লেখা তরজমা

আলোর আবাস (অসমাপ্ত)


 আলোর আবাস (অসমাপ্ত) 

জিম আল-খলিলী

অনুবাদঃ সাজ্জাদুর রহমান 


সারগন, আক্কাদের অধিপতি, ইশতারের সর্বদ্রষ্টা, কিশের সম্রাট, আনূর অভিষিক্ত ধর্মযাজক, ভূখণ্ড শাসক; তিনি উরুককে পরাজিত করেছেন, ভেঙে দিয়েছেন তার প্রতিরোধ দেয়াল। উরুকের রাজা লুগালজাজ্ঞিসি যুদ্ধে বন্দী হয়েছে। তাকে এনলিলের দরজায় কুকুরের গলাবন্ধ পরিয়ে হাজির করা হয়েছে।

(প্রাচীন সাহিত্য)।

একঘন্টা ড্রাইভ করে বাগদাদ থেকে দক্ষিণে গেলে হিন্দিয়া শহরটি পাওয়া যায়। এই শহরেই আমার আনন্দময় কৈশোরের শেষদিনগুলো কাটিয়েছি। অতঃপর ১৯৭৯ সালে ইরাক থেকে সুখের উদ্দেশ্যে স্থানান্তর করি। উসমানীদের ক্রান্তিকালে ১৯১৩ সালে ফোরাত নদীর উপরে হিন্দিয়া বাধটি নির্মাণ করা হয়। সেখান থেকে শহরটিও এই নাম আপন করে নেয়। এর সাথে রয়েছে আমার দৃঢ় এবং মনলাগানো কিছু অনুভূতি। ঠাণ্ডা শরতের দিনগুলোতে আদিল, খালিদ, যাহরিল দ্বীন এবং আমি ক্লাস পালাতাম, বাধ ধরে হেটে অপর পাশের পর্যটনীয় স্থানে ঘুরে বেড়াতাম। আমাদের বন্ধুত্ব ছিল সবচেয়ে সেরা। হাফ ডজন ফরিদা বিয়ার কিনে নদীর পাড়ে বসে ফুটবল, দর্শন, সিনেমা এবং মেয়েদের নিয়ে আলাপ জমাতাম।

এই সুখময় দিনগুলোর সাথে একই স্তরে আরেকটি শক্তিশালী স্মৃতি আমার অস্তিত্বে হানা দেয় যেন তার স্পষ্ট প্রতিবিম্ব দেখতে পাই। এটি ১৯৯১ সালের প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধকালীন কথা। আমার টিভিতে চলা সিএনএন চ্যানেলে প্রিয় হিন্দিয়াকে দেখাচ্ছিল। ফোরাতের বাধে এক একাকী, আতঙ্কিত এবং মুখাপেক্ষী মহিলাকে দেখা যাচ্ছিল যে ক্রসফায়ারের মাঝে আটকা পড়েছে। আমাদের মতই বাধ পার হয়ে অপর পাড়ে পৌঁছুতে গিয়েই ঘটেছে এই বিপত্তি। অন্য সবার কাছে এটি যুদ্ধের আরেকটি দিন, সশস্ত্র ভয়াবহতার কিয়দংশ মাত্র হতে পারে তবে আমি ফেলে আসা প্রিয় শহরের মাঝে নিজেকে আবিষ্কার করলাম। চিরসবুজ এই মাটি আজ লাল আল্পনায় বিধ্বস্ত। বার বছর পার হয়েছে আমি এই মাটি ছেড়ে এসেছি। মহিলাটি যেখানে আজ একাকী অসহায় এই বাধেই আমাদের কত না বিকাল গড়িয়ে সন্ধ্যা হয়েছিল! আজ সেখানে হাজা্রও শঙ্কায় রাত থেকে ভোর হয়!

