ইতিহাসে ডাকসু
সাজ্জাদুর রহমান
ডাকসুর (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ) ইতিহাস লেখার মানে অনেকটাই বাংলাদেশের ইতিহাসকেই তুলে ধরা। ৫২’র ভাষা আন্দোলন, ৬২’র শিক্ষা আন্দোলন, ৬৯’র গণঅভ্যুত্থান এবং ৭১’র মুক্তিযুদ্ধে ডাকসুর ভূমিকা এই মাটির ইতিহাসকে গড়ে তুলতে সাহায্য করেছে। ইতিহাসের প্রতিটি বাঁক পরিবর্তনে, সংগ্রামের প্রতিটি ধাপে, "বাংলাদেশের দ্বিতীয় সংসদ" নামে পরিচিত ডাকসুর ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য।
ডাকসুর নির্বাচন এখন পর্যন্ত মোট ৩৭ বার অনুষ্ঠিত হয়েছে। স্বাধীনতার আগে যেখানে নিয়মিত নির্বাচনের একটি সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল, সেখানে স্বাধীনতার পর মাত্র আটবার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এই লেখায় ডাকসুর সংক্ষিপ্ত ইতিহাস তুলে ধরার চেষ্টা করব, যাতে এর সংস্কৃতি, সমৃদ্ধ অতীত এবং প্রভাব সম্পর্কে নতুনরা ধারণা পায়।
ডাকসুর পর্যালোচনা যদি দিই তবে দেখা যায় যে বিভিন্ন নির্বাচনে ভিপি, জিএস পদগুলোতে নির্বাচিত হয়েছিল এখনকার নিষিদ্ধঘোষিত ছাত্রলীগ, সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট (বাসদ-ছাত্রলীগ), ছাত্র ইউনিয়ন, জাসদ ছাত্রলীগের নেতৃবৃন্দ। জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল একবার করে ভিপি, জিএস, ছাত্র অধিকার একবার ভিপি পদ পেয়েছিল।
ডাকসুর বিশাল, জটিল এবং সম্পূর্ণ ইতিহাসকে আমরা চারভাগে বিভক্ত করতে পারি। আমি ধাপে ধাপে প্রতিটা টাইমলাইনকে লেখার চেষ্টা করছি। এখানে তথ্যসূত্র হিসেবে নিচ্ছি নির্বাচনকালীন সময়ে প্রকাশিত বিভিন্ন পত্রিকা, ২০১৯ সালের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে লিখিত পত্রিকায় প্রকাশিত আর্টিকেল, এবং ডাকসুর সাবেকদের স্মৃতিচারণ।
- ১৯৯২২-১৯৫২। এই সময়টাতে ডাকসুতে মনোনয়নের মাধ্যমে ভিপি, জিএস সহ অন্যান্য পদ দেওয়া হত।
- ১৯৫৩-১৯৭১। ৫৩তে প্রথম নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, এস এ বারী ভিপি হিসেবে, জুলমত আলী খান, পরবর্তীতে ফরিদ আহমেদ জিএস হিসেবে নির্বাচিত হন। এই টাইমলাইনে, বিশেষ করে আইয়ুব খানের সামরিক শাসনের (১৯৫৮-১৯৬৯) সময়েও নিয়মিত ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতো। তবে, ১৯৬৫-৬৬ এবং ১৯৬৯-৭০ সালে নির্বাচন স্থগিত ছিল। এই সময়ের ডাকসু কার্যক্রম ভাষা আন্দোলন, শিক্ষা আন্দোলন এবং গণঅভ্যুত্থানে বিশেষ অবদান রেখেছে।
- ১৯৭২-১৯৯০। এই টাইমলাইন গুরুত্বপূর্ণ। যদিও মাত্র সাতবার ডাকসু নির্বাচন হয়েছিল কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক পট পরিবর্তন, রাজনৈতিক সংস্কৃতি, স্বার্থবাদীতা, সন্ত্রাসবাদী চিন্তা ও কাজকর্ম নানা বিষয় এই সময়কে প্রতিনিধিত্ব করে যা একইসাথে জাতীয় রাজনীতি এবং ডাকসু রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলেছিল।
