লেখা তরজমা

রসায়নের গল্প - ০২

 

রসায়নের গল্প ০২
সাজ্জাদুর রহমান


শাসন ছেড়ে রসায়নে

নূর স্যার এতই মজা করে পড়ান যে ছেলেপেলেরা তন্ময় হয়ে থাকে। মনোযোগের কমতি থাকে না, তার উপর আবার প্রথম ক্লাসই তার। এভাবেই দেখতে দেখতে প্রথম সেমিস্টারের সময় ঘনিয়ে আসতে শুরু করল। সবার মাঝেই চাপা দুশ্চিন্তা, হালকা ভয় ভয় কাজ করছে! কারণ এরপরের ক্লাস নিতে আসবেন ফাতেমা ম্যাম। গণিত পড়ান, ভীষণ কড়া বৈকি! তার চোখরাঙানো যেন কালবৈশাখীর মেঘের গুড়গুড় ধ্বনি! গতকাল আবার বিশাল হোমওয়ার্ক দিয়েছিলেন, রুহী সেটা শেষ করতে পারেনি। আজকে আবার সাওদাও কেন জানি ক্লাসে আসেনি! সবমিলিয়ে দিনটাকে মোটামুটি চিন্তাজনকই বলা যায়।

তবে কিনা চিন্তা আর স্বস্তি পাশাপাশি চলে! হুট করে দপ্তরী এসে জানাল গণিত ম্যাম আজকে স্কুলেই আসেনি! এদিকে স্যারও জানালেন তার সেকেন্ড পিরিয়ডে কোনো ক্লাস নেই। সবাই সমস্বরে গল্প, গল্প, গল্প বলতে বলতে স্যারের কান ঝালাপালা করে দিল! তো চিরাচরিত নিয়মানুযায়ী আজকে আবারো ইতিহাস নিয়ে কচকচানি শুনতে সবাই সোজা হয়ে বসে গেল।

-        তোমরা কি আজকে একজন শাসকের গল্প শুনবে যিনি রসায়নের জন্য ক্ষমতা ছেড়েছিলেন?

-        রসায়নের জন্য কে ক্ষমতা ছাড়ে রে বাবা! ক্লাসে একটা মৃদু গুণগুণ ছড়িয়ে পড়ল, সবার চোখ রসগোল্লার মত হয়ে আছে।

-        তার নাম ছিল খালিদ ইবনে ইয়াযিদ ইবনে মুয়াবিয়া। নাম শুনেই বুঝেছ তিনি উমাইয়া খেলাফতের প্রতিষ্ঠাতা মুয়াবিয়া (রাঃ) এর নাতি। স্বাভাবিকভাবেই বাবা ইয়াযিদের পর তারই ক্ষমতার মসনদে বসার কথা ছিল। কিন্তু তিনি জ্ঞানচর্চায় মন দিলেন।

সবার আগ্রহ ভরা মুখের দিকে তাকিয়ে স্যার আবারো শুরু করলেন।

-        আরবদের মাঝে তিনিই প্রথম যে আলকেমি চর্চা শুরু করেছিলেন। অনুবাদও করেছিলেন বেশকিছু। প্রখ্যাত জ্ঞানবিদ আল-বিরুনী একাদশ শতকেও তার লেখা একটি বই পেয়েছিলেন, নাম ছিল “কিতাবুল তামার বা বুক অব দ্যা ফ্রুট”। এখন এটি হারিয়ে গিয়েছে।

-        আমরা কতই না দূর্ভাগা! একরাশ আক্ষেপ ঝড়ে পড়ল রুহীর কন্ঠ থেকে। পাশ থেকে একজন বলল, “স্যার, মুসলিমরা হুট করে কেনই বা এভাবে অন্যান্য জ্ঞানের প্রতি আগ্রহী হল?”

-        অবশ্যই হুট করে নয়, এর একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া তো ছিলই। মুসলমানরা সবসময়ই জ্ঞানার্জনে ব্যাপৃত ছিল। শেখার সব সুযোগকেই তারা কাজে লাগাত। রাসূল (সাঃ) এর যুগে সাহাবাদের ভাষা শিক্ষা, বদর যুদ্ধের পর মুশরিক বন্দীদের থেকে অক্ষরজ্ঞান শিক্ষা এসব ছোটখাটো কিছু উদাহরণ।

স্যার ত্রতব্যস্ত হয়ে বারবার ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছিলেন, বললেন কাজ পড়ে গিয়েছে, চলে যেতে হবে। তবে কিছু হোমওয়ার্ক দিয়ে গেলেন। আগামী ক্লাসের জন্য জেনে আসতে হবে জাবির ইবনে হাইয়ান, মুহাম্মাদ ইবনে যাকারিয়া রাযী এবং ইয়াকুব ইবনে ইসহাক কিন্দী সম্পর্কে।

                               

কুফার গবেষণাগারে

-        আচ্ছা, আব্বু, জাবিরকে নিয়ে আমার আরো জানা লাগবে।

খাবার টেবিলে বসেই বাবার দিকে উৎসুক দৃষ্টি ঝেড়ে দিল রুহী। যেন না জানলে আজকে তার খাবারই হজম হবে না!

