অন্তর্দ্বন্দ্বের সংঘাতঃ মকিংবার্ডীয় উছিলা
সাজ্জাদুর রহমান
১
আমরা পারসোনালিটি, ক্যারেক্টারাইজেশনকে আসলে কিভাবে দেখি? সহজ ভাষায় আমরা যে বলি ইন্ট্রোভার্ট, অ্যাম্বিভার্ট, ইত্যাদি ইত্যাদি জিনিসগুলোকে আমরা আপেক্ষিকতার দিক দিয়ে বিবেচনায় আনি নাকি নিজেদেরকে একটা পরিচয়ে আবদ্ধ করে যার মাধ্যমে সমাজে পরিচিত হওয়াটা, সোশ্যালাইজ করাটা সহজ হবে, ঝামেলা কম হবে সেটাকে বেছে নিই? উত্তর খুবই সহজ। এইটা নিয়ে ভাবারও কিছু নাই আসলে। ভাবার বিশয়টা এখানে যে পরিস্থিতিকে আমরা কিভাবে ডিফাইন করতেসি, একটা ঘটনার প্রেক্ষিতে আমাদের প্রতিক্রিয়া কিরকম হচ্ছে। এই জিনিসটা মূলত একটা ইন্টারেস্টিং ডিলেমা তৈরী করে। প্রশ্নটা রেখে যাই। ❝যদি বাতাস বিপরীতে বহমান থাকে তাহলে তো সেটা পরিবর্তনীয় নয়, তবে জাহাজের পালকে ঘুরিয়ে বাতাসের সাথে সমন্বয় করে গন্তব্যে পৌছুনো যায়।❞ এই বাক্যটা থেকে আপনি মর্মকথা হিসেবে কি নিচ্ছেন, ভেবে জানাতে পারেন।
২
এআইয়ের সাথে নানা বিষয়ে আলাপ করা আমার একটা নিত্য কাজ। বিভিন্ন এনালাইসিস থেকে শুরু করে কোনোকিছুকে সহজ ভাবে বুঝতে, বুঝাতে, টেক্সটবুকের কাঠখোট্টা ডেফিনিশন থেকে উঠে কমন ভাষায় পরিচিত হতে, গল্পের প্লট, প্রুফিং, অপিনিয়ন-কাউন্টার অপিনিয়ন, ইত্যাদি ইত্যাদি নানা কাজে এআই তড়িৎ ভূমিকা রাখে। এরকম অবস্থাতেই আজকে আমার যাবতীয় ইন্টারেকশনের বেসিসে জানতে চেয়েছিলাম কোন ফিকশনাল ক্যারেক্টারটা আমাকে রিপ্রেজেন্ট করে, সিমিলারিটি বেশী, স্পেশালী ক্যারেক্টারওয়াইজ। ইন্টারেস্টিং উত্তর পেলাম।
৩
মকিংবার্ডের গল্পে আসি। এরা শুধুই গান গায়, কারো ক্ষতি করে না, সাতে-পাঁচে থাকে না, কাজ গান গাওয়া, সঙ্গীর সাথে থাকা। মোটকথা, উপকারটাই দিচ্ছে, সুন্দর গান শুনাচ্ছে, নিজেও উপকৃত হচ্ছে গানের বদৌলতে সঙ্গীকে কাছে পেয়ে। কিন্তু সোশ্যাল স্ট্রাকচারে মকিংবার্ডের অনুরূপ হিসেবে একটা ঘটনা আনা যায়।
