লেখা তরজমা

জুলাইয়ের স্মৃতি - ৩৬শে জুলাই

কথাবার্তা হচ্ছিল আগস্টে ২০২৪ এর ৪-৫ তারিখ রাতে কি করতেসিলাম, কি চিন্তা করতেসিলাম সেসব। ভাবলাম এক্টু-আধটু লিখে ফেলি। 

৪ তারিখ গাজীপুরেই ছিলাম। আশেপাশে কথাবার্তা বলে, খোজটোজ নিয়ে মোটামুটি বুঝা গেল এইদিন গাজীপুর সদর এরিয়ায় একটা বড়সড় জমায়েত করা যাবে। যদিও বিভিন্ন গ্রুপের মাঝে সমন্বয়হীনতা ছিল, তবুও মোটামুটি ফিক্সড হল যে ১১টায় শিববাড়ী মোড়ে থাকবে সবাই। যাক, সেখানেও কাহিনী হল অনেক। দিনের শুরুতেই ছাত্রলীগের ধাওয়ায় আটকা পড়লাম ককটেল থেকে বাঁচতে, পুলিশের দাঁড়ায়ে থাকা দেখলাম, অবশেষে পালটা ধাওয়া দেওয়াও হল, মোটামুটি ১১:৩০ এর মধ্যে অন্যরাও চলে আসল। স্লোগান শুরু করলাম, পুলিশও লাইনে চলে আসল, সমর্থন দিল। প্রচণ্ড বৃষ্টিতে ফোন-টাকা সব ভিজে একাকার। মোবাইল নেটেও ঝামেলা হচ্ছিল ভালোই। যাইহোক, ৫টার মধ্যে গাজীপুর মোটামুটি প্যাক আপ করল ওইদিনের আন্দোলন। 

ওয়াইফাইও ঝামেলা করছিল ওইদিন। কোনো আপডেটই ঠিক টাইমে পাওয়া যাচ্ছিল না। ৪টার দিকে জানলাম পরবর্তী দিনের কর্মসূচি। ৫টার পরেই যে ওইটাকে চেঞ্জ করা হয়েছিল এইটা গিয়ে জানতে পেরেছিলাম রাত ৮টারও পরে। তখন রাগে-দুক্ষে-ক্ষোভে একটা কথাই ভাবতেসিলাম আগামীকাল ঢাকা পৌছাব কিভাবে! 

এইসবের ভেতরেও একটা তীব্র মনোবল জেগে ছিল, কনফিডেন্স পাচ্ছিলাম ৫ তারিখ হবে কিছু একটা। আমার কথাবার্তায় সেসব প্রকাশও পাচ্ছিল, আজকেই জানলাম। আমিও চাইতেসিলাম যত বেশি পারা যায় মানুশকে অংশ নেওয়াইতে, সবাইকে নামাইতে রাস্তায়। এইতো, ৫ তারিখে ফজর পড়েই ঢাকার জন্য বের হয়ে গেছিলাম। 

এখন তো সময় পাচ্ছি না। লেখার মত এতকিছু আছে, যদি উপন্যাস লিখতে চাই, টুইস্টের অভাবও থাকবে না। আল্লাহ আমাকে সেই তাওফীক দিক।


বিজয়ের ক্ষণে


মার্চ টু গণভবন সবার জন্যই ছিল আনন্দের, মুক্তির, বিজয়ের, স্বাধীনতার! এক দুঃসহ যাতনায় আমি বারবার পিছিয়ে পড়ছিলাম, পা টলছিল, মনে  হচ্ছিল কি যেন রেখে এসেছি, কি যেন ফেলে এসেছি, কি যেন কি যেন! 

৩৬শে জুলাই বাদ ফজর থেকে শহীদ মিনারে লোকজনের আনাগোনা দেখা যায়। একে একে আসছে, ছোট থেকে বড়, কেউ হেঁটে, কেউ সিএনজিতে, কেউ রিকশায়! সবার একটাই উদ্দেশ্য, চোখের মুক্তির আশ্বাস, হাতে দৃপ্ত স্বাধীনতার ঝাণ্ডা, মুখে স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনার শপথ! এরই মধ্যে হুট করে পুলিশ এসে গুলিই ছুড়ল! আশাতীত বৈকি, অপ্রত্যাশিত নয়! সাউন্ড আর স্মোক গ্রেনেড, আর লাঠি, বুলেটের উপর্যুপরি আক্রমণে ছত্রভঙ্গ হয়ে সবাই মেডিকেল পানে ছুটলাম। পুলিশ মেডিকেল ঘিরে ফেলল, সাথে আহত করল পাঁচ থেকে ছয়জনকে। একজনের প্রাণও কেড়ে নিল পুলিশের ছুড়া ঘাতক গুলি! ঘাড়ের উপরেই লেগেছিল, খোদা পরওয়ারদিগার তাকে কবুল করলেন৷ 

অবস্থানের এক পর্যায়ে পুলিশ যখন মেডিকেলের চতুর্দিকেই অবস্থান নিল, আমরা প্রতিরোধের চেষ্টা করলাম। টিয়ারশেল, গ্রেনেড, বুলেটের বিপরীতে খালি বুক আর ইট দিয়ে! একের পর এক টিয়ারশেলে আমরা যখন পর্যুদস্ত, বারবার গুলির সম্মুখে সিনাটান করে তখনো আমরা দাঁড়িয়ে ছিলাম। উজবুক হানাদারদের তা সহ্য হবে কেনো! তারা তো খুনের নেশায় মত্ত, তারা নিঃশ্বাসহীন দেহ দিয়ে বিজয়কে মাপে। আমাদের কাছে তো শাহাদাত পরম আরাধ্য, আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ! স্নাইপারের ছুড়া শট আমার চারজন ভাইকে হত্যা করল! 

তখন স্বাধীনতা থেকে ঘন্টাখানেক দূরত্বেই ছিলাম! 

যখন শাহবাগ হয়ে পদচলা শুরু হল, আমি বারবার ফিরছিলাম পেছনে। ফেলে আসা ভাইদের খুন, আহতদের আহাজারী আর করুণ চোখকে উপেক্ষা করার সাধ্য আমার ছিল না, আমার নেই তাদেরকে ফিরিয়ে আনার সামর্থ্যও। শুধু গুণগুণ করে গাইলাম, 


❝মুক্তিরও মন্দিরও সোপান তলে

কত প্রাণ হল বলিদান

লেখা আছে অশ্রুজলে!

-------------------

তারা কি ফিরিবে এই সুপ্রভাতে

যত অরুণ তরুণ গেছে অস্তাচলে!

মুক্তিরও মন্দিরও সোপান তলে।❞

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