আমাদের ভ্রমণ
আলিম ১ম বর্ষের প্রথম সাময়িক পরীক্ষার পর একটা লম্বা ছুটি পেলাম। ছুটিতে তো ঘরে বসে থাকা চলেনা। কি করা যা, কি করা যায় ভাবতে ভাবতে একটি প্লান করেই ফেললাম। ট্যুর টু কাপ্তাই, রাঙামাটি, সাজেক, কক্সবাজার। ৭ দিনের পরিকল্পনা হাতে নিলাম এবং শুরু করলাম আমাদের অন্যতম সেরা দিনগুলোর পথে যাত্রা।
শুরুটা হয়েছিলো রাত ১০:৩০ মিনিটে আব্দুল্লাহপুর থেকে বাস ছাড়ার মাধ্যমে ডিসেম্বর মাসের ২০ তারিখ রাতে। ২০/১২/২০১৭ থেকে ২৭/১২/২০১৭ এর একটি লম্বা ট্যুর শেষ করে আমরা ঢাকায় ফিরে আসি। চলুন জেনে আসি এর ভেতরের খবর ।
কাপ্তাই, রাঙামাটি, সাজেক,কক্সবাজার এই চারটি জায়গায় আমরা মোট ৭ দিনের মতো অতিবাহিত করি। শুরুটা করেছিলাম কাপ্তাই দিয়ে।
আব্দুল্লাহপুর থেকে শ্যামলী বাস আমাদের সরাসরি কাপ্তাই নিয়ে পৌছায়। রাত ১০:৩০ মিনিটে আমাদের জার্নি শুরু হয়, শেষ হবার কথা সকাল ৬:০০ টায় থাকলেও রাস্তার নিদারুণ জ্যামের কারণে আমরা ১:০০ টার দিকে কাপ্তাই পৌছাই।
কাপ্তাই এলাকাটা যেনো সুন্দরের সুন্দর। মানে অত্যাধিক সুন্দর। লেকের পাশের রাস্তা দিয়ে হাটা কিংবা লেকে নৌকা দিয়ে ঘুরে তা উপভোগ করা যায়। কাপ্তাইয়ে আমরা একদিন থাকি। ওই একদিনকে জীবনের শ্রেষ্ঠ দিন বলা যায়। বিকালে স্থানীয় ছেলেদের সাথে ক্রিকেট খেলা, রাত ২ টা পর্যন্ত ওয়াজ শুনা, যদিও ওয়াজ ভিন্ন উদ্দেশ্যে শোনা হইছিলো। আর ক্রিকেট আমরা দুই ম্যাচ খেলে একটা হারছি আর আরেকটা জিতেছিলাম। এর আগেই কাপ্তাই বাধ এবং জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র ঘুরে আসা হয়েছিলো। আর রাতের কাপ্তাই হচ্ছে নিঝুম নিস্তব্ধ একটা রূপকথার পূরী, অনিন্দ্যসুন্দর এই জায়গাটি পর্যটকদের আরাধ্য স্থান, মুগ্ধ হবার স্থান।
২২ তারিখ সকালে আমরা কাপ্তাই থেকে সিএনজি নিয়ে রাঙামাটির উদ্দেশ্যে যাত্রা করি।
কাপ্তাই থেকে রাঙামাটি যাবার যে রাস্তা, সেটা যেনো পটে আকা কোনো দৃশ্য। হয়তো জয়নুলের তুলির আচড় সেখানেও পড়েছিলো। সিএনজি দিয়ে যেতে যেতে যতটুকু না সৌন্দর্য উপভোগ করতে পেরেছি তারচেয়ে বেশি আক্ষেপই বেড়েছে। মনে হচ্ছিলো অনন্তকাল এই রাস্তা দিয়ে হাটি।
রাঙামাটি যাবার মূল কারণ ছিলো সাজেক যাবার রাস্তা সহজ করা। এছাড়াও ঝুলন্ত ব্রীজ সহ আরো কিছু দারুণ স্থান রয়েছে সেগুলোও দেখার ইচ্ছা ছিলো। কিন্তু হঠাৎ সমস্যা উদ্ভূত হবার কারণে ঝুলন্ত ব্রীজ ছাড়া কোথাও যাওয়া হয়নি।
আমাদের ইচ্ছা ছিলো সাজেকে সকাল ১০ টার এসকর্ট ধরে পৌছাবো। কিন্তু রাঙামাটি গিয়ে জানতে পারি সকাল ৮ টায় খাগড়াছড়ির উদ্দেশ্যে প্রথম বাস ছাড়া হয় এবং এটাই দিনের একমাত্র বাস। যদিও শান্তি পরিবহণ সকাল ৬ টায় ছাড়ে কিন্তু সিট সব বুকড। সবার মাথায় হাত, কেমনে কি হবে এবার!
