লেখা তরজমা

রসায়নের গল্প - আমাদের স্বর্নালী সময়



নতুন ক্লাসে ভর্তি হওয়া যতটা আনন্দের মাঝেমাঝে ততটাই বিরক্তিকর যদি প্রথমদিনেই সাউদার মত বাচাল মেয়ের সাথে বসতে হয়। চেনা নেই, জানা নেই এসেই কথা বলা শুরু করে দিল অথচ রুহির কোনো আগ্রহই ছিল না। আর স্যারেরও আসার কোনো খবর নেই। প্রথম দিন, নতুন স্কুল, সবাই অপরিচিত সবমিলিয়ে তার ইচ্ছা হচ্ছে নিজের চুল টেনে ছিড়তে।

প্রথমদিন দেখে স্কুলেও আগে আসতে হয়েছে। সাউদার প্যাচপ্যাচানি থেকে সুস্থ ভাবে বাসায় ফিরে যাওয়াই এখন ওর একমাত্র লক্ষ্য, অপরিচিত লোকের সাথে কেউ এত কথা বলতে পারে সেটা জানা ছিল না।

অবশেষে পাঁচ মিনিট লেইট করে হাসিমুখে সালাম দিয়ে স্যার ক্লাসে ঢুকলেন। সে হাফ ছেড়ে বাঁচল, অন্তত ওই মেয়েটার কথায় কান ঝালাপালা হবে না এবার।

স্যারের সাথে নতুন বই দেখে চোখমুখ চিকচিক করে উঠল। বইপড়ুয়া রুহি নতুন বইয়ের জন্য সবসময় পাগল। তার ভালো লাগে নতুন বইয়ের মনকাড়া ঘ্রাণ। বইয়ের পাতায় হারিয়ে যাবার চেয়ে বেশি আনন্দ আর কিচ্ছুতেই আছে নাকি!

- আমি তোমাদের নূর স্যার। প্রথমেই দুঃখিত দেরি হবার জন্য। বইগুলো গুছিয়ে আনতেই দেরি হয়ে গেল।

- ইটস ওকে, স্যার। সমস্বরে সবাই বলে উঠল।

স্যারের মিষ্টি কথা শুনে তার মন এক মুহূর্তেই ফুরফুরে হয়ে গেল। তারচেয়েও বেশি আনন্দ পেল যখন দেখল বই বিতরণ শুরু হয়েছে। বই হাতে নিয়েই চোখ বন্ধ করে ঘ্রাণ শুঁকার জন্য যেই প্রস্তুতি নিল তখনি স্কার্ফে টান লেগে তা খুলে গেল।

আর কাহাতক সহ্য করা যায়! এবারও ওই মেয়েটা, প্রথম থেকেই তার পিছনে লেগে আছে। শুধু টান দিয়েই ক্ষান্ত হয়নি, তার বইগুলোও নিয়ে গিয়েছে। প্রথম দিনেই এরকম পাগলের পাল্লায় পড়তে হবে কে ভেবেছিল! তার ইচ্ছা করছে মেয়েটার একেকটা চুল টান দিয়ে ছিড়ে দড়ি বানিয়ে দড়িলাফ খেলতে। নেহাত সে ভদ্র মেয়ে, তাই কিছু বলছে না!

কিন্তু পরক্ষণে অবাক হল। আরে এই মেয়েটাও দেখি তার মতই ঘ্রাণ শুঁকছে বইয়ের। তারমানে সেও বইপাগল, ঠিক তার মতই। মেয়েটা পাগল হোক আর যাইহোক, বইপাগল মানুষ কখনোই খারাপ বন্ধু হবে না। সে মনে মনে বেশ খুশিই হল।

এতক্ষণ তারা খেয়ালই করেনি, স্যার অলরেডি তার পুরো পরিচয় বোর্ডে লিখে দিয়েছেন। স্যার রসায়নে অনার্স, মাষ্টার্স করেছেন ঢাকা ইউনিভার্সিটি থেকে। রুহির মনে পড়ল তার বাবাও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই পড়াশুনা করেছেন।

স্যারের মিষ্টি গলা তার ভাবনায় সবসময় ছেদ ফেলে দিচ্ছে। ভুলে তার স্কার্ফ খুলে ফেলাতে সাউদাও তাকে সরি বলেছে। এখন সবকিছু তার কাছে ঠিকঠাক লাগছে।

- পরিচয় দেখেই বুঝেছ আমি তোমাদের রসায়ন পড়াব।

- জ্বি স্যার,সমস্বরে আবারো সবাই বলে উঠল।

- আমি তোমাদের ম্যাজিক, কালো জাদু, ডাইনীবিদ্যা শিখাব।

ক্লাসের সবাই এবার উচ্চস্বরে হেসে উঠল। স্যারের গলা শুধু মিষ্টি না, মানুষটাও মজাদার, মনে মনে ভাবল রুহি।

- প্রাচীন কালে ইউরোপে রসায়নকে বলা হত দ্যা অকাল্ট সায়েন্স। অকাল্ট (Occult) শব্দের অর্থ কে বলতে পারবে?

- সুপারন্যাচারাল, ব্ল্যাকম্যাজিক। কেউ কিছু বুঝার আগেই সাউদা দাড়িয়ে বলে ফেলল।

- গুডগার্ল, বসো। যার বাংলা অর্থ অতিপ্রাকৃত, জাদুময় বা সুপ্ত। কে বলতে পারবে কেন রসায়নকে এরকমটা বলা হত?

