ফেমটোকেমিস্ট্রি কথকতা এবং আবিষ্কারকের সাতকাহন
সাজ্জাদুর রহমান
প্রারম্ভিকা:
সাদা, তুলতুলে কিউট একটা বিড়াল নিয়ে সন্তর্পণে দুতলা বাসাটির ছাদে উঠছে রিয়াদ। বিড়ালটিকে উল্টো করে চার পায়ে ধরে নিচের দিকে ছুড়ে মারল সে। নিচ থেকে ক্লিক ক্লিক শব্দ তরঙ্গায়িত হল। কিন্তু শুধু উপরে থাকা অবস্থায় বিড়ালের ছবি এবং মাটিতে এসে পড়ার মুহূর্তের ছবি ছাড়া ক্যামেরায় আর কিছুই আসল না। দুপুর গড়িয়ে বিকেল, এরকম এক্সপেরিমেন্ট করতে করতে হতাশ হয়ে গিয়েছে তারা দুজন। একটা স্লো মোশন ক্যামেরা থাকলে এতটা কষ্ট করতে হয়ত হত না তাদের।
আসলে কি সম্ভব নয় ছাদ থেকে মাটিতে পড়ার আগ পর্যন্ত প্রতিটি মুহূর্তকে ক্যামেরাতে ধারণ করা?
কিংবা যদি রাসায়নিক বিক্রিয়ায় আসি। আমরা শুধু বিক্রিয়ক থাকা অবস্থায় এবং উৎপাদ হয়ে যাবার পরে সবকিছু দেখি। কিন্তু এর মাঝখানে যা কিছু ঘটে তা কি দেখবার উপায় নেই? আছে এমন কোনো ক্যামেরা যা রাসায়নিক বিক্রিয়ার সূক্ষ্মতম অবস্থাগুলোরও প্রতিচ্ছবি ধরতে পারবে? সময়ের সূক্ষ্মতম এককে কি মহাপ্রলয় ঘটছে ছোট্ট কণাগুলোতে তা উঠিয়ে আনবে ক্যানভাসে?
সে আলোচনায় আসার আগে সময়ের পরিসীমায় একটু ঘুরে আসি। সময়ের ক্ষুদ্রতম একক কি? আমরা জানি সেকেন্ড এখানে উত্তর হবেনা। কারণ ন্যানোসেকেন্ড সম্পর্কেও আমরা অবগত। ন্যানোসেকেন্ডের পরিসীমা নিয়ে কী ধারণা আছে আমাদের? এক সেকেন্ডের একশো কোটি ভাগের এক ভাগ মানে ১০-৯ সেকেন্ড। ইংলিশে বললে “One billionth of a second”. আরো ছোটও আছে কি? অবশ্যই, পিকোসেকেন্ড কি করে ভুলে যাব। এক সেকেন্ডের এক লক্ষ কোটি ভাগের এক ভাগই হচ্ছে এক পিকোসেকেন্ড অর্থাৎ ১০-১২ সেকেন্ড। ইংলিশে বলে, “One trillionth of a second or one millionth of one millionth of a second”. তবে সময়কে আরো সূক্ষ্ম করা যায়। আমাদের আজকের আলোচনা তা নিয়েই আবির্ভূত হবে।
এক সেকেন্ডের এক কোটি কোটি ভাগের একভাগ! কি! মাথা ঘুরাচ্ছে! এটাকেই বলে ফেমটোসেকেন্ড। ১০-১৫ সেকেন্ড। সহজে বুঝার জন্য ইংলিশে বলি, “One quadrillionth of a second or one milliionth of one billionth of a second”. মানে কতটা ক্ষুদ্র বুঝা যাচ্ছে নিশ্চয়। এই ফেমটোসেকেন্ডেরই হাত ধরে উৎপত্তি হয়েছে কেমিস্ট্রির একটি নতুন শাখার। ফেমটোকেমিস্ট্রি। যেখানে সূক্ষ্মতম সময়ে রাসায়নিক বিক্রিয়া নিয়ে অধ্যয়ন করা হয়। এটি ফিজিক্যাল কেমিস্ট্রি বা ভৌত রসায়নের একটি শাখা। আরো সহজভাবে বলতে গেলে,
“Femtochemistry is the area of physical chemistry that studies chemical reactions on extremely short timescales (approximately 10^-15 seconds or one femtosecond, hence the name) in order to study the very act of atoms within molecules (reactants) rearranging themselves to form new molecules (products).”

