লেখা তরজমা

শ্রমিক দিবস : আমাদের কিছু কথা


ঊনিশ শতকের গোড়ার দিককার কথা। শ্রমিকরা তখনো শোষিত, সপ্তাহে ৬ দিনের প্রতিদিনই গড়ে প্রায় ১০ থেকে ১২ ঘন্টার অমানবিক পরিশ্রম করতো কিন্তু তার বিপরীতে মিলত নগন্য মজুরী। অনিরাপদ পরিবেশে রোগ-ব্যধি, আঘাত, ম্রত্যুই ছিল তাদের নির্মম সাথী। কিন্তু দুঃখের বিষয় তাদের পক্ষ হয়ে বলার মত কেউ ছিলনা তখন।
১৮৬০ সালে শ্রমিকরাই মজুরি না কেটে দৈনিক ৮ ঘন্টা শ্রম নির্ধারনের প্রথম দাবি জানায়। কিন্তু কোন শ্রমিক সংগঠন ছিলনা বলে এই দাবী জোরালো করা সম্ভব হয়নি। এই সময় সমাজতন্ত্র শ্রমজীবি মানুষের মাঝে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করতে থাকে।

শ্রমিকরা বুঝতে পারে বনিক ও মালিক শ্রেণীর এই রক্ত শোষণ নীতির বিরুদ্ধে তাদের সংগঠিত হত হবে। ১৮৮০-৮১ সালের দিকে শ্রমিকরা প্রতিষ্ঠা করে Federation of Organized Trades and Labor Unions of the United States and Canada [১৮৮৬ সালে নাম পরিবর্তন করে করা হয় American Federation of Labor]। এই সংঘের মাধ্যমে শ্রমিকরা সংগঠিত হয়ে শক্তি অর্জন করতে থাকে। ১৮৮৪ সালে সংঘটি '৮ ঘন্টা দৈনিক মজুরি' নির্ধারনের প্রস্তাব পাশ করে এবং মালিকও বনিক শ্রেণীকে এই প্রস্তাব কার্যকরের জন্য ১৮৮৬ সালের ১লা মে পর্যন্ত সময় বেঁধে দেয়। তারা এই সময়ের মধ্যে সংঘের আওতাধীন সকল শ্রমিক সংগঠনকে এই প্রস্তাব বাস্তবায়নে সংগঠিত হওয়ার পুনঃ পুনঃ আহবান জানায়। প্রথম দিকে অনেকেই একে অবাস্তব অভিলাষ, অতি সংস্কারের উচ্চাকাংখা বলে আশংকা প্রকাশ করে। কিন্তু বনিক-মালিক শ্রেণীর কোন ধরনের সাড়া না পেয়ে শ্রমিকরা ধীরে ধীরে প্রতিবাদী ও প্রস্তাব বাস্তবায়নে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হতে থাকে। এ সময় এলার্ম নামক একটি পত্রিকার কলাম 'একজন শ্রমিক ৮ ঘন্টা কাজ করুক কিংবা ১০ ঘন্টাই করুক, সে দাসই' যেন জ্বলন্ত আগুনে ঘি ঢালে। শ্রমিক সংগঠনদের সাথে বিভিন্ন সমাজতন্ত্রপন্থী দলও একাত্মতা জানায়। ১লা মে কে ঘিরে প্রতিবাদ, প্রতিরোধের আয়োজন চলতে থাকে। আর শিকাগো হয়ে উঠে এই প্রতিবাদ প্রতিরোধের কেন্দ্রস্থল। 