১৯৭৯ সাল সমগ্র মুসলিম বিশ্বের জন্যই চিত্তাকর্ষক ছিল। বহু ঘটনার সম্মিলনে পুষ্ট ছিল। মিশরের আনোয়ার সাদাত এবং ইসরায়েলের মেনাহেম বিগেনের মাঝে ওয়াশিংটনে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। গদিচ্যুত শাহ কায়রোতে পালানোর পর ইরানে প্রথম ইসলামী রিপাবলিক প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। পবিত্র শহর মক্কায় বন্দুকযুদ্ধ হয়েছিল পথচ্যুত চরমপন্থীকে থামানোর জন্য যে ছিল হাজারো হজ্জ্বযাত্রীর মৃত্যুর কারণ। তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন আফগানিস্তানে অনুপ্রবেশ করেছিল, তেহরানে আমেরিকান দূতাবাসের কর্মকর্তাদের আটক করা হয়েছিল। এত সবকিছুর মাঝেই সাদ্দাম হোসেন, ফিল্ড মার্শাল মুহাম্মাদ হাসান আল-বকরকে সরিয়ে ইরাকের ক্ষমতা দখল করে এবং যার ফলে বিশাল সংখ্যক জনগণের জীবন ভয়াবহ হয়ে পড়ে। তার ক্ষমতাগ্রহণের ঠিক দুই সপ্তাহ পড়ে আমি পরিবারসহ মার্গারেট থেচারের ব্রিটেনে পা রাখি, তখন ছিল জুলাইয়ের শেষ সময়। আমরা যেন একদম ঠিক সময়েই সরে আসতে পেরেছিলাম! কেননা কয়েক মাসের ভেতরেই সে যুদ্ধের বার্তা নিয়ে ইরানের মুখোমুখি দাঁড়ায়। যদি আমরা পালাতে না পারতাম তবে অবশ্যই এই অযাচিত, উদ্দেশ্যহীন সংঘর্ষে আমাকে এবং আমার ভাইকে জড়াতে চক্রান্ত করা হত, অবশেষে যুদ্ধস্মৃতি নিয়ে বাকী জীবন পার করতে হত। একজন ব্রিটিশ মা, শিয়া মুসলিম বাবা এবং ইরানী বংশোদ্ভূত সন্তান হিসেবে আমরা তাদের কাছে অগ্রহণযোগ্য ছিলাম। একই সাথে যুক্ত হয়েছিল ১৯৫০-এর ইরাকী কম্যুনিস্ট আন্দোলনের সময়ে আমার বাবার বাক-বিতণ্ডাও। এসব আমাদেরকে পরিণত করেছিল পশুর সামনে ফেলে দেওয়া সহজলভ্য খাদ্যের মত।

এরপর থেকেই ইরাকী জীবনযাত্রার মান নিম্নগামী হতে থাকল। আমার শৈশবকালের দৃশ্যগুলো দ্রুত পট বদলাতে লাগল। ১৯৬০ কিংবা ১৯৭০ এর দশকে মধ্যবিত্ত পরিবারের একজন ইরাকী বাচ্চার জীবন ছিল খুবই চমৎকার এবং তুলনামূলক সুখী। আমার বাবা ব্রিটেন থেকে পড়ে আসা ইলেক্ট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন। একজন অফিসার হিসেবে ইরাকী বিমান বাহিনীতে দায়িত্বও পালন করেছেন। আমার বাচ্চাকাল ছিল বৈচিত্র্যময় কারণ বাবাকে বিভিন্ন জায়গায় প্রায়শই স্থানান্তর করতে হত। ৭০-এর দশকের প্রথম দিকে ক্ষমতাসীন বাথ পার্টি অদ্ভুত আইন জারি করল। ব্রিটিশ স্ত্রী আছে এরকম জনবলদের সশস্ত্র বাহিনী থেকে তড়িৎ অব্যাহতি দেওয়া হল, বলা হল তারা বিশ্বাসযোগ্য নয়। কর্মজীবনে এই প্রথমবার বাবাকে বেসামরিক জীবিকার উপায় খুঁজতে হল যখন তিনি মেজর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। সহসাই তিনি পেয়ে গেলেন। প্রধান ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে মা’মাল আল-হারির-এ অবস্থান পাকা করলেন। এটি হিন্দিয়ায় অবস্থিত কৃত্রিম রেশম উৎপাদনকারী একটি রাসায়নিক ফার্ম ছিল। দৈনন্দিন এবং যাবতীয় খরচ পরিমিত করতে আমরাও সত্ত্বর বাগদাদ থেকে হিন্দিয়ায় চলে আসলাম। এটা আমার জন্য সুখকর ছিল কেননা দ্রুত কিছু বন্ধু পেয়েছিলাম এবং “রায়োন ডায়নামোজ” নামে একটি ফুটবল টিমও বানিয়েছিলাম। সেখান পরিহিত নয় নম্বর জার্সিটি এখনো আমি সযত্নে রেখেছি। পরবর্তীতে ভাইয়ের সাথে বসে বিবিসিতে ইংলিশ ফুটবলের খবর রাখতাম, সাধারণত যা প্রতি শনিবারে “স্পোর্টস রিপোর্ট” নামক অনুষ্ঠানে বলা হত। আসলে বিবিসি নিউজ আমাদের ঘরে আবহ সঙ্গীতের মত সবসময় বাজতেই থাকত। সময় পেলে বাগদাদের ব্রিটিশ কাউন্সিল লাইব্রেরিতে নিয়মিত ঘুরে আসতাম। সেটি ছিল আমার ইংলিশ বইসমূহের সরবরাহ কেন্দ্র। এভাবেই বেড়ে উঠতে উঠতে আমি জানলাম স্বৈরতন্ত্র ততক্ষণ সহনীয় যতক্ষণ আপনি মেরুদণ্ড সোজা না করেন, মাথা নিচু রাখেন এবং গোপনে অথবা প্রকাশ্যে ক্ষমতাসীন বাথ পার্টির সমালোচনা না করেন।

