ড. খান: একজন পারমাণবিক বিপ্লবী
সাজ্জাদুর
রহমান
একটি নীরব কামরা। বাইরে তখন ইউরোপের
শীতের তুষারপাত আলতো ছন্দে জানান দিচ্ছে প্রকৃতির রুক্ষতা। কিন্তু নেদারল্যান্ডসের
ইউরেনকো গবেষণা কেন্দ্রের হিমশীতল পরিবেশেও একজন মানুষের মনে উষ্ণ স্বপ্নের আগুন জ্বলছিল।
টেবিলে রাখা গ্যাস সেন্ট্রিফিউজের জটিল নকশা আর ফোল্ডার ভর্তি ইউরেনিয়াম
সমৃদ্ধকরণ প্রযুক্তির স্পর্শকাতর দলিলগুলো তাঁর কাছে নিছকই কাগজ ছিল না; সেগুলো ছিল এক ঘুমন্ত জাতির আত্মমর্যাদার নতুন ভোরের
প্রতিশ্রুতি। তাঁর ভেতরের আকুলতা তখন একটিই, এই জ্ঞানকে
ব্যবহার করে কিভাবে নিজের জন্মভূমিকে সুরক্ষিত করা যায়! তাঁর নাম আব্দুল কাদির
খান।
ড. খান কেবলই একজন তুখোড়
মেটালার্জি ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন না; তিনি ছিলেন এক
স্বপ্নদ্রষ্টা, যিনি তাঁর জ্ঞান ও মেধাকে দেশের জন্য উৎসর্গ
করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করেননি। তিনি ছিলেন এক জাতির মানসিক বিজয়ের স্থপতি,
যাঁর হাত ধরে পাকিস্তান বিশ্বের সপ্তম পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্রে
পরিণত হয়। এই লেখা তাঁর জীবন, ব্যক্তিগত সংগ্রাম, বিতর্ক এবং নানা ঘটনাপ্রবাহে আলোকপাত করবে।
শৈশব ও শিক্ষাজীবন
আব্দুল কাদির খান জন্মগ্রহণ করেন
১৯৩৬ সালের ১ এপ্রিল, অবিভক্ত ভারতের
ভোপালে, এক শিক্ষিত ও সম্ভ্রান্ত পরিবারে। দেশভাগের
রক্তক্ষয়ী অভিজ্ঞতার সাক্ষী হয়ে, ১৯৫২ সালে কিশোর আব্দুল
কাদির পরিবারসহ পাকিস্তানে পাড়ি জমান, যেখানে তাঁর সামনে এক
নতুন জীবনের দুয়ার খোলে। করাচি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মেটালার্জিতে স্নাতক ডিগ্রি
অর্জনের পর উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন তাঁকে ইউরোপে নিয়ে যায়। জার্মানির বার্লিন
টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটি, নেদারল্যান্ডসের ডেলফট
ইউনিভার্সিটি অফ টেকনোলজি এবং বেলজিয়ামের ল্যুভেন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ধাপে ধাপে
তিনি মাস্টার্স ও পিএইচডি সম্পন্ন করেন। তিনি ধাতব প্রকৌশলের সূক্ষ্মতম দিকগুলো
আত্মস্থ করেছিলেন, যা পরবর্তীতে তাঁর ঐতিহাসিক কাজের ভিত্তি
স্থাপন করে।
ইউরোপে গবেষণা ও সেন্ট্রিফিউজ
প্রযুক্তি বৃত্তান্ত
১৯৭২ সালের বসন্তে ড. খানকে ‘ফিজিক্যাল
ডাইনামিকস রিসার্চ ল্যাবরেটরি’ নিয়োগ করে, যা
ডাচ অংশীদার URENCO-এর একটি উপ-ঠিকাদার ছিল। ১৯৭১ সালে
প্রতিষ্ঠিত হওয়া ইউরেনকো ছিল ব্রিটিশ, জার্মান এবং ডাচ
কোম্পানিগুলির একটি কনসোর্টিয়াম, যেখানে গবেষণা হত
আল্ট্রাসেন্ট্রিফিউজ ব্যবহারের মাধ্যমে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ এবং বিকাশ নিয়ে।