-        হ্যা, আমরা ল্যাবরেটরী পর্যন্ত গিয়েছিলাম। সেখানে কি কি করেছেন শুনো তাহলে। তিনি উর্ধ্বপাতন, স্ফটিককরণ, পরিস্রাবণ, পরিশোধন, কেলাসন, তরলীকরণ, পাতন, জারণ, বাষ্পীভবন এবং টাইট্রেশনের মত আধুনিক পরীক্ষণগুলো করেছিলেন!

-        রুহীর গোলগোল চোখগুলো যেন কথার তালে তালে আরোও বড় হতে থাকে। সেইস অময়ে এতকিছু কিভাবে সম্ভব হয়েছিল!

-        শুধু কি এসবই নাকি মেয়ে! আরোও শুনো। তিনি ফিটকিরি পাতন করে সালফিউরিক এসিডও প্রস্তুত করতে পেরেছিলেন! এরপরে তিনি পদার্থগুলোকে প্রথম তিন ভাগে ভাগ করেছিলেন। গ্যাসীয়, কঠিন এবং তরল। তিনি বের করেছিলেন কিভাবে বিভিন্ন পদার্থ নিজেদের বৈশিষ্ট্য ঠিক রেখে যৌগ গঠন করে! তোমার কাছে এসব হয়ত খুবই সাধারণ লাগবে শুনতে, তবে এটাও তো জানো এসব আরো সাড়ে বারশ বছর আগের কথা!

-        না, আব্বু। আমি বুঝতে পেরেছি আসলে তিনি সময়ের থেকে কতটা এগিয়ে ছিলেন!

-        তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার হচ্ছে এসিডগুলো।

-        তিনি আরোও এসিড আবিষ্কার করেছিলেন? রুহীর মুখ যেন এখন বেলা বিস্কুট সাইজের হা হয়ে রইল, হাতের লোকমাটা প্লেটে পড়ে গেল।

-        হ্যা, আরো করেছিলেন। এসবকে আবিষ্কারের চাইতে পরীক্ষণ বলাই ভালো। তিনি বিভিন্ন এসিড নিয়ে পরীক্ষা-নিরিক্ষা চালিয়েছিলেন। আগেকার বিশ্ব ভিনেগার, যাকে আমরা এসিটিক এসিড বলে জানি, সেটা ছাড়া অন্য কোনো এসিডের অস্তিত্ব আছে বলে জানত না! ভিনেগারের একটি নির্দিষ্ট স্বাদ আছে। জাবির সালফিউরিক, নাইট্রিক, নাইট্রোমিউরিএটিক এসিড আবিষ্কার করে রসায়ন গবেষণার ক্ষেত্রে ব্যাপক একটা ক্ষেত্র উম্মোচন করে ফেলেছিলেন। রসায়ন শিল্পে এসব এসিডের গুরুত্ব এখনো অনেক বেশী।

রুহীর এবার যারপরনাই অবাক হওয়ার পালা! আর প্রশ্ন কি করবে, ভাবতেই সময় চলে যাচ্ছে। এত আগে একজন মানুষ কিভাবে এতকিছু করলেন! তবে বাবার গমগমে কন্ঠ কানে ভেসে আসাতে ভাবনার চাদরে ভাজ পড়ল, আবার কথার দিকে মনোযোগ দিল।

-        তিনি পরিমাপ নিয়েও কিছু কাজ করেছিলেন। তিনি এতটাই সূক্ষ্ণ পরিমাপক স্কেল বানিয়েছিলেন যা দিয়ে এক কেজির চেয়েও ৬৪৮০ গুণ ক্ষুদ্র কোনো কিছু পরিমাপ করা যেত! তিনি বিভিন্ন পরীক্ষণের মাধ্যমে দেখেছিলেন নির্দিষ্ট জারণ অবস্থায় পদার্থের ওজন হ্রাস পায়।

-         আব্বু, বলেছিলে তিনি অনেক বই লিখেছিলেন। সেগুলো কি বিষয়ে ছিল?