- ১৯৯১-বর্তমান। ২০১৯ সালের আগে এই টাইমলাইনে বিভিন্ন কারণে ডাকসু নির্বাচন হয়নি। কেন হয়নি সেই কারণগুলো পর্যালোচনার দাবী রাখে, যা একইসাথে আমাদেরকে দেখাবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির হালচাল।
১৯২২-১৯৫২ঃ ডাকসুর প্রথম ধাপ
ডাকসুর যাত্রা শুরু হয় ১৯২২ সালের ১ ডিসেম্বর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে শিক্ষকদের একটি সভায়। সেসময় এটি "ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ" নামে পরিচিত ছিল। ১৯২৩ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাহী পরিষদ এই উদ্যোগকে অনুমোদন দেয় এবং ১৯২৫ সালে ছাত্র সংসদের জন্য একটি গঠনতন্ত্র প্রণয়ন করা হয়।
প্রথমবারের মতো ১৯২৪-২৫ সেশনে মমতাজ উদ্দিন আহমেদ ভিপি (সভাপতি) এবং যোগেন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত জিএস (সাধারণ সম্পাদক) হিসেবে মনোনীত হন। পরবর্তী সময়ে, ১৯২৮-২৯ সেশনে এ এম আজহারুল ইসলাম (ভিপি) এবং এস চক্রবর্তী (জিএস), ১৯২৯-৩২ সেশনে রমণিকান্ত ভট্টাচার্য (ভিপি), কাজী রহমত আলী এবং আতাউর রহমান খান (জিএস), ১৯৪৭-৪৮ সেশনে অরবিন্দ বোস (ভিপি) এবং গোলাম আযম (জিএস) ছিলেন।
১৯৫৩-১৯৭১ঃ ডাকসুর দ্বিতীয় ধাপ ও বাংলাদেশের অভ্যুদয়
এই সময়কালকে ডাকসুর ইতিহাসের সোনালী অধ্যায় বলা যায়। নিয়মিত নির্বাচন আয়োজন, আন্দোলন ও সংগ্রামে সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে ডাকসু দেশের ছাত্রসমাজের অন্যতম শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম হয়ে ওঠে।
ডাকসুর এই সময়ের উল্লেখযোগ্য দিকগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো নারীদের অংশগ্রহণ। আমরা এই সময়ে বেগম জাহানারা আখতার এবং মাহফুজা খানমদের মতো নারীদের ভিপি হিসেবে নির্বাচিত হতে দেখি। বিভিন্ন পদে ন্যাশনাল স্টুডেন্টস ফেডারেশন পাকিস্তান (এনএসএফ) এবং ছাত্র ইউনিয়নের আধিপত্য ছিল।
শহীদ আব্দুল মালেক হত্যাকাণ্ড
এই সময়ের সবচেয়ে মর্মান্তিক ঘটনাগুলোর একটি হলো ১৯৬৯ সালের শহীদ আব্দুল মালেক হত্যাকাণ্ড। ডাকসুর আয়োজিত একটি শিক্ষানীতির উপর আলোচনা সভায় তিনি ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে বক্তব্য প্রদান করেন। এর পরপরই রেসকোর্স ময়দানে আক্রমণের শিকার হয়ে তার মাথা থেঁতলে হত্যা করা হয়। ঘটনার ভিডিও ফুটেজে তৎকালীন ছাত্র ইউনিয়ন এবং ছাত্রলীগের নেতাদের উপস্থিতি দেখা যায়, যেখানে তোফায়েল আহমেদ, রাশেদ খান মেনন, এবং হাসানুল হক ইনুর ছবি প্রকাশিত হয়। এ ঘটনা বাংলাদেশে ছাত্ররাজনীতিতে সহিংসতার সূচনা করে, যার দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব পরবর্তী নির্বাচন এবং ছাত্র রাজনীতিতে লক্ষ করা যায়।
