চলমান এ জীবন কারো জন্য থেমে থাকেনা। নিজের গতিতে সে বয়েই চলেছে সবসময়। একেকজন মানুষ যেনো এই বয়ে চলা জীবনের একেকটি নৌকার মাঝি,কর্ণধার। সেভাবেই বলা যায় সফর আলিও এ জীবন স্রোতের একজন ক্ষুদ্র কর্ণধার। দিন এনে দিনে খাওয়াই যার নিত্যকাজ। কাজ খুজে পেতে করতে হয় তীব্র সংগ্রাম, মাঝেমাঝে পেলেও অধিকাংশ সময় রাস্তায় বসেই দিন কাটাতে হয়। তারপরও তার জীবন থেমে থাকছে না, বয়ে চলেছে নিজস্ব গতিতে, নিজ স্বাচ্ছন্দ্যে। সফর আলি তার জীবনে সুখী হয়ে বেচে আছে।
সফর আলি, মনু মিয়া, ঝন্টু মৃধা একই মননের মানুষ। খাওয়া-দাওয়া, চলাফেরা, উঠাবসা সব একসাথেই হয় তাদের। থাকে তারা কল্যাণপুর বস্তিতে। বস্তির কোণায় ছোট্ট এক ছাউনিতে তারা নিজেদের সংসার গুছিয়ে নিয়েছে। এভাবেই তারা ভালো আছে।
ঝন্টু মৃধা একটু ঝটকা স্বভাবের মানুষ। অল্পতেই সবসময় রেগে গেলেও লোকে বলে তার মন নাকি বেজায় ভালো। মানুষের দুঃখকষ্ট সইতে পারেনা। ঘরের দুটি বউয়ের খোঁজখবরও তেমন রাখেনা, দিনশেষে রাতপরীদের সাথে উড়ে বেড়ায়। এভাবে তার দিনগুলো সুখেই কাটে।
মনু মিয়া আবার তাদের দুজন থেলে আলাদা। মন এক হলেই মানুষ তো আর এক হয়না। শান্তশিষ্ঠ এই মানুষটি না থাকে কারো সাতে, না থাকে কারো পাঁচে। সেই সাতসকালে খুন্তি,কোদাল,ঝাকা নিয়ে বেরিয়ে পড়ে ফেরে ঠিক মাগরিবের পরপর। এসেই দেয় লম্বা একটা ঘুম। রাত ১০ টায় উঠে খেয়েদেয়ে আবার ঘুমের রাজ্যে হারায়। বিয়ে করেনি আর করবে কিনা সেই ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত দূরবীন দিয়েও খুজে পাওয়া যায়না। এ নিয়ে তার আক্ষেপও নেই, সে ভালো আছে।
আমরা মানুষ, আমাদের জীবনচক্র বড় অদ্ভুত। জীবনের এই চক্রের প্রতিটি ঘূর্ণনের সাক্ষী হতে চাই আমরা, আমরা সবসময়ই চাই পরিবর্তনের সাক্ষী হতে। এটি তো মানুষের রক্তেই মিশে আছে। এটি নিয়ে আমরা ছোট থেকে বড় হই আর বড় থেকে আরো বড়, আরো বড়। কিন্তু কেউই চাইনা পরিবর্তনকে নিজেদের মাঝে ধারণ করতে, নিজেকে বিলিয়ে দিতে পরিবর্তনের জন্য। যেটুকু পাওয়া যায় বিনামূল্যে কিংবা যেটুকু এমনিই এসে পড়ে সেটুকুকেই আমরা অর্জন বলে ধরে নিই, তাই নিয়েই করি বিজয়োল্লাস, করি অহংকার। নীরব দর্শকের ভূমিকা থাকলেই তো সাক্ষী হওয়া যায়, মূল্য এখানে মূল্যহীন।
উচ্চাকাঙ্ক্ষা যেখানে একজনকে সর্বদা কুড়েকুড়ে খাচ্ছে তারমাঝেই জন্ম নিচ্ছে অল্পে তুষ্ট থাকা কিছু চরিত্রের। যারা যা পাচ্ছে তাতেই খুশি, আশা করছে না তারচেয়ে বেশিকিছু। উচ্চাকাঙ্ক্ষা একদিকে আমাদের বড় করে তোলে আবার এটি টেনে নামিয়ে আনতেও পারে। সবকিছুরই যেমন লিমিটেশন অতি জরুরী, ঠিক তেমনি উচ্চাকাঙ্ক্ষারও প্রয়োজন রয়েছে লিমিটেশনের। আমরা মানুষেরা স্বাধীনতাকে ঠিক ততটাই তুচ্ছ করি যতটা ভালোবেসে গ্রহণ করি বাধ্যবাধকতাকে,লিমিটেশনকে। বলা যায় এটি আমাদের রক্তগত অভ্যাস, আমাদের রক্তে যেনো এরকমই লেখা আছে বহুকাল ধরেই। আমরা এভাবেই ভালো থাকি সবসময়।
উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে আমরা গরীবের ঘোড়ারোগ বলে থাকি। সফর আলি,মনু মিয়া,ঝন্টু মৃধা এরা গরীব হলেও, উচ্চাকাঙ্ক্ষা নামক ঘোড়ারোগটি তাদের নেই। বসতির পাশের মায়ের দোয়া হোটেলের ভাতই তারা খেয়ে আসছে ২০ বছর ধরে, তরকারীতে লবণের কমবেশি হওয়াটা তাদের কাছে নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার, ভাতের মধ্যে একটু পাথর থাকতেই পারে তবেইনা চাবাতে একটু মজা লাগবে।
হোটেলের ডালে পানি থাকলেও তাতে যে চেহারাটা একবার দেখা যায়,এটা আয়নার অভাবটা পূরণ করে দেয়। জীবন এভাবেই চলে যাচ্ছে,তারা কিন্তু ভালোই থাকছে, সুখে দিনাতিপাত করছে।