১লা মে এগিয়ে আসতে লাগল। মালিক-বনিক শ্রেণী অবধারিতভাবে ঐ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করল। ১৮৭৭ সালে শ্রমিকরা একবার রেলপথ অবরোধ করলে পুলিশ ও ইউনাইটেড স্টেটস আর্মি তাদের উপর বর্বর আক্রমন চালায়। ঠিক একইভাবে ১লা মে কে মোকাবেলায় রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের প্রস্তুতি চলতে থাকে। পুলিশ ও জাতীয় প্রতিরক্ষা বাহিনীর সংখ্যা বৃদ্ধি করা হয়। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা শিকাগো সরকারকে অস্ত্র সংগ্রহে অর্থ দিয়ে সহযোগিতা করে। ধর্মঘট আহবানকারিদের বিরুদ্ধে ব্যবহারের জন্য শিকাগো বানিজ্যিক ক্লাব ইলিনয় প্রতিরক্ষা বাহিনীকে ২০০০ ডলারের মেশিন গান কিনে দেয়। ১লা মে - সমগ্র যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৩০০,০০০ শ্রমিক তাদের কাজ ফেলে এদিন রাস্তায় নেমে আসে। শিকাগোতে শ্রমিক ধর্মঘট আহবান করা হয়, প্রায় ৪০,০০০ শ্রমিক কাজ ফেলে শহরের কেন্দ্রস্থলে সমবেত হয়। অগ্নিগর্ভ বক্তৃতা, মিছিলে, মিটিং, ধর্মঘট, বিপ্লবী আন্দোলনের হুমকি সবকিছুই মিলে ১লা মে উত্তাল হয়ে উঠে। পার্সন্স, জোয়ান মোস্ট, আগস্ট স্পীজ, লুই লিং সহ আরো অনেকেই শ্রমিকদের মাঝে পথিকৃত হয়ে উঠেন।
ধীরে ধীর আরো শ্রমিক কাজ ফেলে আন্দোলনে যোগ দেয়। আন্দোলনকারি শ্রমিকদের সংখ্যা বেড়ে দাড়ায় ১লক্ষ। আন্দোলন চলতে থাকে। ৩ মে (কারো কারো মতে ৪মে)১৮৮৬ সালে সন্ধ্যাবেলা হালকা বৃষ্টির মধ্যে শিকাগোর হে-মার্কেট বাণিজ্যিক এলাকায় শ্রমিকগণ মিছিলের উদ্দেশ্যে জড়ো হন। আগস্ট স্পীজ জড়ো হওয়া শ্রমিকদের উদ্দেশ্যে কিছু কথা বলছিলেন। হঠাত দূরে দাড়ানো পুলিশ দলের কাছে এক বোমার বিস্ফোরন ঘটে, এতে এক পুলিশ নিহত হয় এবং ১১ জন আহত হয়, পরে আরো ৬জন মারা যায়। পুলিশবাহিনীও শ্রমিকদের উপর অতর্কিতে হামলা শুরু করে যা সাথে সাথেই রায়টের রূপ নেয়। রায়টে ১১ জন শ্রমিক মারা যান। পুলিশ হত্যা মামলায় আগস্ট স্পীজ সহ আটজনকে অভিযুক্ত করা হয়। এক প্রহসনমূলক বিচারের পর ১৮৮৭ সালের ১১ই নভেম্বর উন্মুক্ত স্থানে ৬ জনের ফাঁসি কার্যকর করা হয়। লুই লিং একদিন পূর্বেই কারাভ্যন্তরে আত্মহত্যা করেন, অন্যএকজনের পনের বছরের কারাদন্ড হয়। ফাঁসির মঞ্চে আরোহনের পূর্বে আগস্ট স্পীজ বলেছিলেন, "আজ আমাদের এই নি:শব্দতা, তোমাদের আওয়াজ অপেক্ষা অধিক শক্তিশালী হবে"। 

২৬শে জুন, ১৮৯৩ ইলিনয়ের গভর্ণর অভিযুক্ত আটজনকেই নিরপরাধ বলে ঘোষণা দেন, এবং রায়টের হুকুম প্রদানকারী পুলিশের কমান্ডারকে দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত করা হয়। আর অজ্ঞাত সেই বোমা বিস্ফোরণকারীর পরিচয় কখনোই প্রকাশ পায়নি।