প্রাথমিক পরিচয়:
এই অদ্ভুত শাখাটির জন্ম হয়েছে নীলনদ বিধৌত অপূর্ব সুন্দর দেশ মিশরের এক মুসলিম মনীষীর হাত ধরে। মিশরের দামানহুরে ১৯৪৬ সালের ২৬ শে ফেব্রুয়ারিতে জন্মগ্রহণ করেছিলেন তিনি। বেড়ে উঠেন নীলনদের পারের শহর আলেকজান্দ্রিয়ায় তাঁর তিন বোনের সাথে। পড়াশোনার পাঠও এখানেই চুকিয়ে নেন। আলেকজান্দ্রিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৬৭ সালে স্নাতক এবং ১৯৬৯ সালে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করে পাড়ি জমান সুদূর আমেরিকার পেনসিলভানিয়ায় উচ্চতর শিক্ষার উদ্দেশ্যে। পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচ ডি করার উদ্দেশ্যে আসেন। সেখানে তিনি মেন্টর হিসেবে পান ড. রবিন হচস্ট্রসার কে। এইতো তার মোটামুটি শিক্ষাজীবন। ১৯৯৯ সালে রসায়নে নোবেল প্রাইজ পাওয়া এই মানুষটি হচ্ছেন ড. আহমেদ জিওয়াইল। পুরো নাম আহমেদ হাসান জিওয়াইল।
জন্মগত প্রতিভা বলে কি কিছু আছে? বা যখন আমরা বলি “মর্নিং শৌজ দ্যা ডে” কথাটির ভিত্তি কি আছে আসলেই? কেন থাকবেনা? মানুষ ছোট থেকেই তৈরি হয় তার ডেজটিনি বাস্তবায়ন করার জন্য। ড. আহমেদের বেলাতেই যদি আসি। ছোট থেকেই তিনি ভালোবাসতেন “কেন” এবং “কিভাবে” প্রশ্নগুলো করতে। বাসায় বসে ছোটখাটো বিজ্ঞান পরীক্ষা আমরা কে না করেছি পিচ্চিকালে? বোর্ডে মোটর লাগিয়ে জাহাজ বানিয়েছি, পাখা বানিয়েছি, মাথার চুল আচড়িয়ে তড়িৎ চৌম্বকীয় ধর্ম দেখেছি এরকম কতকিছুই তো উঠে আসবে। ড. আহমেদও ব্যতিক্রম ছিলেন না। তাঁর পছন্দের বিষয় ছিল ভৌত বিজ্ঞান বা Physical Science. তাহলে তিনি কি করতেন ছোটবেলায়? তিনি আগুন নিয়ে খেলেছেন। না না! ভয় পাবার কিছু নেই। মায়ের স্থায়ী চুলাকে অস্থায়ী বুনসেন বার্ণার বানিয়ে সেখানে কাঠ কিভাবে আগুনে পুড়ে তা পরীক্ষা করতেন। এই না হলে পরবর্তীতে তিনি কিভাবে রাসায়নিক বিক্রিয়ার সময় নিয়ে খেলতে পারতেন?
তাঁর চাচার দ্বারা ভালোমাত্রায় উৎসাহ পেতেন তিনি। তাঁর চাচা তাকে এসব উদ্ভট পরীক্ষা করতে সাহায্য করতেন, প্রেরণা দিতেন। তাঁর ঘরের দরজাতেও লেখা ছিল “Dr. Ahmed.” যদিও তিনি ডাক্তার হতে পারেন নি তবে ডক্টর হয়েছিলেন। ছোট থেকেই যিনি এরকম আগ্রহ দেখিয়েছিলেন, অনুপ্রেরণা পেয়েছিলেন, বড় হয়ে সে বড় কিছুই করবে ভাবাটা কখনোই অমূলক নয়।

আলেকজান্দ্রিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর শেষ করে সেখানেই শিক্ষকতায় নিযুক্ত হলেন। সেই সাথে উচ্চশিক্ষা অর্থাৎ গবেষণার জন্য আবেদন করলেন। আলেকজান্দ্রিয়া বিশ্ববিদ্যালয়েও গবেষণা চালিয়ে যেতে থাকলেন। তাঁর গবেষণার বিষয়বস্তু ছিল “স্পেকট্রোস্কোপি বা Spectroscopy.” সংজ্ঞায় যদি যাই,“The study of molecules using light and wavelengths”. আরেকটু বিস্তারিত বললে হবে,
“Study of the absorption and emission of light and other radiation by matter, as related to the dependence of these processes on the wavelength of the radiation.”