ধরেন, ছোট্ট একটা শহর, বাচ্চারা খেলাধুলা করে, দরজায় টোকা দিয়ে দৌড়ে পালায়, গাড়ি আসলে পিছে দৌড়ায়, লুকোচুরি খেলে, আড্ডা দেয়, ভয় দেখায়, ইশকুলে যায়, লজ্জা পায়, সবমিলিয়ে সুন্দর হাস্যোজ্জ্বল, প্রাণবন্ত এক সমাজ। বিভিন্ন জাতির বসবাস সেখানে। আমলারাও থাকে, দিনমজুরও আছে। এরকমই এক বাস্তবতায় এক দিনমজুরের নামে ধর্ষণ এবং মারপিটের অভিযোগ আসল এক আমলার পিওনের মেয়েকে নিয়ে। আদালত বসল, যুক্তিতর্ক হল। প্রমাণ হল দোষী মেয়েটাই, সাথে মেয়ের বাবাও, মারপিট সেই করেছে। তারপর জুরিরা বসল সিদ্ধান্ত জানাতে। ঘন্টার পর ঘন্টা গেল। উৎকন্ঠার মূহুর্তগুলো দীর্ঘায়িত হল। অবশেষে রায় আসল দোষী দিনমজুরই। বিচারকের উপর কথা চলে না। আপীল করার আগে এক এনকাউন্টারে তাকে মেরে ফেলা হল। জিঘাংসা তো গেল না, উন্মোচিত সত্যকে তো দাবানো যায় না, ভয় দেখায়ে থামানো যায়। তথাস্তু দিনমজুরের লইয়্যারের ছেলেমেয়ের উপর আরেকদিন সন্ধ্যায় আক্রমণ করল দোষী বাবা। অচ্ছুত প্রতিবেশী, যাকে নিয়ে সবাই ভয় পেত, ছেলেপেলেদের যার ভয় দেখিয়ে ঘুম পাড়াত, আতঙ্কে থাকত, তার সহায়তায় বাচ্চাগুলো বাচল তবে দোষী ছুরিকাঘাতে মারা গেল।
উপরের কাহিনীটা খুবই ছোট্ট করে ❝টু কিল আ মকিংবার্ড❞ উপন্যাসের কাহিনীর সারসংক্ষেপ।
৪
এখন কয়েকটা দ্বন্দ্ব নিয়ে কথা বলি। আপনি যদি ফিল্ম দেখেন, বই পড়েন একটা ইন্টারেস্টিং দ্বন্দ্ব হচ্ছে লাভ ভার্সেস ইন্টেগ্রিটির দ্বন্দ্ব। ভালোবাসা নাকি যথার্থতা! ভালোবাসা ফ্যামিলিকে, রেসপনসেবলিটিকে রিপ্রেজেন্ট করতে পারে, ইন্টেগ্রিটি প্রফেশনাল রেসপনসিবিলিটিকে নিয়ে আসতে পারে। কমন প্র্যাক্টিস হচ্ছে যে সবক্ষেত্রেই একজন রেস্পেক্টেড, ভ্যালুওয়ালা পারসনকে দেখানো হয় এবোভ অল ইন্টেগ্রিটিকে রক্ষা করতে। এখন জিনিসগুলো ভাইসভার্সা হতেই পারে, কোনোকিছুই স্ট্যাটিক না। সবকিছু মিক্স হয়ে জগাখিচুড়িও হতে পারে। এইটা শুধুমাত্র একটা কনসেপ্ট।
মকিংবার্ডে ছিলাম। অই অচ্ছুত প্রতিবেশী হচ্ছে আমাদের সমাজে মকিংবার্ডের প্রতিরূপ। এইটাকে কি সত্য বলা যায়? সত্য-মিথ্যার মাঝে আসলে ফারাক কতটুকু? পার্থক্যটা আমরা কিভাবে করব? এইযে নানা রকমের দ্বন্দ্বের মারপ্যাঁচ, এসবকে পাশ কাটিয়ে নিপাট সত্য পাওয়া আসলেই কতটুকু উপযুক্ত সমাধান হবে? মানুশকে ব্যক্তিগতভাবে না চিনে, না বুঝে আসলেই তাদের দ্বন্দ্বগুলোর সমাধান কিভাবে সম্ভব? এখানে প্রশ্নও আসে মানুশ আসলেই কতটুকু দোষী তা নির্ণয়ের সবচেয়ে যথার্থ মাপকাঠি এখনো এবং সবসময়ের জন্যই মানুশের বিবেক, এই বিবেককে আনবায়াসড রাখা আসলেই কি সম্ভব?