- যারা রসায়ন চর্চা করতেন চার্চ তাদের ঈশ্বরের শত্রু ভাবত। চার্চ বিজ্ঞানচর্চাকারী সবাইকেই ডাইনীদের অন্তর্ভূক্ত করেছিল। তাই রসায়নকে উইচক্র্যাফটও বলা হত। আর বাইবেলের দোহাই দিয়ে তারা তাদের পুড়িয়ে মারত। রসায়নকে তারা জাদুবিদ্যার অন্তর্ভুক্ত করেছিল।

রুহি তাকিয়ে দেখল এবারো সাউদা। তার হিংসাও হল আবার ভালোও লাগল। যাক, প্রথমদিনেই সে ভালো একজন বন্ধু পাচ্ছে।

- বাহ, তুমি তো অনেক কিছুই জানো। আরো পড়াশুনা করবে। অল দ্যা বেস্ট অফ ইউ, বসো। সবাই তো এবার জানলে কেন রসায়নকে দ্যা অকাল্ট সায়েন্স বলা হত।

- কিন্তু স্যার, আমি পড়েছি রসায়নকে দ্যা ডিভাইন সায়েন্স বলা হয়। দুটো কেমন বিপরীত লাগছে।

খুব তাড়াতাড়ি কথাগুলো বলেই ঘেমে গেল সে। সাউদার আগে সে বলেছে এই নিয়ে দারুণ আনন্দ পেল।

- হ্যা, মাই গার্ল। দুটি শব্দই তৎকালীন রসায়নের জন্য তাৎপর্যপূর্ণ। যেমন মধ্য যুগকে ইউরোপীয়রা বলে অন্ধকার যুগ কিন্তু মুসলিমদের জন্য সেটা ছিল রেনেসাঁর যুগ। স্থান, কাল ভেদে সবকিছুই পরিবর্তন হয়। তাই রসায়ন এক জায়গায় স্বর্গীয় তো আরেক জায়গায় নরকীয়।

- জ্বি,স্যার। বুঝতে পেরেছি।

- মহাকবি দান্তে অলিঘিয়েরির নাম কে কে শুনেছ?

- আমি। ড্যান ব্রাউনের ইনফার্নোতে তার সম্পর্কে জেনেছিলাম।

এবারও সাউদা। এই মেয়েটা এত্ত কিভাবে জানে! ড্যান ব্রাউনের ইনফার্নো আজকেই পড়ে ফেলবে, মনে মনে সিদ্ধান্ত নিল সে।

- বাহ, আবারো তুমি। বসো,বইটা আমিও পড়েছি। মহাকবি দান্তে রসায়নচর্চাকারীদের নরকের  অষ্টম অংশে স্থান দিয়েছেন। সময় পেলে তোমরা তার ডিভাইন কমেডি পড়ে নিও।

ঢং ঢং ঢং।

 

যাহ! ঘন্টা বেজে গেল। ক্লাসটাতো ভালোই লাগছিল। সালাম দিয়ে স্যার ক্লাস থেকে বের হয়ে গেলেন। প্রথম দিন দেখে ফার্স্ট ক্লাসের পর স্কুলও ছুটি হয়ে গেল। রিকশায় যেতে যেতে রুহির মাথায় মধ্যযুগ টার্মটা ঘুরতে লাগল। স্যারের ব্যাখ্যায় মস্তিষ্কের ক্ষুধা পুরোপুরি মেটেনি। যাইহোক, আব্বুকে জিজ্ঞেস করে নিব আজকেই। মনে মনে সিদ্ধান্ত নিল।

মধ্যযুগের ঘূর্ণিমালায়

- ক্রুসেড সিরিজ পড়েছ?

- জ্বি, আব্বু। আসাদ বিন হাফিজ স্যারের লিখা।

- মধ্যযুগের ইতিহাসে ক্রুসেডের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।

- আমার কনফিউশন হচ্ছে এটার নাম দুইটা কেন? তাও আবার দুইটাই বিপরীত? রুহির চোখ জিজ্ঞেস করতে গিয়ে ছোট হয়ে আসল।

-  ইউরোপীয়রা যেখানে মধ্যযুগকে দ্যা এইজ অব ডার্কনেস বলে ঠিক তেমনি আমাদের কাছে মধ্যযুগ হচ্ছে দ্যা এইজ অব লাইটনেস। ঐতিহাসিকরা এই মধ্যযুগকে দ্যা এইজ অব ফেইথও বলেছেন। কারণ প্রতিটা নামের পিছনেই ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষাপট রয়েছে।

- আমি জানতে আগ্রহী, আব্বু। নড়েচড়ে হাত টেবিলে রেখে থুতনিতে লাগিয়ে বসল সে।

- ঐতিহাসিকরা মধ্যযুগকে চিত্রিত করেছেন দ্যা হলি রোমান এম্পায়ার এর পতন থেকে ক্রিস্টোফার কলম্বাসের আমেরিকা নেভিগেশনের মধ্যবর্তী সময়টুকুকে। এই সময়টুকু ৪৭৬-১৪৯২ খ্রীষ্টাব্দ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।

- তারমানে হাজার বছরেরও বেশি! দুই ঠোঁটের মাঝে শূণ্যতায় একটা বিরাট হা প্রতিস্থাপিত হল।

- কিন্তু মূল মধ্যযুগ ধরা ৪৭৬-৮০০ খ্রীষ্টাব্দের মধ্যবর্তী সময়কে।

- কেন?

