লেখা তরজমা

কবি আল মাহমুদ : কৈশোরের ভালোবাসা



ছোটবেলায় এমন কে আছে যে পাখির মত মুক্ত আকাশে উড়তে চায়না?

আমিও চাইতাম। কিন্তু পাখির মত কিভাবে হব সেটা ভেবেই কখনো কূল কিনারা পাইনি। অবশেষে কবি আল মাহমুদ পথ দেখালেন।
         
             “ আম্মু বলেন পড়রে সোনা, 
                    আব্বু বলেন মন দে;
               পড়ায় আমার মন বসেনা,
                    কাঁঠালচাঁপার গন্ধে।”

তখন কাঁঠালচাঁপা নিয়ে এক ধরণের ফ্যান্টাসি কাজ করত। ব্যাপারটা আসলে বুঝতাম না কাঁঠালচাঁপা কি ধরণের বস্তু। শেষমেশ ধারণা করেছিলাম কাঁঠালকে চেপে বাচ্চা ছেলেমেয়েদের পড়ায় মন না বসানোর জন্য যে গন্ধ বানানো হয় সেটাই কাঁঠালচাঁপার গন্ধ।
যাইহোক, তখন মাত্র ক্লাস টুতেই ছিলাম। আর হ্যাঁ ক্লাস টু-থ্রীতে এই কবিতা আবৃত্তি করে কিছু কিছু পুরষ্কার হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে।

ক্লাস টু, তারপর থ্রী তারপর ফোর কিন্তু কবির সাথে সম্পর্ক এই পাখির মতোতেই আটকে ছিল। ক্লাস ফাইভে এসে সম্পর্কের দ্বিতীয় ধাপে পা রাখলাম। পাখির মতো কবিতায় যে দুধভরা চাঁদের বাটি ফেরেশতারা উলটে দিয়েছিল সেই চাঁদ ক্লাস ফাইভে এসে উঠল নারকেলের লম্বা মাথায়।
 
              “নারকেলের ঐ লম্বা মাথায়
                      হঠাৎ দেখি কাল
                ডাবের মতো চাদঁ উঠেছে
                     ঠান্ডা  গোলগাল।”                

কবিতার নাম “না ঘুমানোর দল”। ছোট্ট মাথায় তখন বুদ্ধি এসেছিল না ঘুমিয়ে থাকলে নারকেল গাছের লম্বা মাথায় আমার মত গোলগাল চাঁদ দেখতে পারব। দূর্ভাগ্য যে নারকেল গাছটাই হোস্টেলের আশেপাশে ছিলনা।

”পাখির মতো” দিয়ে আবৃত্তি ভালোই চালাচ্ছিলাম। ক্লাস ফাইভেই আবৃত্তির কুঁড়েঘরে নতুন নাম সংযোজন হল দুটি। তার মধ্যে একটি ছিল “একুশের কবিতা”।

সত্য বলতে আমার জীবনে প্রথম যে কবিতাটি কার্যকর প্রভাব রেখেছে সেটি এই “একুশের কবিতা”। একটা ঘোরলাগা কাজ করত কবিতাটা পড়ার সময়। এই কবিতা পড়েই ইতিহাসের সোনালী অধ্যায়গুলোতে চোখ দিয়ে ঘুররার তীব্র বাসনা লাভ করি।তিতুমীর,ক্ষুদিরাম,প্রীতিলতাদের সম্পর্কে প্রথম ধারণা দিয়েছিল এই কবিতাটি। একজন কিশোরের জন্য ২১ শে ফেব্রুয়ারি, ভাষা আন্দোলন ও স্বাধীনতা আন্দোলন নিয়ে এরচেয়ে সহজভাবে বোধহয় লেখা যেতনা। কিশোরমনের সমস্ত জিজ্ঞাসা পূরণ করতে না পারলেও কৌতুহল জাগাতে এক পায়ে দাঁড়িয়ে আছে “একুশের কবিতা”।

