লেখা তরজমা

একজন জামাল নজরুল ইসলাম

 

একজন জামাল নজরুল ইসলাম
সাজ্জাদুর রহমান

Feature image: thedailystar.net

প্রাথমিক পরিচয়ঃ

আজকে এমন একজন মানুষের সাথে আমরা পরিচিত হব যাকে কিনা প্রথম দেখাতেই ভালোবেসে ফেলত সবাই। সদা হাস্যোজ্জ্বল এই মানুষটি দেশের জন্য ত্যাগ করেছিলেন তাঁর সোনালী ভবিষ্যৎ। লাখ টাকা বেতনের চাকুরী ছেড়ে, উন্নত সুযোগ-সুবিধাকে পায়ে মাড়িয়ে ছুটে এসেছিলেন এই দেশের বাণিজ্য শহর চট্টগ্রামে মাত্র দুই হাজার আটশত টাকা বেতনের চাকুরী নিয়ে। অনুভব করেছিলেন দেশের বিজ্ঞান শিক্ষা ও গবেষণাকে উজ্জীবিত করতে হবে আগামীর সফলতার জন্যই। তিনি একাধারে ছিলেন পদার্থবিজ্ঞানী, গণিতবিদ, জ্যোতির্বিদ এবং বিশ্বতত্ত্ববিদ। মহাবিশ্বের উদ্ভব এবং পরিণতি বিষয়ে গবেষণার জন্য তিনি ছিলেন বিশ্বজুড়েই বিখ্যাত। এই মহৎপ্রাণ এবং সৃষ্টিশীল বিজ্ঞানী আর কেউই নন, আমাদের একান্তই আপন অধ্যাপক ডক্টর জামাল নজরুল ইসলাম।

জন্মগ্রহণ করেছিলেন বাংলাদেশের অপূর্ব সুন্দর জনপদ ঝিনাইদহে। ১৯৩৯ সালের ২৪ শে ফেব্রুয়ারিতে। অদ্ভুত ভাবে তাঁর নামেও সুন্দর রয়েছে। জামাল শব্দের অর্থই সুন্দর, ততধিক সুন্দর তাঁর কর্ম ও ব্যক্তিগত জীবন। তিনি বংশগত দিক থেকে অভিজাত ছিলেন। ঢাকার নবাব বাড়ির পাশাপাশি জর্ডানের বাদশাহর পরিবারের সাথেও যুক্ত ছিলেন। সাধাসিধে এই মানুষটির ছিল না কোন আভিজাত্যের অহংবোধ। আর যা ভাবছেন তা সত্যিই, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সাথেও ছিল তাঁর পরিবারের যোগাযোগ, নিয়মিত আসা-যাওয়াও ছিল। কবির নামের সাথে মিল রেখেই তাঁর নাম রাখা হয়।

Image source: Jamal Nazrul Islam Facebook Page 

বাবা সিরাজুল ইসলাম ছিলেন ঝিনাইদহ জেলার সাব-জজ বা মুন্সেফ। মা রাহাত আরা বেগম সাহিত্যানুরাগী হিসেবে বিশেষ সুনাম কুড়িয়েছিলেন। তিনি রবীন্দ্রনাথের ‘ডাকঘর’ নাটকটি উর্দুতে অনুবাদ করেছিলেন। বেশ দারুণ গানও গাইতেন। চার ভাই এবং চার বোনের সাথে ছোটবেলায় তিনি বেড়ে উঠেছিলেন। ১৯৪৯ সালে যখন তাঁর মা পৃথিবী থেকে বিদায় নেন তখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র দশ।