- দ্যা হলি রোমান এম্পায়ার এর পতনের পর ইউরোপে সেই সময়টুকুতে না এসেছিল কোনো গ্রেট লিডার, না এসেছিল কোন ভাল শিল্প। কোনো গ্রেট লিডার না থাকার দরুন ক্যাথলিক চার্চের ক্ষমতা বহুগুণে বেড়ে গেল। তাদের কথাই হয়ে গেল ঈশ্বরের বাণী। ঈশ্বরের দোহাই দিয়ে বিজ্ঞান চর্চার উপরেও নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল চার্চ।

- তারা রসায়নকে ডাইনীবিদ্যা, জাদুবিদ্যা বলত। সুযোগ পেয়েই ক্লাসে শোনা কথাটুকু বাবার সামনে ঝেড়ে দিল রুহি।

- হ্যাঁ। চার্চই ১০৯৫ সালে ক্রুসেড শুরু করেছিল। যার ফলে চার্চের ক্ষমতা আরো বেড়ে গেল এবং ইউরোপও অন্ধকার থেকে আলোতে আসার পথ পেল। ক্রুসেডের সুযোগ নিয়ে চার্চের ব্যালেন্সও আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়ে গিয়েছিল।

- সালাহউদ্দিন আইউবীর কাহিনী আমি পড়েছি, আব্বু। অনেক এডভেঞ্চারাস!

- ঠিক যখন ইউরোপ অন্ধকারে ধুকে ধুকে পথ চলছে তখনি মুসলিমরা আলকেমি চর্চা করে সভ্যতার সর্বোচ্চ শিখরে পৌছাচ্ছিল। তাই আমরা মধ্যযুগকে দ্যা এইজ অব লাইটনেস বলি।

- আলকেমি কি?

- বলছি, শুনতে থাকো। তাকে তড়িৎ থামিয়ে দিয়ে বাবা আবার শুরু করলেন।  আলকেমিকে অনেকে শুধু রসায়ন চর্চা বলে অভিহিত করে। কিন্তু আলকেমির বিস্তৃতি আরো বিশাল। রসায়ন, ধাতুবিদ্যা, পদার্থবিজ্ঞান, চিকিৎসাশাস্ত্র, জ্যোতিষশাস্ত্র, আধ্যাত্মবাদ, শিল্পকলা এগুলো সবগুলোই আলকেমি চর্চার অন্তর্ভূক্ত ছিল।

- তাহলে তো বলাই যায় বিজ্ঞান চর্চাটাই আলকেমি নামে পরিচিত ছিল।

- হ্যাঁ, ঠিক বলেছ। আর রসায়ন হচ্ছে বিজ্ঞানের সবথেকে বড় এবং প্রধান শাখা। রসায়নের সাথে বিজ্ঞানের অন্যান্য সব শাখাই কানেক্টেড। তাই আলকেমি চর্চাকে আংশিকভাবে অনেকে শুধু রসায়ন চর্চা বলে থাকে।

এই, খেতে আসোতো। বাবা মেয়ের গল্পে দুপুর গড়িয়ে বিকাল হতে চলল। মায়ের কপট রাগী ডাক শুনে বাবা-মেয়ে হাসতে হাসতে খেতে চলল।

রসায়ন! রসায়ন! রসায়ন! রুহির মাথায় রসায়ন বোঁ বোঁ করে ঘুরতে লাগল।

বিকালে ঘুম থেকে উঠে মাথাটা সোজা রাখতে পারল না রুহি। মাথা ঘুরাচ্ছে কিন্তু তারথেকেও বেশি ঘুরাচ্ছে তাকে রসায়ন। এই ছাতার রসায়নের জন্য তার দুপুরের ঘুমটাও হল না। স্বপ্নেও জাবির ইবনে হাইয়ান নামে কাউকে দেখল বোধহয়। বাবাকে জিজ্ঞেস করতে হবে। আজকে রাতে পড়াতো দূরের কথা সন্ধ্যাতেই ঘুম এসে যাবে তার। নিজের উপর বিরক্ত হয়ে আসর নামাজ আদায় করতে গেল রুহি।

দ্যা ফাদার

- এই মানুষটি সবমিলিয়ে দুইহাজারের বেশি বই লিখেছেন! কিন্তু কিভাবে সম্ভব? নামাজ শেষে চা নিয়ে বাবার সাথে বসার পরেই জাবির ইবনে হাইয়ান সম্পর্কে জানতে চেয়েছিল রুহি। তারপরই তার আশ্চর্যান্বিত হওয়া।

- হ্যাঁ, দুইহাজারের বেশি বই লিখলেও তার বইগুলোর পৃষ্ঠাসংখ্যা সাধারণত কম থাকতো। এই ধরো গড়ে সাত থেকে আট পৃষ্ঠা। এমনকি তার লেখা দুই পৃষ্ঠারও বই আছে।

- কিন্তু তাকে রসায়নের জনক বলা হয় কেন? কাপ থেকে ঘাড় উঁচিয়ে বাবাকে শুধাল সে।

- ওইযে বলেছিলাম না বিজ্ঞান চর্চা বিশেষ করে রসায়নকে সবাই জাদুবিদ্যা কিংবা নিষিদ্ধ কিছু ভাবত। রসায়নকে বিজ্ঞান হিসেবে স্বীকৃতি তো তখনো ইউরোপ দেয়ই নি এমনকি মুসলিম বিদ্বানগণও রসায়নকে বিজ্ঞানের শাখা হিসেবে মানতে নারাজ ছিলেন।

- কিন্তু বাবা, তুমি তো বলেছিলে এটি বিজ্ঞানের প্রধান শাখা। তাহলে কিভাবে?

