আগামীর ইশতেহার
সাজ্জাদুর রহমান
আগামীর দিনটাকে সুন্দর করবার স্বপ্ন এঁকেছিলাম বুকের গহীন কোণে।
ন্যায়বিচার কথা কবে পাড়ার প্রতিটি মুখের হাসিতে, আশাতো এরকমই ছিল।
ন্যায়বিচার কথা কবে পাড়ার প্রতিটি মুখের হাসিতে, আশাতো এরকমই ছিল।
রাস্তার শেষ মাথায় অন্ধকারেও বুক ফুলিয়ে হাটবে মানুষ, ফাকা বাসে নির্ভাবনায় ঘুমাবে স্কুল ফেরত মেয়েটি।
জানেন, স্বপ্ন আরোও ছিল।
এ জনপদে বিচার হবে ন্যায্য, এ জনপদ হবে স্বচ্ছ, সুন্দর, পরিশিলীত এবং নিরাপদ। এ জনপদ হবে আপনার, আমার, আমাদের।
জানেন, রাতে বের হলে কান ছুঁয়ে যাওয়া ঠান্ডা বাতাসটা উপলব্ধ হয় না, যার বিবেক মরে যায় কানের তরুণাস্থির হালকা আচড়ে তার কিই-বা আসবে যাবে!
আচ্ছা, বলেছিলেন কিনা গন্ডার নামক প্রাণীর চামড়া মোটা, সত্যি? আপনি বোধহয় মানুষ দেখেন নি?
আমি দেখেছি তাদের।
হিংস্রতা কখনোই লম্বা নখ, ভয়ংকর চেহারায় থাকেনা জানেন, ওইযে ও পাড়ার সবচেয়ে সুদর্শন ছেলেটা, যার চোখের রঙে পীত বর্ণ খেলা করে, সেখানে আমি দেখেছিলাম পাশবিকতা, নির্মমতা আর হিংস্রতাও।
আমার আগামীর পথ রুদ্ধ হয়েছিল সেদিন। বিচার চেয়েছিলাম, বলেছিলাম আমার বাবাকে হত্যা করা হয়েছে, বলেছিলাম ভাইকে করেছে পঙ্গু, চোখের সামনে বোনের শ্লীলতাহানিরও। উত্তর পাইনি নাকি চাইনি সেই দ্বিধাতে ভুগেই অশ্রুপাতে ভিজিয়েছিলাম তাদের কণ্টকাকীর্ণ দুয়ার। বৃথা, নয়নজলে হয়ত প্রশান্তকে ছাড়িয়ে যাইনি অনুভবে গিয়েছিলাম। বলেছিলাম তো চামড়া মোটা, ইস্পাতের পাতের তৈরি, আমার ভোতা চোখের সরু জল তা ভেদ করে আগাতে পারেনি। থেমে গিয়েছিলাম।
তারপর কি হল?
আরে বসুন না মশায়, সবে তো শুরু। তবে আসলেই থেমে গিয়েছিলাম কিনা, সব চেপে চেপে বসল আমার কাঁধজোড়ায়। তারপর, তারপর বহুবছর পেরিয়ে গেল।
আবছায়া বিকেলে বেঞ্চিতে বসে ইশতেহার রচনায় ব্রত ছিলাম। সুন্দর, স্বচ্ছল এক নিষ্ঠুর পৃথিবীর ইশতেহার। বাতাসে উড়ো কাগজ এসে চেহারাটা আবৃত করল।
ঝালমুড়ি কিংবা বাদামের ঠোঙা হবে হয়ত, চানা এবং বিটলবণের ঘ্রাণ একত্রে আসাতেই এই সাময়িক বিপত্তি। হাতে নিয়ে তাকালাম সেদিকে।
হাহাকার শব্দটায় আমার রয়েছে ব্যাপক সংশয়। শিরোনাম জুড়ে মানুষের হাহাকার আর বিজ্ঞজনদের কাছে শব্দের। ধর্ষণকে ধর্ষণ বলার কিংবা হত্যাকে হত্যা বলতে গিয়ে বেঘোরে প্রাণ দিয়েছে কেউ কেউ। রবীন্দ্রনাথ একটা উপাদান এনেছিলেন সাহিত্যে। সুপারফ্লুয়িটি বলে তাকে। মধুর জিনিসকে মধুরতর করবার প্রক্রিয়া। রাতকে যদি নিশিরাত বলি, সুন্দরকে যদি ডাকা হয় অনিন্দ্যসুন্দর