যতীন্দ্রমোহন বাগচীর “কাজলা দিদি” কবিতাটা তখনই মোস্ট ফেভারিট লিস্টে ছিল। আপু ঘুম পাড়ানোর জন্য যখন কবিতাটি আবৃত্তি করত আমি তখন কাঁদতে কাঁদতে ঘুমাতাম। আর একটা ছিল পল্লীকবির “কবর” কবিতা। আপুর আবৃত্তি শুনে চোখে এত পানি কই থেকে যে লাইসেন্স ছাড়াই ঝরতো বুঝবার সুযোগই হয়নি কখনো। এদেরই মাঝে একদিন “ভর দুপুরে” “নোলক” হারিয়ে গেল।
                
  “আমার মায়ের সোনার নোলক হারিয়ে গেল শেষে            
      হেথায় খুঁজি হোথায় খুঁজি সারা বাংলাদেশে।”

নোলক মানে জানলাম গলার হার। কবিতাটা পড়তাম আর আম্মুর গলায় হার খুঁজতাম। স্বভাবতই বাসায় কেউ সারাক্ষণ হার পরে থাকবেনা। তাই ভাবতাম আম্মুর হারটাই হারিয়ে গেছে,খুঁজে আনতেই হবে আমাকে।

“ভর দুপুরে” কবিতা  পড়ার  সময় চোখের সামনে ভেসে উঠত গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে চলা নদীর পাশে অবস্থিত কোন একটা পরিবার, কোন একজন শান্ত মেয়ের কথা। যে কোলে ছোট বাচ্চা নিয়ে নদীতীরে কারো জন্য অপেক্ষমাণ। কেন কবিতাটা পড়তাম জানিনা,তখন কবিতার গূঢ় অর্থ সম্পর্কেও ধারণা রাখতাম না,তবুও পড়তাম। শুধুশুধুই পড়তাম।
                 মেঘনা নদীর শান্ত মেয়ে তিতাসে 
                মেঘের মত পাল উড়িয়ে কী ভাসে! 
                মাছের মত দেখতে এ কোন পাটুনি 
                  ভর দুপুরে খাটছে সখের খাটুনি।“

কারণ ছাড়াই ভালো লাগতো কবিতাগুলো। প্রতিটা কবিতাই মুখস্থ পারতাম তা নয় তবে অধিকাংশই পারতাম। কবিতার প্রতি দুর্নিবার আকর্ষণ তৈরি করে কবি আল মাহমুদের কবিতাই শেষমেশ আমার পথ ছেড়ে দাঁড়াল। আমিও সেই  হাত ছেড়ে দিয়ে  আস্তে আস্তে দূরে  সরে যেতে থাকলাম।

হঠাৎ মাঝপথে  আবার  দেখা  হয়েছিল। তাঁর কয়েকটা উপন্যাসে চোখ বুলিয়েই সে যাত্রার সমাপ্তি ঘটিয়েছিলাম।  এখন তিনিই তাঁর জীবনযাত্রার সমাপ্তি ঘটিয়ে পরপারে চলে গেলেন।

কবি আল মাহমুদের কত বড় মাপের সাহিত্যিক ছিলেন, সেটা বলা কিংবা বুঝাতে চাচ্ছিনা এখানে।  একজন কিশোরের জীবনের প্রথম প্রেম ছিলেন তিনি। তিনি ছিলেন একজন কিশোরের পড়ার জগতে প্রথম পথপ্রদর্শক, প্রথম ভালোবাসা। ওপারে মহান রাব্বুল আলামীন আপনাকে জান্নাত নসীব করুক, এই শেষ সময়ে এটিই  প্রত্যাশা। আমার মত কোটি কোটি কিশোরের কৌতুহল,ভালোলাগা,ভালোবাসা আপনার কবিতা ঘিরে বেড়েই চলুক,যতদিন বাংলা সাহিত্য বেঁচে থাকবে।  মায়ের হারানো নোলক অবশ্যই ফিরে আসবে আবার, আসতেই হবে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