
এক কাব্যিক
অনুসন্ধানী
সাজ্জাদুর
রহমান
ছন্দময়ী জীবন
১০৭৯ সাল। মুঠোবদ্ধ হাত পিছে বেঁধে সুলতান মালিক শাহ অস্থিরতার সাথে পায়চারী
করছেন, সেখানে আছে একটি চিঠি। ইসফাহানের প্রধান মানমন্দিরের পরিচালক এটি পাঠিয়েছে।
তারচেয়েও বড় কথা এই চিঠিতে সুলতানের দীর্ঘদিনের ইচ্ছা সফল হওয়ার সংবাদ! নিজাম-উল-মুলকের
অপেক্ষা, সে আসলেই একত্রে স্বচক্ষে দেখতে ছুটে যাবেন।
যেন-তেন কিছু নয় সাক্ষাৎ একটা সৌর দিনপঞ্জি! তখনকার দিনে রাজ্যসহ যাবতীয়
সবই পরিচালনা হত চন্দ্র দিনপঞ্জিতে। সেখানে বছর গণনা হত ৩৫৪ দিনে। আরবের অকৃষিজাত সমাজে
সেটা যথার্থ অবস্থান রাখলেও বাকী বিশ্বের কৃষিভিত্তিক সমাজগুলোতে সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছিল।
যেমন ফসল তোলার মওসুম, বৃষ্টির মওসুম সহ বিভিন্ন প্রয়োজনীয় সময়ের প্রায়শই তারতম্য হত।
সেজন্যই সাম্রাজ্যের যাবতীয় ব্যবস্থাপনা সঠিক, স্বচ্ছ ও যথাযথ রাখতে একটি নতুন দিনপঞ্জির
প্রয়োজন হল। সেলজুকী সুলতান মালিক শাহ তাই ১০৭৩ সালে ক্ষমতাসীন হয়েই রাজধানী ইসফাহানে
মানমন্দির গড়ে তুলেন এবং সমরখন্দ থেকে ওমর খৈয়ামকে নিজাম-উল-মুলকের পরামর্শে উড়িয়ে
নিয়ে আসেন। আজ সুলতান সেই দিনপঞ্জিটিই দেখতে যাচ্ছেন, ছয় বছরাধিককালের গবেষণার ফল উম্মোচিত
হওয়ার অপেক্ষায়, জালালী ক্যালেন্ডার উদ্বোধনের অপেক্ষায়।
জালালী ক্যালেন্ডার তার অসামান্য অবদান। তিনি এই কাজ করতে গিয়ে সৌর বছরের
দৈর্ঘ্য অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে বের করতে পেরেছিলেন এবং তা ছিল দশমিকের পর ছয় ঘর পর্যন্ত!
তার হিসাবে এক বছরে ছিল ৩৬৫.২৪২১৯৮৫৮১৫৬ দিন। এই পরিমাপ অনুযায়ী প্রতি ৫৫০০ বছরে একঘন্টার
গড়মিল হয়। ঊনিশ শতকের শেষাংশের পরিমাপে এই বাৎসরিক দৈর্ঘ্য ছিল ৩৬৫. ২৪২১৯৬ দিন। বর্তমানে
এটি ৩৬৫.২৪২১৯০ দিন। বর্তমানে আমাদের ব্যবহৃত গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারে এটি হয় প্রতি
৩৩০০ বছরে একদিনের তারতম্য দেখা যায়। ১০৭৯ সালে সুলতান মালিক শাহ সেলজুকী তার এই গবেষণাকর্মকে
স্বীকৃতি দিয়ে সবার জন্য চালু করেছিলেন। তার করা এই কাজ পারসিয়ান বা ইরানিয়ান ক্যালেন্ডারেরও
ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছিল, যা বহু বছর পরে এখনো ব্যবহার হচ্ছে।
গিয়াসুদ্দিন আবুল ফাতিহ ওমর ইবনে ইবরাহীম খৈয়াম ইতিহাসের
এক সোনালী সময়ে এই পৃথিবীতে চোখ মেলেছিলেন। খোরাসানের রাজধানী নিশাপুরে ১০৪৮
সালে তিনি জন্ম নিয়েছিলেন। বিশ বছর বয়সে সমরখন্দের মত প্রসিদ্ধ জায়গায় পাড়ি জমান এবং
শিক্ষা সমাপন করেন এবং অবশেষে জ্ঞানকেন্দ্র বুখারায় এসে নিজেকে একজন আলোচিত গণিতবিদ,
কবি এবং জ্যোতির্বিদ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। তিনিই প্রথম বীজগাণিতিক ত্রিঘাত সমীকরণ
