লেখা তরজমা

সাদা দাড়িওয়ালাদের উপাখ্যান


ইলুমিনাতি,ফ্রি ম্যাসন,দ্যা হসপিটালার অথবা নাইটস টেম্পলার সহ বহু গোপন সংগঠনের নাম আমরা শুনে এসেছি। কথিত থাকে এদের গঠিত হবার পেছনে থাকে কোনো গোপন এবং মহৎ উদ্দেশ্য যা তারা রক্ষা করে থাকে সাধারণ মানুষদের থেকে। ইতিহাস থেকে আমরা যা জানতে পারি এসব সংগঠনগুলো সবই খৃষ্টীয় অথবা প্যাগান সংস্কৃতির অনুসারী। তাহলে মুসলিমদের মাঝে কি এরকম কোনো সংগঠন ছিল? চলুন তবে জেনে আসি।

বিখ্যাত ইতিহাসবিদ রাশীদুদ্দিন হামদানীর মতে ৬৮০ খ্রীষ্টাব্দের দিকে দেদে কুরকুত নামক একজন ব্যক্তি যিনি ওঘুজ তুর্ক ছিলেন সর্বপ্রথম রাসূল(সাঃ) এর সাথে সাক্ষাত করেন এবং মুসলিম হবার সৌভাগ্য অর্জন করেন। যখন তিনি রাসূল(সাঃ) এর সান্নিধ্যে ছিলেন তখন কনস্টান্টিনোপল বিজয় সংক্রান্ত বিখ্যাত হাদীসটি শুনতে পান।

“নিশ্চিতরূপেই তোমার কুসতুনতুনিয়া (কনস্টান্টিনোপল) জয় করবে। সুতরাং তার শাসক কতই না উত্তম হবে এবং জয়লাভকারী সৈন্যরাও কতই না উত্তম হবে!”

হাদীসটি শুনে তিনি ফিরে যান এবং তৎকালীন ওঘুজ শাসককে অবহিত করেন। এরপর থেকে এ বিজয়কে তুর্কগণ নিজেদের নিয়তি বলে ধরে নেন এবং বিজয়কে সফল করা নিজেদের উপর বাধ্যতামূলক করে নেন। সেই লক্ষ্যকে সামনে রেখেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল আমাদের আলোচ্য সংগঠন সাদা দাড়িওয়ালা বা হোয়াইট বেয়ার্ডস।



ইতিহাসে এর বিভিন্ন নাম পাওয়া যায়। আকসাকাল (Aqsaqal), হেয়েত (Heyet) এবং ইহতিয়ারলার (Ihtyarlar) নামগুলো পাওয়া যায়। তবে এর যাত্রা শুরু হয়েছিল বুরু বুদুন (Boru Budun) নামে ৬৮০ খ্রীষ্টাব্দে মেটে হান (Mete Han) নামক একজন ব্যক্তির হাত ধরে। ওঘুজ তুর্ক বে(নেতা) গণ নিজেদের মধ্য থেকে বাছাইকৃত শ্রেষ্ঠ ছেলেদেরকে সাদা দাড়িওয়ালাদের সংস্পর্শে পাঠাতেন। এই গোপন সংগঠন মূলত কাজ করত তুর্কদের ইন্টিলিজেন্স নিয়ে। শত্রুদের থেকে তথ্য সংগ্রহ করা, সৈন্যদের বিভিন্ন মিশনে পাঠানো সহ গুরুত্বপূর্ণ কাজ সম্পাদনা করতেন। শত্রুদের তথ্য সংগ্রহের জন্য বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ কাজ তারা করতেন। শত্রুদের সমাজ, সংস্কৃতির সাথে মিশে যাবার জন্য একদম ছোট বয়সেই গোয়েন্দা নিয়োগ করার তথ্যও রয়েছে। এইসব বালকেরা বড় হতে হতে শত্রুদের কৃষ্টি, সমাজ ও সংস্কৃতির সাথে মিশে যেত, যার ফলে তথ্য সংগ্রহ করার কাজও জলবৎ তরলং হয়ে যেত।