মালেক হত্যাকাণ্ড দেশব্যাপী আতঙ্ক ও শোকের সঞ্চার করে। শেখ মুজিব পশ্চিম পাকিস্তান থেকে ফিরে এ ঘটনায় নিন্দা জানান। এর ফলে দেশের সর্বস্তরের মানুষ শোক প্রকাশ করে, যা তৎকালীন দৈনিক আযাদ পত্রিকায় এক সপ্তাহ ধরে বিবৃতির আকারে প্রকাশিত হয়। কালের পরিক্রমায় এই ঘটনাটি ছাত্ররাজনীতির ধারায় সহিংস প্রবণতার প্রভাব কতটা গভীর হতে পারে, তা তুলে ধরে। কিছুদিন আগেও বর্তমান ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি মেঘমল্লার বসু শহীদ মালেক হত্যাকাণ্ড গর্বভরে উপস্থাপন করে।
ডাকসু ১৯৭০
এই ডাকসু নিয়ে বেশকিছু তথ্য পাওয়া যায়। এবারই প্রথম সরাসরি নির্বাচন হয়েছিল। ছাত্রলীগ, ছাত্র ইউনিয়ন মতিয়া, ছাত্রসংঘ, বাংলা ছাত্রলীগ, এনএসএফ দোলন, এনএসএফ জমির, ডিএসএফ এতে অংশ নেয়। ছাত্র ইউনিয়নের (মেনন-ছাত্রলীগ) তিনটি শাখা (পূর্ব বাংলা বিপ্লবী, পূর্ব বাংলা, পূর্ব পাকিস্তান বড়ুয়া) এই নির্বাচন বর্জন করেছিল। তারা নির্বাচন বানচালেরও ব্যাপক চেষ্টা চলায়, বেশ কয়েকবার সংঘর্ষে লিপ্ত হয়।। এই নির্বাচনে মাহফুজ আনাম মহসিন হলে জিএস হয়। ছাত্রলীগ প্যানেল রব-মাখন জয়ী হয়।
১৯৭২-১৯৯০ঃ ডাকসুর তৃতীয় ধাপ এবং সন্ত্রাসের সিলসিলা
এই সময়কালে সাতটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ৭২-৭৩, ৭৩-৭৪ (পরবর্তীতে পণ্ড), ৭৯-৮০, ৮০-৮১, ৮২-৮৩, ৮৯-৯০, ৯০-৯১।
ডাকসু ৭২-৭৩
দেশ স্বাধীনের পর ৭২ সালের ২২শে মে এই নির্বাচন হয়। মূলত তিনটি প্যানেল এখানে অংশ নেয়। ছাত্রলীগের শহীদ-মনির, ছাত্রলীগ (রব) এর জিন্নত-মজলিশ এবং ছাত্র ইউনিয়নের সেলিম-মাহবুব প্যানেল। ভিপি নির্বাচিত হন ইউনিয়নের মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, জিএস হন মাহবুব জামান। ছাত্রলীগ (রব) প্যানেলকে বিপুল ব্যবধানে হারায় ছাত্র ইউনিয়ন প্যানেল, একটি সদস্য পদ বাদে বাকি সব পদেই তারা জয় পায়।
ডাকসু ১৯৭৯-৮০
এই নির্বাচনকে ঐতিহাসিক বলা যায় কারণ এটি স্বাধীনতা পরবর্তী প্রথম বৈধ এবং স্বীকৃত নির্বাচন, ১৯৭৯ সালের ২৪শে জুলাই অনুষ্ঠিত হয়। জাসদ ছাত্রলীগের মান্না-আখতার প্যানেল ভিপি-জিএস পদে নির্বাচিত হয়। ছাত্রলীগের ওবায়দুল কাদের ভিপি পদে দ্বিতীয়, ছাত্র ইউনিয়নের আকরাম হোসেন তৃতীয় এবং ছাত্রশিবিরের আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের চতুর্থ হন। এছাড়া আলী রিয়াজ (জাসদ) সাহিত্য সম্পাদক পদে নির্বাচিত হন। ছাত্রদলের সেলিনা আখতার রোকেয়া হলে জিএস এবং এস এম হলে ছাত্রশিবিরের ওমর ফারুক সাহিত্য সম্পাদক পদ পায়। এই সেশনেও ছাত্র ইউনিয়ন (মস্কোপন্থী) এর সন্ত্রাসী কার্যক্রম চলমান থাকে। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সম্মুখে ছাত্রশিবিরের নির্বাচনী মিছিলে তারা হামলা চালায়।