নিম্ন-স্তরের নিরাপত্তা ছাড়পত্র এবং তদারকীর শিথিলতার সুযোগ নিয়ে এই
পরিবেশে কাজ করার সুবাদে ড. খান Zippe-type সেন্ট্রিফিউজের
ডিজাইন, এর বিভিন্ন উপাদান এবং এর সাপ্লায়ার নেটওয়ার্ক
সম্পর্কে অনেক তথ্য পান। তিনি বহুবার আলমেলোতে ডাচ প্ল্যান্ট
পরিদর্শনও করেছিলেন। তাঁর একটি কাজ ছিল উন্নত সেন্ট্রিফিউজ সম্পর্কিত জার্মান
নথিগুলোকে ডাচ ভাষায় অনুবাদ করা, যা তাঁকে এই প্রযুক্তির
আরোও গভীরে নিয়ে যায়।
আন্তর্জাতিক আইন এটিকে 'তথ্যচুরি' হিসেবে দেখত, যা একটি নৈতিক দ্বন্দ্ব তৈরি করেছিল। কিন্তু ড. খানের কাছে এটি ছিল
ব্যক্তিগত লাভ বা আন্তর্জাতিক নিয়মের ঊর্ধ্বে এক জাতীয় কর্তব্য। তিনি বিশ্বাস
করতেন, দেশ যখন পারমাণবিক হুমকির মুখে, তখন এই জ্ঞান লুকিয়ে রাখাটা হবে এক বিশ্বাসঘাতকতা। তাঁর ভেতরে তখন কেবলই
দেশের প্রতি ভালোবাসা আর একটি শক্তিশালী পাকিস্তানের স্বপ্ন। ইউরেনকোর সুরক্ষা
ব্যবস্থায় যে সূক্ষ্ম দুর্বলতা ছিল, সেটি তিনি নিজের দেশের
প্রয়োজনে কাজে লাগান। তিনি জানতেন, এই পথ বিপজ্জনক, কিন্তু দেশের সম্মান ও সুরক্ষার জন্য তিনি যেকোনো ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত
ছিলেন।
পাকিস্তানে ফেরা ও KRL-এর হাতেখড়ি
খান তাঁর দেশের ঘটনাবলী দ্বারা
প্রচণ্ডভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন। বিশেষ করে পাকিস্তান
ভেঙে স্বাধীন বাংলাদেশের সৃষ্টি, ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে ভারতের সাথে
একটি সংক্ষিপ্ত তেরদিনের যুদ্ধে পাকিস্তানের অপমানজনক পরাজয়, এবং ১৯৭৪ সালের মে মাসে ভারতের পারমাণবিক বিস্ফোরক পরীক্ষা। এই ঘটনাগুলো
তাঁকে আর চুপ থাকতে দেয়নি। ১৭ সেপ্টেম্বর, ১৯৭৪ তারিখে তিনি
পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টোকে একটি দীর্ঘ ও আবেগময়
চিঠি লেখেন। সেখানে তিনি কেবল পারমাণবিক বোমা তৈরির সক্ষমতার কথাই জানাননি,
বরং পাকিস্তানের অস্তিত্ব রক্ষা, আত্মমর্যাদা
ও ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার জন্য পারমাণবিক ক্ষমতা কতটা অপরিহার্য, তার বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেন। চিঠিতে মতামত দিয়েছিলেন, বোমা সমৃদ্ধকরণের জন্য সেন্ট্রিফিউজের সাহায্যে ইউরেনিয়াম ব্যবহার করা
প্লুটোনিয়াম ব্যবহারের চেয়ে (যা পাকিস্তানে ইতিমধ্যেই চলছিল এবং পারমাণবিক
চুল্লি ও পুনঃপ্রক্রিয়াকরণের উপর নির্ভরশীল ছিল) ভালো। এটি ভুট্টোকে এতটাই
প্রভাবিত করে যে, ১৯৭৪ সালের ডিসেম্বরে ভুট্টো তাঁর সাথে
দেখা করে পাকিস্তানকে বোমা তৈরিতে সাহায্য করার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করার জন্য
