১৭ই জুলাইয়ের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ঃ অভিজ্ঞতা, নির্লিপ্ততা, বাস্তবতা এবং ডকুমেন্টেশন
ছবিটা এক মহিমান্বিত জানাযার, শহীদ আবু সাঈদ, শহীদ ওয়াসিম, শহীদ প্রান্ত সহ বাকি সাত শহীদ ভাইয়ের স্মরণে ১৭ই জুলাইতে ঢাবির ভিসি চত্ত্বরে আমরা পড়েছিলাম। ডকুমেন্টেশনের স্বার্থে আমার মনে হল ওইদিনের ঘটনাক্রম বিস্তারিত জানানো উচিত।
বাসা থেকে বের হয়েই বুঝতে পারলাম যে মোবাইল নেটওয়ার্ক ডাউন করে ফেলা হয়েছে। আগের দিন থেকেই স্লো ছিল, ওইদিন সকালে ভিপিএন ছাড়া শুধুমাত্র টেলিগ্রাম এবং পারসোনাল মেসেজিং করা যাচ্ছিল। গ্রুপ মেসেজিং, ফেসবুক ব্রাউজিং সহ যাবতীয় সবই ছিল আওতার বাহিরে। তখনই মনে হচ্ছিল আজকে কিছু একটা ঘটাবে এই খুনী প্রশাসন।
আমি দশটার দিকে ক্যাম্পাসে পৌছাই। এসেই দেখি ক্যাম্পাসে ব্যাপক রণসাজ। ফুল-ভেস্টেড পুলিশ, বিজিবি এবং র্যাবের অবস্থান। এগারটা থেকে বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেট মিটিং শুরু হয়। এরমধ্যেই সন্দেহ ছড়িয়ে যায় ভিসি হয়ত হল এবং ক্যাম্পাস বন্ধ করে দিবেন। তাই সবার মাঝেই একটা চাপা উত্তেজনা ছিল। তো সকালের কর্মসূচি ছিল সিনেট ঘেরাও করা যেন এইরকম ছাত্রবিরোধী এবং ফ্যাসিস্ট সিদ্ধান্ত নিতে না পারে। পরে মিটিং ভিসির ভবনে স্থানান্তর করা হয়। মোটামুটি একে একে বেশকিছুসং্খ্যক ছাত্র জড়ো হতে থাকে।
সাড়ে দশটা থেকে এগারটার মাঝামাঝিতে একুশে হলের দিক থেকে আসতে থাকা নিরস্ত্র ছাত্রদের উদ্দেশ্যে পুলিশ টিএসসি/রাজু ভাস্কর্যের পাশেই দুইটি সাউন্ড গ্রেনেড ছুড়ে। তখন নৃশংসতাবিরোধী শিক্ষক জোটের কিছু শিক্ষক অপরাজেয় বাংলায় ছিলেন। তাদের মধ্যেও উৎকন্ঠা ছড়ায়। তবে সেখান থেকে ছাত্ররা সুস্থভাবেই বের হয়ে ভিসি চত্ত্বরে অবস্থান নেয়। ধীরে ধীরে সং্খ্যা বাড়তে থাকে। অপরদিকে সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্তের আগেই কিছু কিছু ছাত্র হল ছাড়তে থাকে। একই সাথে ভিসিতে স্লোগান, অবস্তবা। চলতে থাকে। এরইমধ্যে শাহবাগ, নীলক্ষেত মোড়ে দেখা যায় পুলিশের চেকিং, অনেককেই ক্যাম্পাসে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছিল না, আইডি চেক হচ্ছিল।
সিদ্ধান্ত আসতে আসতে প্রায় একটা বেজে যায়। তখন আমরা জানতে পারি অনির্দিষ্টকালের জন্য সবকিছু বন্ধ, সন্ধ্যা ছয়টার মধ্যে হল ছাড়ার নির্দেশ। আমরা তৎক্ষনাৎ সেই সিদ্ধান্ত বর্জন করি, নিজেদের অবস্থান জারী রাখি। এরইমধ্যে আমাদের নৃশংসতাবিরোধী শিক্ষকগণ শাহবাগ থানা থেকে ফেরত আসেন। তাদেরকে জানানো হয় সার্বিক অবস্থা। তারা ভিসির সাথে কথা বলার জন্য ভবনে যান। কিন্তু ভিসি তাদেরকে সাক্ষাৎ দিতে অস্বীকৃত হন। শিক্ষকগণ আমাদের দাবী এবং কথাগুলো ভিসির সহকারীকে জানিয়ে ফেরত আসেন। তারা জানান, সিদ্ধান্ত যেহেতু হয়েই গেছে, তাই ছাত্রদের হল তো ছাড়তে হবেই সন্ধ্যানাগাদ, তবে এরমধ্যে কাউকে হয়রানী করা যাবে না, পুলিশ, র্যাব দিয়ে ফোর্স করা যাবে না, টাইমিং এর ব্যাপারে স্ট্রিক্ট না থেকে শিথিলতার কথা। ছাত্ররা তখনো আসতে থাকে অল্প অল্প করে, একইসাথে অনেকে হলও ছাড়তে থাকে।
