লেখা তরজমা

সিম্বলিজম, কালচার, মনস্তত্ব, এবং জাতীয় সঙ্গীত

সিম্বলিজম, কালচার, মনস্তত্ব, এবং জাতীয় সঙ্গীত 


দেখেন, আলাপটা জাতীয় সঙ্গীত নিয়েও না। দেশের এই পরিস্থিতিতে জাতীয় সঙ্গীত নিয়ে হাউকাউ করা কোনো কাজেরই না এইটা সবাই বুঝতেসে। তারপরেও সবাই করতেসে। আমিও কিছু বলব না বলব না ভাবতে ভাবতে আইসা এইটা এখন লিখতেসি। এনিওয়ে, আলাপটা হচ্ছে জাতীয় সঙ্গীত বলেন, পতাকা বলেন, প্রতীক বলেন সবই একেকটা সিম্বল, দেশের পরিচয়কে বহন করে। এইগুলা সবসময়ই যে শতভাগ জন-আকাঙ্ক্ষাকে ফুটাইয়া তুলবে সেটাও না, পরিবর্তনের দাবী সবসময়ই আসবে, আসছেও। 

যেমন, আমাদের দেশের নাম হইতেসে "পিপলস রিপাবলিক অব বাংলাদেশ"। এখন বলেন তো রিপাবলিক অর্থ কি? গুগল করবে প্রজাতন্ত্র পাইবেন, পাইবেন সাধারণতন্ত্র, এইসেই। রিপাবলিক কনসেপ্টটা এখন বুঝতে কোশেশ করেন। এইটা এমন একটা ব্যবস্থা বুঝায় যেখানে জনগণ সার্বভৌমত্বের মালিক, তারা নিজেদের প্রতিনিধি নির্বাচন করে যে কিনা নির্বাহী ক্ষমতা পায়, নির্বাচিত প্রতিনিধির একজন এম্পেররের মত ক্ষমতা থাকে না। তো, এই সংজ্ঞার সাথে প্রজাতন্ত্র শব্দটা যায়? এইটা তো বহুদিনের বিতর্ক যে দেশের নামের অনুবাদটা পাল্টাইতে হবে। নামটা হইতে পারত "জনগণতান্ত্রিক বাংলাদেশ", এইরকম প্রস্তাবনাই আসছে সময়ে ঘুরেফিরে। 

ফ্যাসিবাদী চেতনা নিয়ে আগে কিছু কথা বলসিলাম। এইটা কেম্নে মানুশের মনে জেকে বসে আছে, কেম্নে দূর করা যাবে বলতে চেষ্টা করসিলাম। ফ্যাসিবাদী চেতনা আমাদের মধ্যে এমনভাবে বিস্তৃত যে মানুশ নিজকে এবং অন্যকে আলাদা সত্ত্বা হিসেবে কবুল করতে পারতেসে না। সে তার বিপক্ষে আসা প্রতিটা কথাকেই ভাবতেসে "এই বুঝি সব গেল" টাইপ সিচুয়েশন। আপনি মুখে বলতেসেন সবাইকে স্পেইস দিবেন, সবার কথা শুনবেন, সমাজে সহাবস্থান জারী রাখবেন, কিন্তু মগজে এইটারে মানতে পারতেসেন না। দেখেন, একতা এমনি এমনি তো আসবেও না কখনো, একতা তৈরী হয় একটা জনপদে কিছু নির্দিষ্ট বিষয়কে সামনে রেখে। এখন সেই একতাটা আসার মত দুইটা বড় ধরণের স্পেসিফিক কারণ (ফ্যাসিনার আর দোসরদের বিচার, জুলাইকে সংরক্ষণ, দেশ সংস্কার) থাকার পরেও যখন এরকম আজাইরা ঝামেলা লাগায়ে বিবাদ বাড়াইতেসেন, তখন আমরা আসলেই বুঝি যে যারা এইসব করতেসেন তারা মূলত ফ্যাসিবাদেরই দোসর, ঘাপটি মাইরা আছেন, আপনাদের কাছে আগের স্বাধীনতাই ভালো ছিল। কথাটা কালচাড়াল ফ্যাসিস্টদের বললাম। 

উপরে সিম্বল নিয়ে যেটা বলতে চাইতেসিলাম, রাষ্ট্রীয় সিম্বল এক ধরণের সম্মিলিত স্পিরিট ধারণ করে। যেইটা বিভিন্ন পরিস্থিতি জনগণকে উজ্জীবিত করে, দেশাত্মবোধক চেতনাকে বাঁচায় রাখে, দেশের সবাইকে এক জায়গায় কানেক্ট করে। এইজন্যই এইসব গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান জাতীয় সঙ্গীত চেঞ্জ হওয়াটা তো আজকের আলাপ না। এই আলাপ ৭৫ থেকেই হচ্ছে, খন্দকার মুশতাকও এই আলাপ তুলসিল, প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানও তুলসিলেন। জনপরিসরে এইসব কথাবার্তা সবসময়ই চাউর ছিল। এইটা এখন এইসব কালচাড়ালদের গায়ে লাগসে কারণ কথাটা ওপেনলি আসছে আমান আযমীর মত মানুশ থেকে। কালচাড়ালদের গায়ে লাগসে কারণ তারা দেখতেসে ব্যক্তিত্ববান, বোল্ড, আসল, মানসিকভাবে সুস্থ, স্বাধীনচেতা মানুশেরা নিজেদের মতকে প্রকাশ করতে পারতেসে। তাই কালচাড়ালরা ভাবতেসে সবই তাদের হাতছাড়া হইতেসে হয়ত। তাদেরকে, তাদের তৈয়ার করা ৫০ বছরের চেতনা ইন্ডাষ্ট্রিকে কেউ খাইতেসে না, থুথু দিচ্ছে। 