দৈনন্দিন জীবনের একঘেয়েমী কাটাতে আমরা ব্যাবিলনের ঝুলন্ত উদ্যানে বেড়াতে যেতাম। হিন্দিয়ার দক্ষিণ-পূর্বে একঘন্টা ড্রাইভ করে আগালেই এই দৃষ্টিনন্দন স্থানটি চোখকে শান্তি দিত। শতাব্দী প্রাচীন এই স্থাপনার তেমন কোনো মাহাত্ম্য আমার কাছে ছিল না। স্কুল ট্রিপে কিংবা বিভিন্ন কারণে প্রায়শই এখানে ঢুঁ মারা হত। এতদসত্ত্বেও ক্লাস ফাঁকির সুযোগে এখানে হুট করে আসা কখনো থামেনি। আমার উদাসীনতা এই ধ্বংসাবশেষ এর উজ্জ্বলতাকে ক্ষীয় করতে পারেনি, এর পরিমণ্ডলের প্রাচীন গৌরবান্বিত, মহিমাসম্পূর্ণ আশ্চর্যগাঁথা এখনো সবার কানে কানে বার্তা দিয়ে যায়। এরকমই একটি ছুটির দিনে পরিবারের সাথে সেখানে গিয়ে আমি দুই টুকরো কাদামাটির ইট পেয়েছিলাম। মুষ্ঠি আকৃতির এই দুটোতে স্পষ্টভাবে প্রাচীন কিউনিফর্ম লিপিতে কিছু লেখা ছিল। ভাই, মা অথবা আমিই সেগুলো তুলে নিয়েছিলাম। যেকোনো অনুষ্ঠানে মা সেগুলোকে লুকিয়ে রাখতেন এবং আমি ও ভাই মিলে তা বাড়ির পেছনে নিরাপদ জায়গায় রেখে আসতাম। এগুলো এখনো আমাদের পরিবারে আলো ছড়িয়ে যাচ্ছে।

এসব শুনে মনেই হচ্ছে বিরাট ধরণের প্রত্নতাত্ত্বিক কোনো চুরি! আমাদের অবশ্যই বাগদাদের ইরাকী জাদুঘরে কিংবা জাতীয় সম্পদ হিসেবে স্থানীয় সরকারের কাছে তা হস্তান্তর করা উচিত ছিল কিন্তু তা করা হয়নি। আমাদের এর পক্ষে বক্তব্যও রয়েছে। এক- একই ধরণের কিউনিফর্ম লিপির ইট আমাদের চারপাশে অহরহ ছিল এবং দুই  হচ্ছে পরবর্তীতে এর উপর চালানো ধ্বংসযজ্ঞের বিবেচনায় আমাদের কাজ কোনো বিশেষত্বই রাখে না। প্রথমত, ৮০-এর দশকে সাদ্দাম হোসেনের ইশতার গেটের অমার্জিত এবং কুরুচিপুর্ণ সংস্কার কাজের মাধ্যমে এবং দ্বিতীয়ত, সাম্প্রতিক ২০০৩ সালে আমেরিকান আর্মির মাধ্যমে। তারা এই মহাতাৎপর্যপূর্ণ স্থাপনার এক অংশ ধূলায় মিশিয়ে হেলিপ্যাড এবং ভারী সামরিক যানবাহনের গ্যারেজ বানিয়েছিল।