হাতেখড়ি এবং উচ্চশিক্ষাঃ

তিনি চতুর্থ শ্রেণী পর্যন্ত কলকাতার বিদ্যালয়েই অধ্যয়ণ করেছিলেন। অতঃপর চলে আসেন নিজ শহর চট্টগ্রামে। মেধা দেখে আশ্চর্যান্বিত হয়ে ডাবল প্রমোশন দিয়ে সরাসরি তাঁকে ক্লাস সিক্সে  তুলে দেন চট্টগ্রাম কলজিয়েট স্কুলের তৎকালীন প্রধান শিক্ষক। অষ্টম শেষ করে পাড়ি জমান পাকিস্তানের লরেন্স কলেজে। তবে সাথে করে নিয়ে যান গণিতের প্রতি প্রচন্ড ভালোবাসাও। সেখান থেকে হায়ার ক্যামব্রিজ বা এ লেভেল এবং সিনিয়র ক্যামব্রিজ বা ও লেভেল শেষ করে আবার ফিরে আসেন শৈশবের স্মৃতি বিজড়িত শহর কলকাতায়। ভর্তি হন সেইন্ট জেভিয়ার্স কলেজে। এখানে তাঁর পরিচয় হয় ফাদার গোরের সাথে, পরবর্তীতে যাকে নিজের প্রিয় শিক্ষক বলে অভিহিত করেছিলেন। ফাদার গোরে গাণিতিক বিষয়গুলো দারুণ ভাবে বুঝাতে পারতেন। প্রিয় শিক্ষকও সমমনা ছাত্র পেয়ে খুশিই ছিলেন। অধ্যাপক জামাল নজরুল ইসলাম সেজন্য বলেছিলেন,

“গণিতকে এমনিতেই অনেকে ভয় পেত। কিন্তু এটির প্রতিই ছিল আমার অসীম আগ্রহ, ঝোঁক। এ কারণেই বোধহয় তিনি আমাকে পছন্দ করতেন” ।

সেইন্ট জেভিয়ার্স কলেজ থেকেই কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে বি. এসসি সম্পন্ন করেন। তখন ছিল ১৯৫৭ সাল। তাঁর বয়স মাত্র ১৮ বছর। এখানেই শেষ নয়, ২০ বছর বয়সের মাঝেই তিনি দ্বিতীয়বারও স্নাতক সম্পন্ন করেন। তবে এবার ট্রিনিটি কলেজ থেকে গণিতশাস্ত্রে, ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে। যদিও এটি ছিল তিন বছরের কোর্স, তিনি মাত্র দুই বছরেই তা শেষ করে ফেলেছিলেন। 

বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিংয়ের সাথে বিজ্ঞানী জামাল নজরুল ইসলাম। Image source: thedailystar.net

ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখে  ১৯৬০ সালে স্নাতকোত্তর এবং ১৯৬৪ সালে পিএইচ.ডিও সম্পন্ন করেন, মাত্র ২৫ বছর বয়সে। বিষয় ছিল “এপ্লায়েড ম্যাথমেটিকস অ্যান্ড থিওরিটিল্যাল ফিজিক্স”। সবকিছু যেন খুব দ্রুতই হয়ে যাচ্ছিল। সে ধারাবাহিকতাতেই আবারো পেলেন ডাবল প্রমোশন। তবে এবার পেলেন পোস্ট ডক্টরালের জন্য। পিএইচ.ডির কাজ সময়ের আগে শেষ হওয়াতে সুযোগটি পেয়েছিলেন। যদিও তখনো তাঁর থিসিস জমা দেয়া বাকি ছিল। তাঁর প্রতি এই বিশেষ বিবেচনার তিনি প্রমাণ করেছিলেন। ১৯৮২ সালে পেলেন সেরাদের সেরা, শিক্ষকদের শিক্ষক স্বীকৃতি। অর্জন করলেন ডি.এসসি অর্থাৎ ডক্টর অব সায়েন্স ডিগ্রী।

তাঁর মুখেই চলুন শুনে আসি শিক্ষাজীবনের সারাংশ, কথাগুলো বলেছিলেন চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক সংগঠন বিশদ বাংলার মুখপত্র বিশদ সংবাদের সাথে এক সাক্ষাতকারে।

