হয়ে
উঠে,
তখনই আতরাফদের কথা ভূলুন্ঠিত হয়, তাদের আব্রু আগ্রাসের আবরণে বিদ্ধ হয়, তাদের হক ধ্বংস জারজার হয়। কারণ এই দ্বন্দ্বের সৃষ্টি আদমের
জন্মেরও আগের, বহু বহুকাল আগে, আমাদের ফিরতে হবে আগুনের রাজ্যে, জ্বিনদের জিন্দানখানায়।
সভ্যতার সর্বশ্রেষ্ঠ আবিষ্কার বললে
আগুনের পরিসীমায় আর কেউই আসে না। এটা কোন কাজে না প্রয়োজন হচ্ছে? রাসায়নিক বিক্রিয়া মিলছে না? আগুন দাও। খেতে
হবে?
আগুনে দাও। কনকন ঠাণ্ডা রাতে তাপ পোহাতে হবে? আগুন নাও। প্রিয়তমার অন্ধকারাচ্ছন্ন মায়াময় মুখ দেখতে হবে? আগুন নাও। মানুষ মারতে হবে? আগুন নাও। ধ্বংস করতে হবে? আগুন দাও।
রেনেসাঁর জন্য আগুন দাও, নতুনের জন্য আগুন
দাও,
পুরাতনের জন্যও আগুন দাও। আগুনের এই সর্বকাজপটিয়সী মহিমা এই
নশ্বর দুনিয়াতে খুবই বিরল। তাই আগুনের তৈরী জীব নিজেদের আশরাফ, খোদার সর্বশ্রেষ্ঠ বলবে তা নিয়ে সন্দেহের তো অবকাশ নাই।
খোদা তাদেরকেই আগে পাঠিয়েছিলেন। সুযোগ দিয়েছিলেন, পেলেছেন, খাইয়েছেন, বড় করেছেন, স্বাধীনতা
দিয়েছেন। কিছুরই অভাব ছিল না। তবুও তাদের অবাধ্যতা ছিল, নৃশংসতা ছিল, অরাজকতা ছিল, নিষ্পেষন ছিল।
খোদার ফযল আমাদেরকে অহংকারীই কেনো বানায় তার উত্তরও পাওয়া যাবে এখানেই।
ভাবনারা ডানা মেলে ছড়িয়ে যাবে এইটাই চিন্তার সারকথা। খোদার ফযল আমাদেরকে অসীম
সম্ভাবনার পানে ঠেলে দেয়। আমাদেরকে শেখায় সম্ভাব্যতার সীমাকে তুড়ি মেরে অসাধ্যকে
হাতের মুঠোয় এনে খোদাকে কৃতজ্ঞতা জানাতে। খোদার সন্তুষ্টিই তো এই ছোট্ট জীবনে
আমাদের পরম পাওয়া। তিনিই শুরু, তিনিই শেষ। তার জন্যই সব। আমরা অবাধ্যও হই তার প্রতি ভালোবাসার আতিশায্য
দেখাতে! অদ্ভুত শুনাচ্ছে না? ভালোবাসা কিভাবে
নেতিবাচকতাকে নিয়ে আসতে পারে? খোদাকে ভালোবাসায়
কি ত্রুটি থাকতে পারে? খোদাকে ভালোবেসেও
কি ভালো না বেসে থাকা যেতে পারে? খোদার ভালোবাসায়
কি ঈর্ষা করা যায়?
নাদান মূর্খ মানুষরা ভাবে তারা সবই
পারবে। খোদাপ্রদত্ত স্বাধীনতাকে তারা মুক্তি ভেবে পাখা মেলতে চায়। অথচ এইসবকিছুর
মানে ছিল শুধুই তাদেরকে পরীক্ষার সামনে ফেলা, তাদেরকে যাচাই করা। খোদার এই ব্যবস্থাপনা বড়ই নিখুত। মানুষেরও হাজার হাজার বছর
আগে একইরকম উপায়ে আগুনের তৈরী জ্বিনেরাও নানা কিছুর মুখোমুখি হয়েছিল। তাদের
ধ্বংসস্তুপ থেকেই বেঁচে ফিরে মানবজাতির শ্রেষ্ঠ শত্রু ইবলিশ। যে নিজেকে সর্বপ্রথম
সর্বশ্রেষ্ঠ আশরাফ ভেবেছিল।

0 মন্তব্যসমূহ