অতি সম্প্রতি একজন বিশেষজ্ঞকে আমি ইটদুটো দেখিয়েছি। তিনি হচ্ছেন আরভাইন ফিংকল, ব্রিটিশ মিউজিয়ামের প্রাচীন মেসোপোটেমিয়া বিষয়ক কিউরেটর। তার উত্তর আমাদের ঈসা (আঃ) এর জন্মেরও সাতশত বছর আগে দ্বিতীয় নেবুচাদনেজার-এর শাসনামলে নিয়ে যায়, যখন এই ঝুলন্ত উদ্যানটি নির্মিত হয়েছিল। কিউনিফর্ম লিপিগুলো বিশ্লেষণ করলে জানা যায় লেখা আছে যে, “ব্যাবিলনের অধিপতি নেবুচাদনেজার, যিনি ইসাগিলা এবং ইযিদার সেবা করেন (ব্যাবিলনীয় দেবতা মারদুক এবং নাবু-এর মন্দির), নাবুপোলাজার-এর বড় সন্তান”।

খ্রীষ্টপূর্ব সপ্তম শতাব্দী হয়ত শুনতে অনেক প্রাচীন মনে হতে পারে ইউরোপীয়ানদের, হয়ত আমেরিকানদের কাছেও। তবে ইরাকী প্রত্নতাত্ত্বিক মাপদণ্ডে এটি ইউরোপীয়ানদের মধ্যযুগের মত। বলাই যায় ইরাকী মধ্যযুগ হচ্ছে নেবুচাদনেজারের শাসনামল। আমরা কি কল্পনাও করতে পারি আজকে যারা ইরাকে সাধারণ জীবনযাপন করতেও শত বাধা-বিপত্তির সম্মুখীন হচ্ছে তাদের ঐতিহ্যের শিকড় সাত হাজার বছর আগের পৃথিবীতে গেঁথে আছে! এই মাটিতেই জন্ম নিয়েছিল বিশ্বের প্রাচীন কিছু সভ্যতা! প্রত্নতাত্ত্বিকগণ দক্ষিণ ইরাকে ছয় সহস্রাব্দ বছর আগে শুরু হওয়া উবাইদ সংস্কৃতির সন্ধান পেয়েছেন। তারা আরো পেয়েছে উরুক সভ্যতা, সেখানে হয়েছিল চাকা আবিষ্কার এবং পদার্থের সংযোজন একইসাথে মাটির তৈজসপত্র তৈরির জন্য কুমোরের চাকাও। এমনকি সীলমোহর, ইটের ছাঁচ এবং মন্দিরের নকশাও, এসব হচ্ছে খ্রীষ্টপূর্ব ৪১০০ সালের কথা। উরুক সভ্যতার অবদান আরোও বড়। শুধু চাকাই নয়, এই সভ্যতা আমাদের দিয়েছিল অনুভূতির লেখ্যরূপ!

অতঃপর, তাদের ভাষাতেই বলতে হয়, ইতিহাসের শুরু।

বর্তমান ইরাকের আরব দেশীয়দের বংশধারায় সবচেয়ে শক্তিশালী পূর্বপুরুষ ছিলেন সারগন। তিনি ছিলেন একজন সেমাইট রাজা, আক্কাদিয়ানদের অধিপতি। খ্রীষ্টপূর্ব ২৪ শতকে তিনি সুমেরিয়ানদের পরাজিত করেন। তার সম্পর্কে স্বল্পই জানা যায়। কথিত আছে যে, আজ বাগদাদের অদূরে আক্কাদে তিনি রাজধানী স্থাপন করেন। সংক্ষিপ্ত সময়ে তার রাজ্য বিস্তৃত হয় পশ্চিমে ভূমধ্যসাগর থেকে পূর্বে পারস্য (ইরান)। তাকে ডাকা হত “বিশ্বের চার ভাগের রাজা”।