- হ্যাঁ,বলছি শুনো। জাবির জন্ম নেয় ৭২০-৭৩০ খ্রীষ্টাব্দের মাঝামাঝি কোন এক সময়ে। তখন রসায়ন চর্চা করা নিয়ে মানুষের মাঝে ভয়ভীতি কাজ করত। আর বিদ্বান লোকেরা যখন এটাকে জাদুবিদ্যার অন্তর্ভূক্ত করেছিল, তাই সাধারণভাবেই মানুষ এতে আগ্রহী ছিলনা। কিন্তু জাবির হাটলেন স্রোতের একেবারে উল্টোদিকে। রসায়নকে তার কঠোর পরিশ্রম ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে একটি পরিপূর্ণ বিজ্ঞান শাস্ত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করলেন।

- স্রোতের বিপরীতে সেই সময়ে তাকে কতটাই না কষ্ট করতে হয়েছে!

- তাতো হয়েছেই, তবে সে তৎকালীন আব্বাসী খলীফা হারুনুর রশীদের পৃষ্টপোষকতা পেয়েছিলেন। বর্তমানে ইউফেট্রিস নদীর তীরে অবস্থিত ইরাকের কুফা শহরে তার ল্যাবরেটরিও ছিল।

- তারমানে রসায়ন শাস্ত্র সম্পূর্ণ মুসলিমদের তত্ত্বাবধানেই প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিল।

- হ্যাঁ, তা ঠিক। কিন্তু রসায়নের ইতিহাস আরো অনেক অনেক আগের থেকেই পাওয়া যায়।

- ইসলামের প্রথম রাসায়নিক ছিলেন মুহাম্মদ (সাঃ)।

- আব্বু, এটা সত্যি!

- হ্যাঁ। তাকে চিকিৎসাবিদও বলা চলে। বিভিন্ন হাদীস গ্রন্থে তিব্বুন নবী নামক অধ্যায় সংযোজিত আছে।

- তারমানে মুসলিমদের সাথে রসায়নের ইতিহাস অঙ্গাঙ্গী ভাবে জড়িত।

- হ্যাঁ, ঠিকই বলেছ। এরপর আসে হযরত আলী (রাঃ) এর নাম। তাকে রাসূল (সাঃ) “দারুল হিকমা” উপাধি দিয়েছিলেন। উপাধিটার অর্থ জানো তুমি?

- জ্বি, আব্বু। “দারুল হিকমা” অর্থ জ্ঞানের দরজা।

- আরবী সাহিত্যে রসায়ন নিয়ে আলী (রাঃ) এর প্রচুর উক্তি রয়েছে। তিনি পুরোপুরিভাবে ভাবে রসায়ন চর্চা করেননি ঠিকই তবে এ সম্পর্কে ভালো ধারণা রাখতেন। ইতিহাস থেকে এটাও জানা গিয়েছে যে তিনি স্বর্ণ তৈরি করার পরিকল্পনা করেছিলেন!

- বাহ, আমরা সেই কত আগের থেকেই বিজ্ঞানে এগিয়ে ছিলাম। এই আধুনিক যুগে এসেই পিছিয়ে পড়েছি।

- হতাশ হবার কিছু নেই মা। আমরা পিছিয়েছি নিজেদের ভুলের কারণেই। আমরা গবেষণা থেকে দূরে সরে গিয়েছি। যেটুকু আমাদের অগ্রজগণ দিয়ে গিয়েছিলেন আমাদের উত্তরাধিকার হিসেবে তা থেকে আমরা আর আগে বাড়তে পারিনি।

- আমাদের এই অলসতার সুযোগটাই ইউরোপ নিয়েছে। তারা এখন বিজ্ঞানের কর্ণধার বনে গিয়েছে।

আল্লাহ্ আকবর, আল্লাহ্ আকবর...

কানে আযানের ধ্বনি ভেসে আসাতে বাবা-মেয়ের গল্পে ছেদ পড়ল। এক সুন্দর সোনালী অতীত দিনশেষের সূর্যের লাল আভায় হারিয়ে গিয়েছে। সে পথ খুঁজছে ফিরে আসার, ফিরে সে আসবেই।

শাসন ছেড়ে রসায়নে

নূর স্যার এতই মজা করে পড়ান যে ছেলেপেলেরা তন্ময় হয়ে থাকে। মনোযোগের কমতি থাকে না, তার উপর আবার প্রথম ক্লাসই তার। এভাবেই দেখতে দেখতে প্রথম সেমিস্টারের সময় ঘনিয়ে আসতে শুরু করল। সবার মাঝেই চাপা দুশ্চিন্তা, হালকা ভয় ভয় কাজ করছে! কারণ এরপরের ক্লাস নিতে আসবেন ফাতেমা ম্যাম। গণিত পড়ান, ভীষণ কড়া বৈকি! তার চোখরাঙানো যেন কালবৈশাখীর মেঘের গুড়গুড় ধ্বনি! গতকাল আবার বিশাল হোমওয়ার্ক দিয়েছিলেন, রুহী সেটা শেষ করতে পারেনি। আজকে আবার সাওদাও কেন জানি ক্লাসে আসেনি! সবমিলিয়ে দিনটাকে মোটামুটি চিন্তাজনকই বলা যায়।

তবে কিনা চিন্তা আর স্বস্তি পাশাপাশি চলে! হুট করে দপ্তরী এসে জানাল গণিত ম্যাম আজকে স্কুলেই আসেনি! এদিকে স্যারও জানালেন তার সেকেন্ড পিরিয়ডে কোনো ক্লাস নেই। সবাই সমস্বরে গল্প, গল্প, গল্প বলতে বলতে স্যারের কান ঝালাপালা করে দিল! তো চিরাচরিত নিয়মানুযায়ী আজকে আবারো ইতিহাস নিয়ে কচকচানি শুনতে সবাই সোজা হয়ে বসে গেল।

-        তোমরা কি আজকে একজন শাসকের গল্প শুনবে যিনি রসায়নের জন্য ক্ষমতা ছেড়েছিলেন?