এ সময় বেশ ভালো কিছু কাজ করেছিলেন তিনি। তবে এ সময় তাঁর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজটি ছিল অণুগুলোর মধ্যকার সংযোগ নিয়ে। তবে তখন তাঁর মনে হল আরো উচ্চতর গবেষণার প্রয়োজন। অতঃপর পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডাক পেলেন। নীলনদের তীর ছেড়ে পাড়ি জমালেন সুদূর আমেরিকায়।
আমরা যখন স্কুল থেকে কলেজে উঠি তখন নতুন এক জগতে নিজেদের আবিষ্কার করি। আবার কলেজ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পা রাখলে আরেক নতুন দুনিয়ায় নিজেদেরকে নিয়ে আসি। আলেকজান্দ্রিয়া বিশ্ববিদ্যালয় মিশরে শ্রেষ্ঠ হলেও পেনসিলভানিয়ায় গিয়ে নিজেকে ভিন্ন এক দিগন্তে উম্মোচন করলেন ড. আহমেদ। তাঁর ভাষাতেই শুনি চলুন,
''The feeling of being thrown into an ocean. The ocean was full of knowledge, culture, and opportunities, and the choice was clear: I could either learn to swim or sink. ''
১৯৭৪ সালে পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচ.ডি ডিগ্রীপ্রাপ্ত হন। এরপর ১৯৭৬ সালে পোস্ট-ডক্টরাল রিসার্চার এবং এসিস্ট্যান্ট প্রফেসর হিসেবে ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, বার্কলীতে যোগদান করেন। এরপর ১৯৭৮ সালে এসোসিয়েট প্রফেসর এবং ১৯৮২ সালে প্রফেসর পদে উন্নীত হন। এখানে তিনি প্রফেসর চার্লস হ্যারিসের সাথে কাজ করেন । এবং এখানেও স্পেকট্রোস্কোপির উপর উচ্চতর গবেষণা অব্যাহত রাখেন। তারা দুজনে একত্রে বেশ ভালো কিছু পরীক্ষা-নিরিক্ষা চালান। লেজারের সাহায্যে বিক্রিয়ায় অণুগুলোর চলাচল, বন্ধন গঠন পর্যবেক্ষণ সহ বিভিন্ন কার্যকরী কাজ তারা উভয়ে মিলে করেছিলেন। আর এসব করতে গিয়েই ড. আহমেদ ধীরে ধীরে আকৃষ্ট হয়ে পড়েন, আগ্রহী হয়ে উঠেন ছোট ছোট কণাগুলোর অর্থাৎ অণু-পরমাণুগুলোর মধ্যকার কাজকর্মগুলোতে।

ফেমটোকেমিস্ট্রির জন্মদাতা:
ইতোমধ্যেই শিক্ষক হিসেবে নামডাক ছড়িয়ে পড়ল তাঁর। একজন আদর্শ শিক্ষক ছিলেন তিনি ছাত্রদের নিকট। সে সূত্রেই এবার যুক্ত হলেন ক্যালটেকের সাথে। Caltech এর পূর্ণরূপ হচ্ছে California Institute of Technology. এখানে নতুন জীবন শুরু করলেন তিনি।
শুধু একজন ভালো শিক্ষক হিসেবেই নয়, গবেষক হিসেবেও পিছিয়ে ছিলেন না তিনি। সেই পুরনো তাড়না এখানে এসে যেন মাথায় চড়ে বসল। মাথার সেই পুরনো ভূতটা আবার এসে বলে গেল রাসায়নিক বিক্রিয়া নিয়ে খেলতে। তো, তিনি দ্রুত কার্যকরী লেজারের সাহায্যে রাসায়নিক বিক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করে সূক্ষ্মতম সময়ের অবস্থাও দেখতে পারলেন। কিভাবে অণুগুলো বন্ধন গঠন করছে কিংবা যৌগগুলো বন্ধন ভাঙছে সেসব যেন স্লো মোশনে দেখতে পেতেন। সেই সূক্ষ্মতম সময়টি ছিল ফেমটোসেকেন্ড বা ১০-১৫ সেকেন্ড। অসাধারণ নয় কি? রাসায়নিক গবেষণায় নতুন কিছুর শুভাগমন বার্তা তখন হয়ত ইথারে ভাসছিল। নতুন কিছু করার সময়, নতুন করে ভাবার সময় হয়ত এসেছিল।