সমাধান করেন। এক্ষেত্রে পরাবৃত্তকে বৃত্তের ছেদক হিসেবে নিয়ে সমাধান করা হয়। দিনপঞ্জি
সংস্কারেও তার অবদান উল্লেখযোগ্য। রেনে দেকার্ত, ইতিহাসে যাকে বলা হয়েছে বীজগণিত এবং
জ্যামিতিকে একই সূত্রে গেঁথেছেন, তার আগেই খৈয়াম বিশ্লেষণী জ্যামিতি নিয়ে বিস্তর আলাপ
করেছেন। শুধু কি এটুকুই? না! এই কবি-বিজ্ঞানী স্বাধীনভাবে দ্বিপদী উপপাদ্যও আবিষ্কার
করেছেন। তার করা ইউক্লীডের সমান্তরাল স্বীকার্যের সমালোচনা পরবর্তীতে অ-ইউক্লীডীয় জ্যামিতির
সূচনা ঘটায়। ১০৭০ সালে সমরখন্দে বসে তিনি রচনা করেন বিখ্যাত বই যা ছিল বীজগণিত নিয়ে।
গণিত নিয়ে তার কিছু কাজ এখনো পাওয়া যায়। তন্মধ্যে,
১০৭৭ সালে লিখিত ইউক্লীডীইয় জ্যামিতির উপর কৃত সমালোচনা, ত্রিঘাত সমীকরণ সমাধানের ক্ষেত্রে
পরাবৃত্তকে বৃত্তের ছেদক হিসেবে ধরে কৃত আলোচনা, বীজগাণিতিক সমস্যাবলী নিয়ে আলোচনা
যা ১০৭৯ সালে করেছিলেন এবং দ্বিপদী উপপাদ্য নিয়ে বিস্তর আলোচনাগুলো প্রণিধানযোগ্য।
এই মনীষী ৮৩ বছর বয়সে ১১৩১ সালে নিশাপুরেই মহান রবের
ডাকে সাড়া দিয়ে পরপারে পাড়ি জমিয়েছেন।
বীজগণিত
হাইস্কুলে বীজগণিত আমাদের অনেকের কাছেই বিভীষিকা! x, y, z ব্যবহার করে কতই না আজব আঁকিবুঁকি। যেমন, ax2+bx+c=0, এটি হচ্ছে দ্বিঘাত সমীকরণ। আবার রয়েছে, ax3+bx2+cx+d=0, এটি হচ্ছে ত্রিঘাত সমীকরণ। প্রথমটির চেয়ে দ্বিতীয়টি সমাধান করা বেশী কষ্টসাধ্য। খৈয়াম বুঝেছিলেন প্রচলিত গ্রীক পদ্ধতি দিয়ে এটিকে যথার্থ ভাবে সমাধান করা যাচ্ছে না। তিনি দেখালেন এই ধরণের ত্রিঘাত সমীকরণের একাধিক উত্তর থাকতে পারে! পরাবৃত্তকে বৃত্তের ছেদক হিসেবে নিয়ে ত্রিঘাত সমীকরণের জ্যামিতিক সমাধান উপস্থাপন করেন। যদিও আর্কিমিডিস তার সময়ে একই ধরণের সমাধানের সূচনা করেছিলেন তবে খৈয়াম এখানে আরো সাধারণ এবং পদ্ধতিগত ভাবে এগিয়েছেন। এমনকি মাত্র বাইশ বছর বয়সেই তিনি তার জীবনের এই অন্যতম শ্রেষ্ঠ কাজটি করেছিলেন, যার নাম ছিল, “ট্রিটিজ অন ডেমোন্সট্র্যাশন অব অ্যালজেবরা এণ্ড ব্যালেন্সিং”।
তিনি বিভিন্ন ধাপে
সমাধানের ক্ষেত্রে ঋণাত্মক মানগুলোকে ছেড়ে যেতেন, কেননা তখনো ইসলামী বিশ্বের গণিতে
ঋণাত্মক মানের স্বীকৃতি ছিল না। যদিও তৎকালীন ভারতীয় গণিতে ঋণাত্মক মানের অস্তিত্ব
দেখা যায় যার শুরু হয়েছিল আরো চারশত বছর আগে। যদিও খৈয়ামের কাজটি দূর্দান্ত ছিল তবুও
তিনি এই সমাধানের জন্য জ্যামিতিক প্রক্রিয়া ব্যবহার করাতে অসন্তুষ্ট ছিলেন। তিনি চাইতেন
যেন শুধু বীজগাণিতিক রাশি দিয়েই যেন সমাধান করা সম্ভব হয়। মজার ব্যাপার হচ্ছে তখন বীজগণিতকে
এখনকার মত সংখ্যা দিয়ে প্রকাশ করা হত না! তাহলে তিনি কিভাবে এতসব গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো
করেছিলেন? বর্তমানে আমরা লিখি, “Solve for x: x2 + 6 = 5x”। তিনি লিখেছিলেন, “একটি নির্দিষ্ট