উৎসাহিত করেন।
পরের বছর খান সেন্ট্রিফিউজের ব্লুপ্রিন্ট
'চুরি' করেন এবং প্রধান
ইউরোপীয় সরবরাহকারীদের একটি তালিকা তৈরি করেন যে জায়গাগুলো থেকে যন্ত্রাংশ সংগ্রহ
করা যেতে পারে। ১৯৭৫ সালের ১৫ ডিসেম্বর, তিনি তাঁর স্ত্রী
এবং দুই কন্যাকে নিয়ে নেদারল্যান্ডস থেকে পাকিস্তানে ফিরে আসেন।
খান প্রথমে পাকিস্তান পারমাণবিক
শক্তি কমিশন (PAEC) এর সাথে কাজ করেছিলেন,
কিন্তু এর প্রধান মুনির আহমেদ খানের সাথে মতবিরোধ দেখা দেয়। ড. খান
দ্রুত কাজ শেষ করার তাগিদ অনুভব করতেন, যেখানে PAEC-এর আমলাতান্ত্রিক জটিলতা প্রক্রিয়াকে ধীর করে দিচ্ছিল। ১৯৭৬ সালের
মাঝামাঝি সময়ে ভুট্টোর নির্দেশে খান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ক্ষমতা বিকাশের
উদ্দেশ্যে ইঞ্জিনিয়ারিং রিসার্চ ল্যাবরেটরি বা ERL প্রতিষ্ঠা
করেন। ১৯৮১ সালের মে মাসে ল্যাবরেটরিটির নাম পরিবর্তন করে খান রিসার্চ ল্যাবরেটরি
বা KRL রাখা হয়। তাঁর কার্যক্রমের স্থান ছিল ইসলামাবাদ থেকে
৫০ কিলোমিটার (৩০ মাইল) দক্ষিণ-পূর্বে কাহুতা; সেখানে খান
জার্মান নকশার উপর ভিত্তি করে প্রোটোটাইপ সেন্ট্রিফিউজ তৈরি করেছিলেন এবং
সরবরাহকারীদের তালিকা ব্যবহার করে সুইস, ডাচ, ব্রিটিশ এবং জার্মান কোম্পানিগুলি থেকে প্রয়োজনীয় উপাদান আমদানি
করেছিলেন। KRL ছিল পাকিস্তানের পারমাণবিক কর্মসূচির সবচেয়ে
গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান। এটি ছিল ড. খানের ব্যক্তিগত স্বপ্ন, যা
রাষ্ট্রের সমর্থনে বাস্তবে রূপ নেয়।
KRL-এর গবেষণা কাঠামো
ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা
KRL-এ Zippe-type সেন্ট্রিফিউজ প্রযুক্তির সমন্বয়ে তৈরি হয় এক বিশাল ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ
নেটওয়ার্ক, যার প্রতিটি ধাপে ছিল ড. খানের সরাসরি
সম্পৃক্ততা। তিনি একাধারে ছিলেন বিজ্ঞানী, কঠোর প্রশাসক এবং
অনুপ্রেরণাদায়ী নেতা। মেশিন ডিজাইন থেকে শুরু করে উৎপাদন, সরবরাহ
এবং সামগ্রিক প্রকৌশল ব্যবস্থাপনার প্রতিটি সূক্ষ্ম বিষয় তিনি নিজে তদারকি করতেন।
আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এবং প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা ছিল নিত্যসঙ্গী, কিন্তু তিনি হার মানেননি। ১৯৮০-এর দশকের গোড়ার দিকে পাকিস্তান চীনের কাছ
থেকে ইউরেনিয়াম ইমপ্লোশন ডিজাইন ব্যবহার করে একটি পারমাণবিক অস্ত্রের নীলনকশা
অর্জন করে, যা ১৯৬৬ সালে চীন সফলভাবে পরীক্ষা করেছিল। প্রচলিত
আছে যে, চীন ২৬শে মে, ১৯৯০ সালে পাকিস্তানের জন্য একটি
ডেরিভেটিভ ডিজাইন পরীক্ষা করে।