ইতিহাসের দুটি বিখ্যাত সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠায় এদের বৃহৎ অবদানের কথা উল্লেখিত। মহান সেলজুক সাম্রাজ্য এবং উসমানী খেলাফত প্রতিষ্ঠায় সাদা দাড়িওয়ালাগণ বড় অবদান রেখেছেন। তারা সবসময় গোপন পরামর্শ, শত্রুদের থেকে হাতানো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়ে সাম্রাজ্যকে ঝুঁকি মুক্ত রাখতেন। উসমানী খেলাফতের প্রতিষ্ঠাতা উসমান গাজীকে তারা সব ধরণের সামরিক এবং বুদ্ধিবৃত্তিক সাহায্য করেছেন। রাজনৈতিক ভাবে তারা কখনো প্রকাশ্যে আসতেন না, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই গোয়েন্দা কার্যক্রমে নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখতেন।



উসমানী খেলাফতের প্রতিষ্ঠাতা উসমান গাজী সহ তার পিতা এরতুগরুল গাজী এবং দাদা সোলায়মান শাহের সাথেও সাদা দাড়িওয়ালাদের সম্পৃক্ততার কথা ইতিহাসে পাওয়া যায়। মধ্য এশিয়া, খোরাসান, ককেশাস অঞ্চলে যখন মঙ্গোল তান্ডব মাথাচাড়া দিল, তখন সাদা দাড়িওয়ালাদেরকে প্রচুর পরিমাণে হত্যা করা হয়েছিল। কারণ ধারণা করা হত যে তারা হচ্ছেন মুসলমানদের প্রতিরোধের সর্বোচ্চ পর্যায়। সাদা দাড়িওয়ালাদের পরামর্শেই সোলায়মান শাহ গোত্র নিয়ে আনাতোলিয়ায় বসতি স্থাপনের জন্য রওনা দিয়েছিলেন।

সাদা দাড়িওয়ালাদের প্রতীক ছিল তিনটি চাঁদ, একটির সাথে অপরটি জোড়া দেওয়া। সাধারণত দৃষ্টি পড়ে এরকম স্থানে প্রতীকটি ব্যবহার নিজেদেরকে প্রকাশ করত তারা। বর্তমানে বহুল প্রচারিত এবং দর্শজনন্দিত তুরস্কের ঐতিহাসিক ড্রামা সিরিয়ালগুলোতেও এর দারূণ উপস্থাপন দেখা গিয়েছে।



বাছাইকৃত ছেলেদেরকে নিয়ে সাদা দাড়িওয়ালারা গঠন করত শক্তিশালী সৈন্যবাহিনী। আর সৈন্যবাহিনী থাকত চার স্তরে বিভক্ত। প্রথম ভাবে থাকত আকিনজিরা। যারা ছিলত ঘোড়সওয়ার এবং যুদ্ধের সর্বোচ্চ ঝুঁকি মোকাবিলা করত। এরপর আসত দেলাইলার (Deliler) বা স্পেশাল ফোর্স। এদেরকে সুইসাইড স্কোয়াড বা গেরিলা যোদ্ধা বলেও অভিহিত করা যায়। এদের কাজ ছিল ময়দানের কোথাও কোনো ঘাটতির তাৎক্ষণিক মোকাবিলা কিংবা হঠাৎ আক্রমণ করে শত্রুপক্ষকে আতঙ্কিত করে দেওয়া। তৃতীয় স্তরে থাকত আল্পস বা সাধারণ সৈন্যগণ। যারা যুদ্ধের মধ্যে যেকোন আদেশ পালন করত। চতুর্থ বা সর্বশেষ স্তরেই পাওয়া যেত সাদা দাড়িওয়ালাদের। যুদ্ধের গোয়েন্দা কার্যক্রম থেকে শুরু করে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত প্রণয়নে সার্বিক সহযোগিতা করত তারা।

