স্মৃতিতে ৩৬শে জুলাই
সাজ্জাদুর রহমান
৫ই আগস্ট সর্বপ্রথম পুলিশী হামলাটা হয় শহীদ মিনারে, সেখানে ছিলাম। ৪ই আগস্টের আন্দোলনে গাজীপুর ছিলাম। তাই ফজর পড়েই সিএনজি নিয়ে মহাখালী, তারপর আরেক সিএনজি দিয়ে শহীদ মিনার চলে আসলাম। এত সকালে হওয়াতে কোথাও আসলে বাধা ছিল না তবে রাস্তাজুড়ে আর্মির সাঁজোয়া বহর, পুলিশের উপস্থিতি দেখা যাচ্ছিল।
সেদিনও ইন্টারনেট খুবই দূর্বলভাবে কাজ করছিল। ক্যাম্পাসে এসেই অন্যান্য দিনের মত আমার কাজ ছিল পুরাটা ঘুরে দেখা, কোথায় কি হালচাল। বেলা বাড়তে বাড়তে মিনারে উপস্থিতির পরিমাণও বাড়তে থাকে। নানা ধরণের মানুষ, কারো হাতে পানির বোতলের স্যাক, কারো হাতে পতাকা, কারো মাথায়। আমার সাথে ছিল নাহিদ। লোকজনের সাথে কুশল বিনিময় হচ্ছিল।
মিনারে মানুষের আনাগোনা বাড়ছিল। সকাল সাড়ে আটটার দিকে হুট করেই দেখি টিএসসি ও পলাশী উভয় দিক থেকেই পুলিশের দুইটা গাড়ি হাজির। আমরা সবাই মিনারের পাদদেশে সতর্ক অবস্থান নিলাম। হালকা স্লোগান শুরু হল। সাথে সাথেই সাউন্ড গ্রেনেড বর্ষণ! অতর্কিত হামলায় পুলিশ গুলিও ছুড়া শুরু করল।
আমরা ট্র্যাপে পড়ে গেলাম। পলাশী, টিএসসি দুইদিক ব্লক করে মিনারে পুলিশের উঠায় হতচকিত হয়ে আমরা মূলত পিছের দিকটায় গিয়েছিলাম, যাতে পুলিশকে বাইপাস করতে পিছের দেয়াল, অথবা মিনারের পিছন দিক থেকে ঢামেকে পৌছুনো যায়। অনেকেই দেয়াল টপকাল, উপরে ছিল কাঁটাতার। আহত হল, গ্রেফতার হল, পুলিশ টার্গেট করে এক আপুর পা-ও ভেঙে দিল। দুতিনজন গুলিও খেল, একজনের বোধহয় ঘাড়ে বুলেট আঘাত করল। ১৫-২০ মিনিটের জন্য শহীদ মিনার হয়ে উঠল জাহান্নাম!
যেভাবেই হোক আমরা কতক সেখান থেকে বের হয়ে ঢামেকে আশ্রয় নিলাম। ততক্ষণে পুলিশের আরোও বহর হাজির। দোয়েল চত্বর, শহীদ মিনার, চানখারপুল মোড়, পলাশী, মোটামুটি জায়গাগুলো সব ব্লক হয়ে গেল। আমাদের আর বের হবার উপায় রইল না। নেট না থাকায় তখনো আমরা জানি না শাহবাগের কি হাল অথবা ঢাকার অন্যান্য জায়গায় কি হচ্ছে আসলে।
ঢামেকে এসে প্রথমদিকে সবাই ছত্রভঙ্গ হয়েই রইল। হামলার রেশ কারো উপর থেকেই কাটেনি। কোনো খবরও পাওয়া যাচ্ছিল না, পরিচিত কয়েকজনের সাথে দেখাও হল। তখন আমি ভাবছিলাম এখানে বসে থেকে তো কাজ হবে না। বের হয়ে অন্য যেখানে মানুষের সমাগম আছে সেদিকে যেতে হবে। কিন্তু বের হবার উপায় ছিল না।
আহত ছিল অনেকেই, নাহিদও আহত ছিল। যাদেরকে পারলাম সাথে থাকা ফার্স্ট এইড থেকে ম্যানেজ করলাম। সময়ের সাথে আমাদের সেখান থেকে বের হবার প্রয়োজনীয়তা আসলে বাড়ছিল। পুলিশ হাসপাতালে হামলা করতেও দ্বিধা করবে না। এভাবেই মোটামুটি ঘন্টা দেড়-দুই চলে গেল। তখন আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম প্রতিরোধের। সবাই একসাথে রাস্তায় নেমে আগালে হয়ত কোনো পথ তৈরী হবে কারণ তখন শুনা যাচ্ছিল শাহবাগে বিপ্লবীরা অবস্থান নিয়ে ফেলেছে।
তখন ১১ অথবা ১২টার কাছাকাছি বাজবে। আমরা চানখারপুল রোডে নেমে আসলাম। ঢামেকের গেটের সামনে দাঁড়িয়েই নিজেদের অবস্থান নিলাম। আশেপাশে ছোট ইটের টুকরা আর ডাবওয়ালাদের কেটে দেওয়া ডাবের ছোবড়াই ছিল আমাদের আক্রমণের সম্বল। মাস্ক, পেস্ট, লাইটারের ব্যবস্থাও হল, লাঠিও পাওয়া গেল। ছড়ড়া গুলি, টিয়ারশেল ছুড়ে পুলিশও জানান দিল, তারা প্রস্তুত।