তিনি দেশীয় শিল্পকে একত্রিত করেন, উদ্ভাবকদের উৎসাহিত করেন এবং বিশ্বজুড়ে প্রয়োজনীয়
যন্ত্রাংশ সংগ্রহে এক জটিল নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন। তাঁর দূরদর্শী নেতৃত্ব আর
কর্মীদের অদম্য পরিশ্রমের ফলস্বরূপ, ১৯৮১ সালের মধ্যেই
পাকিস্তান স্বনির্ভরভাবে হাই-স্পিড সেন্ট্রিফিউজ তৈরি করতে সক্ষম হয়। KRL-এর গোপনীয়তা ছিল কিংবদন্তি, আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা
সংস্থাগুলোর কাছেও এটি সুবিশাল রহস্য ছিল। এই ভূগর্ভস্থ সাম্রাজ্য ছিল ড. খানের
ব্যক্তিগত প্রতিজ্ঞা আর পাকিস্তানের জাতীয় আকাঙ্ক্ষার প্রতীক।
১৯৯৮ সালের চাগাই বিস্ফোরণ: পরমাণু
বিজয়, ভূ-রাজনৈতিক পুনর্গঠন ও
আন্তর্জাতিক ঝড়
২৮ মে ও ৩০ মে ১৯৯৮ সাল, পাকিস্তানের ইতিহাসে এই দুটি তারিখ কেবল সংখ্যা নয়, ছিল জাতির উত্থানের প্রতীক। ভারতের পারমাণবিক পরীক্ষার জবাবে চাগাই
পাহাড়ে পাকিস্তান মোট ছয়টি পারমাণবিক পরীক্ষা চালায়। KRL-এর
সমৃদ্ধকৃত ইউরেনিয়াম ফুয়েল ছিল এই ঐতিহাসিক মুহূর্তের মূল উপাদান। এই পরীক্ষাগুলো
এমন সময়ে করা হয়েছিল যখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় পাকিস্তানকে তীব্রভাবে নিরুৎসাহিত
করছিল এবং কঠোর নিষেধাজ্ঞার হুমকি দিচ্ছিল। কিন্তু ড. খান এবং দেশের নেতারা জানতেন,
এটিই তাদের আত্মমর্যাদা রক্ষার শেষ সুযোগ। পাকিস্তান সমস্ত
আন্তর্জাতিক চাপ উপেক্ষা করে নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা প্রদর্শন করে এবং পরমাণু
শক্তিধর রাষ্ট্রে পরিণত হয়।
ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব ও দক্ষিণ
এশিয়ার ভারসাম্য: পারমাণবিক সক্ষমতা অর্জনের
মাধ্যমে পাকিস্তান দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্যে এক নতুন মাত্রা যোগ করে।
দীর্ঘদিন ধরে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে প্রচলিত সামরিক শক্তির যে ব্যাপক ব্যবধান
ছিল, পারমাণবিক অস্ত্র সেই ব্যবধানকে
তাৎপর্যপূর্ণভাবে কমিয়ে আনে, যা পাকিস্তানকে তার বড়
প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে এক অদৃশ্য ঢাল এনে দেয়। পাকিস্তান 'মিনিমাম
ক্রেডিবল ডেটারেন্স' (Minimum Credible Deterrence) অর্থাৎ 'ন্যূনতম বিশ্বাসযোগ্য প্রতিরোধ' নীতি প্রতিষ্ঠা করে।
এর অর্থ হলো, তাদের কাছে এতটুকু পারমাণবিক ক্ষমতা আছে,
যা দিয়ে তারা প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে এক নিশ্চিত ধ্বংসাত্মক পাল্টা
আঘাত হানতে পারে, এমনকি যদি প্রতিপক্ষ প্রথম আঘাত হানেও। এই
ডেটারেন্স মূলত উভয় দেশকে, বিশেষ করে ভারতকে, কোনো বড় ধরনের প্রচলিত সামরিক সংঘাত শুরু করা থেকে বিরত রেখেছে।