জীবন সম্পর্কে অভিযোগহীনতাকে না বলা যায় ভালো না খারাপ বলা যায়। দুটি দিক দিয়েই এটি ব্যাপক শক্তিশালী রূপেই থাকে। ভালো-খারাপের সমন্বয়ে তৈরী হওয়া এই অভিযোগহীনতা আমাদের উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে থামিয়ে দেয়। ভালো-খারাপের বিচার জীবনের উপরেই থাকা ভালো।
তাদের তিনজনের সম্মিলিত আয় হাজার টাকার বেশি হবেনা দিনপ্রতি। তারপরেও চলে যাছে ভালোভাবেই। নেই কোনো অভিযোগ কিংবা কোনো চাওয়া। ঝন্টু মৃধা আবার দালালী করে, রাত-বিরাতে গ্রাহক ধরে বাড়তি কিছু উপার্জনও করে। অবশ্য এটা সে ফূর্তির জন্য করে থাকে। ঘরে দুটি বউ তাকে যা দিতে পারেনি সেটাই তাকে দেয় তার চম্পাবানু। চম্পাবানুর পিছনেই সে মাসের সব আয় ঢেলে দেয়। এতে দুজনই খুশি থাকে, অনেক সুখী থাকে।
মনু মিয়া সহজ সরল দেখে তার আয় প্রায়ই মেরে দেয় সফর আলি। সন্ধ্যার পর দোকানে দোকানে আড্ডা দেওয়া তার নিত্য রুটিন। তারই টাকা যোগাতে সে মনু মিয়াকে যথেচ্ছা ব্যবহার করে, করে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। যদিও এতে মনু মিয়ার কোনো অভিযোগই নেই, সে সফর আলির খুশিতেই বরং খুশি।
মানুষ সবকিছুর পিছনেই কারণ খুজে,আমরা খুজে থাকি। আমাদের সবকিছুর পিছনেই থাকে কোনো উদ্দেশ্য, থাকে কোনো কারণ। যা আমাদের কাজটি করতে উদ্বুদ্ধ করে থাকে। মনু মিয়া নাকি ছোটবেলায় খুশী নামে কাউকে ভালোবাসতো। খুশী, তার চাচাতো বোন ছিলো। ছোটবেলায় একসাথে থেকে তারাও খুব খুশিই ছিলো। কিন্তু চাচা নিজের খুশির জন্য খুশীকে কোথায় যেনো নিয়ে গেলো, ফিরিয়ে নিয়ে এলোনা আর। লোকে কানাকানি করতো খুশীকে নাকি টাকার জন্য বিক্রি করে দিয়েছে। সেইসাথে মনু মিয়ার সব খুশিও খুশীর সাথে বিক্রি হয়ে গিয়েছে। খুশীকে ছাড়াও সে এখন খুশি আছে,তাকে থাকতে হয়। অন্যের খুশির জন্য নিজের খুশি ভুলে থাকাও অনেক বড় তৃপ্তিময় খুশি।
এইযে তারা তিনজন, তাদের জীবন এভাবেই চলে যাচ্ছে। প্রতিদিনের এই একঘেয়ে রুটিনে তারা খুশিই থাকছে। তারা বিরক্ত হয় না, তারা কিছু বুঝেনা কিংবা তারা আশাও করেনা। জীবন যেভাবে চলছে, ঠিক তার সাথে তাল মেলালেই তারা খুশি থাকে, সেভাবেই তাদের খুশি থাকতে হয়।
জীবন সম্পর্কে তাদের অভিযোগহীনতা কিংবা তাদের এই কিছু না পেয়েও খুশি থাকার কারণ এটা নয় যে তাদের কোনো ইচ্ছা, আকাঙ্ক্ষা নেই কিংবা নেই কোনো উচ্চাকাঙ্ক্ষা। একজন মানুষ হিসেবে, একজন প্রাণী হিসেবে তাদেরও রয়েছে কিছু ইচ্ছা, কিছু চাওয়া-পাওয়া। কিন্তু তারা তা প্রকাশের জন্য পদক্ষেপ নিতে পারছেনা, তারা সাহসী হচ্ছে না সেই ইচ্ছাকে প্রকাশ করে পৃথিবীকে জানাতে। আমরাই তাদের বাধা দিচ্ছি, তাদের আটকে রাখছি তাদের নিজেদের অভ্যন্তরে। আমাদের মতো তাদেরও সর্বোচ্চ অধিকার রয়েছে নিজেদের প্রকাশ করার, নিজেদের ইচ্ছাকে অবমুক্ত করার, সেই সুদূর নীল আকাশে ডানা মেলে উড়ার। সমাজে তাদের ব্যক্তিত্বের স্বাক্ষর রাখার, সমাজে নিজেদের অবস্থান জানান দেবার, তাদের মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত করার। যদি আমরা সুযোগ দিই তবেই তারা পারবে, তারা সুযোগ পাবে নিজেদেরকে প্রকাশ করতে, নিজেদের তুলে ধরতে সমাজের এই চলমান স্রোতে। তাদের পালছাড়া জাহাজের কর্ণধারের মতো হারাতে হবেনা দিগন্তের মাঝে। জীবনের এই বিস্তৃত দিগন্তে যদি তাদের সাথে নিয়ে চলতে পারি তবেই হয় হবে মানুষের, জয় হবে আমাদের, জয় হবে মানবতার।
কবি তো বলেই গিয়েছেন,
" সবার উপরে মানুষ সত্য
তাহার উপরে নাই।”
0 মন্তব্যসমূহ