-        রসায়নের জন্য কে ক্ষমতা ছাড়ে রে বাবা! ক্লাসে একটা মৃদু গুণগুণ ছড়িয়ে পড়ল, সবার চোখ রসগোল্লার মত হয়ে আছে।

-        তার নাম ছিল খালিদ ইবনে ইয়াযিদ ইবনে মুয়াবিয়া। নাম শুনেই বুঝেছ তিনি উমাইয়া খেলাফতের প্রতিষ্ঠাতা মুয়াবিয়া (রাঃ) এর নাতি। স্বাভাবিকভাবেই বাবা ইয়াযিদের পর তারই ক্ষমতার মসনদে বসার কথা ছিল। কিন্তু তিনি জ্ঞানচর্চায় মন দিলেন।

সবার আগ্রহ ভরা মুখের দিকে তাকিয়ে স্যার আবারো শুরু করলেন।

-        আরবদের মাঝে তিনিই প্রথম যে আলকেমি চর্চা শুরু করেছিলেন। অনুবাদও করেছিলেন বেশকিছু। প্রখ্যাত জ্ঞানবিদ আল-বিরুনী একাদশ শতকেও তার লেখা একটি বই পেয়েছিলেন, নাম ছিল “কিতাবুল তামার বা বুক অব দ্যা ফ্রুট”। এখন এটি হারিয়ে গিয়েছে।

-        আমরা কতই না দূর্ভাগা! একরাশ আক্ষেপ ঝড়ে পড়ল রুহীর কন্ঠ থেকে। পাশ থেকে একজন বলল, “স্যার, মুসলিমরা হুট করে কেনই বা এভাবে অন্যান্য জ্ঞানের প্রতি আগ্রহী হল?”

-        অবশ্যই হুট করে নয়, এর একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া তো ছিলই। মুসলমানরা সবসময়ই জ্ঞানার্জনে ব্যাপৃত ছিল। শেখার সব সুযোগকেই তারা কাজে লাগাত। রাসূল (সাঃ) এর যুগে সাহাবাদের ভাষা শিক্ষা, বদর যুদ্ধের পর মুশরিক বন্দীদের থেকে অক্ষরজ্ঞান শিক্ষা এসব ছোটখাটো কিছু উদাহরণ।

স্যার ত্রতব্যস্ত হয়ে বারবার ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছিলেন, বললেন কাজ পড়ে গিয়েছে, চলে যেতে হবে। তবে কিছু হোমওয়ার্ক দিয়ে গেলেন। আগামী ক্লাসের জন্য জেনে আসতে হবে জাবির ইবনে হাইয়ান, মুহাম্মাদ ইবনে যাকারিয়া রাযী এবং ইয়াকুব ইবনে ইসহাক কিন্দী সম্পর্কে।      

কুফার গবেষণাগারে

-        আচ্ছা, আব্বু, জাবিরকে নিয়ে আমার আরো জানা লাগবে।

খাবার টেবিলে বসেই বাবার দিকে উৎসুক দৃষ্টি ঝেড়ে দিল রুহী। যেন না জানলে আজকে তার খাবারই হজম হবে না!

-        হ্যা, আমরা ল্যাবরেটরী পর্যন্ত গিয়েছিলাম। সেখানে কি কি করেছেন শুনো তাহলে। তিনি উর্ধ্বপাতন, স্ফটিককরণ, পরিস্রাবণ, পরিশোধন, কেলাসন, তরলীকরণ, পাতন, জারণ, বাষ্পীভবন এবং টাইট্রেশনের মত আধুনিক পরীক্ষণগুলো করেছিলেন!

-        রুহীর গোলগোল চোখগুলো যেন কথার তালে তালে আরোও বড় হতে থাকে। সেইস অময়ে এতকিছু কিভাবে সম্ভব হয়েছিল!

-        শুধু কি এসবই নাকি মেয়ে! আরোও শুনো। তিনি ফিটকিরি পাতন করে সালফিউরিক এসিডও প্রস্তুত করতে পেরেছিলেন! এরপরে তিনি পদার্থগুলোকে প্রথম তিন ভাগে ভাগ করেছিলেন। গ্যাসীয়, কঠিন এবং তরল। তিনি বের করেছিলেন কিভাবে বিভিন্ন পদার্থ নিজেদের বৈশিষ্ট্য ঠিক রেখে যৌগ গঠন করে! তোমার কাছে এসব হয়ত খুবই সাধারণ লাগবে শুনতে, তবে এটাও তো জানো এসব আরো সাড়ে বারশ বছর আগের কথা!

-        না, আব্বু। আমি বুঝতে পেরেছি আসলে তিনি সময়ের থেকে কতটা এগিয়ে ছিলেন!

-        তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার হচ্ছে এসিডগুলো।

-        তিনি আরোও এসিড আবিষ্কার করেছিলেন? রুহীর মুখ যেন এখন বেলা বিস্কুট সাইজের হা হয়ে রইল, হাতের লোকমাটা প্লেটে পড়ে গেল।

-        হ্যা, আরো করেছিলেন। এসবকে আবিষ্কারের চাইতে পরীক্ষণ বলাই ভালো। তিনি বিভিন্ন এসিড নিয়ে পরীক্ষা-নিরিক্ষা চালিয়েছিলেন। আগেকার বিশ্ব ভিনেগার, যাকে আমরা এসিটিক এসিড বলে জানি, সেটা ছাড়া অন্য কোনো এসিডের অস্তিত্ব আছে বলে জানত না! ভিনেগারের একটি নির্দিষ্ট স্বাদ আছে। জাবির সালফিউরিক, নাইট্রিক, নাইট্রোমিউরিএটিক এসিড আবিষ্কার করে রসায়ন গবেষণার ক্ষেত্রে ব্যাপক একটা ক্ষেত্র উম্মোচন করে ফেলেছিলেন। রসায়ন শিল্পে এসব এসিডের গুরুত্ব এখনো অনেক বেশী।