আক্কাদিয়ানদের আগে উর রাজবংশের রাজত্ব ছিল। ধারণা করা হয় এটি ছিল দক্ষিণ ইরাকে খ্রীষ্টপূর্ব দুই হাজার বছর আগে। ৬০,০০০ জনসংখ্যা সমৃদ্ধ এই শহরটি তৎকালীন পৃথিবীতে ছিল সবচেয়ে বড়! ইবরাহীম (আঃ)-এর জন্মশহর থেকেই এর সূচনা হয়েছিল, তিনি হলেন পৃথিবীর বড় তিনটি একত্ববাদী ধর্ম ইসলাম, খ্রিষ্টধর্ম এবং ইহুদী ধর্মের পিতা।

প্রথম ব্যাবিলনিয়ান সাম্রাজ্যের সূচনাও কাছাকাছি সময়ে হয়েছিল। আমরা মহান এবং ইরাকের প্রাচীন রাজাদের মাঝে শ্রেষ্ঠতর হাম্মুরাবী-এর কথা জানি। তিনি ৪০ বছরেরও অধিক কাল রাজত্ব করেছিলেন, (১৭৯২-১৭৫০ খ্রীষ্টপূর্ব)। তার সময়েই দুনিয়া প্রথম স্কুলের ধারণা পেয়েছিল, একইসাথে পেয়েছিল প্রথম লিখিত আইন! এরপর হাজার বছর অতিক্রম হয়, অনেক রাজারা সিংহাসনে বসেন তবে কেউই হাম্মুরাবীর কাছে ঘেষতে পারেননি, অর্জন কিংবা কোনো দিক দিয়েই। অবশেষে বর্তমান উত্তর ইরাকের মসুলের কাছে বৃহৎ নিনেভেহ গ্রন্থাগারের প্রতিষ্ঠাতা অ্যাসিরিয়ান রাজা আশুরবানিপাল-এর মঞ্চে আগমন ঘটে।

ইরাকের স্বাধীন শাসনের বিলুপ্তি ঘটে ঈসা (আঃ) এর জন্মের কয়েক শতাব্দী আগে। পারসিয়ান, গ্রীক, মোঙ্গল এবং তুর্কিদের অধীনে নিরবিচ্ছিন্ন পরাধীনতার মাধ্যমে ১৯১৭তে এসে ব্রিটিশদের হাতে উপনিবেশিত হয়। ১৯২১ সালে সেখান থেকে মুক্তি মেলে। এরপরেই বর্তমানের আধুনিক ইরাক রাষ্ট্রের জন্ম হয়। তবে ব্যতিক্রম রয়েছে। ৭৫০ সাল থেকে ১২৫৮ সাল পর্যন্ত আব্বাসী খেলাফতের অধীন সময়টাকে ঠিক উপনিবেশিক বা পরাধীনতা ধরণের কিছু বলা যাবে না। তবে এরপরে আব্বাসীরা অন্যান্য শাসকদের হাতের পুতুলে পরিণত হয়। বিশেষ করে দশম শতাব্দীতে পারস্যের বুয়িদ সাম্রাজ্য এবং একাদশ শতাব্দীতে সেলজুক সাম্রাজ্যের প্রভাব বেশ লক্ষ্যনীয় বলা যায়।