সেদিন আমাদের মূল কর্মসূচি ছিল দেশব্যাপী শহীদদের স্মরণে গায়েবানা জানাযা এবং কফিন মিছিল। আমাদের এই কর্মসূচি পালনে পুলিশ যথাসাধ্য বাধা দিচ্ছিল। কফিনগুলো ক্যাম্পাসে প্রবেশ করাতে দিচ্ছিল না। অবশেষে তিনটার পর আমরা সারিবদ্ধ হই, স্লোগান চলতে থাকে, বিভিন্ন হল, ক্যাম্পাসের বাইরে থেকে ছাত্ররা জড়ো হতে থাকে। আমাদের দল কিছুটা ভারী হয়। তখন আমাদের কয়েকজন গিয়ে মুক্তি ও গণতন্ত্র তোরণ থেকে কফিনগুলো নিয়ে আসে। এভাবেই আমরা ওইদিনের কর্মসূচির প্রথমটার দিকে ধাবিত হই। ইতোমধ্যে বিভিন্ন হল থেকে আরোও ছাত্ররা এসে আমাদের সাথে জড়ো হয়। ততক্ষণে পুলিশ আমাদের মোটামুটি ঘিরে দাঁড়ায়। তারা চাচ্ছিল আমাদেরকে ছোট স্পেসে ঘেরাওয়ে রাখতে। ছাত্রসং্খ্যা কিছু বাড়াতে আমরা চেষ্টা করি যথাসাধ্য ছড়ায়ে দাড়াতে। আপুরা সাইডে অবস্থান নেয়, সাংবাদিকেরাও।
অবশেষে চারটা নাগাদ জানাযার কার্যক্রম শুরু হয়। কফিন মিছিল শুর হয়ে কলাভবনের সামনে এক বহিরাগত টোকাইকে বের করা হয়, তার হাতে ইট ছিল, সুযোগ বুঝে পুলিশের দিকে মারত, আমাদের শান্তিপূর্ণ অবস্থান, মিছিলকে মিথ্যার রঙে সাজাত। সতর্কতার দরুণ এইসব প্রতিরোধ করা গিয়েছিল। তবে তখনি পুলিশ পরপর দুইটা সাউন্ড গ্রেনেড ফাটাল ভিসির ভবনের সামনে, মিছিলের পেছনে। টার্গেট ছিল ভয় দেখায়ে আমাদের ছত্রভঙ্গ করা। আমরা ভ্রুক্ষেপ না করে আগাচ্ছিলাম। আরেকটু এগিয়ে দুয়ারাতে পৌছুতেই পুলিশ মিছিলের সামনে কয়েকটা টিয়ারশেল ফাটাল। হালকা প্যানিক ছড়ালেও সবাই ঠায় দাঁড়িয়ে ছিল। আমরা আবার আগাচ্ছিলাম। এরপর আবারো এলোপাথাড়ি উপর্যুপরি সাউন্ড গ্রেনেড, টিয়ারশেল ছুড়তে থাকল। এবার মোটামুটি ছত্রভঙ্গ হওয়া শুরু হল। তখনো আমরা অনেকেই রাস্তার অবস্থান ছাড়িনি। কিন্তু অধিকাংশ দৌড়াদৌড়ি শুরু করাতে মোটামুটি সবার মধ্যেই অস্থিরতা ছড়াল। এরপরেও যখন আমাদের সবাইকে সরাতে পারছিল না তখন পুলিশ বিনা বিরতিতে একের পর এক সাউন্ড গ্রেনেড, টিয়ারশেল ফালাতে লাগল। ততক্ষণে সবাই আক্রান্ত টিয়ারশেলে, কারো গায়ে সরাসরি পড়েছে, মোটামুটি প্রস্তুতি থাকলেও এতটা মাস স্কেলে হামলা অপ্রত্যাশিত ছিল। তাই নিজেদের রক্ষার্থে সবাই নিরাপদ পজিশনে চলে যেতে বাধ্য হল। আমরা কলাভবন এরিয়ায় গিয়ে প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে শান্ত হতে না হতেই পুলিশ মলচত্ত্বরের দিকে মার্চ করতে লাগল। আমরা দৌড়ে গিয়ে হলপাড়ায় অবস্থান নিলাম।
পুলিশ মার্চের সাথে সাথে গুলি, টিয়ারশেলও চালাচ্ছিল। তাই বাধ্য হয়ে আমাদের আরো পিছিয়ে বঙ্গবন্ধু হলে অবস্থান নিতে হল। পুলিশ তখনো পুরোদমে টিয়ারশেল, গুলি চালাচ্ছিল। এক ভাইয়ের দুই পায়ে ১৫-২০টা গুলি লেগে ঝাঁযরা হয়ে যায়। তাকে হাসপাতালে নিতেও বাধা দিচ্ছিল পুলিশ। ভাইটির কন্ঠ এখনো কানে ভাসে, "ভাই, আমার পা দুইটা অবশ হয়ে যাইতেসে"!