ডাকসু ১৯৮০-৮১
ধারাবাহিকতায় ১৯৮০ এর ১১ই নভেম্বর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এবারো মান্না-আখতার প্যানেল নির্বাচিত হয়, তবে তারা মূলত সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট বা বাসদ ছাত্রলীগকে প্রতিনিধিত্ব করে। ছাত্রদলের মিলন-কামাল, ছাত্রলীগের কাদের-চুন্নু, ছাত্রশিবিরের তাহের-কাদের, জাসদ ছাত্রলীগের মুনির-ফিরোজ, এবং ছাত্র ইউনিয়নের আনোয়ার-আকাশ প্যানেল অংশগ্রহণ করেছিল। ভিপি পদে মাহমুদুর রহমান মান্নার সাত্থে ওবায়দুল কাদের, আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের, গোলাম সরওয়ার মিলন, মুনির উদ্দিন, আনোয়ার উদ্দিন প্রতিদ্বন্দীতা করেন, নামের সিরিয়াল তাদের নির্বাচনী অবস্থানকেও নির্দেশ করে।
ডাকসু ১৯৮২-৮৩
এই বছরকে ছাত্রলীগের দূর্দিন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। গত দুই নির্বাচন থেকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল শিক্ষার্থীরা দলীয় ইমেজের চাইতে ব্যক্তির ইমেজকে প্রাধান্য দিচ্ছে। ১৯৮২তে বাংলাদেশ কয়েকটি ঐতিহাসিক ঘটনার চৌরাস্তায় দাঁড়িয়েছিল। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে খুন করা হল, শেখ হাসিনা দেশে ফিরে আওয়ামী লীগকে পুনরুজ্জীবিত করার সর্বোচ্চ চেষ্টা চলাচ্ছিল। বরাবরের মত নির্বাচনী তফসিলের পর বিভিন্ন প্যানেল ঘোষিত হল। নিজয়ী হল বাসদ ছাত্রলীগের আখতার-বাবলু প্যানেল। আখতারুজ্জামান এবং জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু। তবে আরো একটা কারণে এই ৮২’র নির্বাচন বেশ আলোচিত।
ছাত্রশিবির নির্বাচনকে সামনে এনাম-কাদের প্যানেল ঘোষণা করেছিল। নির্বাচনী প্রচারণার শেষ হবে ২১শে জানুয়ারী, রাত ১২টায়। সবাই যখন শেষ মূহুর্তের প্রচারণায় ব্যস্ত, তেমনই এক সময়ে ছাত্রশিবিরের একটি মিছিল হলপাড়া পেরিয়ে এফ আর গলের সামনে দিয়ে নীলক্ষেত অভিমুখে রাস্তায় দাঁড়িয়ে ছিল। হুট করে সেখানে ঠা ঠা শব্দ, কানে তালা লাগবার জোগাড়, চারদিকে কালো অন্ধকার, রাত তখন দশটা। মিছিলে কারা যেন গ্রেনেড ছুড়েছে! ন্যাক্কারজনক এই ঘটনায় ছাত্রশিবির ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হল। তোফাজ্জল হোসেনের বাম পা কেটেই ফেলতে হল। এছাড়াও উল্লেখযোগ্য আরোও কিছু নাম হল মতিউর রহমান মল্লিক, আজীজ মোহাম্মদ সাইফুল্লাহ, এবং ৩৫জন শিবিরকর্মী।
