বাঙালী জাতীয়তাবাদঃ পূর্বাপর, প্রসঙ্গ, পরিণতি এবং যৌক্তিকতা
সাজ্জাদুর রহমান
একাত্তর বঙ্গ বা বাংলার রাষ্ট্রীয় এবং রাজনৈতিক ইতিহাসের জন্য কখনোই স্টার্টিং পয়েন্ট না। বাংলার ইতিহাসের পিছে গেলে সেটাকে চারহাজার বছর পর্যন্ত পিছে যাওয়া যায়, ঐতিহাসিক প্রমাণ বিদ্যামান।
একাত্তরের সিগ্নিফিক্যান্স অন্য জায়গায়। একাত্তর পরবর্তী আমরা এমন এক শাসকগোষ্ঠী পাই যারা সরাসরি বাংলাভাষী। তারা বাংলায় বাতচিৎ করে, দরখাস্ত লেখে, অফিসিয়াল আলাপ করে, ভাব-ভালোবাসা বিনিময় করে, কবিতা-গল্প-উপন্যাস লেখে।
তাহলে এই কয়েকহাজার বছরী বঙ্গের ভাষা, রাষ্ট্রভাষা আগে কি ছিল? বাংলার স্থানই বা কই ছিল?
শশাঙ্ককে শুরু ধরে বলি, যেহেতু সে খণ্ড-বিখণ্ড বিচ্ছিন্ন বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলকে একত্রিত করেছিলেন। সে হিন্দু হওয়ায় দাপ্তরিক কাজকর্ম হত সংস্কৃত ভাষায়। তখন বাংলার আদিরূপ (প্রাকৃত) ছিল জনসাধারণের ভাষা।
এরপর পালরা আসল, পালি হল দাপ্তরিক, মাগধী প্রাকৃত হল জনসাধারণের ভাষা। এই সময়ে সাহিত্যিক ভাষা হিসেবে বাংলার (প্রাকৃত অপভ্রংশ) অবদান চর্যাপদ।
এরপর আসল সেনরা। একইভাবে সংস্কৃত হল প্রশাসনিক ভাষা, বাংলার প্রাচীন রূপ ছিল জনসাধারণের ভাষা। এই সময়ে রীতিমত বাংলা ভাষার বিকাশকে জোর করেই বাধাগ্রস্ত করা হয়েছিল।
মুসলিম বাঙাল সালতানাতে বাঙলা সাহিত্যের ব্যাপক উন্নতি হয়েছিল সত্যি তবে দাপ্তরিক ভাষা ছিল ফারসী। ধর্মীয় কাজে ব্যবহৃত হত আরবী।
তো, দেখাই যাচ্ছে, বাংলা ভাষা এই রাষ্ট্রের সুপ্রীম ভাষা হিসেবে অধিষ্ঠিত হয়েছিল একাত্তরের পরেই।
বাংলা অঞ্চল সবসময়ই স্বাধীনচেতা ছিল, তারা বর্ণপ্রথা মানতে চায় নাই, মোঘলদের ফিরাইতে পারছে, আলেক্সান্ডারকেও আটকাইছে, পাকিস্তান আন্দোলনেরও অগ্রপথিক ছিল। এইটা একটা গবেষণার বিষয় হতে পারে যে প্রথম পরিপূর্ণ বাংলাভাষী শাসকগোষ্ঠী পাবার পরেই কেন এই বাংলা জনপদ রাষ্ট্র হিসেবে নিন্মগামী হল!
বাংলাভাষী শাসকগোষ্ঠী কেন ব্যর্থ হল এই বাংলা জনপদকে একটা কাঠামোবদ্ধ, সুস্থিত, এবং সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে সেটা নিয়ে বলতে গিয়ে কিছু ঐতিহাসিক পরম্পরা দেখিয়েছিলাম।
আমি দুইটা যুক্তি দিতে পারি।
১/ এটাও কি হতে পারে কিনা যেহেতু বাংলা জনগণের ভাষা ছিল, মানে ক্ষমতার ভাষা ছিল না, তাই সমপর্যায়ের, সমভাষার লোকেদের পাওয়ারফুল হইতে দেখাটা বিপরীত ভাবে কাজ করসে।
২/ আবার, এইটাও হতে পারে কিনা যে একচুয়াল বাংলাভাষীরা যেহেতু আগে রাষ্ট্র পরিচালনা করে নাই, ক্ষমতা নিয়ে ডীল করে নাই, তাদের ঐতিহাসিক ভাবে এই এক্সপেরিয়েন্সের ঘাটতি ছিল!
