লেখা তরজমা

বই পর্যালোচনা : ক্রাচের কর্ণেল


স্বাধীনতা অর্জনের জন্য যার সাইলেন্সার বিহীন জীপের প্রকাণ্ড গর্জনে যুদ্ধক্ষেত্রে সৈনিকদের ঘুম ভাঙতো, তার ক্রাচের ঠকঠক শব্দে সৈনিকদের ঘুম যে আবার ভেঙেছিলো স্বাধীনতা রক্ষার জন্য। খোঁড়া পা নিয়েও হাসিমুখে ফাঁসিকাষ্ঠে যে প্রাণ দিয়েছিলেন সেই প্রাণ হাতে নিয়েই তিনি পালিয়েছিলেন তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তান থেকে, সেই প্রাণ তিনি উৎসর্গ করেছিলেন দেশের স্বার্থে, দেশের মানুষের মুক্তির স্বার্থে, অধিকার আদায়ের স্বার্থে।

আমরা নায়কদের ভুলে যাই। তাদের অর্জন, তাদের কর্মকান্ড, তাদের উপস্থিতি কিংবা তাদের সব ভালো কাজ। ভুলে যাবাই তো আমাদের ধর্ম। গোথাম সিটি যেমন ভুলে গিয়েছিলো তাদের রক্ষাকর্তা ব্যাটম্যানকে, ঠিক তেমনি আমাদেরও যে একজন ব্যাটম্যান ছিলেন এই ক্ষুদ্র বাংলাদেশের জন্য। একজন নায়ক, যাকে আমরা ভুলতে চাই, তার ইতিহাস, তার উপস্থিতি।

কিন্তু ভুলতে চাইলেই কি ভুলা যায়। ব্যাটম্যানের মতোই প্রয়োজনে সে সবসময় পাশেই ছিলো। সময়মত ঝাপিয়েও পড়েছে। তাকে কি করে ভুলি? কেউ না কেউ তো আছেই এই নায়ককে মনে করিয়ে দেবার জন্য, স্মরণ করবার জন্য। 

শাহাদুজ্জামান, নামটা অপরিচিত তো নয়ই, তার লেখা তো আরো পরিচিত। একের পর এক দারুণ সব লেখা যিনি আমাদের উপহার দিয়েছেন সেই তিনিই আবার আমাদের সেই ব্যাটম্যানকে মনে করিয়ে দিলেন। ক্রাচ নিয়ে ঠকঠক করে হেটে যাওয়া আমাদের ব্যাটম্যান কর্ণেল আবু তাহের। 

কর্ণেল আবু তাহের সম্পর্কে আমাদের মাঝে মিশ্র প্রতিক্রিয়া বিদ্যমান। দেশের জন্য তিনি হারিয়েছিলেন তার একটি পা। মর্টারশেলের আঘাতে উড়ে গিয়েছিলো যা স্বাধীন দিগন্তে। 

কর্ণেল তাহেরের পরিবারটাই ছিলো বিপ্লবী পরিবার। ভাই, বোন, মা সবার মাঝেই বিপ্লবী চিন্তার প্রকাশ ছিলো খুব ভালো করেই। দেশের সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্যই তারা বিপ্লবকে আমন্ত্রণ জানাতেন। তাদের বিপ্লবের সামরিক দিক বিবেচনা করেই কর্ণেল যোগ দিয়েছিলেন তৎকালীন পাকিস্তান আর্মিতে। বাঙালী অফিসারদের মধ্যে উচ্চপদস্থ একজন অফিসার ছিলেন কিন্তু তার দৃষ্টিভঙ্গি ছিলো অন্যরকম। বিপ্লবকে যিনি সর্বশেষ পর্যায় মনে করতেন তার আর্মিতে যোগদান সেই বিপ্লবের জন্যই।

দেশের মায়ায় তিনি স্ত্রী-পুত্রকে ভুলে গিয়েছিলেন। সাইলেন্সার বিহীন জীপ হাকিয়ে যখন তিনি যুদ্ধের একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে ছুটে বেড়াতেন, তখন পরিবারের কথা জীপের তীব্র গর্জনে হারিয়ে যেতো। গালফ স্টিকের মৃদু ঠকঠক শব্দ পরবর্তীতে ক্রাচের শব্দে রূপান্তরিত হবে, এটা কি কেউ বুঝেছিলো?

