ডিনাজীফিকেশনের হালচাল এবং ডিমুজিবীফিকেশন
সাজ্জাদুর রহমান
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরপর ডিনাজীফিকেশন নামে একটা টার্ম আসল। দেখেই বুঝা যাচ্ছে এর অর্থ কি হতে পারে! সোজাবাংলায় সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, বিচারিক, সাংস্কৃতিক স্তরগুলো থেকে নাৎসী আইডিওলজি এবং নাৎসীবাদীদের (নাজি) পুরোপুরি উৎখাত এবং নির্মূল করা জার্মান এবং অস্ট্রিয়ান সোসাইটি থেকে।
এইটা একটা কম্বাইন্ড এপ্রোচ ছিল বিশ্বযুদ্ধের এলাইড শক্তির। এটাও হয়ত অনেকের জানা আছে যুদ্ধের পরেই জার্মানীকে চারভাগে ভাগ করে চার পরাশক্তি (আমেরিকা, ব্রিটেন, সোভিয়েত ইউনিয়ন, ফ্রান্স) এর হাতে দিয়ে দেওয়া হয়। তো এরা নিজেদের অংশগুলোতে বিভিন্ন উপায়ে সর্বোচ্চ কঠোর অবস্থান নিয়েছিল নাৎসীজমকে সমূলে মুছে ফেলার জন্য। ন্যুরেমবার্গ ট্রায়ালের নামও অনেকেরই জানা, সেখানে মেজর ওয়ার ক্রিমিনালদেরকে যুদ্ধে কৃত অপরাধগুলার জন্য শায়েস্তা করতে আরেকটা এলাইড উদ্যোগ ছিল। বেসিক্যালি এই ট্রায়ালে চার ধরণের অপরাধকে ক্রাইম হিসেবে ধরা হইসিল,
১/ কন্সপিরেসি এগেইনস্ট পীস,
২/ যুদ্ধে কৃত অপরাধ,
৩/ যুদ্ধকে উসকানো, যুদ্ধকে অবশ্যম্ভাবী করা রিলেটেড কাজ, এবং
৪/ মানবতাবিরোধী অপরাধ।
আবার এইখানে আরেকটা ক্যাটাগরী ছিল এরকম যে অপরাধের সীমা বিবেচনায় কার স্থান কই হবে। যেমন,
১/ মেজর অপরাধীরা, যারা সরাসরি কানেক্টেড ছিল, এদের জন্য লাইফটাইম জেল অথবা মৃত্যু,
২/ এক্টিভিস্ট, মিলিটারী পারসোনেল, সুবিধাবাদীরা, এদের জন্য অনূর্ধ্ব দশ বছরের কারাবাস,
৩/ কিছুটা কম অপরাধীরা, এরা পাচ্ছিল অনূর্ধ্ব তিন বছরের কারাবাস,
৪/ নাৎসী সমর্থকরা, এদেরকে চোখে চোখে রাখা হত, সাথে জরিমানাও করা হইসিল, এবং
৫/ অভিযোগ আসছিল কিন্তু খালাস পাইসে এরকম লোকেরা, এরা কোনো পানিশমেন্ট পাইত না।
এইযে টোটাল ডিনাযীফিকেশন প্রসেসটা জার্মান এবং অস্ট্রিয়ান সোসাইটির সব স্তরে চালানো হইসিল তাতো বললামই। এরপরেও কিন্তু এদের পুরোপুরি নির্মূল করা যায় নাই। শেষমেশ যখন জার্মান রিপাবলিক হল, নতুন কাউন্সিলর আসল, দ্যান এই নাৎসীবাদীদের সোসাইটিতে ধীরে ধীরে ইন্টিগ্রেট করতে হলই, অনেকেই প্রাপ্য শাস্তি থেকে বঞ্চিত হল, তারা নিজেদের আগের অবস্থান ধরে রাখতে সমর্থ হইল, নিজেদের সহায়-সম্পত্তি, আশয়-বিষয় সবই রাখতে পারল, এমনকি অনেক রাইটফুল মালিকদের থেকে এইসব নাৎসীবাদীরা নানা সময়ে বিভিন্ন জিনিসপত্র, পজিশন হাইজ্যাক করসিল, সেসবও অক্ষত রইল। আল্টিমেটলি, সামনে আগাইয়া যাবার অজুহাতে সোসাইটিতে সবাই ইনক্লুড হইল।
এইসব বলার কারণ হচ্ছে, আমরাও সিমিলার একটা নাৎসীজমের মুখোমুখিই ছিলাম। এইটাকে মুজিবীজম বলা যাবে হয়ত। তাত্ত্বিকরা সংজ্ঞায়ন করবে পরে। যেহেতু মুজিবকে কেন্দ্র করেই এই ফ্যাশিজমটা আগায়ে চলসিল, তাই আমি বললাম মুজিবীজম। মুক্তিযুদ্ধের পর এম্নেও গণতন্ত্র, জনাকাঙ্ক্ষা সব বাদ দিয়ে চোর-বাটপাররা মুজিববাদই প্রতিষ্ঠা করতে চাইসিল, তাই নামটা চলে। তো, আমাদেরও এই পোস্ট-গণঅভ্যুত্থান সময়ে এরকম একটা পষ্ট, প্রিসাইস কাজের দরকার ছিল আসলে। কিছুটা হয় নাই সেটাও না, কিন্তু মোটাদাগে ডিমুজিবীফিকেশন করার আগেই ফ্যাসিবাদের দোসররা বিভিন্ন ভাবে ইন্টিগ্রেট হয়ে গেছে জনপরিসরে। আমরা ক্যাম্পাসগুলারে যেভাবে চিহ্নিত তালিকা করসিলাম, সেটার আঙ্গিকেও ব্যবস্থা নেওয়া যায় নাই কারণ ক্যাম্পাস এখনো বন্ধ।
সময় শেষ হয়ে এরকমও না। সরকারকর্তৃক হয়ত হবেও না এরকম কিছু, যেহেতু তাদের হাত ধরেই অনেক দোসররা ভবিষ্যত নির্মাণের শরীক হয়ে যাচ্ছে। বাট আমরা যেন এইসব দোসরদের, দালাল-পাচাটা, সুবিধাভোগী, এক্টিভিস্টের ভুলে না যাই। তারা ভোল পাল্টে ফেলতেসে। অবশ্য হাজার চাইলেও, মুখের চামড়া বদলাইলেও তাদের রক্ত ঠিকই আগের পরিচয় জানান দেয়। এই আরকি। আমাদের জনপরিসরে এই ধরণের ডিমুজিবীফিকেশন জারী রাখা লাগবে।
ডিনাজীফিকেশনের হালচাল এবং ডিমুজিবীফিকেশন
সাজ্জাদুর রহমান
পনেরই সেপ্টেম্বর, দুইহাজার চব্বিশ

0 মন্তব্যসমূহ