লেখা তরজমা

লেখালেখির আইসবার্গ




আইসবার্গ শব্দটা মনে আসলেই প্রথম ধারণাটা মাথায় আঘাত করে টাইটানিক মুভি থেকে। ছোট্ট একটি আইসবার্গের সাথে সংঘর্ষে পুরো জাহাজটিই ধ্বংস হল! কিন্তু আইসবার্গ কি আসলেই ছোট?

না, আইসবার্গ ছোট নয়। একটি আইসবার্গের মাত্র ০৮ - ১০% ভাসমান থাকে। বাকি সবটুকুই সাগরের অন্ধকার জলে ডুবে থেকে ঘাতকের মত অপেক্ষা করতে থাকে। তাই সাবধান! সমুদ্রে চলাচলের সময়। এখন চলুন, আমার পড়া এবং সিরিজ, মুভি আকারে নির্মিত হবার পর দেখা তিনটি ফ্যান্টাসি ক্যাটাগরির ফিকশন থেকে ঘুরে আসি।
  • হ্যারি পটার।
  • দ্যা লর্ড অব দ্যা রিংস।
  • আ সং অব আইস এন্ড ফায়ার।
একে একে যদি আসি। হ্যারি পটার মুভি যারা দেখেছেন কিংবা বইও পড়েছেন, তারা খেয়াল করেছেন কি লেখিকা খুবই ধীরে ধীরে ম্যাজিক্যাল ওয়ার্ল্ড নিয়ে বিভিন্ন তথ্য উম্মোচন করেছেন। একই সাথে বিস্তারিত সব তথ্য দেননি। যখন যেখানে যতটুকু প্রয়োজন ততটুকুই দিয়েছেন। হ্যারি পটারের সাথে ম্যাজিক্যাল ওয়ার্ল্ডে আপনিও কি প্রবেশ করেছিলেন? এতে লাভ কি হয়েছে?

যখন আপনি ফিকশনটি পড়া শুরু করলেন, বিস্তারিত ব্যাখ্যা না পাবার দরুন আপনি মনে মনে কিছু প্লট, ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়ে ফেলেন। আপনি কল্পনাকে কাজে লাগান। ইমাজিনেইশন পাওয়ার। আপনি ক্যারেক্টারকে কল্পনা করে ফেলেন, পরবর্তী কাহিনী কোন পটে মোড় নেবে সেটাও মনে গেথে ফেলতে বাধ সাধে না। এতো গেল পাঠকের অবস্থা।

ধীরে ধীরে গল্পের ভেতরে যেতে যেতে সবকিছু পরিষ্কার হতে থাকে এমনটাও নয়। তবে যতটুকু প্রয়োজন ততটুকু কিন্তু ঠিকই পাওয়া যায়। কিন্তু লেখক বা লেখিকার হাতে সম্পূর্ণটুকুই গুছানো থাকে। হ্যারি পটারের বিভিন্ন প্লটের উপর জে কে রাউলিং এর আলাদা ব্লগও রয়েছে কিন্তু সেগুলো আসল রচনায় উঠে আসেনি।

এবার যদি মুখ ফিরাই লর্ড অব দ্যা রিংসের দিকে। প্রায় একই ফর্মুলা দেখতে পাই। কাহিনী গভীরে যাচ্ছে, প্রয়োজন মত তথ্য, ক্যারেক্টার ইনফো পাওয়া যাচ্ছে। অতিরিক্ত কিছু জানাচ্ছেন না লেখক। কিন্তু তাই বলেও কোন ক্যারেক্টারাইজেশনে গ্যাপ থাকছে, প্লটহোল থাকছে এরকমটাও না। পুরো বিষয়টির ব্যাখ্যা না থাকার দরুন পাঠকরা নিজেদের কল্পনাশক্তিকে পূর্ণ্মাত্রায় ব্যবহার করছে। এতে করে লেখক এবং পাঠকের মাঝে এক অদ্ভুত ধরণের কানেক্টিভিটি তৈরি হয়, পাঠকের মনে হয় লেখক তার সাথেই কথা বলছে নয়ত তারা আলোচনা করেই লিখেছে।