রুহীর এবার যারপরনাই অবাক হওয়ার পালা! আর প্রশ্ন কি করবে, ভাবতেই সময় চলে যাচ্ছে। এত আগে একজন মানুষ কিভাবে এতকিছু করলেন! তবে বাবার গমগমে কন্ঠ কানে ভেসে আসাতে ভাবনার চাদরে ভাজ পড়ল, আবার কথার দিকে মনোযোগ দিল।

-        তিনি পরিমাপ নিয়েও কিছু কাজ করেছিলেন। তিনি এতটাই সূক্ষ্ণ পরিমাপক স্কেল বানিয়েছিলেন যা দিয়ে এক কেজির চেয়েও ৬৪৮০ গুণ ক্ষুদ্র কোনো কিছু পরিমাপ করা যেত! তিনি বিভিন্ন পরীক্ষণের মাধ্যমে দেখেছিলেন নির্দিষ্ট জারণ অবস্থায় পদার্থের ওজন হ্রাস পায়।

-         আব্বু, বলেছিলে তিনি অনেক বই লিখেছিলেন। সেগুলো কি বিষয়ে ছিল?

-        হ্যা, সেগুলো অনেক বিষয়ই নিয়ে এসেছিল। যেমন, রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য, পরিমাপ, রাসায়নিক যৌগ, রঙ, ইত্যাদি। এসবে তিনি রাসায়নিক বিভিন্ন পরীক্ষণে ওয়াটার বাথ (জলগাহ) এবং তাপের ব্যবহার নিয়ে আলোচনা করেছিলেন। এছাড়াও মার্কারীর অক্সাইড এবং সালফারের বিভিন্ন যৌগ নিয়েও আলাপ ছিল। কাপড়, চামড়া ও চুলে রঙ করা নিয়েও তার বিস্তর গবেষণা ছিল।

হাত ধুয়ে টেবিলে এসে বসে আবারো শুরু করলেন কথা।

-        কাপড়কে পানিরোধী করা, লোহাকে মরিচা পড়া থেকে রক্ষা, গ্লাস তৈরির জন্য ম্যাঙ্গানিজ ডাই-অক্সাইড নিয়ে কাজ, স্বর্ণের উপর লেখার জন্য পাইরাইট নিয়ে পরীক্ষণ, সিরামিক ও টাইলের উজ্জ্বলতার জন্য লবণের ব্যবহার, ভিনেগারের পাতন থেকে ঘন এসিটিক এসিড তৈরি, আগুনপ্রতিরোধী কাগজ, রাতেও পড়া যাবে এমন ধরণের কালি নিয়েও তার কাজের কথা পাওয়া যায়। এছাড়াও তার ধাতু পরিশোধন সংক্রান্ত গবেষণা ঢালাই শিল্পে বেশ কার্যকরী ছিল।

রুহী যেন একদম চুপ হয়ে রইল। শুনতেই ভালো লাগছে, প্রশ্ন আর করছে না। মানুষকে সত্য জানাতে, জীবনযাত্রা সহজ করতে, সমাজকে সাবলীল ভাবে চালাতে এই মানুষরা সীমিত উপাদান দিয়ে কত কিছুই না করে গিয়েছেন! তারা জ্ঞানার্জনে কতি না আগ্রহী থাকতেন! নিজেদেরকে বিলিয়ে দিতেন। ভাবতে ভাবতে আবারো বাবার কথা ভেসে আসতে থাকল।

-        তার করে যাওয়া এইসব পদ্ধতিগুলো ১৮ শতকে এসেও কিঞ্চিৎ পরিবর্তন, পরিমার্জন করে বিজ্ঞানীগণ কাজে লাগাতে পেরেছেন। তাহলে বুঝতেই পারছো তার কাজের পরিধি কত বিস্তৃত ছিল!

-        তাহলে আব্বু, তার এসব কাজ এখন কোথায় আছে, কেন আমরা সেসব এখন কোথাও দেখি না? একরাশ হতাশা যেন ঝড়ল পিচ্চি মেয়েটার কন্ঠে।

-        তার মৃত্যুর পর সেসব কুফাতেই ছিল। এরও দুইশ বছর পরে বাগদাদের দামাস্কাস গেটের পাশে কিছু বাড়ি সংস্কারের কাজ করতে গেলে তার কাজকর্মের কিছু অংশ সেখানে পাওয়া গিয়েছিল। পরবর্তীতে হালাকু খানের ধ্বংসযজ্ঞের মাধ্যমে বাগদাদ তার সোনালী দিন হারালে এইসব অনেক গবেষণাকর্ম, বই কালের গহ্বরে হারিয়ে যায়!