“১৯৫৭ সালে আমি কলকাতা থেকে অনার্স শেষ করে ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রিনিটি কলেজে গণিতশাস্ত্রে ট্রাইপস করতে যাই। সাধারণত এটা তিন বছরের কোর্স, তবে আমি দুই বছরেই শেষ করি। ওখানে আমার সহপাঠী ছিল পরবর্তীকালে ভারতের বিখ্যাত গণিতবিদ নারলিকার। আরেকজন সহপাঠী ছিলেন ব্রায়ান জোসেফসন, যে তার পিএইচ.ডি থিসিসের জন্য মাত্র ৩৩ বছর বয়সে, ১৯৭৩ সালে, পদার্থবিদ্যায় নোবেল পুরস্কার পায়। আমার এক বছরের সিনিয়র ছিলেন জেমস মার্লি, যিনি ১৯৯৬ সালে অর্থনীতিশাস্ত্রে নোবেল পুরস্কার পান। অমর্ত্য সেন যে-বছর নোবেল পুরস্কার পান সে বছর অর্থাৎ ১৯৯৮ সালে রসায়নে নোবেল পেয়েছিলেন জন পোপল। তিনি ক্যামব্রিজে আমার শিক্ষক ছিলেন। আমি এগুলো বলছি সেই সময়ে আমাদের লেখাপড়ার পরিমণ্ডলটা কতটা সমৃদ্ধ ছিল সেটা বোঝানোর জন্য। যা বলছিলাম, আমার পিএইচ.ডি থিসিস ছিল পার্টিকেল ফিজিক্স বা মৌলিক কণার ওপর। এর তিন-চার বছর পরই আমি আইনস্টাইনের জেনারেল থিওরি অফ রিলেটিভিটি নিয়ে কাজ করা শুরু করি। পরবর্তীকালে এর সঙ্গে যুক্ত হয় কসমলোজি। বলতে পারেন, এই তিনটিই হচ্ছে আমার আগ্রহ ও কাজের মূল ক্ষেত্র। পরে অবশ্য আমি ফ্লুইড ডাইনামিক্স বা তরল গতিবিদ্যা নিয়েও কাজ করেছি”।

কর্মজীবনঃ

তাঁর কর্মজীবন ছিল বৈচিত্র্যময়। তিনি বিভিন্ন বিখ্যাত বিখ্যাত প্রতিষ্ঠানে কাজ, গবেষণা করেছেন। ১৯৬৩-১৯৬৫ সালে ইউনিভার্সিটি অব মেরিল্যান্ডে পোস্ট-ডক্টরাল ফেলো হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। অতঃপর ইউনিভার্সিটি অব ক্যামব্রিজে ইনিস্টিটিউট অব থিওরিটিক্যাল অ্যাস্ট্রোনমিতে কাজ করেন ১৯৬৭-১৯৭১ পর্যন্ত। পরবর্তীতে ক্যালটেক অর্থাৎ ক্যালিফোর্ণিয়া ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে ভিজিটিং এসোসিয়েট হিসেবে যোগদান করেন এবং সেখানে ছিলেন ১৯৭১-১৯৭২ পর্যন্ত। ১৯৭২-১৯৭৩ সালে সিনিয়র রিসার্চ এসোসিয়েট হিসেবে ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত ছিলেন। পরবর্তীতে চলে আসেন কিংস কলেজে, ১৯৭৩-১৯৭৪ সালে এখানে তিনি এপ্লায়েড ম্যাথমেটিকসের লেকচারার হিসেবে কাজ করেন। অতঃপর ১৯৭৫-১৯৭৮ সাল ইউনিভার্সিটি অব কার্ডিফে ফেলো অব সায়েন্স রিসার্চ কাউন্সিল হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ১৯৭৮ সালে সিটি ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনে লেকচারার হিসেবে যোগদান করেন এবং ১৯৮৪ সালে রীডার থাকাবস্থায় অবসর নেন। ১৯৮১ সালে এ সব কিছু ছেড়ে দিয়ে দেশে ফিরে আসবার সিদ্ধান্ত নেন। ফিরে এসে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিত বিভাগে প্রফেসর হিসেবে যোগ দিয়ে দেশের মাটিকে ধন্য করেন যেমন মায়ের কোলে তার সন্তান ফিরে আসলে হয়। তবে আবার তাঁকে ফিরতে হয় লন্ডনে। অতঃপর ১৯৮৪ সালে একেবারেই সব ত্যাগ করে দেশের মাটিতে আবার ফিরে আসেন।

         