তারপরও রাঙামাটি থেকে সিএনজি ম্যানেজ করে আমরা সকাল ১০ টার দিকেই খাগড়াছড়ি পৌছাতে পারি এবং সকালের এসকর্ট ধরতে সক্ষম হই। খাগড়াছড়ি থেকে আগে থেকেই ভাড়া করা চান্দের গাড়ি আমাদের রিসিভ করে। বেলা ৩:০০ টার দিকে আমরা সাজেক পৌছাই।
সাজেক যাবার রাস্তাতে আমরা সমস্যা হয়। সিএনজি বার কয়েকবার খারাপ হয়ে যায়। টেনশনে আমরা শীতেও ঘেমে একাকার হচ্ছিলাম।
খাগড়াছড়ি থেকে সাজেক যাবার রাস্তাটা যেনো আরেকটা ছবির পটভূমি। কাপ্তাই থেকে রাঙামাটির রাস্তায় যদি জয়নুলের তুলির আচড় পড়ে তবে খাগড়াছড়ি থেকে সাজেকের রাস্তাকে পিকাসোর আর্ট পেপার বলা যায়। অনিন্দ্যসুন্দর এই রাস্তা কিন্তু আমাদের প্রতিরক্ষার শিল্পি আর্মিদের হাতের তৈরি।
সাজেক যাবার রাস্তাতে আমরা সমস্যার সম্মুখীন হই। সিএনজি বার কয়েকবার খারাপ হয়ে যায়। টেনশনে আমরা শীতেও ঘেমে একাকার হচ্ছিলাম। আল্লাহর রহমতে আমরা সুস্থভাবেই পৌছাতে পেরেছিলাম সাজেকে।
সাজেকে আমরা য়ারুং নামক একটি কটেজে অবস্থান করি। এই কটেজ থেকে মেঘের দারুণ ভিউ পাওয়া যায়। মেঘগুলো একেকটা পাহাড় মনে হয়। সাদা পাহাড়গুলি মাথা উঁচু করে হাতছানি দিয়ে ডাকে যেনো।অনিন্দ্যসুন্দর একটি জায়গা,সম্পূর্ণ আর্মিদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত।
সাজেকে আমরা ২৩ তারিখ বিকেলেই কংলাক পাহাড়ে যাই। প্রায় ২৬০০ ফুট উচু এই পাহাড় সাজেকের অন্যতম আকর্ষণ। পুরা পাহাড়টিই হেটে উঠতে হয়। পাহাড়ে উঠবার রাস্তাতেই ১০ টাকা করে বাঁশ পাওয়া যায়। হাতে লাঠি জাতীয় কিছু থাকলে উঠতে ভালো হয়। পাহাড়টায় উঠার অভিজ্ঞতাটাও খুব মজার হয়। একেবারে খাড়া পাহাড়,তাই সর্বদা সতর্ক থাকতে হয়।
২৪ তারিখ সকালে আমরা খুব ভোরে উঠেই মেঘ দেখতে কটেজের বারান্দায় বসেছিলাম। তারপর হেলিপ্যাডে গিয়ে সূর্যোদয় দেখা। তবে মজার ব্যাপার হচ্ছে রোদ যতো বাড়ে মেঘের সৌন্দর্য তত বৃদ্ধি পায়। সাজেকের প্রধান আকর্ষণ হচ্ছে এই সুন্দর মেঘগুলো।
সাজেকে আমাদের জনপ্রতি খরচ হয়েছিলো মাত্র ১৭০০/- এবং আমরা ৯ জন ছিলাম। কটেজে দুটি রুম নিয়েছিলাম, ভাড়া ছিলো ২৫০০/- পার রুম।
খাবার ওইখানে প্যাকেজ সিস্টেম। ১০০/-, ২০০/- সহ বিভিন্ন ধরণের প্যাকেজ পাওয়া যায়। ভাত ডাল আনলিমিটেড থাকে। আর সাজেকে পানির ব্যাপক প্রবলেম। তাই প্রয়োজনমত পানি সাথে অবশ্যই রাখতে হবে। পানি সাজেকে কিনে খেতে হয়। এবং সাজেকে এখনো কারেন্ট পৌছায়নি। কটেজ মালিকরা জেনারেটর ব্যবহার করেন। দিনে ২-৩ বার জেনারেটর ছাড়া হয়।