পুলিশ ততক্ষণে জসীমউদ্দিন হলের ক্যান্টিনের কাছাকাছি কয়েক স্তরের ব্যারিকেড দিয়ে দাঁড়ায়। এবং নিয়মিত বিরতিতে ফায়ার, টিয়ারশেল ছোড়া অব্যাহত রাখে। অনেকেরই চোখ, মাথা, মুখ মারাত্মক ভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হয়। কেউ কেউ পকেটগেটটা টপকিয়ে চলে যাওয়ার সুযোগ পায়, যদিও শাহবাগে থাকা টোকাইদের আক্রমণ এবং ছিনতাইয়ের শিকার হয়।
আমরা তখনো আটকা ছিলাম। কয়েকজন গুরুতর অসুস্থ হয়ে মাঠেই লুটিয়ে পড়ে। বঙ্গবন্ধু হলের ওয়াইফাই দিয়ে সাময়িক যোগাযগের ব্যবস্থা হয়। হলে তখন উপস্থিত থাকা ভাইয়েরা আমাদের সর্বোচ্চ সহায়তা দেন, পানি, ওয়াইফাই, আগুনের ব্যবস্থা করেন। পুলিশও ধীরে ধীরে আগাতে থাকে। গুলি, টিয়ারশেল অব্যাহত ছিল নিয়মিত বিরতিতে।
হলে অবস্থান করাতে, কিছুটা সুস্থ পরিবেশ পাওয়াতে সবাই ধীরে ধীরে কিছুটা ধাতস্থ হয়। ততক্ষণে দুইজন শিক্ষক আসেন। তারা চেষ্টা করতে থাকেন নেগোসিয়েশনের। আশেপাশে থাকা ছত্রভঙ্গ সবাই জড়ো হতে থাকে। প্রথমবার নেগোসিয়েশন হবার পর আমরা আগাতে থাকলে পুলিশ আবারো আক্রমণ করে। টিয়ারশেলে আরো কয়েকজন গুরুতর আহত হয়। আমাদের আবার হলের অভ্যন্তরে স্থান নিতে হয়।
অবশেষে পুলিশ রাজি হয় আমাদেরকে প্যাসেজ দিতে কিন্তু ওদের মাঝ দিয়ে যেতে হবে। যেটার তীব্র প্রতিবাদ জানাই আমরা। তারপর আমরা সূর্যসেনের সামনে দিয়ে মহসীন হলের পাশ দিয়ে বের হতে পারলাম। এর আগে যারা অন্যান্য দিক দিয়ে বের হতে পেরেছিল তারা ছাত্রলীগের ভাড়া করা টোকাইদের দ্বারা বিভিন্ন ভাবে হামলা, ছিনতাইয়ের শিকার হয়।
এই ছিল সারাদিনের সবকিছুর নিরপেক্ষ ঘটনাকথন। পুলিশের ভাষ্যনুযায়ী মিছিল ছত্রভঙ্গ করাটা সরাসরি ভিসির নির্দেশেই হয়েছিল। এই ন্যাক্কারজনক পরিস্থিতি সূচনা থেকে ক্লাইম্যাক্স সবকিছুই ভিসির বাসার সামনেই হয়েছিল। তাই পুরো দায় তার উপরই পড়ে।
পরিশেষে, ক্যাম্পাস থেকে বের হয়ে নীলক্ষেত এরিয়াতেও আমি আরেক দফা পুলিশী হামলার শিকার হই। ঢাকা কলেজ সহ রাস্তায় থাকা নিরীহ পথচারী, জীবিকার তাগিদে আসা রিকশাওয়ালা সহ সবার উদ্দেশ্যেই দালাল পুলিশ তাদের আক্রমণ অব্যাহত রাখে। অবশেষে সুস্থ ভাবেই বাসায় ফিরতে পারি।
0 মন্তব্যসমূহ