মৃত্যুর ফিলোসফি এবং এস্থেঠিকতাঃ উছিলা নিনাদ
সাজ্জাদুর রহমান
মৃত্যুর মত সুন্দর, কথাটাতে ঠিক ধরণের বার্তা আপনারা পান? এখানে কি মৃত্যুকে মহিমান্বিত করা হল, নাকি সৌন্দর্যকে একটা নির্দিষ্ট সীমানায় আটকে সংজ্ঞায়ন করা হল? এইখান থেকে এরকম কথাও তো আসতে পারে মৃত্যু ঠিক কখন সুন্দর হয়! আবার, মৃত্যুর যদি একটা সুন্দরতম রূপ থাকে, তবে তো এটার একটা বিশ্রী রূপ থাকাটাও যৌক্তিক! মৃত্যুকে আমরা পূর্ণতার প্রতিরূপ ধরি। পূর্ণতাকে সুন্দর বলা তো যায়। কোনোকিছু স্বীয় বিভবে, মর্যাদায়, সৌন্দর্যে যদি প্রতিষ্ঠিত হতে পারে তবে সেটাকে মহিমান্বিত করতে বা বলতে তো বাধা নাই।
খোয়াবনামা পড়ে যখন পর্যালোচনা করলাম, বলেছিলাম আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের চাইতে মৃত্যুকে কেউ সুন্দর ভাবে বর্ণনা করতে পারে নাই, পারবে না। লেখা পড়তে পড়তে এক অজানা বিষন্নতা ছেয়ে যায় মনজুড়ে, এক নিস্তব্ধতা মাথায় ভর করে, নিভু নিভু মোমের মত চোখদুটোও নির্মিলিত থাকে। বেদনাটা যেন শরীরের সাথে মিশে যায়, অসাড়তা চলে আসে মগজে, মনে হয় এই বুঝি এল চরম পূর্ণতা, এই বুঝি ডাক এল অনন্তকালে যাত্রার! মৃত্যুকে পড়াতে এক আনন্দ আছে, তবে আলিঙ্গন করাতে আছে পূর্ণতা।
আবার, আল-মাহমুদের কবিতাটা মনে পড়ে যায়। "অনন্ত মহাকালে মোর যাত্রা অসীম মহাকাশের অন্তে"! এটাই কি মৃত্যু! অসীমের পানে যাত্রা করে কিভাবেই বা পূর্ণতার আখ্যান গাওয়া যায়! মৃত্যুতেও যদি বিশ্রাম না আসে, তবে আমাদের এই জীবনের চিরন্তন ছুটে চলা শুধুই সসীম থেকে অসীমে আবারো নিরন্তর ছুটে চলার প্রস্তুতি মাত্র! কি ভয়াবহ, নিষ্ঠুর, করুণ এই ছুটে চলা, যার শেষ নাই!
আমি মৃত্যুতে পূর্ণতা খুঁজে পাওয়া মানুশ। নানা গল্প-কবিতার উপসংহার টানতে গিয়ে হরদম আমি মৃত্যুকে আলিঙ্গন করাতাম, উত্তম হিসেবে বেছে নিতাম, মৃত্যুর ভালোবাসায় চরিত্রকে সাজাতাম। মৃত্যু এক অমোঘ পরিণতি, পালানো তো যায় না। আমার আন্দোলনের কথা মনে পড়ে। সাবলীল ভাবে নির্দ্বিধায় আবু সাঈদদের বুক টানটান করে দাঁড়ানো, গুলির আওয়াজে পিছু না হটে দুই কদম আগায়ে যাওয়া, মানুশরূপী আযরাঈলদের চোখে চোখ রেখে কথা বলা সবই কেমন কেমন করে একা একাই হচ্ছিল। মুখ দিয়ে কিভাবে বের হচ্ছি তেজস্বী স্লোগান, আমরা মৃত্যুকে বরণ করতে এসেছি, আমরা একজন গেলে দশজন আসবে, আমরা কয়েক শতগুণ হয়ে ফিরে আসব! কি অদ্ভুত, কি মায়া, কি এক উচ্চকিত নীরবতা! যে শব্দে সাত আসমান উত্তাল হয়, পাহাড় বেয়ে খুন ঝরে, সাগর লোহিত হয়, আর মানুশ হাতে হাত ধরে দৃপ্ত পদক্ষেপে মৃত্যুকে ভালোবেসে আলিঙ্গন করে।
নিনাদ পড়তে গিয়ে কি আমি মৃত্যুকে নতুন আঙ্গিকে দেখলাম? না। নিনাদকে কি একগাদা মৃত্যুর উপাখ্যান বলব? সেটাও নয়। আমার শুধু মনে হয়েছে নিনাদ মৃত্যুকে উদ্দেশ্য দিয়েছে। এখানে এসে মৃত্যু বিভিন্ন রূপে নিজেকে মহিমান্বিত করেছে। নিজেকে পূর্ণতা দিয়েছে আর মানুশকে দিয়েছে হতাশা, আক্ষেপ, অনুশোচনা, কিংবা অনেকগুলো মৃত্যু। মৃত্যুকে চাইলে হাসিমুখে অভ্যর্থনা জানানো যায়, চাইলে ভয়ে কুকড়ে থাকা যায়, চাইলে অবিশ্বাস করা যায়, চাইলে বিশ্বাসীও হওয়া যায়। সব ছাপিয়ে মৃত্যুকে তো পরম আনন্দও বলা যায়। খোদার সাথে মোলাকাত, তার নিজ হাতে বানানো বাগানে হাটাহাটির সুযোগ মৃত্যুই তো এনে দেয়।
জানো মদিরাক্ষী, আমি খুব ছোট্ট কিছুর জন্য একদিন মারা যাব।
গাছের ডালে থাকা ছোট্ট পাখিটার জন্য,
কিংবা জ্যামে আটকে থাকা সাইকেলের ক্রিং ক্রিং এর জন্য।
আমি পথের ধুলোবালিতে মিশে আরেকদিন হারিয়ে যাব,
মাঠের পর মাঠ পেরিয়ে অতলান্তিকে তলিয়ে যাব,
বৃদ্ধ মাঝির শ্যোন নযরে আলতো করে লুকিয়ে রব।
জেনে রাখো, আমি একদিন খুউব ছোট্টকিছুর জন্য মারা যাব।
চৌঠা সেপ্টেম্বর, দুইহাজার চব্বিশ
সাজ্জাদুর রহমান
0 মন্তব্যসমূহ