   Image source: alchetron.com

এত সুন্দর, সমৃদ্ধ ক্যারিয়ার, গবেষণার দুর্দান্ত সব সুযোগ একপাশে রেখে দেশে ছুটে এসেছিলেন দেশের কল্যাণের জন্যই। তিনি কথা রেখেছিলেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করে গড়ে তুললেন আন্তর্জাতিক মানের উচ্চতর বিজ্ঞান গবেষণাগার, “রিসার্চ সেন্টার ফর ম্যাথমেটিক্যাল অ্যান্ড ফিজিক্যাল সায়েন্স (আরসিএমপিএস)”

বই ও গবেষণাঃ

তাঁর গবেষণার বিষয় ছিল একটু বেশিই চিত্তাকর্ষক। স্টিফেন হকিং ব্যতীত তৎকালীন কোন বিজ্ঞানীকেই তাঁর পথে হাটতে দেখা যায়নি। মহাবিশ্বের চূড়ান্ত পরিণতি কি হবে তা নিয়ে তিনি উচ্চতর গবেষণা করেছেন। বর্তমানে এটির ক্ষেত্র বিস্তৃত হলেও সেই সময়ে ছিল খুবই কম। স্টিফেন হকিং মহাবিশ্ব নিয়ে কিছু কাজ করেছিলেন এবং পরবর্তীতে ১৯৮৮ সালে তিনি “কালের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস” বা “এ ব্রীফ হিস্ট্রি অব টাইম” নামে বই লিখেন। তবে জামাল নজরুল ইসলাম ১৯৮৩ সালে লিখেছিলেন “দ্যা আলটিমেট ফেইট অব দ্যা ইউনিভার্স”

জামাল নজরুল ইসলাম বেশকিছু বই লিখেছেন। বাংলা এবং ইংরেজি উভয় ভাষাতেই। তন্মধ্যে “দ্যা আল্টিমেট ফেইট অব দ্যা ইউনিভার্স” ক্যামব্রিজ, হার্ভার্ড সহ বেশকিছু বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্য। তাছাড়াও বইটি ফরাসী, পর্তুগীজ, জার্মানী, ইতালিয়ান সহ বেশ কয়েকটি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। প্রকাশিত হয়েছে ক্যামব্রিজ ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে। বইটি তাঁকে বিশ্বজোড়া খ্যাতি এনে দেয় কেননা ক্যামব্রিজ এবং অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেসের মত প্রতিষ্ঠানগুলো প্রকাশনা জগতে আস্থা ও মননশীলতার প্রতীক। সে ধারাবাহিকতায় তাঁর গ্রহণযোগ্যতাও পুরো বিশ্বজুড়েই তৈরি হয়।

স্কাই অ্যান্ড টেলিস্কোপ ম্যাগাজিনে প্রকাশিত প্রবন্ধ। Source: sky and telescop

নাম শুনেই বইটির বিষয়বস্তু বুঝা যায়। মহাবিশ্বের চূড়ান্ত পরিণতি নিয়েই লেখা। প্রকাশ হবার আগে তিনি “স্কাই অ্যান্ড টেলিস্কোপ” নামক বিখ্যাত এক ম্যাগাজিনে বইটির সারমর্মের মত একটি প্রবন্ধ লিখেন। রোর বাংলা থেকে সিরাজুম মুনীর শ্রাবণের অনুবাদে প্রবন্ধটির মুখবন্ধ পাঠকদের জন্য দেওয়া হল।