এই ঘটনার ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা গেল। বটতলায় ভিসি ফজলুল হালিম চৌধুরীর সভাপতিত্বে প্রতিবাদ সভা হল। ব্যাপক উপস্থিতির মাধ্যমে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষকগণ নিজেদের জোরালো অবস্থান জানান দিয়েছিলেন। একইসাথে অন্যান্য রাজনৈতিক-সামাজিক দলগুলোও সোচ্চার ছিল। এই ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় ছাত্রশিবির সে বছর ডাকসুতেও ভালো করে, একটি সদস্য পদ সহ বেশকিছু হলে অবস্থান পায়, ভোটের পরিমাণও বেড়ে যায়। ছাত্রদল এজিএস পদ পায়। ১৯৮২ সালে এরশাদ সামরিক শাসন জারী করায় জাতীয় রাজনীতির সাথে সাথে ছাত্ররাজনীতিতেও নিষেধাজ্ঞা আসে।
ডাকসু ১৯৮৯-৯০
এই নির্বাচনে ছাত্রলীগের নেতৃত্বাধীন সংগ্রামী ছাত্র ঐক্য বিজয়ী হয়। সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমেদ ভিপি এবং মুশ্তাক হোসেন জিএস হিসেবে দায়িত্বগ্রহণ করে। জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সংখ্যক ভোট পায়। ছাত্রশিবির হাজারখানেকের মত প্যানেল ভোট পায়।
ডাকসু ১৯৯০-৯১
এই নির্বাচনে প্রথমবারের মত ছাত্রদলের প্যানেল বিজয়ী হয়। আমান-খোকন প্যানেল সাত হাজার ভোট পেয়ে ভিপি-জিএস হয়। যথাক্রমে তিন হাজার এবং দেড় হাজার ভোট পেয়ে ছাত্রলীগ দ্বিতীয় এবং ছাত্রশিবির তৃতীয় স্থান অর্জন করে।
১৯৯১-১৯৯৬
এই সময়টি বাংলাদেশের রাজনীতির জন্য নানা কারণে ক্রিটিক্যাল। ১৯৯১ সালে তৎকালীন ভিসি মনিরুজ্জামান মিয়াঁ সন্ত্রাসবিরোধী সর্বদলীয় বৈঠক করেন। সেখানে উপস্থিত তৎকালীন সরকারের কৃষিমন্ত্রী মতিউর রহমান নিজামীর উপর ছাত্রলীগ, ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্রফ্রন্ট মিলে সম্মিলিত হামলা চালায়। ছাত্রশিবিরের কর্মীদের প্রচেষ্টায় তিনি রক্ষা পেলেও মারাত্মক ভাবে আহত হন।
এই সহিংস ঘটনার প্রেক্ষিতে ১৯৯১ এর ডাকসু নির্বাচন বন্ধ হয়। এরপর থেকেই বলা যায় শিবির সন্দেহে অকারণে ছাত্রদের মারধর, ধরপাকড়ের রাজনীতি চর্চা শুরু হয়, বিশেষ করে নামাযী, সহজ-সরল ছাত্রদের। একইসাথে ছাত্রশিবির কর্মীদের বিভিন্ন হল থেকে বের করে দেওয়াও শুরু হয়। এমনকি অমুসলিম কিন্তু দাড়ি আছে এরকম ছাত্রকেও পাশবিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়। কাউকে সন্দেহ হলেই সিগারেট-মদ পান করতে দেওয়া হত। এভাবে আরবী-ইসলামিক স্টাডিজের অনেক ছেলেরাই নির্যাতিত হত। যার ধারাবাহিকতা আমরা ২০১৯ এর ডাকসুর আগ পর্যন্ত ভালোভাবেই দেখেছি।
২০১৯ এর আগে এটিই ছিল শেষ ডাকসু নির্বাচন। এরপর ক্যাম্পাস হয়ে উঠল ক্ষমতার তাবেদার, যখন যারা ক্ষমতায় আসত তারাই হল দখলে রাখত, বাকিরা বিতাড়িত হত। নানা অজুহাতে ডাকসুকে আটকানো হত, তার পরিবর্তে পরিবেশ পরিষদের মত ভুঁইফোড় সংগঠনকে স্থান দেওয়া হয়েছিল।
১৯৯২-বর্তমানঃ চলমান সময়