সাধারণত একটি রাসায়নিক বিক্রিয়া সংঘটিত হতে ১০-১০০ ফেমটোসেকেন্ড সময় লাগে। তাই স্বাভাবিক ভাবে অনেক বিজ্ঞানীই এটাকে অসম্ভব মনে করতেন যে বিক্রিয়া চলাকালীন ঘটনাবলী পর্যবেক্ষণ করা সম্ভবের পর্যায়ে পড়বে। আসলে, অসম্ভব বলে কিছু কি আছে? সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের পোকা কারো মাথায় তো কিলবিল করছেই। ১৯৮০ এর শেষের দিকে কিছু একটা করে ফেলেছিলেন ড. আহমেদ। তিনি দশ ফেমটোসেকেন্ডস এর মধ্যে নতুন লেজার প্রযুক্তির সাহায্যে বিক্রিয়া সংঘটনকালীন অণু-পরমাণুগুলোর গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করতে পারলেন। লেজার প্রযুক্তি নিয়ে তাঁর আগ্রহের এবং কাজের কথা আগেই বলা হয়েছে। নতুন এই সাফল্য নতুন কিছুর সূচনা ঘটাল এবং পদ্ধতিটি পরিচিতি পেল “Femtosecond Spectroscopy” নামে।
প্রশ্ন থেকে যায় না তিনি কিভাবে কাজটি করতে সক্ষম হয়েছিলেন? চলুন তবে সেটিই জেনে আসি না হয়। একটি বায়ুশূন্য বদ্ধ নলে (Vacuum Tube) অণুগুলোকে রেখে তার মধ্য দিয়ে অতি দ্রুতগামী লেজার পরপর দুইবার পাঠানো হয়। প্রথমবার লেজারটি বিক্রিয়ায় শক্তির যোগান দেয় এবং দ্বিতীয়বার চলাকালীন বিক্রিয়াটি পর্যবেক্ষণ করতে সাহায্য করে। অণুগুলোর মধ্য দিয়ে লেজার প্রবাহিত হবার ফলে তাদের স্বভাবগত বর্ণালী (Characteristic Spectra) অথবা আলোর ধরণ (Light Pattern) দেখে বুঝা যেত তাদের গঠনগত কিরূপ পরিবর্তন হচ্ছে। এছাড়াও এর ফলাফল কাজে লাগিয়ে তিনি 4D Electron Microscope আবিষ্কার করেন। স্পেসের তিনটি ডাইমেনশন (x,y,z) এবং সময়কে (Time) এখানে চতুর্থ ডাইমেনশন হিসেবে নিয়েছিলেন তিনি। এসব অভাবনীয় আবিষ্কারগুলো বিজ্ঞানীদের অভূতপূর্ব সহযোগীতা করে রাসায়নিক বিক্রিয়ার ফলাফলের উপর আরো নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আসতে, তারা সক্ষম হয় সাধ্যের মধ্যে সর্বোচ্চ ভালো ফলাফলটি পেতে এবং 4D Electeon Microscope এর সাহায্যে বিজ্ঞানীগণ পরমাণুর গতিশীলতা আগের Microscope গুলো থেকে ১০৯ গুণ দ্রুত অর্থাৎ Billion times faster অবলোকন করতে পারলেন। বলাটা বাহুল্যহীনই হবে যে আবিষ্কারগুলোর কারণে রসায়নের জগতে দারুণ সাড়া পড়ে গিয়েছিল।
নোবেল এসেম্বলির বক্তব্যেই এর কিছুটা প্রমাণ আমরা পেয়ে যাই। চলুন শুনি,
“With femtosecond spectroscopy we can for the first time observe in ‘slow motion’ what happens as the reaction barrier is crossed,”
অর্থাৎ সহজ ভাষায় ফেমটোসেকেন্ড স্পেকট্রোস্কোপির সাহায্যে প্রথমবারের মত আমরা রাসায়নিক বিক্রিয়াকে স্লো মোশনে, অতি ধীর গতিতে দেখতে পাই। শুধু কি এতটুকুই? এই আবিষ্কারের সুফল এখন কিভাবে আমরা ভোগ করছি সেটাও তো জানা কর্তব্য। জেনে নিই তবে,
“Scientists the world over are studying processes with femtosecond spectroscopy in gases, in fluids and in solids, on surfaces and in polymers. Applications range from how catalysts function and how molecular electronic components must be designed, to the most delicate mechanisms in life processes and how the medicines of the future should be produced.”