“১৯৭৭ সালে “মহাবিশ্বের সম্ভাব্য অন্তিম পরিণতি- Possible ultimate fate of the universe” শিরোনামে একটি বৈজ্ঞানিক গবেষণাপত্র লিখেছিলাম। কোয়ার্টারলি জার্নাল অব রয়্যাল অ্য্যাস্ট্রোনমিক্যাল সোসাইটিতে গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হয়েছিল। আমার কিছু সহকর্মীর নিকট গবেষণাপত্রটি বেশ আগ্রহোদ্দীপক ও চমৎকার বলে মনে হয়েছে। এর পরপরই বিজ্ঞানের জগতে আবির্ভাব ঘটেছে স্টিভেন ওয়াইনবার্গের সাড়া জাগানো বই “দ্য ফার্স্ট থ্রি মিনিটস”। একদিকে আমার গবেষণাপত্র নিয়ে সহকর্মীরা বেশ উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছে, অন্যদিকে মহাবিশ্বের শুরুর দিক নিয়ে ওয়াইনবার্গ বই লিখেছেন। এই দুই দিক মিলিয়ে ভাবলাম, মহাবিশ্বের শেষ পরিণতি নিয়ে একটি বই লিখলে চমৎকার হয়। এর পরপরই স্কাই অ্যান্ড টেলিস্কোপ নামে একটি জ্যোতির্বিজ্ঞান বিষয়ক সাময়িকী থেকে আমাকে একটি অনুরোধ করা হয়। মহাবিশ্বের চূড়ান্ত পরিণতি নিয়ে আমার গবেষণাপত্রটি যেন সকলের উপযোগী করে সহজসাধ্য ভাষায় লিখে দেই তাদের জন্য। ঐ সাময়িকীতে লেখাটি প্রকাশিত হয় ১৯৭৯ সালের জানুয়ারি সংখ্যায়। লেখার শিরোনাম ছিল ‘The ultimate fate of the universe’।

এটি প্রকাশের পর যে সাড়া পেয়েছি তা-ই আমাকে এই বিষয়ে একটি বই লিখতে প্ররোচিত করেছে। এই বিষয়ের উপর বিস্তারিত আলোচনা করে একটি বই লিখে ফেললে মন্দ হয় না। এসব ঘটনার মিলিত ফলাফলই হচ্ছে বর্তমান এই বই”।

এছাড়াও তাঁর উল্লেখযোগ্য বইগুলো হল “রোটেটিং ফিল্ডস ইন জেনারেল রিলেটিভিটি”, “অ্যান ইন্ট্রোডাকশন টু ম্যাথমেটিক্যাল কসমোলজি”। রয়েল সোসাইটি অব লন্ডন থেকে তাঁর ছয়টি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়। রয়েল সোসাইটি থেকে গবেষণাপত্র প্রকাশ করা মানে পারতপক্ষে রয়েল বা রাজকীয় কাজই সম্পন্ন করা। আবার প্রকাশ করতে সোসাইটির ফেলো রিকমেন্ডেশনও প্রয়োজন হয়। তিনি বিশ্ববিখ্যাত বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং এবং ফ্রেড হয়েল থেকে রিকমেন্ডেশন পেয়েছিলেন। তাঁর গবেষণাপত্রগুলো ধারাবাহিক ছিল এবং বিষয় ছিল “অন রোটেটিং চার্জড ডাস্ট ইন জেনারেল রিলেটিভিটি”। সাধারণ আপেক্ষিকতা ও চার্জিত বস্তু নিয়ে গবেষণা থেকেই ১৯৮৫ সালে ক্যামব্রিজ ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে প্রকাশ হয় তাঁর বই “রোটেটিং ফিল্ডস ইন জেনারেল রিলেটিভিটি”। এই গুরুত্বপুর্ণ গবেষণাকর্মের জন্যই ক্যামব্রিজ ইউনিভার্সিটি তাঁকে অত্যন্ত সম্মানজনক ডিগ্রী "ডক্টর অব সায়েন্স" প্রদান করে।




বিখ্যাত কিছু বইয়ের প্রচ্ছদ। source: roar.media

প্রকাশিতব্য তালিকায় তাঁর আরো দুটি বইয়ের নাম পাওয়া যায়। “অ্যান ইন্ট্রোডাকশন টু ম্যাথমেটিক্যাল ইকনোমিক্স” এবং “কনফাইনমেন্ট অ্যান্ড শ্রোডিংগার ইকুয়েশন ফর গাউস থিওরিস”। অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে বইগুলো হয়ত প্রকাশ হবে।