যেহেতু সাজেক অপরূপ একটি জায়গা, সবাই প্রচুর ছবিও তুলে, তাই ক্যামেরা, ফোন ইত্যাদির জন্য চার্জের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা সাথেই রাখতে হবে।
সাজেক থেকে আমরা ২৪ তারিখ সকাল ১০ টায় বের হয়ে আসি। কিন্তু তখন সাজেকের আসল আকর্ষণ মেঘ আরো আকর্ষণীয় হচ্ছিলো, ছেড়ে আসতে কোনোভাবেই মন চাচ্ছিলো না। তারপরেও ফিরে তো আসতে হবেই। অতঃপর খাগড়াছড়ি ঝুলন্ত ব্রীজ এবং আলুটিলা গুহা ঘুরে আসলাম।
আলুটিলা একটি অসাধারণ জায়গা। অসাধারণ বললেও কম হয়ে যাবে। মাটির অনেক গভীরে একটি গুহা, তার মাঝদিয়ে সুড়ঙ্গপথ। মশাল নিয়ে প্রবেশ করতে হয়। কেউ হয়তো মোবাইলের ফ্ল্যাশলাইট নিয়ে মশালের কাজটা সারার কথা ভাবে, তবে মশাল নিলেই আসল এনভায়রনমেন্ট এর স্বাদ পাওয়া যায়। মশালের দামও ১০/- করে। পুরো পথটা পার হয়ে আসতে পারলে নিজেকে একজন রাজা মনে করতে আপনার দ্বিধা থাকবেনা।
খাগড়াছড়ি শেষ করার পরে আমাদের গন্তব্য কক্সবাজার। চিটাগাং হয়ে কক্সবাজার যেতে হয়। ২৪ তারিখ চিটাগাং পৌছাতে আমাদের প্রায় রাত ১১:০০ টা বেজে যায়। তাই রাতে চিটাগাং থাকতে হয়।
২৫ তারিখ সকাল ৬:০০ টার শ্যামলী বাসে করেই আমরা কক্সবাজারের উদ্দেশ্যে চিটাগাং ছেড়ে যাই। বেলা ১১:৩০ এর দিকে কক্সবাজার পৌছাই। ওইদিন বিকালে এমনিতেই কিছুক্ষণ বীচে হাটাহাটি করি। বিকালে সূর্যাস্তের দৃশ্য আমাদের মন কেড়ে নেয়। আর রাতের সমুদ্র তার গর্জন দিয়ে আমাদের অপেক্ষা করিয়ে রাখে অনেক্ষণ।
এর পরদিন সকাল ৯ টার দিকে আমরা মহেশখালী যাই স্পীডবোটের সাহায্যে। মহেশখালী, বাংলাদেশের একমাত্র পাহাড়ি দ্বীপ। লবণ উৎপাদন আর অশেষ সৌন্দর্য এর জন্য বিখ্যাত। অনিন্দ্যসুন্দর এই দ্বীপটি এক টুকরো ছোট্ট বাংলাদেশ। এখানে বেশকিছু জায়গা আছে ঘুরার মতো। তাছাড়া এখানে সাগরপথে ঘুরতেও বেশ মজা লাগে।
মহেশখালী থেকে ফিরে এসে সাগরের পাড়ে যাই গোসল করতে। ফিরে আসতে আসতে বিকাল হয়ে যায়।
তারপর দুপুরের খাবার এবং কক্সবাজারের স্পেশাল ফালুদা খাই। মনে রাখার মতো কিছু মুহূর্ত।
ওইদিন রাত ৮:০০ টার এনা বাসে করে আবার চিরচেনা ব্যস্ত শহর, এই আমার শহরে ফিরে আসি। আমার জাদুর শহরে।
আসলে এই ভ্রমণটা আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ কিছু সময় ছিলো। আল্লাহর সৃষ্টি করা এই মহাবিশ্বের অপার সৌন্দর্য দেখার জন্য এবং শিক্ষালাভের জন্য আমাদের ভ্রমণ করা উচিত।
0 মন্তব্যসমূহ