লেখা তরজমা

জুলাই ভাবনা - ০৪ (স্মৃতি সংরক্ষণ)

জুলাইকে গণপরিসরে বিদ্যমান রাখা, মানুশের স্মৃতিতে বাচায়ে রাখা আমাদের পয়লা প্রায়োরিটি হিসেবে থাকা উচিত। বাংলাদেশের এখনকার একটা মূল সংকট হচ্ছে একতা ধইরা রাখতে না পারাটা, সবাই সবার জায়গা থেকে সবার সমস্যা নিয়ে ব্যস্ত। একটা কমন গ্রাউন্ড নিয়ে এই দ্বিতীয় স্বাধীনতায় জনতার হিস্যাকে স্বীকার করা, সেটাকে সাহিত্য-গল্প-কবিতা-নাটক-উপন্যাসে তুইলা আনা অনেক গুরুত্বপূর্ণ এবং জরুরী কাজ। 

আমরা বারংবার স্বৈরাচারের ফাঁদে পা দিই। ৭৫ এর পতিতকে ৯৬তে নিয়ে আসি, ৯০ এর পতিতকে ভুইলা যাই। এইযে আমরা ৪৭কে মনে রাখসি, স্মরণ করি, ৫২কে ধারণ করি, শোক করি, সুখীও হই, ৭১কে সবকিছু দিয়ে জড়ায়ে রাখি এইসবের পেছনে তাত্ত্বিক বইগুলার চাইতে ফিকশনের অবদানই বেশী। ফিকশন বলতে এখানে এরকম সবকিছুকেই বুঝানো হচ্ছে যেখানে গণমানুশের গল্প বলা যায়, হোক সেটা সিনেমা, গল্প, কবিতা বা উপন্যাস, নাটক। এইগুলো মানুশকে রিলেইট করতে সাহায্য করে, সহমর্মী করে, সহযোগী করে,কল্পনা বিস্তার করে, ভালোবাসা, অনুশোচনা, আকাঙ্খা বাড়ায়। এইসব বিভিন্ন ন্যারেটিভ নির্মাণ করে। জুলাইয়ের অংশীজনরা এই কাজটুকু না করতে পারলে ইতিহাস বেহাত হয়ে যাবে। 

৭৫ নিয়ে আমাদের সাহিত্য নাই, হাতেগোণা কয়েকটা বই ছাড়া বিশ্লেষণী বইও নাই। ৯০ নিয়েও নাই। ৯২ এর দাঙ্গা নিয়েও নাই।  হাসিনার বাহিনীর হাতে ০৬এর নয়াপল্টনে নৃশংস হত্যাকাণ্ড কোনো কথায়-উপকথায় নাই, ০৮ এর কথাবার্তাও নাই, না আছে ১৩ নিয়েও কোনো যৌক্তিক সাহিত্য, এভাবেই ১৫, ১৬, ১৮ এর কোটা আন্দোলন, নিরাপদ সড়ক আন্দোলন, ২১, ২২ এর নানা বিক্ষোভ, মোদী বিরোধী বিক্ষোভ সহ নানা বিষয় নিয়ে নাই কোনো প্রকারের স্মরণিকা, সাহিত্য, আলোচনা। স্বল্প-পরিসরে কিছু পাওয়া গেলেও তা জনতার নাগালে তো নাই। 

যখন যাকেই পেয়েছি, আমি সবসময়ই বলেছি আমাদের ফিকশনের দিকে মনোযোগী হতে হবে, লিখেছিও। আমরা ভুলে গেসি অনেক কিছুই। ইন্টারেস্টিং এইটাই যে আমাদেরকে এইসব ভুলাইতে কারো কোনো এফোর্ট সেইভাবে দেওয়াও লাগে না। জাস্ট ভুলে যাই। যেভাবে জুলাইয়ের গ্রাফিতিগুলা দেওয়ালগুলা থেকে তুলে ফালানো হইসে, এম্নেই, সৌন্দর্য বর্ধনের নামে। 

কিছু কবি, সাহিত্যিকদের দেখেছি জুলাই নিয়ে কাজ করেছে। হাসান রোবায়েত, দিপ্র হাসানদের নিয়মিত দেখছি। বাকিদেরও আগায়ে আসা লাগবে। আমাদের কাওয়ালীও যেমন দরকার আছে, তেমনই দরকার জুলাই এর র‍্যাপগুলা নিয়েও আগায়ে যাওয়ার। আমরা বলসিলাম সবার নাম ধরে ধরে আমরা মনে রাখব, লিখে রাখব, এখনো মৃত্যুর মিছিলই শেষ হয় নাই, আমাদের তালিকাও প্রস্তুত নাই। 

বাংলাদেশের ইতিহাসে জুলাইয়ের নিজস্ব অবস্থান থাকবে। একে স্বীকার করেই এইটা যে একটা ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই সংগঠিত হয়েছে, গণ-অভ্যুত্থানের রূপ পেয়েছে সেটাকেও স্বীকৃত দেওয়া হয়। বরাবরের মতই আমি আবারো আহবান জানাব, সাহিত্যিক-লেখকদের আগায়ে আসার। তাদের লেখাগুলো জাস্ট ম্যাগাজিন-পত্রিকার জন্য না রেখে জনতার জন্য উম্মুক্ত করার। জুলাই এর স্মৃতি এবং এসেন্স আগামীর বাংলাদেশকে স্বৈরাচার, ফ্যাসিবাদ মুক্ত, ইনসাফ, আদালত, এবং ইক্যুইটির রাষ্ট্র হিসেবে গড়ার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।


দোসরা সেপ্টেম্বর, দুইহাজার চব্বিশ

সাজ্জাদুর রহমান

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