এর পরই শ্রমিকদের দাবীগুলো মেনে নেওয়া হয়।
(তথ্যসূত্র : somewhereinblog.net)

এই হচ্ছে শ্রমিক দিবসের মোটামুটি সংক্ষিপ্ত ইতিহাস। শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের সংগ্রাম আজও চলছে। শ্রমিক-মালিক দ্বন্দ কেনো থামছে না? না থামবার পেছনে কারণ কি? সেগুলোই জানার বিষয়।

ইতিহাস হয় মূলত একচোখা। ঐতিহাসিকের কলম যেদিকে যাবে ইতিহাস সেদিকেই বাক নিবে। ইতিহাসের নিরপেক্ষতা নিয়ে তাই প্রশ্ন থেকেই যায়। কিন্তু ইতিহাসও বিশ্বাসযোগ্য হতে পারে যদি অধিকাংশরাই একই মত পোষণ করে থাকে। শ্রমিক দিবসের ইতিহাস অনেকটা সেরকমই। সবার কলম দিয়ে একই তথ্য বারবার প্রকাশ পেয়েছে।

ইসলাম বলেছে,  শ্রমিকদের গায়ের ঘাম শুকানোর আগেই তাদের মজুরী পরিশোধ করে দিতে। শ্রমিকদের নিয়ে একটি অমূল্য বচন এটি। শ্রমিকরা শোষণ, নির্যকতনের শিকার হয়েই সংগ্রামের পথে অগ্রসর হয়েছিলো এটা বলার অপেক্ষা রাখেনা। বর্তমানেও সেই সংগ্রাম চলছে, এখনো তারা তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত, তারা এখনো হচ্ছে শোষিত,নির্যাতিত।

আমরা কাজ করি জীবিকার তাগিদে, জীবন ধারণের তাগিদে। চলার পথকে মসৃণ রাখার জন্য, জীবনকে সহজ ও সুন্দর করার জন্য আমরা কাজ করি, শ্রম দিই বিভিন্ন কাজে। কেউই এর ব্যতিক্রম নই। যেহেতু কাজ করতে হয় আমাদের জন্য, আমার নিজের জন্য, আমার কল্যাণের জন্য অতএব সেই কাজটি সর্বোচ্চ আগ্রহ নিয়েই করতে হবে।

আগ্রহ ব্যাপারটাকে আপেক্ষিক বলা যায়। আপনি ইচ্ছে করলেই আগ্রহ নিয়ে আসতে পারেন কোনো কাজে কিংবা আগ্রহ হারিয়েও ফেলতে পারেন। কিন্তু ব্যাপারটা আপেক্ষিক হলেও তা আপনার নিজ মনের উপর সবসময় নির্ভর করেনা। পারিপার্শ্বিক অবস্থা কিংবা অন্যান্য কিছু ব্যাপার এতে প্রভাব খাটায়।

আগ্রহ সৃষ্টি হবার মূল তাড়না পাওয়া যায় উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ থেকে। অধঃস্তনদের  কাজের প্রতি সর্বোচ্চ আগ্রহী করে তুলতে, কাজের প্রতি পূর্ণ সহানুভূতিশীল করে তুলতে একজন সিনিয়র পারসনের ভূমিকা গাড়ির চালকের মতোই। একজন সিনিয়র পারসন যেভাবে গাইড করবেন, পরিচালনা করবেন জুনিয়রের আগ্রহী মনোভাব সেভাবেই বেড়ে উঠবে। একই কথা প্রযোজ্য শ্রমিক - মালিকের ক্ষেত্রেও। মালিকের ব্যবহার, আচরণবিধির উপর নির্ভর করবে একজন শ্রমিকের কাজের গ্রাফ কতটা উঁচু বা নিচু হবে। মালিকের সহানুভূতি একজন শ্রমিকের কাছে অনেক গর্বের, সম্মানের যেমনটা সিনিয়র- জুনিয়রের ব্যাপারেও বলা যায়।