নতুন করে বলার আর অপেক্ষা রাখে না যে, রাসায়নিক জগতে একটি যুগান্তকারী আবিষ্কার করেছেন একজন মিশরীয় বংশোদ্ভূত মুসলিম বিজ্ঞানী ড. আহমেদ হাসান জিওয়াইল। এজন্য তাকে “Father of Femtochemistry” উপাধিতেও ভূষিত করা হয়।
পুরষ্কার, সম্মাননা এবং প্রকাশনা:
১৯৯০ সালে তার জীবনে ভালোকিছু আসে। ভাগ্যতারকা যেন তখন দিনকে রাত মনে করেই সর্বক্ষণ প্রোজ্জ্বল ছিল। তিনি নির্বাচিত হলেন ক্যালটেকের লিনাস পলিং (Linus Pauling) প্রফেসর অব কেমিক্যাল ফিজিক্স হিসেবে এবং তিনিই ছিলেন সর্বপ্রথম। ১৯৯০-১৯৯৭ পর্যন্ত অত্যন্ত দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন। অতঃপর ১৯৯৭ সালে লিনাস পলিং প্রফেসর অব কেমিস্ট্রি হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হন। সেই সাথে ১৯৯৫ সালে প্রফেসর অব ফিজিক্স এবং Physical Biology Center for Ultrafast Science and Technology, Caltech এর ডিরেক্টর ছিলেন। ক্যালটেকে শিক্ষকতা এবং গবেষণার পাশাপাশি বেশকিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি ভিজিটিং প্রফেসর হিসেবেও দায়িত্ব পালন করতেন। সেগুলো ছিল, Texas A & M University, University of Iwoa, American University of Cairo. এসবের পরে ২০১১ সালে কায়রোতে তিনি সরকারি উদ্যোগে Zewail City of Science and Technology প্রতিষ্ঠা করেন। যা ছিল যুগান্তকারী এবং সর্বশ্রেষ্ঠ একটি শিক্ষাকেন্দ্র বা প্রতিষ্ঠান।

গুণী লোকের কদর গুণীরাই করে থাকে। এমন যুগান্তকারী পরিবর্তন করবার সাথে সাথে তাঁর জীবন ছিল বিভিন্ন পুরষ্কার ও সম্মাননায় পরিপূর্ণ। ১৯৯৯ সালে পেলেন নোবেল প্রাইজ। ফ্রান্সের সর্বোচ্চ সম্মাননা দ্যা অর্ডার অব লিজিওন ডিঅনার পেলেন, মিশরেরও সর্বোচ্চ সম্মাননা দ্যা অর্ডার অব গ্র্যান্ড কলার অব দি নাইলও পেলেন। এভাবে ১০০ এরও বেশি পুরষ্কার, সম্মাননা তাঁর নামের পাশে শোভা পাচ্ছে। বিভিন্ন দেশের সায়েন্স একাডেমিতে নির্বাচিত সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। তন্মধ্যে আমেরিকা, রাশিয়া, চীন, ইংল্যান্ড, সুইডেন উল্লেখযোগ্য।
এছাড়াও অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়, ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়, ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়, পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়, পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, আলেকজান্দ্রিয়া বিশ্ববিদ্যালয় সহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্মানসূচক ডিগ্রীও লাভ করেন বিজ্ঞান এবং সমাজসেবায় অবদান রাখার জন্য। এছাড়াও ওষুধ, কলা, আইন, দর্শনেও কিছু অবদানের কারণেও এসব সম্মাননা পেয়েছেন তিনি। তাঁর নামেই আমস্টারডাম থেকে একটি আন্তর্জাতিক পুরষ্কার দেয়া হয়।