বিভিন্নজনের কমেন্টস থেকে আরোও দুই একটা যুক্তি পাওয়া যায়। যেমন,
১/ ইংরেজ উপনিবেশ এই দেশের জনগণকে গোলামী কাঠামোতে আবদ্ধ করে রেখে গেছিল। কলোনিয়াল মাইন্ডসেটে বড় হওয়া পলিটশিয়ানরা এইটাকে হ্যান্ডল করতে পারে নাই।
২/ আবার, কলকাতাইয়া বাংলার প্রভাব ছিল, যেহেতু স্থানিক ভাবে আমরা ভারত পরিবেষ্টিত, ৭১ এও ভারতের ভূমিকা সাহায্যকারী হিসেবে দেখালেও প্রশ্নবিদ্ধ, একটা নোকতা যে, ভারত সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীর বদলে আধা-মিলিশিয়া টাইপ বাহিনী তৈরী করতে চাপ দিচ্ছিল শুরু থেকেই, সেই আলাপেই রক্ষী বাহিনীর জন্ম। এইগুলো আলাপে আনা যায়। বিস্তারিত না যাই।
এখন আমি আমার মত কিছু কথাবার্তা বলি।
বাংলাভাষী শাসকগোষ্ঠীর অসফলতার পেছনের ঐতিহাসিক এক্সপেরিয়েন্স না থাকাটাকে একদমই হেলায় ফেলানো কোনো যুক্তি না।
একেতো, ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েই বাংলাভাষী শাসকগোষ্ঠী স্থানিক পরম্পরা, জনগোষ্ঠীর বৈচিত্র্যতাকে পাশ কাটায়ে সবাইকে বলসিল বাঙালী হয়ে যাইতে। অথচ হবার কথা ছিল বাংলাদেশী। বাঙালী বলতে ৭১ এর পর অন্তত স্থানিক বিচারে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব প্রকাশ পায় না।
এইখানে লিগ্যাসী তৈরীর একটা ব্যাপারও ছিল। এমনকি লিগ্যাসী অস্বীকার করারও। আগের দেঢ়হাজার বছরের লিগ্যাসীকে পাশ কাটায়ে নতুন ভাবে ইতিহাস লেখার প্রয়োজনীয়তা না থাকা সত্ত্বেও নিজদেরকে সুপ্রীম প্রমাণের একটা আকাঙ্খা ছিল!
আবার, যেহেতু বাঙলা ভাষা শাসকগোষ্ঠীকে ধারণ করতে পারে নাই এর আগে, তাই আগেকার কালচার, ট্র্যাডিশনকে নিজেদের বা সাধারণের বা বাংলা ভাষার মনে না করার মত একটা লজিক্যাল ফ্যালাসীও তাদের ছিল।
তো সবমিলায়ে এইসব কিছু এক জায়গায় দাড়ায়ে জন্ম হইল নতুন একটা বিন্দুর, যেখানে নব্য শাসকগোষ্ঠী চাইল, আশা করল, কোশেশ করল একটা বৈচিত্র্যময় জনপদকে এক পয়েন্টে আনতে। সেটার প্রবাদ পুরুষ হইল শেখ মুজিব।
এইভাবে আরকি আমরা বাঙালী জাতীয়তাবাদের উত্থানকে ভাবতেও পারি।
২৪ এ আমরা বলতে পারি এই বাঙালী জাতীয়তাবাদ কেন্দ্রিক রাষ্ট্রগঠনের প্রজেক্ট ধ্বংস হয়ে গেছে। কেম্নে হইল, কিভাবে হইল, কারা করল এইসব তো অনেকেই জানেন, দেখসেন, বুঝেন।
বাঙালী জাতীয়তাবাদ এবং এর প্রবাদ পুরুষ কেউই বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে সার্বভৌম করে তোলার মত অবস্থান তৈরী করতে পারে নাই।
আরেকটা জিনিস, স্বৈরাচারের পতন আন্দোলনে সবাই একমুখী ছিলাম, সবার এক্টাই আকাঙ্ক্ষা ছিল, সবাই একসাথে পথে ছিলাম। বাট এরপরেই ৫ আগস্টেই সব হুড়মুড় করে ভেঙে গেল, সবাই বিপরীতমুখী হয়ে গেলাম। আমাদের ঐক্যবদ্ধ থাকার মত একটা বিন্দু যে ছিল সেটা না থাকার কারণে।