সময়ের কাটা ঘুরে বিকাল হল। রুহী ঘরে আসর আদায় করে বারান্দায় চা হাতে বসল। পাশের কৃষ্ণচূড়া গাছে ফুল ফুটতে শুরু করেছে, বৈকালিক মৃদু সূর্যরশ্মি সেই ফুলগুলোকে আরোও যেন অতীতের মায়ায় আচ্ছন্ন করল। হালকা বাতাস, কান ছুঁয়ে যাওয়া ইতিহাসের গল্পের মত! কতই না বাস্তব, তবুও কতই না দূরে! এই বাতাসকে বশ করতে হবে, ফেরাতে হবে আবার সোনালী সুদিন। সুর্য ডুবে যায় আবার উঠার জন্যই, আমাদেরও আবার উঠতে হবে। আকাশের লোহিত রাঙার সাথে তার মনের কোণেও দৃঢ় হল এক প্রতিজ্ঞা, উঠতেই হবে আমাদের, ছুতে হবে সেই লোহিত গগণ, ফেরাতে হবে সেই সুদূর স্বর্ণালী অতীত, আমাদেরকে ফিরতেই হবে।

আল-কিন্দীর এক্সপেরিমেন্টস

শুক্রবারের বিকেল। আম্মুর বানানো চা, মুচমুচে পাপড়ভাজা, আলুপোড়া আর সাথে মামার মুখরোচক গপ্পো! এরচেয়ে সুন্দর সময় সম্ভব হতে পারে কি না তা রুহীর জানা নেই। ওর আবদার ছিল আজকে মামা বিখ্যাত কাউকে নিয়ে কথা বলবেন। চায়ের চুমুকের শো শো আওয়াজের পাশাপাশি তাই বিজ্ঞান কপচানোও শুরু হল।

-        শুনো তবে আজকে আল-কিন্দীর গল্প। জাবির ইবনে হাইয়ান পরীক্ষণ পদ্ধতিগুলোর মাধ্যমে দেখিয়েছিলেন যে বিজ্ঞান শুধুমাত্র ধারণাজাত কিছু নয়। আমরা আজকের আলোচিত মনীষী থেকেও একই জিনিসগুলো পাব তবে ভিন্ন ক্ষেত্রে।

এক ছলক চা উপচে উঠল! রুহীর চোখগুলো ইয়াব্বড় হল, যেন মামার সব কথা চোখ দিয়েই গিলে ফেলবে!

-        গবেষক ডানলোপ তার “আরব সিভিলাইজেশন” বইতে জোয়ার-ভাটা নিয়ে আল-কিন্দীর নিজস্ব একটি উদ্দ্বৃতি দিয়েছেন। বলা হয়েছে, “জোয়ার-ভাতার গতিবিধি তাপমাত্রার পরিবর্তনের কারণে হয়ে থাকে, তাপমাত্রা পরিবর্তন হলে সমুদ্রের বাহ্যিক অবস্থারও পরিবর্তন হয়ে থাকে। কেউ একটু চিন্তা করলেই এটি পরীক্ষা করতে পারবে। সে দেখতে পারবে কিভাবে ঠান্ডা বাতাস পানিতে রূপ নেয়! যদি সে একটি কাঁচের বোতল তুষার দিয়ে পূর্ণ করে, মুখ আটকে ওজন করে একই মাপের আরেকটি পাত্রে রাখে যার ওজন আগেই নেওয়া হয়েছিল। তারপর দেখা যাবে বোতলের ভেতরে থাকা বায়ু ধীরে ধীরে পানি হয়ে যাচ্ছে এবং পানির ফোঁটার মত গায়ে লেগে থাকছে। এখন যদি সে আবার বোতলটিকে ওজন দেয় তবে দেখা যাবে তা বৃদ্ধি পেয়েছে। যা মূলত পরিবর্তনকেই বুঝাচ্ছে”। মোবাইলের নোট থেকে এক নিঃশ্বাসে যেন মামা কথাগুলো পড়ে ফেলল!

-        রুহীর ভালোই অবাক হওয়ার পালা, জোয়ার-ভাতার গতিবিধিকে কিভাবে দুটি গ্লাস দিয়ে বুঝানো যায়! এরকমও তো হতেই পারে বরফ বা তুষারগুলো কাচ ভেদ করে এসে পানি জমাচ্ছে অপর বোতলের গায়ে। বেশী না ভেবে প্রশ্নটা করেই ফেলল।

-        মুচকি হেসে সালেহ আগ বাড়ল। বলল, মামণি, এর উত্তরটাও তিনি দিয়েছিলেন। বরফ কখনোই কাচ ভেদ করে অপরপাশে যেতে পারবে না যদি না গ্লাস ভাঙা থাকে। এরকম কোনো পদ্ধতি বা মাধ্যমই নেই যার দ্বারা পানিজাতীয় কিছু কাচ ভেদ করতে পারবে!

-        মুসলিম বিজ্ঞানীরা এক্সপেরিমেন্ট এরেনায় এতটা সফল হলেও ইতিহাসে কেন বলা হয় যে বিজ্ঞানে পরীক্ষণের সূচনা হয়েছিল ইউরোপীয়ান রেনেসাঁর পরে? দুঃখমিশ্রিত কন্ঠের সাথে ছোট্ট মেয়েটার মনের চাপা বেদনাও প্রকাশ পেল!

-        তুমি তো জাবির আর কিন্দীকে জেনে ফেললে, তো তাদের ওইসব ভিত্তিহীন কথাতে কান দেওয়ার তো আর কারণ নেই, তাই না? এরকম আরোও শত শত বিজ্ঞানী যারা আরবে বসে জ্ঞান শাণিত করেছিলেন, বিজ্ঞানকে দূর-দূরান্তে ছড়িয়েছিলেন তারা অনেক আগেই পরীক্ষণ পদ্ধতিকে বরণ করেছিলেন। কিন্তু এটি করা খুবই সহজ ছিল না!

-        কেন?