ইদানীং কিছু আওয়ামী দালালরা দূরে বসে আরেকটা বয়ান ছড়াইতেসে যে আয়নাঘর আসলেই ছিল কিনা! দুনিয়ার ইতিহাসে এরকম একটা জিনিস আপনি দ্বিতীয়টা পাইবেন না। দুনিয়াজোড়া কাউরে দেখসেন আবু গারীব নিয়ে মশকরা করতে? কিংবা গুয়ান্তানামো নিয়ে? ইহুদী কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প নিয়ে মশকরা তো দূর কী বাত কথাবার্তা বলতেও তিনপা পিছানো লাগে। অথচ এই কালচাড়াল ফ্যাসিস্টরা এরকম চাক্ষুষ প্রমাণ, মানুশদের দেখেও এরকম ঊনমানুশী কাজ করতেসে। তাই আমিও কবিতায় লিখসিলাম, এইসব ফ্যাসিস্টদের স্বাধীনতাকে আমি ইনকার করি। বছরের পর বছর উচ্ছিষ্ট খাইতে খাইতে এখন তাদের বমি করার মত পরিস্থিতিও নাই, তারপরেও ভাবতেসে সামনে যখন আছেই আরোও কয়েকটা ঢুকাই পেটে। 

সিম্বলের আলাপে ফিরি। আমার সোনার বাংলাতে আসেন। প্রথমত, এইটা জনমানুশের আকাঙ্ক্ষার প্রেক্ষিতে নির্বাচিত জাতীয় সঙ্গীতও ছিল না। মুক্তিযোদ্ধাদের একবার এইটা গাওনের ভিডিও থাকলে ওদের আযান, কুরআন তেলাওয়াতের হাজারটা বয়ানও আছে। আপনারা তাইলে আযানরে কেন বাংলা সংস্কৃতির অংশ মানতে পারেন না? আমার সোনার বাংলা গানটা এই আন্দোলনেই কারা ব্যবহার করসিল বলেন তো দেখি? এই কালচাড়ালরাই টিভি ভবনে গিয়া গাইসিল মাইকে। বঙ্গভঙ্গের ইতিহাসে নাই গেলাম, সবাই জেনে গেসেনই মোটামুটি। এইসব কালচাড়ালরা মূলত রবীন্দ্রনাথরে খোদা ডাকে, সকালে-রাতে দুইবার করে রঠার ছবিতে ফুল দেয়। তাই রঠার লেখারে ভাবে ধর্মগ্রন্থ, পূজ্যতম, অবিসংবাদিত, অপরিবর্তনীয়। তাই এরা রঠার পক্ষে জনমানসকেও ইনকার করে, কারণ প্রভু না থাকলে তারা মাযার চালাবে কার নামে!

বারবার সিম্বলের আলাপটা থেকে দূরে চলে যাইতেসি। গানটার কথাগুলাই দেখেন। আপনার মা আক্রান্ত হইলে আপনি কোন দুক্ষে নদীর কূলে বইসা গিয়া কান্নাকাটি লাগাবেন? গায়ে-গতরে শক্তি নাই? ঘটে বুদ্ধি নাই? প্রতিরোধটাও করতে পারবেন না? এইযে ছোট্ট পোলাপানগুলা অন্তত বারটা বছর এইটা রেগুলার গাইতেসে ক্লাস শুরুর আগে, তারা যে এই কুসুম কুসুম প্রতিবাদের দীক্ষা পাইতেসে, কান্নাকাটি করতে চাইতেসে, এইটাই হইতেসে এইসব ফ্যাসিস্টের জন্য শুভ। তারা সব চাপায়ে দিতে

পারে নির্দ্বিধায়, তারা নিজেদের মেইনস্ট্রীম এলান কইরা সব দখল করতে পারে এইসব কুসুম কুসুম অবস্থার কারণেই। একটা রাষ্ট্রীয় সিম্বলের ভাষা এতটাই যদি দূর্বল থাকে, একইসাথে সেটা বরাবর ফ্যাসিস্টের সহযোগী ভাষাতে রূপ নেয়, যেই সিম্বল গেয়ে গেয়ে কালচাড়ালরা আহবান জানায় জনগণের উপর গরম পানি ঢালতে, মেরে ফেলতে সেইটাকে রাখার যৌক্তিকতা, লেজেটিমেসি থাকে না। নতুন বাংলাদেশের যাত্রায় আপনি কুসুম কুসুম ফ্যাসিবাদকে বাচাইয়া যদি রাখেন, খোলস ভাইঙা একদিন জ্যান্ত প্রাণীও বের হবে। তখন আবার ঘেরাটোপে পড়বেন। এই বাঙাল জনপদ আবার ২০ বছরের বেশী আন্দোলন-অভ্যুত্থান ছাড়া থাকতে পারে না। 

জাতীয় সঙ্গীত শুনতে চাইলে আলজেরিয়ারটা শুনেন। ফার্স্ট রিকমেন্ডেশন। ফ্রান্স, পাকিস্তান, আমেরিকা, সাউথ আফ্রিকা, তুরস্ক, ইরান, ইরাক এইগুলাও চাইখেন। 

যাক, এইসব পরিবর্তনের আলাপ এখন না। নির্বাচিত সরকার আসলে হয়ত হবে, হয়ত হবে না। সবসময়ই চেষ্টা করা হয়ে আসতেসে, সাম্নেও হবে, হতেই থাকবে। যা অবশ্যম্ভাবী তা হবেই। 

অগোছালোভাবে অনেককিছুই বলতে চাইসি। এখন দেখেন আপনারা যা ভালো মনে করেন।


চৌঠা সেপ্টেম্বর, দুইহাজার চব্বিশ

সাজ্জাদুর রহমান

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