[১]
ঘামে ভিজে গোসল করে যেন বাজার থেকে বাসায় আসল শাফায়াত। অসহ্য এক অবস্থা! প্রতিদিন বাজারে যেতে হয়। এমন কি-ই বা ক্ষতি হত যদি মানুষের খাওয়াই না লাগত, অন্তত প্রতিদিন বাজারে গিয়ে ঘামে ভিজে বাসায় আসা লাগতনা। নিজেকে ঘেন্না লাগে শাফায়াতের। একমুঠো খাবারের জন্য তাকে এসব করতে হচ্ছে। খাবার ছাড়া কি আমরা বাঁচতে পারতাম না?
এসব ভাবতে ভাবতে আনমনা হবার সুযোগটাও সে পায়না। শাশুড়ি-বউয়ের পূণ্যে বাসা সারাক্ষণ বাজার থেকেও জঘন্য রূপে থাকে। শান্তি কোথায় পাবে সে, শান্তি মিলবে কোথায়! বউয়ের চিৎকার শুনে পাশের ঘরে যায় সে। প্লেটে সামান্য পান্তাভাত নিয়ে বসে থাকা মায়ের করুণ মুখ দেখে কান্না আসা চোখটার পানিও সেখানেই আটকে থাকে। কষ্ট সহ্য করতে করতে মানুষ পাথর হয়। তার বুকে পাহাড় জমে আছে, পাহাড়! পাহাড় কি এত সহজেই ভাঙা যায়?
বাজারে যদিও গিয়েছিল সে। তবে কিছুই আনতে পারেনি। এটাই বরং স্বাভাবিক। কিছু আনতে পারলেই তার বউ আশ্চর্য হত! পাশের ডোবা থেকে তুলে আনা কচুপাতা সেদ্ধ করতে করতে তার বউও হরদম কথা শোনায়। তার পুরুষত্ব নিয়ে সন্দেহ করে। ব্যঙ্গাত্মক ভাবে প্রতিনিয়ত আঘাত করে বুকের পাহাড়ে একটা একটা করে পাথরের ভিত্তি যেন তৈরি করে। পাথরের পর পাথর গেঁথে একটা বড় পাহাড় তৈরি হবে, সেই পাহাড় কেটে পথ তৈরি করে মানুষ চলাচল করবে দিগন্তে এসব ভাবে আর হাসতে থাকে শাফায়াত। হা হা হা! এই কদিনের না খাওয়া, চালচুলোহীন, রিফিউজিদের মত থাকার জন্যই কি দেশ স্বাধীনে নামছিলাম, হাহ! এই কি ছিল আমাগো কপালে, শেখের ডাকে সব ফালাইয়া কি বের হই নাই আমিও! শেখের দোসররা সব ভুইলা গেল, দুইবেলা দানাপানি দিলেও তো বুকের পাহাড় সরত!
[২]
- বউ বউ, চলো এক্ষনি বাইর অইতে হইব। দেরি করন যাইবনা। চলো।
শাফায়াতের তড়িঘড়ি আর বাইরে চিৎকার,অদূর থেকে ভেসে আসা গুলির শব্দ শুনে আছিয়াও দেরি করে নাই সেদিন। হাতের কাছে যা ছিল, সাথে একমাত্র মেয়ে আর শাশুড়িরে নিয়েই পথ মাপতে নেমেছিল সে। পথ মাপা কি এতই সহজ! আছিয়ার বাবা সার্ভেয়ার ছিলেন। পাকিস্তান আমলের কথা। শাফায়াত তখন ম্যাট্রিক পাস ছেলে। কাজ কাম কইরা গ্রামে নাম কামাইল বহুত। সব কাজেই আগে আগে থাকত, সবার উপকারে আসত। তাই দেখে মা মরা মেয়ে আছিয়ারে তুলে দিল শাফায়াতের হাতে। মেয়ে বাপের কাছেই থাকবে। জামাইরে শ্বশুর শিখাইয়া পড়াইয়া চাকুরী একটা দেবেন। এইতো, তার মেয়েও খুশি-সুখী হবে, শান্তিতে মরতে পারবেন।
সুন্দর ভাবনা গুলো মস্তিষ্কে ফুল ফুটানো পর্যন্তই সুন্দর। বাস্তবের নিষ্ঠুর ময়দানে এসে ঘা খেতে খেতে শেষে ভাবনাগুলো সুন্দর হতে পারেনা। অভিযোজন ক্ষমতা প্রয়োগ করে তারাও বিদ্রোহী হয়। খারাপ না হয়ে যখন সমাজে টিকে থাকা দায় হয়ে যায় তখন সারভাইভাল অব দ্যা ফিটেস্ট তত্ত্বের মতই তারাও খারাপ হয়ে যায়। জগতে যোগ্যরাই বাঁচবে, এরচেয়ে নির্দয়তা হয় কিছু!