-        মুসলিমদের আগে বিজ্ঞানের ঝান্ডা ছিল গ্রীকদের হাতে। যাদের পাঠশালাগুলো ছিল গুরুনির্ভর। গুরু যা বলবে তাই সঠিক তা যদি সূর্য পশ্চিমে উঠে কিংবা পৃথিবী সমতল হয় তবুও! তাই ৭-৮ শতকের মুসলিম সাম্রাজ্যের অধীনে থাকা বিজ্ঞানীদের বিভিন্ন জ্ঞানের উপরে গ্রীকদের এসব অনুমাননির্ভর কথার উপরেই ভরসা করতে হত। কিন্তু তারা এখানেই আটকে থাকেনি, নিজেদেরকে আরো আগে বাড়িয়েছেন। তারা জ্ঞানকে অপ্রমাণিত অবস্থায় তুলে এনে সেটাকে প্রমাণ করেছেম, ভুলকে সঠিক করেছেন, সঠিককে করেছেন যথার্থ। এটাই তো জ্ঞানের শিক্ষা, এটাই তো আমাদের আগামীর পথ দেখাবে।

মা এসে চায়ের কাপগুলো উঠাল। রাফাতকে দিয়ে গেল বাবার কোলে। খিলখিল হাসির দমকের মাঝেই মামার কথা রুহীর কানে আসতে থাকল,

-        আল-কিন্দী একজন এক্সপেরিমেন্টাল কেমিস্ট ছিলেন। তিনি সুগন্ধি নিয়েও অনেক কাজ করেছেন। তার বিখ্যাত বই “কিতাবুল কিমিয়া আল-ইতর” প্রায় শতাধিক সুগন্ধি তেল, সুগন্ধি পান সহ বিভিন্ন কিছুর রেসিপি লেখা ছিল।

-        রুহীর যারপরনাই অবাক হবার পালা! সেই সময়ে এতকিছু কিভাবে সম্ভব হয়েছিল ভেবেই কিনারা পায় না! আরোও জানতে তার মন আকুপাকু করে। কিন্তু মামার সময় শেষ, তার উঠতে হবে, তাই ইচ্ছা এখানেই সমাপ্তি।

আল-রাযীর জিনিয়াসনেসে

আল-কিন্দীকে নিয়ে জানার অপূর্ণতা রুহীকে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছিল। ভাবছিল শনিবার ক্লাসে নূর স্যারকে দেখানোর জন্য কিছু তথ্য নিয়ে গেলে মন্দ হবে না, বাকিরাও বুঝতে পারবে অনেক কিছু, ওদের অনেক ভুল ধারণা মিটে যাবে। কিন্তু হল কি সার্চ দিতে দিতে সে পেয়ে গেল একজন ডাক্তারকে যিনি কিনা রসায়নেও বেশ অবদান রেখেছেন। আচ্ছা, রসায়ন আর মেডিকেল কি ভাই-ভাই না?

প্রথমত তাকে শিশুরগের চিকিৎসার জনক! আরো দুটি সুন্দর কথা হচ্ছে বিখ্যাত চিকিতসকদ্বয় ইবনে সিনা এবং আল-বিরুনীও তার পথের অনুসারী। বলা যায় উভয়ই তার ছাত্র! জাবিরের দেখানো পাতন পদ্ধতিকে তিনি আরোও উন্নত করেছিলেন। তিনি অপিয়ামকে প্রক্রিয়া করে অপারেশনের কাজে ব্যবহারের জন্য জ্ঞাননাশক পদার্থও উদ্ভাবন করেছিলেন! এবং এটি তিনিই প্রথম করেছিলেন। এসবই কি শেষ? না, মোটেও না। আলকেমির উপরেও লিখেছেন বিরাট বই! যার নাম “আল-আসরার”। অর্থ হয় “সিক্রেট বা গোপন”। সেখানে রয়েছে বিভিন্ন মিনারেলস থেকে পাওয়া যায় এমনসব কেমিক্যালের নাম, প্রানী এবং উদ্ভিদ থেকে পাওয়া এমন প্রয়োজনীয় বস্তুগুলোর নাম যেগুলো চিকিৎসার কাজে ব্যাপক ভাবে লাগত। তিনি স্মল পক্সের মত অসুখ নিয়েও বই লিখেছেন। এই অসুখে সাধারণত জ্বর হয় এবং মুখজুড়ে দাগ হয়ে যায়। মিজলস নিয়েও লিখেছেন, যেখানে চোখ গরম থাকে এবং শরীরজুড়ে দাগ পড়ে যায়। চোখের পিউপিল বা চক্ষুতারাই যে প্রথম আলোতে আন্দোলিত হয় এটিও তিনিই প্রথম বলেছিলেন! তাকে আরো বলা হয় চিকিৎসকদের শিক্ষক এবং চোখ সংক্রান্ত জ্ঞানের আলাপচারীতার সুচনাকারী।

এতসব পড়তে পড়তে রুহীর মাথা ঘুরে যায়! তবুও আগ্রহ বিন্দুমাত্র কমে না। জ্বরে বাড়া পারদের মত তা উপরে উঠতেই থাকে, উঠতেই থাকে। যা যা পড়েছে এবং শুনেছে সত্ত্বর তার নোট ডায়েরীতে লিখে ফেলে সে, আগামীকাল অন্তত সাওদাকে দেখাতে হবে। জানার রোমাঞ্চে তার লেখার গতি বেড়ে যায়, সন্ধ্যা পরে চাঁদের কায়া পাশের জলাশয়ে পড়ে। সেদিকে তাকিয়ে থেকে ছোট্ট মেয়েটিও ফিরে যায় সেই চাঁদোয়া সময়ে, কিন্দী কিংবা রাযীর হাত ধরে হাটতে হাটতে পৌঁছায় বায়তুল হিকমাহর দোরগোড়ায়, জাবির সেখানে তাকে স্বাগত জানায় আর খালিদ ইবনে ইয়াযিদ যেন কাছে বসিয়ে নানান পরিকল্পনা শুনায়, মেয়েটা ঘুমিয়ে পড়ে আর তার স্বপ্নে আগামীরা বেঁচে ফেরার দৃশ্যে বিভোর হয়। 

 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