আ সং অব আইস এন্ড ফায়ারও একটি নন্দিত ফ্যান্টাসি ফিকশন। যেটি সিরিজে রূপান্তরিত হয়েছে গেম অব থ্রোন্স নামে। জর্জ আর আর মার্টিন এই ফিকশনের ক্যারেক্টারাইজেশনে বিপ্লব ঘটিয়েছেন। প্রচন্ড আনপ্রেডিক্টেবল তা বলার অপেক্ষা রাখেনা। এ কথাও প্রচলিত আছে যে, “গেম অব থ্রোন্স দেখবার সময় কোন ক্যারেক্টারকে ভালোবাসা যাবে না, যাকে ভালোবাসবে সেই মারা যাবে।” কথাটি যদিও পুরোপুরি সত্য নয় তবে মিথ্যাও বলা যাবে না।

ফিকশনটির ক্যারেক্টার, প্লটের উপরে আলাদা ভাবে বইও লেখা হয়েছে। কাহিনীর পেছনের কাহিনী নিয়ে। হাজার বছরের এক সময়ের হাতে ধীরে ধীরে উদ্ভাসিত হয়েছে ওয়েস্টেরসের ঘটনাবলী।

এই উদাহরণগুলো থেকে একটা বিষয়ই পরিষ্কার হয়, লেখাগুলোর মডেল আইসবার্গের মত। উপরে অল্প একটু দেখা যাচ্ছে মানে প্রয়োজনমত তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, শুধু মূল অংশটুকু পাওয়া যাচ্ছে কিন্তু পানির নিচের বাকি ৯০% অংশ কিন্তু দেখা যাচ্ছে না। সেরকমই লেখকের হাতে থাকা সম্পূর্ণ গুছানো প্লটটি পাওয়া যাচ্ছে না। তবে লেখা দেখে অসম্পূর্ণও লাগছে না। সবকিছু অদ্ভুত ভাবে পারফেক্ট। এটি পাঠকের লেখক সত্ত্বা জাগিয়ে তুলতেও সাহায্য করে।

লেখালেখির জগতে এই মডেলটিকেই “আইসবার্গ থিওরী” নামে ডাকা হয়। উদ্ভাবক হচ্ছেন “আর্নেস্ট হেমিংওয়ে।” লেখক হবার আগে তিনি সাংবাদিক ছিলেন। খবর অধিক প্রচারের স্বার্থে তিনি অধিকাংশ সময় শুধু মূল অংশটুকুই প্রচার করতেন, তার ভাষাতেই জানি,

“If a writer of prose knows enough of what he is writing about he may omit things that he knows and the reader, if the writer is writing truly enough, will have a feeling of those things as strongly as though the writer had stated them. The dignity of movement of an ice-berg is due to only one-eighth of it being above water. A writer who omits things because he does not know them only makes hollow places in his writing.”

এটিকে আরেকদিক দিয়ে ভাবা যায়। শুধু প্রয়োজনমত তথ্য দেয়া না, এমনকি এই থিওরীতে সবারই জানা থাকা বিষয়গুলোও স্কিপ করা যায়। জানা বিষয়গুলোই পুনঃউপস্থাপন পাঠকের মনেও এক ধরণের তাড়া তৈরি করে বা মনে উদয় হয় যে অংশটুকু স্কিপ করে গেলে ক্ষতি হবেনা।

বিভিন্ন ভাবেই আইসবার্গ থিওরীকে লেখার ক্ষেত্রে ব্যবহার করা যায়। প্লট সাজানোর ক্ষেত্রে, ক্যারেক্টার বিল্ড আপ কিংবা ফিকশনাল ওয়ার্ল্ড সাজানোর জন্য। তথ্য হাতে রেখে যতটুকু দিলে পাঠক ক্যারেক্টারের সাথে নিজের সামঞ্জস্যসাধন করতে পারবে, ক্যারেক্টারের সাথে নিজেকে মিলিয়ে নিতে পারবে কিংবা ক্যারেক্টারে ডুবে যাবে ততটুকুই প্রকাশ করা, পাঠককে জানতে দেয়া। লেখালেখির ক্ষেত্রে বুঝে কিংবা না বুঝে অনেকেই এ ধরণের মডেল হয়ত ফলো করে আসছি। তবে এখন সময় হয়েছে এ টপিকে সম্যক অবগত হবার। শেষ করতে চাই একটি ছোট কিন্তু বলশালী বাক্য দিয়ে,

“The power of a story comes from what’s not in it.”

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