লেখা তরজমা

বই বই বই

 




বই কি? কি কাজে লাগে? কি এর পরিচয়? আমরা কেনো বই পড়ি? এরকম কতশত প্রশ্ন মাথায় ভূতের মতো চেপে থাকে। বই বন্ধু নাকি শত্রু সেটাও ভাবার বিষয়। চলুন একবার তবে গল্প করেই আসি বইয়ের সাথে।

বই নিয়ে যেহেতু হাজার প্রশ্ন, তবে চলুন বইটা কি সেটা আগে জানি। দার্শনিকগণ গুরুগম্ভীর ভাষায় বলে গিয়েছেন “ যা আত্মাকে পরিতৃপ্ত করে, তাই বই। ” যেমন, বার্গার খেলে আত্মা পরিতৃপ্ত হয়, তাই এটাও বই! অদ্ভুত!
আবার অনেকে বলে বই মানুষের সর্বোৎকৃষ্ট বন্ধু। সে হাসাতে পারে, কাদাতে পারে, মনের ভাব বুঝতে পারে, পরিস্থিতি শিক্ষা দিতে পারে। কাজগুলো তো প্রকৃত বন্ধুর মতোই। কিন্তু এতোটুকুতে কি সন্তুষ্ট হওয়া যায়?
চলুন বিজ্ঞানী মহলে একটু ঢু মেরেই আসি। রবার্ট চ্যাস্মার একটা দুঃসাহসিক কাজ করে ফেলেছেন এখানে। কি বলেছেন তিনি জানেন?
তার ভাষ্যমতে বই হচ্ছে উন্নতমানের ক্লোরোফর্ম। কি সাংঘাতিক! বইয়ের মতো জিনিসকে ক্লোরোফর্ম দিয়ে তুলনা! আসলে এটাও না বই হচ্ছে একটা এটম বোম্ব। আরো সাংঘাতিক! হয়তো কেউ বলেই ফেলেছেন, এসব কি বলছে বই নিয়ে।
তাহলে এখন শুনুন আরেকজন মনীষীর মূল্যবান বাণী। চার্লস ল্যাম্ব, ল্যাম্ব মানে যদিও ভেড়া কিন্তু মনীষীটি একজন পুরোদস্তুর বুদ্ধিমান মানুষ ছিলেন। তার কথা দিয়েই যাচাই করুন একবার। তিনি বললেন “ যা কিছু মোড়ানো থাকে তাই বই। ” আরে! এসব কি কথা! আমার দেহও তো কাপড় দিয়ে মোড়ানো, আমিও কি বই!
এতোক্ষণে মূল বক্তব্য ধরতে পেরেছেন তবে আপনি। আসলে আমরা প্রত্যেকেই একেকটি বই। প্রতিটা মুহূর্ত যাচ্ছে আর আপনার বইয়ের একেকটি লাইন লেখা হচ্ছে। আমাদের জীবন, আমাদের গল্প, আমাদের ইতিহাস সবমিলিয়ে আমরাই, আমরা প্রত্যেকেই নিজেদের বই, নিজের সবচেয়ে ভালো সঙ্গী, ভালো বন্ধু।
মানুষের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জিনিসটা কি? আপনার কাছে কি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয় সেটা জানিনা তবে আমি যেটা জানি তা হচ্ছে আত্মমর্যাদাবোধ। নিজ সম্পর্কে যথেষ্ট এবং যথাযথ জ্ঞান রাখা, নিজ সম্মান সর্বাবস্থায় ঠিক রাখা।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ গুণ আছে যা আপনাকে খুব ভালো পর্যায়ে নিয়ে যাবে। সেটি হচ্ছে ইতিবাচক মানসিকতা। ইতিবাচক মানসিকতা এবং আত্মমর্যাদাবোধ একে অপরের সাথে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। অনেকটা এভাবে বলা যায় একটি অপরটির সমানুপাতিক। আর এগুলো অর্জন করতে আপনাকে সহযোগীতা করবে নিঃস্বার্থ ভাবে যে বস্তুটি তাকে আপনি বই বলে ডাকতে পারেন।