পারমাণবিক শক্তির অধিকারী হওয়ার আগে ভারতের প্রচলিত সামরিক শ্রেষ্ঠত্বের কারণে
পাকিস্তানের উপর সামরিক আগ্রাসনের ঝুঁকি অনেক বেশি ছিল। কিন্তু পারমাণবিক শক্তির
উত্থান এই ঝুঁকিকে প্রায় অসম্ভব করে তোলে, কারণ উভয় পক্ষই
বুঝতে পারে যে কোনো পূর্ণাঙ্গ সংঘাতের পরিণতি হবে নিশ্চিত ধ্বংস। দক্ষিণ এশিয়ায়
পারমাণবিক অস্ত্রের উপস্থিতি পুরো অঞ্চলজুড়েই একটি 'স্থিতিশীল
অস্থিতিশীলতা' (Stable Instability) তৈরি করেছে, অর্থাৎ, দুই পারমাণবিক শক্তির মধ্যে সরাসরি বড় যুদ্ধ হওয়ার সম্ভাবনা
কম, কিন্তু ছোটখাটো উত্তেজনা এবং সীমান্ত সংঘাতের ঝুঁকি রয়েই
গেছে, যা উভয় দেশের জন্য এক নতুন বাস্তবতার জন্ম দিয়েছে।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া: চাগাই পরীক্ষার পর বিশ্বজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, জাপান এবং ইউরোপীয়
ইউনিয়নের মতো দেশগুলো পাকিস্তানের উপর কঠোর অর্থনৈতিক, প্রযুক্তিগত
এবং সামরিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এর মধ্যে ছিল ঋণ সহায়তা বাতিল, প্রযুক্তি হস্তান্তর স্থগিত এবং সামরিক সরঞ্জাম বিক্রি বন্ধ। আন্তর্জাতিক
মুদ্রা তহবিল (IMF) এবং বিশ্বব্যাংকের মতো সংস্থাগুলো থেকে
ঋণ পাওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে। পাকিস্তানের অর্থনীতি তখন বিশাল চাপের মুখে পড়ে। তবে,
পাকিস্তান এই আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা কাটিয়ে উঠতে নিরন্তর কূটনৈতিক
প্রচেষ্টা চালায় এবং ধীরে ধীরে নিষেধাজ্ঞার কিছু অংশ তুলে নিতে সক্ষম হয়। চীন
অবশ্য পাকিস্তানের পাশে দাঁড়িয়েছিল এবং মধ্যপ্রাচ্যের কিছু দেশও তাদের পারমাণবিক
সক্ষমতাকে ইতিবাচকভাবে দেখেছিল, যা কূটনৈতিক প্রচেষ্টাগুলোকে
কিছুটা হলেও সহজ করে। এই পরীক্ষা প্রমাণ করে যে, ড. খানের
নেতৃত্বে পাকিস্তান আন্তর্জাতিক চাপ উপেক্ষা করে জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় দৃঢ়প্রতিজ্ঞ
ছিল, এমনকি তার জন্য বিশাল মূল্য চুকাতে হলেও।
এই পারমাণবিক বিজয়ের পর ড. আব্দুল
কাদির খানকে 'জাতীয় বীর' হিসেবে ঘোষণা করা হয়। তাঁকে দুইবার পাকিস্তানের সর্বোচ্চ বেসামরিক
পুরস্কার নিশান-ই-ইমতিয়াজ পদকে ভূষিত করা হয়, যা তাঁর
অবদানের প্রতি অসামান্য স্বীকৃতি। নাম চিরস্মরণীয় করে রাখতে তাঁর নামে বহু স্কুল,
রাস্তা, বিশ্ববিদ্যালয় এবং গবেষণাকেন্দ্রের
নামকরণ করা হয়। তিনি হয়ে ওঠেন পাকিস্তানের আত্মমর্যাদা ও স্বাধীনতার এক মূর্ত
প্রতীক।
প্রযুক্তি পাচার বিতর্ক ও
গৃহবন্দিত্ব
১৯৮০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে, পাকিস্তানের নিজস্ব ইউরেনিয়াম অস্ত্রের চাহিদা পূরণ করে ড.