ইরাকে পারসিয়ান শাসনের শুরু মেসোপোটেমিয়া নামে পরিচিত। যার অর্থ হচ্ছে দুই নদীর মধ্যবর্তী জায়গা। দুই নদী হচ্ছে এখানে ফোরাত এবং টাইগ্রীস। এই সীমানা থেকেই আধুনিক ইরাকের উৎপত্তি। খ্রীষ্টপূর্ব ৩৩৩ সালে অ্যালেকজান্ডারের আক্রমণে এই শাসনের পরিসমাপ্তি হয়। তবে অ্যালেকজান্ডারের মৃত্যু হলে তার বিশাল ভয়ংকরী সেনাবাহিনী বিভিন্ন জেনারেলদের হাত ধরে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। টলেমি যান মিশরে, আলেকজান্দ্রিয়া থেকে শাসন করতেন। উত্তর-পশ্চিম সিরিয়ার অ্যান্টিয়োকে নতুন রাজধানী স্থাপন করে সেল্যুকাসও এশিয়ায় রাজত্ব গাড়েন। এই অ্যান্টিয়োক পরবর্তীতে গ্রীকদের থেকে আরবদের জ্ঞান-বিজ্ঞান গ্রহণের প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।

সপ্তম শতাব্দীর শুরুর দিকে ইসলামের আগমন ঘটে। আজকের মধ্যপ্রাচ্য তখন ছিল দুই সাম্রাজ্যের মাঝে বিভক্ত। পারস্য এবং বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য। আরব থেকে উদ্ভূত ইসলামের ছড়িয়ে পড়া নতুন কিছুর খবর বয়ে নিয়ে যায়। জন্ম নেয় শক্তিশালী আরেকটি শাসনব্যবস্থা যার আছে সমৃদ্ধ এক সভ্যতা এবং মহিমান্বিত কিছু সোনালী সময়।

যতই পিছনে যাই না কেন ইরাকের ইতিহাস এতই বড় যে একটি ক্যানভাসে তা আঁকা যায় না। তারচেয়ে বরং কিছু নির্দিষ্ট সময়ের আলাপ করা যাক। ইসলাম আজকের মহান সভ্যতা হওয়ার গল্প। সম্মুখ যোদ্ধা হিসেবে বাগদাদ যেখানে রেখেছিল দুর্দান্ত অবদান। জ্ঞানের সাম্রাজ্যে রাজত্ব করার গল্পই আজকে শুনানো হবে, যখন বড় বড় মনিষীগণ এখানের পথ মাড়িয়েছিল।

আমাদেরকে শেখানো প্রাচীন গ্রীকদের পরিসমাপ্তির মাঝে দিয়ে পৃথিবী অন্ধকারে নিপতিত হয়। যার উত্তরণ হয়েছিল ইউরোপীয় রেনেসাঁর মাধ্যমে। এর মাধ্যমে সবই নাকি অন্ধকার, মধ্যযুগীয় কিংবা বর্বর! বিজ্ঞানের তথাকথিত এই টাইমলাইন দেখায় এই দুটো ঘটনার মাঝে কোনো বৃহৎ আবিষ্কারই হয়নি! পুরো দুনিয়ায় কালো ছায়া ছিল। আমার সবসময় ইচ্ছা ছিল দুনিয়া-পরে সত্যি ঘটনাগুলো তুলে ধরার। পশ্চিমা সংস্কৃতি এবং ঐতিহাসিক কাঠামো আমাদের যা শেখায় তা থেকে মিথগুলোকে ভেঙে ফেলার। তারা আমাদের কাছে ঋণী, আমাদের হাজার বছরের সাধনার কাছে তারা ঋণী। আমি এসব তুলে ধরতাম কিন্তু এখন হচ্ছে উপযুক্ত সময় সবার বিশ্বাস এতদবিষয়ে দৃঢ় করার।

সত্য বলতে প্রাত সাতশত কিংবা এর অধিক কাল জুড়েই বিজ্ঞানের ভাষা ছিল আরবী। এটি পবিত্র কুরআনের ভাষা, যেটি মুসলিমদের ধর্মীয় গ্রন্থ এবং সমগ্র মানবজাতির জন্য সংবিধান। একইসাথে আরবী ছিল অর্ধবিশ্বজুড়ে বিস্তৃত ইসলামী খেলাফতের রাষ্ট্রীয় ভাষাও যা অষ্টম শতকের শুরুতে ছড়িয়েছিল হিন্দুস্তান থেকে স্পেন পর্যন্ত। 

(অসমাপ্ত)।

পরের অংশ পড়তে এখানে ক্লিক করুন (সভ্যতার আযান, তারিখ-ই-গোয়েবলস এবং আরবীয় বিজ্ঞান) 


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