এখন যে প্রশ্নটি মাথায় আসে তা হলো “ নগদ যা পাও, হাত পেতে নাও ” এর মতো সামনে যা পাবো তাই কি পড়বো?
হ্যা, আপনি অবশ্যই পড়তে পারেন। তবে নিজেকে আগে জানুন। আপনি কি পারবেন খারাপ কিছু থেকে ভালো কিছুর আবির্ভাব ঘটাতে? কিংবা সুচে সুতা প্রবেশ করানোর মতো ভালোটাকে বাছাই করে নিতে?
যদি এটুকু আত্মবিশ্বাস থেকেই থাকে তবে আপনি পড়ুন। যা ভালো লাগে তাই, যা মলাটে মোড়ানো সেটাই। আর যদি না পান সেটুকু বিশ্বাস নিজ মন থেকে তবে বাছাই করুন, পরামর্শ নিন ভালো পড়ুয়াদের।
বিখ্যাত দার্শনিক ফ্রান্সিস বলেছিলেন, “ কিছু বইকে শুধু চাখতে হবে, কতগুলো গিলতে হবে এবং কিছুসংখ্যক হজম করতে হবে।” অতএব জানুন, বুঝুন এবং মনকে উদার করার জন্য বই হাতে নিন।
আরেকটি ইতালীয় প্রবাদ বলার বড্ড ইচ্ছা হচ্ছে। “ খারাপ বইয়ের চেয়ে নিকৃষ্টতম তস্কর আর নেই।”
বই নিয়ে এতো প্যাচাল কতোক্ষণ আর ভাল্লাগে।
বই পড়ে লাভ কি তা জানি এখন চলুন। নিজের জীবনের সঞ্চয়ের জন্য। ৬০ লক্ষ বই নিয়েও নেপোলিয়ন যুদ্ধক্ষেত্রে যেতেন। যুদ্ধক্ষেত্রেও মহানবী (সাঃ) এর উপর নাযিল হয়েছে মহাবই বা গ্রন্থ আল-কুরআন। অলিভার গোল্ডস্মিথ নামক ভদ্রলোক আবার মাত্র ৫০ টি বই সারাজীবনের জন্য সঞ্চয় করতে উপদেশ দিয়েছেন। কিন্তু কথা হচ্ছে কেনো এতোকিছু এই বই নিয়ে, লাভটা কি হবে আমাদের।
কবি ফররুখের ভাষায় বই পড়ে আমরা যেখানে কখনো যাইনি সেখানেও যেতে পারি। হ্যারি পটার কিংবা মারভেলের সাথে কল্পনার রাজ্যে, প্রবেশ করতে পারি হোয়াইট হাউজে কিংবা তিব্বতের নিষিদ্ধ ভূমিতেও। হাটতে পারি গ্রামের মেঠোপথে কিংবা রকেটে চড়ে যেতে পারি মঙ্গলেও। কুরুক্ষেত্রের ভ্রমণ শেষে আবার যেতে পারি বাগদাদের সেই সোনালী রাজ্যে। করতে পারি অনেক কিছুই । বই হচ্ছে হাতিয়ার, বই হচ্ছে সম্পদ।
চলুন শেষ করি মজার তবে গুরুত্বপূর্ণ কথার দ্বারা। ম্যানন্সভিল্ড কি বলে গিয়েছেন জানেন?
“ বই পড়ার আনন্দ দ্বিগুণ হয়ে যায় তখন, যখন এমন কারো সাথে বাস করা যায় যে আমার মতো একই বইগুলোকে ভালোবাসে।” তো বাছাই করুন দেখেশুনে।
বই দিবস বলে নয়, বইয়ের জন্যই লিখা।
আগামীরা বেড়ে উঠুক বইয়ের ঘ্রাণে, তারা ঘুমাক বইয়ের পাতায়।
তিনশত পয়ষট্টি দিনই হোক বইয়ের, বেঁচে থাকি তারই ছায়ায়।
বই বেঁচে থাকুক সবার মাঝে।
বই বই বই / সাজ্জাদুর রহমান
২৩/০৪/২০১৮

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