খান দুবাই, মালয়েশিয়া এবং অন্যান্য স্থানে ফ্রন্ট কোম্পানি
তৈরি করা শুরু করেন। এইগুলোর মাধ্যমে তিনি গোপনে একটি বিস্তৃত নেটওয়ার্কে
সেন্ট্রিফিউজ, উপাদান, নকশা এবং দক্ষতার
ব্যবসা করতেন। এই কর্মকাণ্ড কয়েক দশক ধরে চলেছিল। এই নেটওয়ার্কের গ্রাহকদের মধ্যে
ইরানও ছিল, যারা পাকিস্তানি মডেলের উপর ভিত্তি করে একটি
ইউরেনিয়াম-সমৃদ্ধকরণ কমপ্লেক্স তৈরি করেছিল। খান কমপক্ষে ১৩ বার উত্তর কোরিয়া সফর
করেছিলেন এবং সন্দেহ করা হয় যে তিনি সেখানে সমৃদ্ধকরণ প্রযুক্তি স্থানান্তর
করেছেন। তাঁর পরীক্ষাগার উত্তর কোরিয়ানদের সহায়তায় পাকিস্তানের ঘৌরি ব্যালিস্টিক
ক্ষেপণাস্ত্রও তৈরি করেছে। খান কর্তৃক সরবরাহকৃত উপদান দিয়ে লিবিয়া পারমাণবিক
অস্ত্র কর্মসূচি শুরু করে যা ২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র দ্বারা বাধাগ্রস্ত হয়।
২০০৪ সালের ৩১শে জানুয়ারি, খানকে অন্যান্য দেশে পারমাণবিক প্রযুক্তি স্থানান্তরের
অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়। এই অভিযোগ বিশ্বের পারমাণবিক অপসারণ প্রচেষ্টার জন্য এক
বড় ধাক্কা ছিল। অভিযোগের সূত্রপাত হয় লিবিয়ার পারমাণবিক কর্মসূচির অবসানের পর,
যখন লিবিয়ার হাতে থাকা নথিপত্র থেকে তাঁর নেটওয়ার্কের প্রমাণ মেলে।
এই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পারমাণবিক প্রযুক্তির বিস্তার বৈশ্বিক নিরাপত্তায়
মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করে।
এই অভিযোগ ড. খানের ব্যক্তিগত
জীবনকে তছনছ করে দেয়। পাকিস্তান সরকার প্রথমে এই অভিযোগ অস্বীকার করলেও, তীব্র আন্তর্জাতিক চাপ এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা
তথ্যের মুখে শেষ পর্যন্ত তাঁকে জনসমক্ষে ক্ষমা চাইতে বাধ্য করে। ৪ ফেব্রুয়ারি
তিনি পাকিস্তানি টেলিভিশনে একটি বিবৃতি পড়েন যেখানে তিনি তাঁর অভিযানের সম্পূর্ণ
দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং সেনাবাহিনী ও সরকারকে যেকোনোও ধরণের জড়িত থাকার অভিযোগ
থেকে অব্যাহতি দেন। এই দাবিটি অনেক পারমাণবিক বিশেষজ্ঞের কাছে বিশ্বাস করা কঠিন
হয়ে পড়ে। এই একটি বাক্য রাষ্ট্রের উপর থেকে আন্তর্জাতিক চাপ সরিয়ে নেয়, কিন্তু ড. খানের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা কেড়ে নেয়। পরের দিন পাকিস্তানের
রাষ্ট্রপতি পারভেজ মোশাররফ তাঁকে ক্ষমা করেন, কিন্তু ২০০৯
সাল পর্যন্ত তাঁকে গৃহবন্দী রাখা হয়। তাঁর পরিবারের উপরও নেমে আসে এক অদৃশ্য চাপ।
তাঁর এই স্বীকারোক্তি আজও বিতর্কের জন্ম দেয়।
অনেকেই বিশ্বাস করে যে তিনি একা
ছিলেন না, বরং রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতাতেই এই পাচার
কাজ হয়েছিল, আর তিনি কেবল রাষ্ট্রের স্বার্থে এক নিঃসঙ্গ