সাম্রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিগণ সহ সুলতানকে তারা পরামর্শ দিয়ে সাহায্য করতেন। বিভিন্ন সময়ে বিখ্যাত দরবেশগণও তাদের সাথে কাজ করতেন। তন্মধ্যে আখি এভরান(রহঃ) সর্বাধিক পরিচিত। তার নামে পরবর্তীতে একটি ধারার সৃষ্টি হয় এবং সেই ধারার অনুসারীদের আখি বলে ডাকা হত। আখি শব্দের অর্থ আমার ভাই। এই আখিগণ উসমানী খেলাফতের ব্যবসায়িক কার্যক্রমে ব্যাপক উন্নতি সাধন করেছিলেন। ব্যবসায়িক স্বচ্ছতা, সততার ধারণা তাদের মাধ্যমে পুরো খেলাফতে বিস্তৃতি লাভ করেছিল।



ইতিহাসে তাদের সত্যতার অনেকগুলো প্রমাণের মধ্যে একটি ১৪৫২ সালে সুলতান দ্বিতীয় মুহাম্মদ, যিনি আল ফাতিহ মুহাম্মদ নামে সুপরিচিত, যার নেতৃত্বে রাসূল(সাঃ) এর ভবিষ্যৎবাণী কনস্টান্টিনোপল বিজয় সম্পন্ন হয়েছিল তিনি একটি প্রাসাদের নকশা আঁকেন যার সাদৃশ্য ছিল সাদা দাড়িওয়ালাদের তিন চাঁদওয়ালা প্রতীকের সাথে। প্রাসাদটি চানাক্কালে প্রাসাদ নামে সুপরিচিত।

ধারণা করা সুলতান মুহাম্মদ ফাতিহ কর্তৃক কনস্টান্টিনোপল বিজয় হবার পরে তারা কার্যক্রম বন্ধ করে দেন কেননা তাদের প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যই ছিল কনস্টান্টিনোপল বিজয়ের জন্য কাজ করে যাওয়া।

উসমানী খেলাফতের ক্রান্তিকালে যখন সুলতান দ্বিতীয় আব্দুল হামিদ মসনদে ছিলেন, তখন একই রকমের একটি সংগঠন আবার তৈরি করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তৎকালীন উসমানী খেলাফত আশেপাশের অন্যান্য রাষ্ট্রগুলো থেকে জ্ঞান-বিজ্ঞানে অনেক পিছিয়ে গিয়েছিল এবং ইসলামী ভাবধারা থেকে বিচ্যুত হয়ে পাশ্চাত্য ভাবধারায় দীক্ষা নেবার প্রবণতা খুব দেখা গিয়েছিল। সুলতান এরকম সংগঠন করার জন্য তখন যোগ্য লোকও পাননি এবং সফল হতে পারেন নি।



সাদা দাড়িওয়ালাগণ ছিলেন একটি বৃহৎ এবং মহৎ স্বপ্নের ধারক এবং বাহক। বহুবছর ধরে তারা সেই স্বপ্নকে বাস্তবায়নের জন্য নিজেদেরকে উৎসর্গ করে এসেছিলেন। তুর্কদের ইন্টিলিজেন্সকে করেছিলেন সমৃদ্ধ এবং নিজেদেরকেও রেখেছিলেন লোকচক্ষুর আড়ালে। বর্তমানে প্রচারিত ঐতিহাসিক ড্রামা সিরিয়ালগুলোর কল্যাণে আমরা দেখতে পাচ্ছি তাদের কাজের কিছু নমুনা। যদিও বাস্তবে তাদের কাজের পরিধি এবং ব্যাপকতা ছিল আরো অনেক বেশি। 


তথ্যসূত্রঃ 

  • জামি আল তাওয়ারিখ, দ্যা হিষ্ট্রি অব সেলজুক তুর্কস, রাশীদুদ্দিন হামদানী 
  • https://www.historicales.com/who-were-white-beards-or-heyet-secret-organization/

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