অক্সফোর্ড এবং ক্যামব্রিজ উভয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট ডিগ্রীধারী স্বল্পসংখ্যক বিজ্ঞানীদের মধ্যে তিনিও একজন। বাকিরা হচ্ছেন, দিমিত্রি মেন্দেলিয়েভ, মেরি ক্যুরি এবং মাইকেল ফ্যারাডে। আলো যে সোজা পথে চলে এটিও তিনি সর্বপ্রথম ছবির মাধ্যমে প্রমাণ করেছিলেন। ১৯৯১ সালে The Royal Institution of Great Britain এর লেজার ফেমটোকেমিস্ট্রির উপর একটি কোর্সে তিনি খ্রীষ্টপূর্ব ১৪ শতকের মিশরীয় সম্রাট আখেনাতুন এর ছবি দেখাতে সক্ষম হন, যিনি ছিলেন মনোথেইজম ধর্মের প্রবর্তক। এটিই ছিল প্রথম ছবি যেটি প্রদর্শন করেছিল যে আলো সোজা পথে ভ্রমণ করে।
২০০৯ সালে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক পরামর্শক কাউন্সিলের সদস্য হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হন। একই বছর ঘোষিত হন মধ্যপাচ্যে আমেরিকার প্রথম বিজ্ঞান দূত (Science Envoy) হিসেবে। ২০১৩ সালে তৎকালীন জাতিসংঘের সেক্রেটারি জেনারেল বান কি মুনের আহবানে জাতিসংঘ বৈজ্ঞানিক উপদেষ্টা বোর্ডের সদস্যও হন। সে সময়েই মিশরে তিনি প্রেসিডেন্টের পরামর্শক কাউন্সিলের সদস্য ছিলেন।
স্ত্রী দিমা ফাহাম এবং চার সন্তান নিয়ে সুন্দর, সমৃদ্ধশালী এক পরিবার ছিল তার। তাঁর ৬০০ এর মত আর্টিকেল এবং ১৪ টির মত বই প্রকাশিত হয়েছে। এ ক্ষণজন্মা মুসলিম মনীষী পৃথিবী ত্যাগ করে পরকালে পাড়ি জমান ২০১৬ সালের ০২ ই অক্টোবর, ক্যালিফোর্নিয়ায়।
তাঁর বিখ্যাত কিছু বই হচ্ছে,
- Femtochemistry: Ultrafast Dynamics of the Chemical Bond.
- 4D Visualization of Matter.
- 4D Electron Microscopy: Imaging in Space and Time.
এবং তাঁর জীবনি নিয়ে বইগুলো হচ্ছে,
- Age of Science.
- Voyage Through Time: Walks of Life to the Nobel Prize.

জীবনদর্শন:
মানব পরিচয় পূর্ণতা পায় একজন ভালো, সৎ, দায়িত্ববান মানুষ হিসেবে সমাজে বসবাস করার মাধ্যমে। নিজের জাতি, ইতিহাস, সংস্কৃতি, ঐতিহ্যকে লালন করার মাধ্যমে মানুষ পূর্ণতা থেকে স্থায়ীত্বের দিকে অগ্রসর হয়। ড. আহমেদ হাসান জিওয়াইলকে আমরা সে ধরণের মানুষ হিসেবেই ধরে নিতে পারি।
একজন অসাধারণ প্রতিভাবান বিজ্ঞানী হিসেবেই নয়, সমাজসেবক সহ ঐতিহাসিক হিসেবেও তাঁর খ্যাতি ছিল। বিজ্ঞানের ইতিহাস নিয়ে তাঁর পান্ডিত্য অস্বীকার করবার কোন উপায় নেই। মুসলিমদের হারানো সেই সোনালী দিনগুলোর হাতছানি তাকে সবসময় তাড়না দিত আবার ফিরিয়ে আনার।
বিভিন্ন সময়ে তাঁর সাথে কাজ করা সহকর্মীদের মুখনিঃসৃত শব্দের সমাহার আমাদেরকে তাঁর সম্পর্কে অনেক না জানা কথাও স্মরণ করিয়ে দেয়। ইউরোপীয়দের মধ্যযুগের অন্ধকার ভেদ করে যদি পূবের আলোকিত দুনিয়ায় চোখ ফেরাতে পারি তবেই এটা সুষ্পষ্ট দৃশ্যমান যে প্রায় ৭০০ বছর ধরে বিজ্ঞানের ভাষা ছিল আরবী। জাবির ইবনে হাইয়ান থেকে ইবনে সিনা, ইবনুল হাইসাম কিংবা ইবনুন নাফিস তারাই ছিলেন বিভিন্ন শাস্ত্রের উদ্ভাবক।
