আন্দোলনে ব্যাপক জনসম্পৃক্ততার পেছনে আমি মোটাদাগে কয়েকটা কারণ বলব। আমার ময়দানের অভিজ্ঞতা আর অন্যান্যদের আলাপের ভিত্তিতে।
১/ আন্দোলনের অরাজনৈতিক মুখ এবং স্বতঃস্ফূর্ততা
এইটাকে প্রথমে রাখার পেছনে আমার নিজের ভেতরেও দ্বন্দ্ব ছিল। এইটা সত্য যে অন্তত ৭০% লোকই জানত না বা বুঝতে পারে নাইরি আন্দোলনের পেছনের রাজনৈতিক দলগুলোর স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি, কমান্ড গ্রহণ, আন্দোলনকে পুনরুজ্জীবিত করা, ইত্যাদি। আন্দোলনের মুখগুলাও যে ছিল পরিপূর্ণ পলিটিক্যাল এইটাও অধিকাংশ ধরতে পারসে ৩৬শে জুলাইয়ের পরে। এইটাও আকাট সত্য যে আগেকার পলিটিক্যাল রাইজিংগুলাতে মানুষগণ স্বচ্ছন্দ ভাবে অংশ নিত না। আওয়ামী রেজিমে সবসময়ই এমন হয়ে আসতেসিল। প্রতিটা আপরাইজিং হয়ে যাইত একটা একক গোষ্ঠীর আন্দোলন, গণমানুশের কর্ণকুহরে এইসব তোয়াক্কা পাইত না। আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট হইতেসে যে আন্দোলনের মুখগুলার কোনো ধরণের মাদার পলিটিক্যাল অর্গানাইজেশন ছিল না। তাই এরা আরোও বেশী অরাজনৈতিক ভাবে মিডিয়া, গণমানুসজের সামনে আসতে পারসে, স্বৈরাচার হাসিনাও ট্যাগিং রাজনীতিতে সুবিধা করবার পারে নাই।
২/ আন্দোলনের সিম্বলিজম
এইটাও প্রথমে আসার মত যথেষ্ট দাবী রাখে। প্রতিটা অভ্যূত্থানের সফলতার পেছনে সিম্বল সিগ্নিফিক্যান্ট ভূমিকা রাখে। ঊণসত্তরে আসাদ, নব্বইয়ে নূর হোসেন এরা আমাদের প্রতিষ্ঠিত সিম্বল ছিল। সিম্বল মানুষই হইতে হবে কথা নাই। চব্বিশে সিম্বল হিসেবে আবু সাঈদ, মুগ্ধের অবদান সবচেয়ে বেশি, এরা সব শ্রেণী-বর্ণ-পেশা-গোত্রের মানুশকেই ইনফ্লুয়েন্স করসে। তারমানে এইটা না যে অন্যান্য শহীদরা অপাংক্তেয়। আন্দোলনের পরিচায়ক, ডিসাইডিং সিম্বল হিসেবে এরা অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ হইয়া উঠসিল।
ছয় সমন্বয়ক যখন গুম ছিল ডিবি অফিসে, তখন হান্নান মাসুদ, রিফাত রশিদ আর মাহিনের মুষ্টিবদ্ধ হাতের যেই ছবিটা এইটাও একটা ইম্পর্ট্যান্ট সিম্বল ছিল, যা লোকেদের ইনফ্লুয়েন্স করসে, ময়দানে নিয়া আসছে, ঝাপাইয়া পড়তে দ্বিধা ছাড়াইসে। এই জিনিসগুলা মানুশজন নিজেদের সাথে মিলাইতে পারসে, নিজেদেরকে অংশীদার করসে এক বৃহত্তর স্বার্থের।
৩/ অনুশোচনা, পাপবোধ, ঘৃণা
এই তিনটা জিনিস মানুশের ব্যক্তিগত আর সামাজিক লাইফেও জটিল আকার ধারণ করতে পারে। বছরের পর বছর ধইরা চলা স্টিমরোলার, স্বাধীনতা হরণের আক্রোশ৷ মুক্তি পাওয়ার বাসনা, কথা বলার তীব্র আকাঙ্খা, বাঁচতে চাওয়ার ইচ্ছা এইসবও হয়ত কোনোভাবে দায়ী ছিল।
এখানে কথা হইতেসে যে, এইসব আগে হয় নাই কেন? ৭ই জানুয়ারীর অবৈধ নির্বাচনের সময়েও তো হয় নাই। এখন হুট করে কিভাবে হতে পারে! বিস্তারিত যাব না, মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যায় যাব না, উপরে থাকা দুইটা কারণও এইটারর উৎপাদনের জন্য দায়ী। ডিটেইলসে আরেকদিন যাওয়া যাবে।
৪/ আন্দোলনের ভাষা
অন্যান্য আন্দোলনের চাইতে এইটার ভাষাগত ভিন্নতা সবখানেই পরিলক্ষিত হইসে। এইটাকে শুরু থেকেই প্রেজেন্ট করা হইসে একটা ইনক্লুসিভ আন্দোলন হিসেবে। সবার জন্য স্কোপ রাখা হইসে। অবরোধের বদলে ইউজ হইসে ব্লকেড, হরতালের বদলে মার্চ, গায়েবানা জানাযা, কফিন মিছিল হইসে, আরোও বিভিন্ন পন্থায় প্রতিটা কর্মসূচির নামকে ইউনিক রাখা হইসে। এইটা জনমামুশের কাছে নতুন তো ছিলই তাই তাদেরকে আলাদাভাবে নাড়া দিতে পারসে। বারবার ব্যবহৃত জবরজং শব্দগুলো যা মানুশদের কানেক্ট করতে ব্যর্থ হইসিল সেসবকে কেয়ারফুলি সরায়ে রাখা হইসিল।
তবে মনে রাখতে হবে শুধু নাম বা কথাই ভাষা না, ভাষা হচ্ছে আচরণ, ব্যবহার, এটিচ্যুড, আর আকাঙ্খা। আগের কারণগুলাও কানেক্টেড।
৫/ নেতৃত্বের অনড় মানসিকতা
এইটার কথা আর কি লিখব, সবাই জানিই আমরা। বারবার গুম হবার পরেও তাদের কামব্যাক, জনগণের ফ্যাশিস্টের ভাষা বুঝতে পারা এবং সেগুলোকে ইনকার করা, দ্বিধাহীন সমর্থন এইসবই আমরা দেখেছি। আশাকরি ডিটেইলস লেখাটায় এইগুলো নিয়ে আরো ব্যাপকভাবে লিখতে পারব।
0 মন্তব্যসমূহ