রাশির মান কত হবে যখন এটির বর্গের সাথে ছয়টি দিরহাম যোগ করা হয়, ফলে সেটি রাশিটির পাঁচগুণ
হয়”।
বীজগণিত এবং জ্যামিতিকে সংযুক্তিকরণ
রেনে দেকার্ত এবং পিয়েরে দ্য ফেরমা’
১৬০০ সালের দিকে পরিপূর্ণভাবে বীজগণিত এবং জ্যামিতিকে একই সূত্রে গাঁথতে সক্ষম হন।
এবং তাদের সাধনা থেকে শুরু হয় আধুনিক যুগের x-y
কো-অর্ডিনেট সিস্টেমের। খৈয়ামের ত্রিঘাত সমীকরণ নিয়ে করা কাজগুলো এই পদ্ধতিটির
একটি ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছিল। সে ইউক্লীডের বই “এলিমেন্টস” থেকে তত্ত্ব নিয়ে বলেন,
“যারা বীজগ্ণিতকে অজানাকে প্রাপ্তির জন্য কৌশল মনে করে তারা অযথাই এরকমটা করে। যারা
বলে বীজগণিত এবং জ্যামিতি পরস্পর আলাদা, তাদের কথায় মনোযোগ দেবার কিছুই নেই। সত্য হচ্ছে,
বীজগণিত হল জ্যামিতিক ফ্যাক্টস যা ইউক্লীডের এলিমেন্টস এর দুই নং বইয়ের পাঁচ এবং ছয়
নং তত্ত্ব দ্বারা স্বীকৃত”। এলিমেন্টস বই ইউক্লীড প্রণীত বিভিন্ন গাণিতিক তত্ত্ব, প্রমাণ,
সংজ্ঞা, প্রস্তাব সম্বলিত তেরটি বইয়ের একটি সংকলন।
বছরের দৈর্ঘ্য
১০৭৩ সালে ইসফাহান থেকে তিনি আমন্ত্রণ
পান। তখন বছরের দৈর্ঘ্যের কোনো সঠিক পরিমাপ ছিল না। এরজন্য কৃষিসহ আনুষাঙ্গিক বিভিন্ন
কাজে নিয়মিত সমস্যা দেখা যেত। খৈয়াম এসেই আরো কয়েকজন ব্যক্তিকে কাজের জন্য নিয়োগ করলেন।
তারা হিসাব করে পেলেন ১,০২৯,৯৮৩ দিনে হয় ২,৮২০ বছর! এই হিসাব থেকে এক বছরের দৈর্ঘ্য
হয়েছিল ৩৬৫.২৪২২ দিন। বর্তমানে আমরা জানি, বাৎসরিক দৈর্ঘ্য বছর থেকে বছরে ত্রিশ মিনিটের
পরিবর্তন হয়ে থাকে। গড় দৈর্ঘ্য হচ্ছে ৩৬৫.২৪২১৮৯ দিন। তৎকালীন সময়ে কিছু প্রকাশ করতে
সাত সংখ্যার কোনো ফিগারকে তাৎপর্যপূর্ণ ধরা হত, যেরকমটা আমরা খৈয়ামকে দেখেছি সব সাঙ্খ্যিক
মানকে সাত সংখ্যার ফিগার হিসেবে প্রকাশ করতে। বর্তমানের হিসাবকে যদি এভাবে প্রকাশ করা
হয় তবে দাঁড়ায় ৩৬৫.২৪২২ দিন! যা খৈয়ামের হিসাবের সাথে পুরোপুরি মিলে যায়! যদিও বছরের
দৈর্ঘ্য একটু একটু করে ফিবছরই বারছে তবে এটি খুবই স্বল্প সময়ের জন্য বাড়ে। এতে করে
খৈয়ামকালীন এবং বর্তমানের হিসাবে খুব বেশী তারতম্য দেখা যায় না।
সমান্তরাল তত্ত্ব
ইউক্লীড তার এলিমেন্টস রচনা করেন খ্রিষ্টপূর্ব
৩০০ সালে। এটিকে এখনো গণিতের ইতিহাসে অন্যতম প্রভাবশালী বই হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
বইটি পাঁচটি জ্যামিতিক তত্ত্বের উপর লিখিত। বলা হয়েছে এই পাঁচটি তত্ত্বকে জ্যামিতির
ক্ষেত্রে সত্য বলে ধরে নেওয়া যায়। যেমন, “সকল সমকোণ একে অপরের সমান”।
ইউক্লীদের পঞ্চম তত্ত্ব ছিল সমান্তরাল
তত্ত্ব। বহু বছর ধরে এই সমান্তরাল তত্ত্ব গাণিতিকদের জন্য ছিল হতাশা, মজা, আনন্দ, বিস্ময়ের
বিষয়। তবে আনন্দটা হত ক্ষণস্থায়ী, যারাই ভাবত এই তত্ত্বকে প্রমাণ করতে পেরেছে তারা
পরক্ষণেই এতে কোনো ভুল খুঁজে পেত এবং মনোভাব বদলাত বিষাদে!