বাংলাতেও তাঁর দারুণ কিছু বই রয়েছে। তিনি শুধু একজন বিজ্ঞানীই ছিলেন না, শিল্প-সাহিত্যানুরাগীও ছিলেন তাঁর মা-র মতই। বাংলা একাডেমি থেকে তাঁর রচিত সিরিজ “ভাষা শহীদ গ্রন্থমালা” নামে প্রকাশিত হয়েছে। তারই অংশ “কৃষ্ণ বিবর” বইটি। এই সিরিজটিতে সংক্ষেপে কিন্তু পরিপূর্ণভাবে কোনো বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। ব্ল্যাক হোল নিয়ে স্বয়ংসম্পূর্ণ আলোচনা আছে মাত্র ৮০ পৃষ্ঠার কৃষ্ণ বিবর বইটিতে। ১৯৮৫ সালের প্রেক্ষাপটে বাংলা ভাষায় লিখিত এমন উচ্চমার্গীয়, প্রকৃত বিজ্ঞানের বই সত্যিই অভাবনীয় ছিল। কারণ তখন বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চার হাল ছিল নুন আনতে পান্তা ফুরায়-এর মত।

বিজ্ঞানের বাইরেও তিনি তাঁর প্রতিভার ছাপ রেখেছিলেন। গণিত, পদার্থ, জীববিজ্ঞান, সঙ্গীত, অর্থনীতি এবং শিল্পতেও তাঁর বিচরণ ছিল। এসব বিষয়ে গবেষণা, বইগুলোই প্রমাণ বহন করে তাঁর স্পষ্ট, সুন্দর এবং পরিশীলিত চিন্তাধারার। “মার্তৃভাষা, বিজ্ঞানচর্চা এবং অন্যান্য প্রবন্ধ”, “শিল্প সাহিত্য ও সমাজ” তাঁর রচিত দুটি বই যেখানে তাঁর চিন্তার পরিধি এবং পদচারণা নিয়ে ধারণা পাওয়া যায়।

বিশদের সাথে এক আড্ডায় তিনি বলেছিলেন,

“এখন তো আমার অনেক বয়স হয়েছে, ফলে আমার কাজের ক্ষেত্রটাও অনেক বিস্তৃত হয়েছে। আমি যেটাকে রসিকতা করে বলি, ‘ওয়াইডার, বাট নট নেসেসারিলি ডিপার”।

 

                          Sourceপত্রিকা              

দেশে প্রত্যাবর্তনঃ

আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে মেধা পাচার যেন নৈমিত্তিক ঘটনা। উন্নত সুযোগ-সুবিধা, বর্ণিল ক্যারিয়ারের হাতছানি, পরিপূর্ণ জীবনের নিশ্চয়তা সব মিলিয়ে ইচ্ছা বা অনিচ্ছাতেই এসব হয়ে যাচ্ছে। মেধাবী মুখগুলো দেশের জন্য সবকিছু করতে চেয়েও আটকে যাচ্ছে বিভিন্ন কাঁটাতারে। দেশপ্রেমের কথা এখানে খাটে না, সবশেষে বাঁচার জন্য টাকাই প্রয়োজন হয়। আর বিজ্ঞানীদের ক্ষেত্রে তো আরোও বেশি। মেধা পাচার নিয়ে অনেক আওয়াজ উঠলেও তাদের দেশে রেখে পর্যাপ্ত উপযুক্ততা দেওয়ার কথা কেউই বলে না। অধ্যাপক ইসলাম বলেছিলেন, "দেশে ফিরে আসবার পিছনে তাঁর পরিবারের শক্ত অর্থনৈতিক ভিত্তির ব্যাপক প্রভাব ছিল।" 

সাক্ষাৎকার source: morshedislamcu.wordpress.com

তাঁর প্রত্যাবর্তন সহজ ছিলনা। প্রতিকূলতা ভীড় করেছিল প্রান্তরে। ১৯৮১ সালে দেশে মাত্র ২,৮০০ টাকা বেতনের চাকুরী নিয়ে এসেছিলেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেট কিছুতেই তাঁকে ৩,০০০ বেতন দিতে রাজি হয়নি। তবুও থেকে যান তিনি। এক বছর পর গবেষণা ও পারিবারিক প্রয়োজনে আবার লন্ডন যাওয়ার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিলে কর্তৃপক্ষ তাঁকে ছুটি দিতেও অস্বীকার করে। যদিও শিক্ষকরা এটি পেয়ে থাকেন, বেতনও পান এবং এটি শিক্ষা ছুটি হিসেবে গণ্য করা হয়। সেজন্য তাঁকে বাহিরে যেতে হয়েছিল চাকুরী ছেড়ে দিয়ে। ১৯৮৪ সালে লন্ডনের যাবতীয় সবকিছু বিক্রি করে দিয়ে দেশে চলে আসেন। এরপর পুরনো চাকুরীতে পুনরায় বহাল হন, বেতনও বৃদ্ধি পেয়ে ৩,০০০ হয় এবং মাঝের সময়টুকুকে শিক্ষা ছুটি হিসেবে গ্রহণ করা হয়।