কিংবা ধর্ষণকে যদি বলি পরিরম্ভ, সুন্দর শুনা যায়, কোমল হয়, বলতে মুখে আটকায় না। সেরকমই আমাদের মনস্তত্ত্বও। নিজের পায়ে কুড়াল ধেয়ে আসার আগ পর্যন্ত আমরা বসে বসে চুলও গুণতে পারি। কন্ঠ তুলবে ও পাড়ার ওরা, আমরা তো নিরাপদ। আজকে নিরাপদ, আগামীকাল নিরাপদ, পরশু? পরশু দেখি নীড়েই আপদ। এতো সবই পাগলের প্রলাপ। ডায়েরি বন্ধ করে হাটতে শুরু করলাম দিগন্তে। আগামীর ইশতেহার আমার জন্য নয়, দুয়ারে বসে যারা কাঁদে তাদের জন্যও নয়, প্রতিবাদের ভাষাকে যারা মধুরতর করে তারা লেখবার যোগ্য নয়। আগামীর ইশতেহার আগামীর হাতেই আসুক।
এসব ভেবে দেখি, দায়িত্ব বলতে অবশিষ্ট নেই কিছুই। মুক্ত হয়ে গেলাম। বিবেক, সে তো কবে থেকেই স্মৃতির পাতায় লুকোচুরি খেলতে অভ্যস্ত, তবে একটা মাংসপিণ্ড এখনো বাকিই ছিল। এটা নাকি সহজে নষ্ট হয়না, রূপকথার আবে-হায়াতের এক ভিন্ন রূপ। সেটি জাগ্রত ছিল, বুকের মাঝে ধুকপুকুনি দিচ্ছিল। জানেন, বন্ধ চোখে জগতটাকে নিজের মত গড়ে নেয়া যায়, একদম নিজের, একদম। ওইযে বলেনা, চোখ বন্ধ করে যা দেখতে পারো শুধু সেটুকুই তোমার। আমার যে কিছুই নেই, কিছুই নেই।
বাসনা, তাড়না, প্রেরণা সব একাকার হয়ে অবশেষে জন্ম নিল প্রতিহিংসা, জিঘাংসা। অসির জোর কবজিতে না থাকায় মসিই তো ভরসা। তেপান্তরের মাঠ ছাড়িয়ে সে ছুটে চলল দুলদুলের পিঠে ভর করে। দুরন্ত সেই চলার গতি।
রাজা, রাজ্য, বিচারক কাউকেই পরোয়া না করে আটলান্টিকের গভীরতায় ভারাক্রান্ত হল। জানেন কিনা, এই যে পৃথিবী দেখি কি এক আশ্চর্য, সবকিছুই কেমন যেন অসম্পূর্ণ, এক উপাদান এসে আরেক উপাদানকে পরিপূর্ণ করে। আর মানুষ তাকেই বেছে নেয় যে তাকে শতাংশে অধিক পরিপূর্ণতার আশ্বাস দেয়। গভীরতায় নেমে বুঝলাম সবকিছুর মত আমিও তলিয়ে যাচ্ছি। ফেনী নদীতে আবরারের লাশের মত। মুক্ত হয়ে, ভার কমিয়ে এসেছিলাম ওপাড়ে গিয়ে সমাধানের আশায়, কে জানত সমাধান যে পথেই আছে।
আচ্ছা জানেন কিনা, এই আল্লাহর দুনিয়ায় নাফরমানরাও সমৃদ্ধি পেয়েছে কিন্তু শোষকরা পারেনি। আমাদের ঐতিহ্যে তো ওই কথাটা ছিল "ফোরাতের কূলে একটি দুম্বাও যদি অভুক্ত থাকে, তারও দায়ভার আমার", আমাদের ইতিহাস বলে এক নারীর সম্মান রক্ষার্থে হাজার হাজার মাইল পেরিয়ে এসেছিলেন তারিক, মুহাম্মদরা। তারাতো বিস্মৃত নন। এসব কপচানো বাদ দিই, চলুন। সহনশীলতা পরম ধর্ম। এই জনপদে চুপ থাকাটাই শ্রেয়, কিছুদিন বেশি বাচা যায়। আর গর্জে উঠলে বায়ান্ন, একাত্তর বারবার ফিরে আসে।
__________________________________________
0 মন্তব্যসমূহ