নায়কের মতো বিশাল দায়ভার কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন। খানের সমালোচকরা, বিশেষ করে পশ্চিমা বিশ্বে, একজন ব্যক্তির প্রতি এই
ধরনের নম্র আচরণে হতাশা প্রকাশ করেন। তবে পাকিস্তানিদের কাছে খান গর্বের প্রতীক,
একজন বীর যার অবদান পাকিস্তানের জাতীয় নিরাপত্তাকে শক্তিশালী
করেছে।
মৃত্যুবরণ
২০০৯ সালে ড. খানের গৃহবন্দিত্ব
শিথিল হলেও তাঁর আন্তর্জাতিক সফর নিষিদ্ধই থাকে। জীবনের শেষ বছরগুলোতে তিনি কিছু
সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকলেও নীরবে, লোকচক্ষুর
আড়ালে জীবন কাটান। তাঁর প্রতিষ্ঠিত KRL পাকিস্তানের
প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে, যা তার
অসামান্য অবদানের প্রমাণ। ২০২১ সালের ১০ অক্টোবর কোভিড-১৯-এ আক্রান্ত হয়ে
পাকিস্তানের ইসলামাবাদে এই পারমাণবিক বিপ্লবী মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুতে পুরো
পাকিস্তান শোকে আচ্ছন্ন হয়; কারণ তাদের কাছে তিনি ছিলেন একজন
নায়ক, পিতৃতুল্য ব্যক্তি, যিনি দেশকে
এক ভয়াবহ সংকটের মুখে রক্ষা করেছিলেন। তাঁকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত করা হয়,
যা তাঁর প্রতি জাতির গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসারই প্রকাশ।
উপসংহার: এক পারমাণবিক বিপ্লবীর অমর
গাঁথা ও উত্তরাধিকার
ড. আব্দুল কাদির খান ছিলেন এমন এক
ব্যক্তি, যিনি রাষ্ট্রের জন্য বিজ্ঞানকে অস্ত্র করে তুলেছিলেন।
তিনি ছিলেন অসম সাহসের মানুষ, যিনি পাকিস্তানকে বলেছিলেন: “আমরাও পারি।” তাঁর কাজ যেমন দেশের
ভেতর প্রশংসিত, তেমনি আন্তর্জাতিক মহলে
বিতর্কিত। সমালোচকরা তাঁকে পারমাণবিক প্রসারণের প্রধান চরিত্র হিসেবে দেখলেও,
পাকিস্তানের জনগণের কাছে তিনি এক অবিসংবাদিত বীর, যিনি দেশকে পারমাণবিক সক্ষমতা দিয়েছিলেন। তাঁর কর্ম পাকিস্তানের কৌশলগত
অবস্থানকে স্থায়ীভাবে পরিবর্তন করেছে, যা আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক
ক্ষমতা কাঠামোয় এক গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছে।
ইতিহাসে তিনি থাকবেন এক পারমাণবিক
বিপ্লবী হিসেবে, যিনি পাকিস্তানকে বিশ্বরাজনীতির
কেন্দ্রবিন্দুতে এনে দাঁড় করিয়েছিলেন। ড. খানের জীবন আমাদের সামনে একটি জটিল
প্রশ্ন রেখে যায়, যখন জাতীয় নিরাপত্তা ও টিকে থাকার প্রশ্ন আসে, তখন বিজ্ঞানের নৈতিকতার সীমা কোথায়? তাঁর
উত্তরাধিকার শুধু পাকিস্তানের পারমাণবিক সক্ষমতাই নয়, বরং
বৈজ্ঞানিক দায়িত্ববোধ, জাতীয়তাবাদ এবং আন্তর্জাতিক আইন
প্রয়োগের বিতর্ককেও চিরস্থায়ী করে তুলেছে। তিনি ছিলেন এক সাধারণ মানুষ, যিনি পরিস্থিতিকে অসাধারণ ভাবে নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন, একাকী লড়েছিলেন নিজের দেশের জন্য, এবং তার ফলস্বরূপ
হয়ে উঠেছেন একজন অবিস্মরণীয় কিংবদন্তি।
0 মন্তব্যসমূহ