ইউক্লীড দুইটি সমান্তরাল সরলরেখা ধরেছিলেন যাদেরকে আরো
একটি সরলরেখা ছেদ করত। যদি এতে করে তাদের অভ্যন্তরীণ কোণগুলোর মান ১৮০ ডিগ্রী থেকে
কম হয় তবে তারা একটা সময়ে গিয়ে মিলিত হবে। এটি প্রকাশ হওয়ার পর থেকে গাণিতিকরা প্রমাণ
করার জন্য উঠেপড়ে লেগেছিলেন। তারা চেষ্টা করেছিলেন ইউক্লীডের পূর্ব চারটি তত্ত্ব ব্যবহার
করে এটিকে প্রমাণ করতে। এখন আমরা জানি, ওই চার তত্ত্ব ব্যবহার করে এই পঞ্চম তত্ত্বকে
প্রমাণ করা যায় না।
এখানে খৈয়াম একটি ভিন্ন পদ্ধতি ভাবলেন।
তার “এক্সপ্ল্যানেশনস অব দ্যা ডিফিকাল্টিজ ইন দ্যা পোস্টুলেটস ইন ইউক্লীডস এলিমেন্টস”
বইতে তিনি একটি সরলরেখা কল্পনা করতে বলেন। যদি রেখাদুটি একটি অপরটির উপর সমকোণে স্থাপিত
বা উল্লম্ব হয় তবে তিনটি সম্ভাব্য অবস্থা দেখা যায় এবং এখানে একটি চতুর্ভুজিক চিত্র
পাওয়া যায়।

এক্ষেত্রে তিনি দেখান শুধুমাত্র মাঝের
অবস্থাটি সম্ভব ইউক্লীডের তত্ত্বনুযায়ী। বাকি ক্ষেত্রে কোণ C, D এর মান অবশ্যই সমকোণ হবে না। এভাবে
তিনি ভেবেছিলেন যে তত্ত্বটি প্রমাণ করে ফেলেছেন! তবে এভাবে প্রমাণ না হলেও তত্ত্বটি
ভিন্নভাবে প্রকাশ পায়। এবং এখান থেকেই অ-ইউক্লীডীয় জ্যামিতির সূচনা দেখা যায়।
এসবই ছিল ওমর খৈয়ামের ঘটনাবহুল জীবনের
কিছু অংশ। এর বাইরে তার কাব্যিকতা পুরো বিশ্বকেই নাড়া দিয়ে যায়। তিনি ছিলেন একজন পলিম্যাথ।
একাধারে দার্শনিক, গাণিতিক, জ্যোতির্বিদ, কবি এবং তাত্ত্বিক।
তথ্যপঞ্জী
- 1. Dictionary of Scientific Biography. S. G. NAVASHIN - W. PISO by Charles Coulston Gillispie (editor in chief)
- 2. Science and Technology in World History, Vol. 2 Early Christianity, the Rise of Islam and the Middle Ages by David Deming
- 3.
The making of Islamic science by Muzaffar Iqbal
- 4.
Lost
History the Enduring Legacy of Muslim Scientists, Thinkers, and Artists by
Michael H Morgan
- 5. https://www.famousscientists.org/omar-khayyam
- 6. https://www.britannica.com/biography/Omar-Khayyam-Persian-poet-and-astronomer


0 মন্তব্যসমূহ