কামালপুরের যুদ্ধক্ষেত্র এখনো সেই আধেক পায়ের স্মৃতি নিয়ে হাসে।

কর্ণেল তাহের নিয়ে বলতে গেলে অনেক কথা এসে পড়ে। দেশের ব্যাটম্যানকে তো অল্প ভাষায় অঞ্জলি দেওয়া যায় না। দেশ স্বাধীনের পূর্বে যতটুকু উদ্দীপনা নিয়ে কাজ করেছেন দেশ স্বাধীন হবার পর তা যেনো আরো বেড়ে গেলো। কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টকে অন্যধারায় রূপান্তর করে আর্মির দিগন্ত বিস্তৃত করলেন। আর্মি শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে নয় বরং আর্মি হচ্ছে মানুষের সেবার জন্য, মানুষকে ভালোবাসার জন্য। 

আমাদের একটি সাধারণ বাতিক আছে। নতুনকে আমরা তুচ্ছ করি, ফেলনা ভাবি, উপরে উঠতে সাহায্য করিনা বরং আরো দাবিয়ে দিই। কর্ণেল তাহেরের সেই প্রচেষ্টা, যা আর্মিদের মানুষের আরো নিকটবর্তী হবার উপায় ছিলো সেটাও বিনষ্ট করা হয়। আর এভাবেই সমাজের হাতে মার খায় আমাদের ভালো চিন্তাগুলি। কর্ণেল তাহের আর্মি থেকে পদত্যাগ করেন।

দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে কর্ণেলের পরবর্তী প্রভাব বেড়ে গেলো তখন। জাসদের সামনে এসে তিনি নেতৃত্ব দিতে লাগলেন। মানুষের আরো কাছে আসলেন,হলেন মানুষের কর্ণেল, ক্রাচে ভর দিয়ে হাটা একজন প্রবাদ পুরুষ।

কর্ণেলের জীবনে ঘটনা বিভিন্ন দিকে প্রবাহ হয়েছে। ক্ষমতার কেন্দ্রে গিয়েও তিনি যেতে পারেননি বরং তাকে ঝুলতে হয়েছিলো ফাঁসিকাঠে।  জীবনের শেষে স্বীকার হয়েছিলেন বিশ্বাসঘাতকতার কিন্তু হাসিমুখেই মেনে নিয়েছেন তার মৃত্যু পরোয়ানা। নিজ হাতেই পড়েছিলেন ফাঁসির দড়ি। তার বীরত্বের সাক্ষী সেই আধেক পা টা তার সাথেই ছিলো। যেনো পরিহাস করছিলো। আর এভাবেই জীবনাবসান হয়েছিলো একজন সূর্যসন্তানের।

কর্ণেল আবু তাহেরকে নিয়ে লিখা প্রিয় লেখক শাহাদুজ্জামানের বই "ক্রাচের কর্ণেল" আমাদের এমনি কিছু বিষয় সম্পর্কে অবগত করায়। গল্পচ্ছলে এমন উপন্যাস সত্যিও সুখপাঠ্য, এটা না বলা দুষ্কর। বইটি সম্পর্কে বইয়ে লিখা পরিচিতিটাই আমার মনের কথা। সেটাই উল্লেখ করবো এখন,

"যাদুর হাওয়া লাগা অনেকগুলো মানুষ, নাগরদোলায় চেপে বসা একটি জনপদ, ঘোরলাগা এক সময়, একটি যুদ্ধ, একজন যুদ্ধাহত কর্ণেল, কয়েকটি অভ্যুত্থান। "

বলতে গেলে এখানে পুরো উপন্যাসটা যেনো উঠে এসেছে। পড়ার সময় আপনিও হারিয়ে যাবেন বইয়ের প্রতিটি অক্ষরের ঘোরে,মায়ায়। হারিয়ে যাবেন ইতিহাসের কর্ণেল তাহের নামক অধ্যায়ে, হারিয়ে যাবেন একজনের ক্রাচের ঠকঠক শব্দে।

বই পড়ার জন্য হাজারগুণ শুভকামনা

বই        : ক্রাচের কর্ণেল
লেখক   : শাহাদুজ্জামান
মূল্য      : ৪৫০/-
প্রকাশনী : মাওলা ব্রাদার্স

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