এইসবের একনিষ্ঠ উত্তর আসলে নাই। হয়ত থাকা উচিতও না। এইযে ফ্লেক্সিবল থাকাটা, নানা অপশন থাকাটা আমাদের মানুশ হিসেবে স্থান দেয় সমাজে। আমাদের কথা বলার জায়গা রাখে।
৫
তো এআইয়ের সাথে আজকের আলাপে বেশ মজাদার কিছু জিনিস পেলাম। একটা জিনিস ডিজক্লোজ করা যায়, আমার ক্লোজেস্ট ফিকশনাল ক্যারেক্টার হিসেবে বহু হিসাব নিকাশ, আলোচনার পর ❝অ্যাটিকাস ফিঞ্চ❞কে বাছাই করল। টু কিল আ মকিংবার্ডের মূল ক্যারেক্টার বলা যায়। আমিও দ্বিমত করছি না, আসলেই মিলছে। মিলছেটা বুঝলাম যখন দেখলাম আমাদের অন্তর্দ্বন্দ্বগুলো একই সারিতে যাচ্ছে দেখে। মানুশ একপাক্ষিক হয় না, হতে পারে না। প্রফেশনাল রেসপনসেবলিটি পালন করতে গিয়ে হয়ত আপনি আপনার বাবার বিরুদ্ধে মামলাও করবেন, কিন্তু তাকে যদি এনকাউন্টারে দেওয়া হয়, তখন আপনি হয়ত তার জন্য খুনী হতেও দ্বিধা করবেন না। তাই মানুশের মত দ্বন্দ্বগুলোও কমপ্লেক্স। যুক্তিতর্কে এক বিন্দুতে সরলরেখায় আনা যাবে না, চেষ্টা অযথা।
তবে ব্যালেন্স কাম্য সবখানেই। বাটারফ্লাই ইফেক্ট মেবি সবাই জানে। একটা ছোট্ট পদক্ষেপ, আচরণ, ব্যবহার, হাসি, কান্না সময়ের আবর্তনে ব্যাপক আকার নিতে পারে, যা ইতিহাসের গতিপথও পারে বদলাতে। মজার কথা বলি, সমাজের ধর্মই নষ্ট হওয়া, একইভাবে মানুশের কাজই হচ্ছে ধ্বংস করা নিজেকে, এরপরেও আমরা এত ব্যালেন্স করে আসলে কি করতে চাই? ওয়েল, উত্তর খুজে সময় নষ্ট করাও আরেকটা ধ্বংসাত্মক পদক্ষেপ।
৬
মকিংবার্ডকে নিয়ে আরোও আলোচনার সুযোগ আছে। করাও লাগবে। মানুশের ক্যারেক্টারাইজেশন আসলে কিভাবে হচ্ছে, পারসোনালিটি ডেভেলপমেন্ট, অন্তর্দ্বন্দ্বের পরিস্ফুটন, ভালোবাসা আর ইন্টেগ্রিটি কোথায় আর্গ্যু করতেসে সবকিছুই আসতে পারে। যেহেতু লিনিয়ার না কিছুই, তাই এদিক-ওদিক মিলিয়ে বিচ্ছিন্নরকম গুছালো আলাপ দেওয়া যাবে। এখানেও কথা থাকে যে আমাদের আশার সীমারেখা ঠিক কোথায়? কোথায় থামতে হবে এইটা যদি আমরা জেনে যাই, বুঝে ফেলি তবে আমরা কিভাবে ফুল পটেনশিয়াল বাবলে যাব? আবার যদি না থামতেই হয়, তবে ধ্বংস বাস্তবতা থেকে মুখ ফেরানো কি যাবে?
৭
ওয়েল, মকিংবার্ডীয় আলাপ এখনো বাকি। ধরতে পেরেছেন কিনা জানি না, মকিংবার্ড মূলত এখানে সমাজের "আদার" শ্রেণীকে বলা হয়েছে। যারা ভালনারেবল, যাদের পক্ষে মিডিয়া নাই। যাদের দ্বন্দ্ব মূল পরিসরে স্থান পায় না, তাদের ভাষা সার্বজনীন হতে পারে৷ না, যাদের আদারিং বা অপরায়ন করে রাখা হয়। তাদেরকে সহজেই যেকোনো কিছুর শিকারে পরিণত করা যায়। এবং সেটা সবার সম্মতিতে গ্রহণযোগ্যতাও পায়। এই পয়েন্ট অব ভিউটা আমাদের দেখায় যে এবসলিউট ট্রুথ বলতে আসলেই কিছু আছে কিনা! পারসেপশন বায়াসে আমরা কতটা আক্রান্ত!
এইখানে তাহলে দেখাই যাচ্ছে সত্যটাও এক্সপেরিয়েন্স বেসিসে কাজ করে। পারসেপশন তো এক্সপেরিয়েন্স এবং এনভায়রনমেন্ট এর প্রভাবেই তৈরী হয়। বিচারকের পারসেপশন অথবা এক্সপেরিয়েন্সের সাথে যার আপীল, স্টোরি সর্বোচ্চ সিমিলারিলি, রিসেম্বলেন্স রাখতে পারবে বিচারক তাকেই কে বিচারের মঞ্চে বেনেফিট অব ডাউট দেবেন তাতো বলার অপেক্ষা রাখে না! ট্রুথ সাবযেক্টিভ নাকি অবজেক্টিভ এই দ্বন্দ্বের সুরাহা কই?
ওয়েল, এখন থামি। শেষমেশ তো উত্তর একটাই, যা হবার হবে, হোক। দেখা যাবে। শুভকামনা।

0 মন্তব্যসমূহ