ছড়ড়াকে আসলে কেউ পাত্তা দিচ্ছিল না। আমাদের টার্গেটও ছিল যতক্ষণ পারা যায় প্রতিরোধ জারী রাখা। ততক্ষণে এটুকুও নিশ্চিত হওয়া গিয়েছে যে নারায়ণগঞ্জ সাইড থেকে একটা বড় মিছিল এদিকেই আসছে। তাদের জন্য হলেও চানখারপুল মোড়টা ক্লিয়ার করা প্রয়োজন ছিল। যেহেতু গন্তব্য ছিল শহীদ মিনার হয়ে শাহবাগ। টিয়ারশেলের আধিক্য বাড়ছিল, পেস্ট, আগুন দিয়েও কাভার হচ্ছিল না, স্বাভাবিকভাবেই হয় না। অতদূর থেকে ছড়ড়াও আসলে ডেডলী ড্যামেজ করতে পারে না। তবে লাইভ বুলেট পারে।
আক্রমণের পরের ধাপ হিসাব অনুযায়ীই আগাল। পুলিশ টার্গেটেড লাইভ বুলেট ছুড়ল, কতকের হাতে-পায়ে লাগলেও আমাদের উদ্দীপনা আরোও বাড়ছিল। ময়দান ছেড়ে তো যাওয়া যাবে না। ভয়ও ছিল পলাশীর দিকটা থেকে না জানি আবার রি-ইনফোর্স হয়! সতর্ক নজর সেখানেও রাখা লাগছিল। তবে এতসবকিছুর ভীড়ে আমাদের খেয়ালই ছিল না যে আশেপাশে এত এত উঁচু উঁচু বিল্ডিং আছে, পুরো জুলাই জুড়েই সেসব ছিল স্বৈরাচারের ঘাতকদের পছন্দের স্পট।
হাতেগোণা কয়েকজনই ছিলাম সেই রোডে, নেহাত ১০০-১২০ জন হয়ত হবে। কয়েকজন ভাই আলাদা হয়ে বেশিই সামনে চলে গিয়েছিলেন কিনা, সবাই তাল মিলায়ে একসাথে আগানো যায় নাই। ঢামেক কিছুটা হলেও নিরাপদ আশ্রয় ছিল, মেইন গেট থেকে এগিয়ে গেলে সামনে পুরাটাই ওপেন স্পেস, দোকানপাট সব তো বন্ধই। তাদের মাশুল দিতে হল। হাসিনার স্নাইপাররা একে একে ৩-৪ জন ভাইকে হত্যা করল। আমরা পিছু হটতে বাধ্য হলাম, ঢামেকের অভ্যন্তরে আশ্রয় নিলাম। কিছুক্ষণের মধ্যে শহীদ হবার খবর কনফার্ম পাওয়া গেল।
ততক্ষণে মেডিকেলের কিছু ডাক্তারগণ আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। তারা আমাদের কিছু খবর দিলেন। আবছা আবছা শুনা যাচ্ছিল হাসিনা পদত্যাগ করবে, সেনাপ্রধান ভাষণ দিবে দুপুর দেড়টার দিকে। আমার কাছেও ফোন আসছিল শুভাকাঙ্ক্ষী, বন্ধু-বান্ধবদের থেকে। ৪ই আগস্ট ঝুম বৃষ্টিতে ভিজে আন্দোলন করে আমার ফোনটার হায়াতও ছিল পড়তির দিকে, ফাংশন করছিল না। উৎকণ্ঠা, ভয়, সাহস, উদ্দীপনা! কি এক অদ্ভুত সময়। অনেকেই বারবার রীচ করে পাচ্ছিল না, তাদের কন্ঠ, সেই বিপদের সময়ে তাদের আমার খোঁজ নেওয়া, এইসব আমি কখনোই ভুলব না। তাদের প্রতি অশেষ ভালোবাসা এবং অসীম কৃতজ্ঞতা।
মেডিকেলের ভেতর থেকেই আমরা প্রতিবাদ জারী রাখলাম। বাইরে যাওয়া যাচ্ছিল না, স্নাইপারের ভয় ছিল। তবে সময়ের সাথে আবারো আমরা একটু একটু করে বাইরে যাওয়া শুরু করলাম। শুনা গেল সেনাপ্রধানের বক্তব্য পিছাচ্ছে। হতাশা, আশার দোলাচলে আমরা আল্লাহর কাছেই মোনাজাত করছিলাম।
দুপুর দুইটার পরেই হয়ত নারায়ণগঞ্জ থেকে আগত মিছিলটা চানখারপুল ক্রস করতে পারল। ওদের উপরেও বার্ণ ইনস্টিটিউটের ছাদ থেকে স্নাইপার হামলা চলেছিল। শহীদ মিনার থেকে সরে পুলিশ কার্জনের কাছে অবস্থান নিল তখন। আমরা ঢামেকের ইমার্জেন্সী দিয়ে বের হয়ে শাহবাগে গিয়ে অন্যদের সাথে মিলিত হলাম।
বাদবাকী কাহিনী তো ফতেহ গণভবনের। সেই আনন্দযাত্রায়
ছিল না কোনো ক্লান্তি। মোবাইল নষ্ট হওয়াতে স্মৃতি কেবল মনভ্যন্তরেই আছে। আরোও কতকিছু
লেখার বাকি! বছরখানেক পর মনকে মানায়ে এইটুকু লিখেও লাগছে কত বোঝা রয়ে গেছে মনে, কত
ফেলে আসা দায়িত্ব, শহীদদের ত্যাগের দেনা, নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন!

0 মন্তব্যসমূহ