অবশ্য তাঁর ভোগান্তি এতটুকুই ছিলনা। “কালি ও কলম” পত্রিকায় প্রকাশিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এ এম হারুন অর রশিদের  একটি রচনা থেকে এই পরিস্থিতি নিয়ে ভালো ধারণা পাওয়া যায়। তিনি বলেছেন,

“জামালের সঙ্গে আমার সবচেয়ে বেশি ঘনিষ্ঠতা হয় ১৯৮৪ সালে, যখন তিনি ক্যামব্রিজ থেকে চট্টগ্রামে চলে আসার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিলেন। একদিন তিনি টেলিফোনে আমাকে লন্ডন থেকে জানালেন যে, তিনি বাংলাদেশে চলে আসতে চান। আমি বলেছিলাম, ‘এটা নিশ্চয়ই খুব ভালো সিদ্ধান্ত। তবে তিনি যদি তাঁর দরখাস্তটি অবিলম্বে আমার কাছে পাঠিয়ে দেন, তাহলে আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের সঙ্গে আলাপ করে যথাযথ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করার পরামর্শ দিতে পারি।’

তারপর তিনি যা বলেছিলেন তা আমি শুনতে মোটেই প্রস্তুত ছিলাম না। তিনি বললেন, তিনি ঢাকায় যাবেন না, তিনি চট্টগ্রামে যাবেন। কেননা সেখানে রয়েছে তাঁর পৈতৃক ভবন। আমি তাঁকে বোঝাতে চেষ্টা করলাম যে, মনে হয় না, চট্টগ্রামে তিনি খুব ভালো ছাত্র পাবেন এবং হয়তো সেখানে তাঁর গবেষণাকর্ম ব্যাহতই হবে। কিন্তু তিনি সে-কথা মোটেই  কানে তুললেন না।  তাঁর কথা ছিল একটাই যে, আমি যেন তাঁর দরখাস্তটি নিয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের সঙ্গে অবিলম্বে দেখা করি। আমি তাই করেছিলাম। এক সকালে ট্রেনে চট্টগ্রামের টিকিট কিনে চট্টগ্রাম পৌঁছে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের সঙ্গে দেখা করে তাঁকে বলেছিলাম, ‘জামাল নজরুল ইসলাম এদেশের সম্পদ – তাঁকে আপনার বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়ে আসা আপনাদেরই সৌভাগ্য।’ উপাচার্য করিম সাহেব আমার সঙ্গে সম্পূর্ণ একমত হলেন এবং প্রতিশ্রুতি দিলেন যে, জামাল নজরুল ইসলামের জন্য একটি অধ্যাপক পদ পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে অবিলম্বে সৃষ্টি করে তাঁকে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করা হবে।

দুঃখের বিষয়, ঢাকায় ফিরে এসে কয়েকদিন পরে খবর পেলাম যে কিছু জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে। পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে পদ সৃষ্টি করা সম্ভব হবে না। তাই কিছুদিন পরে গণিত বিভাগেই একটি পদ সৃষ্টি করা হয়েছিল এবং তাও দ্বিতীয়বার আমার চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে সকলকে বিশেষভাবে অনুরোধ করার পর। যা হোক, শেষ পর্যন্ত সকলের আন্তরিক প্রচেষ্টায় এবং অকুণ্ঠ সহযোগিতা অধ্যাপক জামাল নজরুল ইসলাম চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে যোগদান করতে সমর্থ হয়েছিলেন” ।