এখন, আমাদের সবসময়ই ঐক্যবদ্ধ থাকার, বা জাতীয় স্বার্থে অন্তত এক বিন্দুতে মিলিত হবার জন্য একটা বিন্দুর তো দরকার আছে। যেখানে এসে সবাই এক হবে। সেইটাই হইতে পারত এবং হবে হচ্ছে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ।
এইযে বাঙালী জাতীয়তাবাদী প্রজেক্ট, যেইটার অধীনে সবাইকে বাঙালী হয়ে যাইতে বলা হচ্ছিল, সেটা যদি বাংলাভাষী শাসকগোষ্ঠী স্থানিক বিচারে পোট্রে করত তাহলে এই সুবিশাল, বিস্তৃত বাংলা অঞ্চল সব জাতিগোষ্ঠীকেই ধারণ করতে পারত। সমস্যা হত না।
বাট তারা এই বাঙালী বলতে বুঝিয়েছিল বাংলা ভাষাকে। তারা লিগ্যাসী তৈরী করল ৫২ থেকে। ৭১কে করল পয়লা আযাদী, ইতিহাসের শুরু। সবার উপর চাপায়ে দেওয়া হইল কলকাতাইয়া বাঙলা ভার্সনের কালচার, ঢাকাইয়া বাঙলার লিগ্যাসীকে অপাংক্তেয় করা হইল কেননা এইখানে মুসলমানী ব্যাপারটা বেশী চইলা আসে।
এইসব করতে গিয়ে বাংলাদেশীরা জাতিগত ভাবে পরিচিত হইল ভীতু হিসেবে, অথচ ঐতিহাসিকভাবে আমাদের সংগ্রাম ইতিহাস কারো অজানা না। সবমিলায়ে একটা ধ্বজভঙ্গ সিশটেম তৈয়ার হইল, যেখানে কেউ প্রতিষ্ঠা পাইতে চাইলে তাকে আসতে হইতেসে নিজের বাপ-দাদাকে ভুলে, নিজের কালচারকে ভুলে, তথাকথিত এবং আরোপিত বাঙালী কালচারকে অভ্যর্থনা জানায়ে।
৭১ এ মুজিব, এই দেশীয় বুদ্ধিজীবিরা, সামরিক বাহিনীর একটা বর্ধিত অংশ কতটুকু বাংলাদেশকে ধারণ করতে পেরেছিল সেটাও প্রশ্ন! মুজিবের ২৫শে মার্চের স্বেচ্ছা কারাবরণ, ৭ই মার্চে সুযোগের পরেও স্বাধীনতা ঘোষণা না দেওয়া, আওয়ামী লীগ নেতাদের ভারত পলায়ন, মুক্তিযুদ্ধের মাঠে তাদের অনুপস্থিতি, যেটা বাস্তবতা থেকে তাদের দূরে রাখে, মুজিবের শেষ সময় পর্যন্ত স্বায়ত্তশাসনের প্রতি আকাঙ্খা, কামাল হোসেনের মত লোক, তিনি পুরোটা সময় পাকিস্তানে সুবিধাভোগী হিসেবেই ছিলেন, সংবিধান লেখক হওয়া, ইত্যাদি ইত্যাদি নানা ঘটনাতেই বুঝা যায় তৎকালীন শাসকগোষ্ঠী হিসেবে যারা ক্ষমতায় বসেছিল, অধিষ্ঠিত হয়েছিল তাদের অধিকাংশেরই বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের প্রতি দায়বদ্ধতার জায়গাটা ইচ্ছাকৃত ছিল না, আরোপিত ছিল। তারা খানিকটা বাধ্য হয়েই নতুন এক রাষ্ট্রকে পরিচালনা করতে নেমেছিলেন। এই দায়বদ্ধতার জায়গা না থাকাটাও বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ গড়ে না উঠার পিছনে একটা বড় কারণ হতে পারে।
এইটা দীর্ঘায়িত করা যায়, তবে আশাকরি বুঝাইতে পারসি যেটা চাইসি। এর পতন অবশ্যম্ভাবী ছিল, তক হয়েছেও। সময় এসেছে নতুন নির্মাণের, বাকীটা দেখা যাক কি হয়, না হয়।
0 মন্তব্যসমূহ