শ্রমিকরা কাজের প্রতি পূর্ণ আগ্রহী হয়ে উঠলে মালিক তার কাজগুলো সর্বোচ্চ ভালোভাবে পাবে, বেনিফিট আসবে সর্বোচ্চ পরিমাণে। এখানে মালিককেই মূখ্য ভূমিকা সর্বদা পালন করতে হবে। শ্রমিকদের সুযোগ-সুবিধা, তাদের ভালো-মন্দ বোঝা ইত্যাদির মাধ্যমে তাদের কাছে নিয়ে এসে কাজ আদায় করা যাবে। এবং এখানে এক্স-ফ্যাক্টর যেটি, সেটি হচ্ছে ভালো, সুন্দর, মার্জিত, সহানুভূতিশীল এবং বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ। 

যেহেতু কাজের উপরে আমাদের জীবন নির্ভরশীল, অতএব আমরা কাজ করি পূর্ণ মনোযোগ দিয়েই। কাজের প্রতি ব্যক্তিগত আগ্রহ থাকাটা ভালো করার জন্য সবচেয়ে সহায়ক। সহায়ক বললেও কম হবে,কেননা এটাই সবচেয়ে জরুরী, প্রয়োজনীয়। এ ব্যাপারে সবারই সর্বোচ্চ সচেতনতা প্রয়োজন।

শুধু যারা মাঠে,ক্ষেতে, খামারে কাজ করে তারাই শ্রমিক না, আমরা সবাই শ্রমিক। বাচার জন্য আমাদের শ্রম দিতে হয়, ভালোভাবে বেচে থাকার জন্য করতে হয় কঠোর শ্রম। এই শ্রমের আগে পরি উপসর্গ যোগ করলে শব্দটা আমাদের কাছে পরিচিত লাগবে। সেটি হচ্ছে পরিশ্রম।

শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার অবশ্যই দিতে হবে। ইসলাম এ ব্যাপারে কোনো ছাড় দেয়নি। তাদের উপর অমানুষিক কিছু চাপিয়ে দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তাদের পর্যাপ্ত পরিমাণ মজুরীও নিশ্চিত করতে হবে। আমরা যদি পারি তাদের পর্যাপ্ত সুযোগ এবং সুবিধা দিতে তবে তারাও পারবে আমাদের এই ভালোবাসার দেশটাকে আরো সুন্দর করে গড়ে তুলতে সাহায্য করতে। তাদের হাত দিয়ে আমরা অনেক মুদ্রা এবং সম্মান দুটোই অর্জন করসি।  অতএব তাদেরকে সেটুকু প্রতিদান যেনো দেওয়া হয় যেটুকু তারা আমাদের দিচ্ছেন। এটুকু তাদের প্রাপ্য, তাদের অধিকার ।

আজকের এই শ্রমিক দিবসে প্রত্যাশা এতটুকুই থাকবে সবার অধিকার, সবার মর্যাদা সবাইকে ফিরিয়ে দেওয়া হোক। যার যা প্রাপ্য তাকে তা অবশ্যই দিতে হবে। দেশের ভবিষ্যৎ নির্মাণে যারা অক্লান্ত পরিশ্রম করছেন, যাদের হাড়ভাঙা খাটুনি আমাদের স্বপ্ন দেখাচ্ছে, যাদের চোখের নিচের কালি আমাদের ভাবায় , যারা চুপ থেকেও বারবার আমাদের পিছনে ফেলে দিচ্ছে দেশের অগ্রযাত্রায় অবদানের ক্ষেত্রে সেইসব মানুষদের পাশে দাঁড়ানো আমাদের কর্তব্য। তাদের অধিকার ফিরে পাওয়া মানে হচ্ছে ভবিষ্যতের কিছু সোনালী মুহূর্ত উপভোগ করতে পারা। তাদের সাথে অবশ্যই ইনসাফ করতে হবে,ন্যায়বিচার করতে হবে।

শ্রমিকদের প্রতি অজস্র শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসা।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