ক্যামেরা অবস্কুরার কথা বলা হয়ে থাকে। আবিষ্কার হয়েছিল ইবনুল হাইসামের হাত ধরে। যিনি পশ্চিমে আজ হাজেন নাম নিয়ে পরিচিত হচ্ছেন। মানবদেহে রক্ত পরিবহন সংক্রান্ত আলোচনা ইবনুন নাফিসের লেখনীতেই প্রকাশিত হয়েছিল উইলিয়াম হার্ভের রচনার বহু আগেই। বীজগণিত, রসায়নে জাবির ইবনে হাইয়ান, আল খাওয়ারিজমী, চিকিৎসায় ইবনে সিনা, আবু আল কাসিম, পদার্থবিজ্ঞানে আল হাইসামের মত বিজ্ঞানীরা আজ আলোচনার বাইরে থাকলেও ড. আহমেদ বিভিন্ন ভাবেই তাদেরকে আলোচনায় স্থান দিতেন। বিজ্ঞান শাস্ত্র সংক্রান্ত জ্ঞানগুলো সম্পর্কে সম্যক অবগত থাকতেন এবং অপরদেরও জানাতেন। মুসলিম অধ্যুষিত মিশরের আলেকজান্দ্রিয়ায় সর্বপ্রথম জেটইঞ্জিন নিয়ে কাজ হয়েছিল এবং সেটারই পথ ধরে ফ্রাংক হুইটল পরবর্তীতে এগিয়ে আসেন আবার পৃথিবী নয় সূর্যই কেন্দ্রে অবস্থান করে কথাটি কোপার্নিকাসেরও বহু বহু আগে, প্রায় ঊনিশ শতক আগে গ্রীক বিজ্ঞানী, দার্শনিক আরিস্টারকাস বলে গিয়েছিলেন এগুলোও তাঁর বক্তব্য, লেখনীতে দৃশ্যগত হয়েছে।
তাঁর সম্পর্কে সহকর্মীদের ইতিবাচক মানসিকতা, মন্তব্যই নির্দিষ্ট করে দেয় মানুষ হিসেবে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা। ফিজিক্যাল এবং বায়োলজিক্যাল সায়েন্সে তাঁর অবদান অবিস্মরণীয়। বিজ্ঞান নিয়েই শুধু তিনি সময় কাটাননি, বিশ্বের সার্বিক অবস্থা, পরিস্থিতি নিয়েও লেখালেখি করেছেন। সমাজে অবদান রেখেছেন। শিশুশিক্ষা, নারীশিক্ষা নিয়ে কাজ করেছেন। নিজ দেশের উন্নয়নে অবদান রেখেছেন।
আমাদের গৌরবময় অতীতকে স্মরণ করিয়ে দিতে ক্ষণজন্মা এসব মনীষীদের আগমন ঘটে এই ধরণীতে। তাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে আমাদেরকেও হাটতে হবে আলোকোজ্জ্বল যে পথটি এখন অন্ধকারে নিমজ্জিত তা আবার আলোতে উদ্ভাসিত করতে। তারা আমাদের অনুপ্রেরণা। আমাদের ইতিহাস, ঐতিহ্যকে সামনে রেখে দুর্বার গতিতে আবার সম্মুখে চলবার সময় উপস্থিত হয়েছে। পেছনে তাকাবার সময় নাই, নাই আর নাই।
তথ্যসূত্র:
Feature image: muslimsarescientists.com
o
Ahmed Zewail, 1946–2016 |
www.caltech.edu
o
Ahmed Zewail obituary | Chemistry
| The Guardian
o
Ahmed H. Zewail |
American-Egyptian chemist | Britannica
o
Ahmed Zewail - Facts -
NobelPrize.org
o
Ahmed Zewail - Biography, Facts,
and Pictures, famousscientists.org
o
Ahmed Zewail: Seeing with
Electrons in Four Dimensions - YouTube
o
Insight: Ideas for Change - How
Science can help solve global challenges - Ahmed Zewail - YouTube
o
Ahmed Zewail: Year of Light can
open doors to education - YouTube


0 মন্তব্যসমূহ