জামাল নজরুল ইসলাম রিসার্চ সেন্টার ফর ম্যাথেমটিকস অ্যান্ড এপ্লায়েড সায়েন্স। source: cu.ac.bd

পুরষ্কার ও সম্মাননাঃ

ক্ষণজন্মা এই বাংলাদেশী সন্তান বিভিন্ন সময়ে অনেক পুরষ্কার ও সম্মাননায় ভূষিত হয়েছিলেন। তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য কিছু নিম্নরুপ,

  • বাংলাদেশ বিজ্ঞান একাডেমী স্বর্ণপদক (১৯৮৫)
  • ন্যাশনাল সায়েন্স এন্ড টেকনোলজি মেডেল (১৯৯৪)
  • ইতালির আবদুস সালাম সেন্টার ফর থিওরিটিকাল ফিজিক্সে থার্ড ওয়ার্ল্ড একাডেমি অফ সায়েন্স এর মেডাল লেকচার পদক (১৯৯৮)
  • কাজী মাহবুবুল্লাহ এন্ড জেবুন্নেছা পদক (২০০০)
  • একুশে পদক (২০০১)
  • পদার্থবিজ্ঞানে বিশেষ অবদান রাখার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এর রাজ্জাক-শামসুন আজীবন সম্মাননা পদক (২০১১)

বেলাপ্রান্তরেঃ

সবাই বলে, অধ্যাপক ইসলামের বিদেশ থেকে যাওয়া উচিত ছিল। হয়ত তাতে তাঁর ভবিষ্যৎ আরোও সমৃদ্ধ হত। তিনি বেছে নিয়েছিলেন দেশমাতৃকাকে। মানুষের চিরাচরিত উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে পিছনে ফেলে চেয়েছিলেন হাজার হাজার শিক্ষার্থীদের পথ দেখাতে। তাঁর অবদান পরিমাপ করা সম্ভব নয়। তিনি বাংলাদেশের বিজ্ঞান জগতের অভিভাবক ছিলেন। ছিলেন নীরব, নিভৃতচারী, আত্মপ্রচারহীন এক মানব। তিনি পথ দেখিয়ে গিয়েছেন, প্রজন্মের কাজ ছিল তা অনুসরণ করে পথটাকে মহাসড়ক বানানো। তাঁর ত্যাগের মাহাত্ম্য, ভিশন, আবেদন কখনোই ফুরিয়ে যাবে না, আলোকবর্তিকা হয়ে প্রোজ্জ্বল থাকবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে যেন আলেকজান্দ্রিয়ার আরেকটি বাতিঘর। আমাদের সুযোগ হারিয়ে যায়নি, এখনো পারি তাঁকে আইকন বানিয়ে সামনে এগিয়ে যাবার শপথ নিতে। 

তাঁর গড়ে তোলা গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো আলো ছড়াচ্ছে দেশ থেকে বিদেশে। বিশ্বমানের গবেষক তৈরি হচ্ছে সেখানে। ২০১৩ সালের ১৬ ই মার্চ এই মহান মনীষী ইহধাম ছেড়ে পরপারের পথে হেটেছেন। তবে তাঁর মত সাধককে কে হারাতে চায়? এই পথ ধরেই সহস্র জামাল নজরুল ইসলাম আসুক নেমে এই চির হরিত বাংলাদেশে।

 

তথ্যসূত্রঃ

1.  ছিদ্দিকী, শরীফ মাহমুদ (২০১৪), বিশ্বনন্দিত বিজ্ঞানী জামাল নজরুল ইসলাম, অনুপম প্রকাশনী
2.   বিশদ আড্ডা, মাসিক বিশদ সংবাদ, আগস্ট ২০০৭
3.   মাসিক কালি ও কলম, বৈশাখ ১৪২০
4.   বিশ্বের বুকে বাংলার গর্ব জামাল নজরুল ইসলাম -
roar.media/bangla
5.   Prof. Jamal Nazrul-Islam - Islamic World Academy of Sciences
6.   Interview with Prof. Jamal Nazrul Islam in 1999 – Muhammad Morshedul Islam, University of       Chittagong
7.  Jamal Nazrul Islam, “Person who inspires me the most” – medium.com

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