পথ মাপতে গিয়ে পথের সামনেই জমি-জিরাত মাপা বাবার লাশ দেখতে পেয়ে সেদিন যদি থমকে না যেত তবে মেয়েটাকে হারাতে হতনা। পা না চললে তার উপর তো জোরজবরি খাটানো যায়না। মেশিন তো না, হাড়মাংসেও প্রবল অনুভূতি থাকে। সেইযে থেমে গিয়েছিল, স্থান হল হায়েনাদের ক্যাম্পে।
আর শাফায়াত, স্ত্রীকে ছেড়ে পুরুষত্ব বিসর্জন নিয়ে পালিয়ে গিয়েছিল মাটি মার টানে। তাকে মুক্ত করবে বলে। স্ত্রী এবং আপন মাকে তার জন্য বর্গা রাখার মতই হল, শিয়ালের কাছে যেমন মুরগি বর্গা রাখলে হবে।
[৩]
বয়স তো এখনো তিরিশ ছাড়ায় নাই, দেন দরবার কইরা একখান চাকরি মাঙ্গবার পারোনা, যুদ্ধ কইরা করলাটা কি! এত ভালা মাইনষের দাম নাইরে মিয়া, জগতে নিজেরটা নিজে ছিনাইয়া না নিলে হারাজীবন কুকাইলেও কাম হইবনা। সাহস দেহাও মিয়া, জোয়ান আছো, কুকাও কেন এমনে। এসব শুনে অভ্যস্ত শাফায়াত। শুনে সরকার কত পদক্ষেপ নাকি নিচ্ছে দেশটারে সুন্দর করার জন্য। দেশের মানুষের ভালোর জন্য। কত হায়েনার সাথিদেরও সে দেখে এসব বাগায় নিতে। সে পারেনা। বেঘোরে যদি শ্বশুরটা মারা না যাইত, তার কিছুরই অভাব হইতনা। যার যায়, তার সবকিছুই যায়। মুক্তদেশে অধিকার কেমনে ছিনিয়ে আনা যায়, ভেবে পায়না সে। স্বাধীন দেশেও অধিকার ছিনিয়ে আনতে হলে আগেরই....... আর ভাবেনা সে। মসজিদের পুকুরপাড়ে বসে ঝিমাতে থাকে।
শেখ সাহেবের কথা ভাবে সে। দুজনের অসহায়ত্বকে পরিমাপের বৃথা চেষ্টার মাঝেই দেখে সেই বরং সুখী অনেক। অন্তত স্বাধীন ভাবে চিন্তা তো করতে পারছে। আষ্টেপৃষ্ঠে হাত-পা অন্তত বাধা না। ইচ্ছামত হাত-পা ছুড়ে কিছু একটা করাও যাবে। রাজনীতি অতশত না বুঝলেও ধরতে পারে স্বাধীন দেশে শেখ সাহেব ভালো নেই। হায়েনার দোসররা চলে গেলেও তাদের থাবা এখনো বসাচ্ছে কুকুরদের দ্বারা। কুকুররা অবশ্য অনেক প্রভুভক্ত হয়, তাই সহসাই তারা থাবা বসানো থামাবে এরকম ভাবারও অবকাশ নেই। ভাবনা জুড়ে বিশাল শূন্যতায় খাবি খেতে খেতে আকাশকে ভালোবেসে ফেলে সে।
আরে, ওইযে শাফা পাগলা। দেশ স্বাধীনের পর পাগল হইছে। আকাশের দিকে তাকাইয়া হুদ্দাই বিড়বিড় বিড়বিড় করে। ঘাট থেকে তো উঠেই না। হ, এইটাই হইতাছে শাফা পাগলা, দেশ স্বাধীনের পর পাগল..............
[৪]
শেখ সাহেব ভালো নাই, দেশ ভালো নাই, আছিয়া ভালো নাই, মাও ভালো নাই। দেশের জন্য কতই না খাটলেন তিনি। মামলা খাইলেন, জেলে থাকলেন, পরিবার থেকে দূরে রাখা হইল, কত ভাই-বন্ধু হারাইলেন। তাও তো না দমে গিয়ে দেশ স্বাধীনে নেতৃত্ব দিলেন, স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন। তাও ভালো নাই।
স্বাধীন, মুক্ত আকাশে পাখিরা নাকি খুউব ভালো থাকে। খুউব। ডানা মেলে যখন উড়ে যায় আটাকাবার তো কেউই থাকেনা। উড়ে উড়ে কত্তদূর যায়, হিসাব কে রাখে। শাফা পাগলার মেয়ের কথা মনে পড়ে, শ্বশুরের কথাও। তারা কি সুখে আছে? ভালো আছে? তারাতো স্বাধীন দেশ দেখবার পারে নাই। আছে তারা ভালো?
তারা নাকি ভালোই আছে। শাফা পাগলা বুঝতে পারে। তাই সে হাসে। সুখের হাসি। অন্তত কাউকে তো স্বাধীনতার পর ভালো রাখতে পেরেছে। সেও ভালো থাকতে চায়। কে না চায়? আসল ভালো তো থাকা যায় মাটির ভেতরে।
তাই একদিন শহরের মোড়ে একঝাক ধেয়ে আসা গাড়ির সামনে ভালো থাকাগুলোকে নিয়ে মুখোমুখি হয় সে। দিগন্তের নীলিমায় ছড়িয়ে যাওয়া তার হাসির মতই ভালো থাকাগুলোও শহুরে মানুষেরা কেড়ে নেয়। ভালো থাকার জন্যও মূল্য দিতে হয়, সেটা যদি প্রাণও হয় তবুও।
0 মন্তব্যসমূহ