-        হ্যা, সেগুলো অনেক বিষয়ই নিয়ে এসেছিল। যেমন, রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য, পরিমাপ, রাসায়নিক যৌগ, রঙ, ইত্যাদি। এসবে তিনি রাসায়নিক বিভিন্ন পরীক্ষণে ওয়াটার বাথ (জলগাহ) এবং তাপের ব্যবহার নিয়ে আলোচনা করেছিলেন। এছাড়াও মার্কারীর অক্সাইড এবং সালফারের বিভিন্ন যৌগ নিয়েও আলাপ ছিল। কাপড়, চামড়া ও চুলে রঙ করা নিয়েও তার বিস্তর গবেষণা ছিল।

হাত ধুয়ে টেবিলে এসে বসে আবারো শুরু করলেন কথা।

-        কাপড়কে পানিরোধী করা, লোহাকে মরিচা পড়া থেকে রক্ষা, গ্লাস তৈরির জন্য ম্যাঙ্গানিজ ডাই-অক্সাইড নিয়ে কাজ, স্বর্ণের উপর লেখার জন্য পাইরাইট নিয়ে পরীক্ষণ, সিরামিক ও টাইলের উজ্জ্বলতার জন্য লবণের ব্যবহার, ভিনেগারের পাতন থেকে ঘন এসিটিক এসিড তৈরি, আগুনপ্রতিরোধী কাগজ, রাতেও পড়া যাবে এমন ধরণের কালি নিয়েও তার কাজের কথা পাওয়া যায়। এছাড়াও তার ধাতু পরিশোধন সংক্রান্ত গবেষণা ঢালাই শিল্পে বেশ কার্যকরী ছিল।

রুহী যেন একদম চুপ হয়ে রইল। শুনতেই ভালো লাগছে, প্রশ্ন আর করছে না। মানুষকে সত্য জানাতে, জীবনযাত্রা সহজ করতে, সমাজকে সাবলীল ভাবে চালাতে এই মানুষরা সীমিত উপাদান দিয়ে কত কিছুই না করে গিয়েছেন! তারা জ্ঞানার্জনে কতি না আগ্রহী থাকতেন! নিজেদেরকে বিলিয়ে দিতেন। ভাবতে ভাবতে আবারো বাবার কথা ভেসে আসতে থাকল।

-        তার করে যাওয়া এইসব পদ্ধতিগুলো ১৮ শতকে এসেও কিঞ্চিৎ পরিবর্তন, পরিমার্জন করে বিজ্ঞানীগণ কাজে লাগাতে পেরেছেন। তাহলে বুঝতেই পারছো তার কাজের পরিধি কত বিস্তৃত ছিল!

-        তাহলে আব্বু, তার এসব কাজ এখন কোথায় আছে, কেন আমরা সেসব এখন কোথাও দেখি না? একরাশ হতাশা যেন ঝড়ল পিচ্চি মেয়েটার কন্ঠে।

-        তার মৃত্যুর পর সেসব কুফাতেই ছিল। এরও দুইশ বছর পরে বাগদাদের দামাস্কাস গেটের পাশে কিছু বাড়ি সংস্কারের কাজ করতে গেলে তার কাজকর্মের কিছু অংশ সেখানে পাওয়া গিয়েছিল। পরবর্তীতে হালাকু খানের ধ্বংসযজ্ঞের মাধ্যমে বাগদাদ তার সোনালী দিন হারালে এইসব অনেক গবেষণাকর্ম, বই কালের গহ্বরে হারিয়ে যায়!

সময়ের কাটা ঘুরে বিকাল হল। রুহী ঘরে আসর আদায় করে বারান্দায় চা হাতে বসল। পাশের কৃষ্ণচূড়া গাছে ফুল ফুটতে শুরু করেছে, বৈকালিক মৃদু সূর্যরশ্মি সেই ফুলগুলোকে আরোও যেন অতীতের মায়ায় আচ্ছন্ন করল। হালকা বাতাস, কান ছুঁয়ে যাওয়া ইতিহাসের গল্পের মত! কতই না বাস্তব, তবুও কতই না দূরে! এই বাতাসকে বশ করতে হবে, ফেরাতে হবে আবার সোনালী সুদিন। সুর্য ডুবে যায় আবার উঠার জন্যই, আমাদেরও আবার উঠতে হবে। আকাশের লোহিত রাঙার সাথে তার মনের কোণেও দৃঢ় হল এক প্রতিজ্ঞা, উঠতেই হবে আমাদের, ছুতে হবে সেই লোহিত গগণ, ফেরাতে হবে সেই সুদূর স্বর্ণালী অতীত, আমাদেরকে ফিরতেই হবে। 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