ডাকসুকে ফেরানোর বহু প্রচেষ্টা এই সময়কালে করা হয়েছিল। ভিসি অধ্যাপক এমাজউদ্দিন আহমদ ১৯৯৪ এবং ১৯৯৫ এ দুইবার তফসিল ঘোষণা করেছিলেন, ছাত্রলীগের বিরোধীতায় সম্ভব হয়নি। পরবর্তী ভিসি এ কে আজাদ চৌধুরী ১৯৯৬তে বারকয়েক নির্বাচনের সময়সীমা ঘোষণা করেও ফলপ্রসূ করতে পারেননি। এরই মধ্যে ১৯৯৮ সালে ডাকসু কমিটি ভেঙে ফেলা হয়। এরপর ২০০৫ সালে ভিসি অধ্যাপক এস এম ফয়েজ ডিসেম্বরের মাঝেই নির্বাচনের ঘোষণা দেন, ছাত্রদলও ব্যাপক চেষ্টা চালায় তবে ছাত্রলীগের বিরোধীতায় আবারো পণ্ড হয়। ২০১২ সালেও বিক্ষোভ, ধর্মঘট, কালো পতাকা মিছিল, ইত্যাদির মাধ্যমে দাবী জোরালো হলেও ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। ২০১৭ সালে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মাঝে হাথাতির ঘটনাও ঘটে। তবে ২০১২তে কিছু শিক্ষার্থী উচ্চ আদালতে ডাকসু নির্বাচনের নির্দেশনা চেয়ে রুট করেছিলেন, তার সূত্র ধরেই আদালত বিশ্ববিদ্যালয়কে নির্দেশ দেয়। এরই প্রেক্ষিতে অনেক দেরীতে হলেও ২০১৯ ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
ডাকসু ২০১৯
২০১৯ এর ডাকসুর স্মৃতি আমাদের অনেকেরই জানা। এই ডাকসুর সবচেয়ে বড় অবদান এটাই যে ক্যাম্পাসে একটা সহনশীল পরিস্থিতি তৈরী হয়েছিল। ছাত্রলীগের দৌরাত্ম্য কমেছিল। এই নির্বাচনেও ছাত্রলীগ তাদের চিরাচরিত সন্নত্রাসী কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা রেখেছিল। ভোট প্রদানে বাধা, জোরপূর্বক সীল মারা, হুমকি-ধামকি সহ নানা ভাবে এই নির্বাচনকে বাঁধাগ্রস্ত করেছিল। তবুও সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের ব্যানারে নূরুল হক নূর ভিপি এবং আখতার হোসেন সমাজসেবা সম্পাদক হিসেবে নির্বাচিত হয়। এছাড়াও ছাত্রদল, প্রগতিশীল ছাত্রজোট, স্বতন্ত্র জোট, এবং ইসলামী শাসনতন্ত্র ছাত্র আন্দোলন পূর্ণাঙ্গ প্যানেল ঘোষণা করে অংশগ্রহণ করেছিল।
এইদিনের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হচ্ছে রোকেয়া হলে ভিপি প্রার্থী নূরের ছাত্রলীগ দ্বারা হামলার শিকার হওয়া। এর প্রতিবাদে স্বতন্ত্র জোট নির্বাচন বর্জনের চেষ্টা চালায়। আলোচনা-পর্যালোচনার পর নূর নিজের জোটের বিজয়ী পদগুলোতে সুষ্ঠু নির্বাচনের দোহাই দিয়ে ছাড়তে না চাওয়ায় সম্পূর্ণ নির্বাচনই এক প্রকার স্বচ্ছতার স্বীকৃতি পায়। নির্বাচন পরবর্তী পরিস্থিতিতে হাসিনার সাথে নূরের সখ্যতা যথেষ্ট আপত্তিকর ছিল।
এই হচ্ছে ডাকসুর মোটামুটি সংক্ষিপ্ত ইতিহাস। আবার ডাকসু নিয়ে আলাপ হচ্ছে। আগামী বছরের ফেব্রুয়ারীর শুরুতে অনুষ্ঠিত হবার ব্যাপক সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। আগামীর ডাকসু আমাদের জন্য ভালো কিছু নিয়ে আসুক।
0 মন্তব্যসমূহ