লেখা তরজমা

ইসলামী শিক্ষাব‍্যবস্থার রূপরেখা (সংক্ষিপ্ত)


ইসলামী শিক্ষাব‍্যবস্থার রূপরেখা
সাজ্জাদুর রহমান

সূচনা

ইসলামী শিক্ষাব‍্যবস্থা” শব্দযুগল আমরা হরহামেশাই ব‍্যবহার করি। আজকের বিষয়ের রূপরেখা দেখার আগেই আমরা তার অর্থটা আগে ভালোভাবে উপলব্ধি করতে চেষ্টা করব। ইতিহাস থেকে ঘুরে আসা যাক। ইসলামী সভ‍্যতা বিশ্বজুড়ে ডানা মেলতে শুরু করে খ্রিষ্টীয় সপ্তম শতাব্দী থেকে। এর আগে কি আসলেই শিক্ষার জন‍্য গুছানো, যথার্থ এবং সুস্পষ্ট কোনোও ব‍্যবস্থা ছিল?

ইতিহাস হাতড়ে আমরা সেরকম কিছু পাই না। অনেকেই বলে থাকে গ্রীকদের থেকে জ্ঞানের সূত্রপাত। তবে আমরা আরও পিছনে তাকাব, মেসোপট‍্যামিয়া, মিশরীয়, সিন্ধু সভ‍্যতার অবদান গ্রীকদের অনেক আগে থেকেই ছিল। তারা বর্ণমালা উদ্ভাবন করেছে, চাকা তৈরী করেছে, বিভিন্ন চিহ্নের মাধ‍্যমে লেখার কার্যও সম্পাদনা করেছে। তাদের মাঝে শিক্ষা ছিল ঠিকই তবে সেখানে পরিপূর্ণ কোনো ব্যবস্থা ছিল না। গ্রীকদের মাঝেও তাই দেখতে পাওয়া যায়। তারা জ্ঞান-বিজ্ঞানে প্রশ্নের উন্মোচন করেছে। তারা প্রশ্ন করতে শিখিয়েছে, যা জ্ঞানার্জনের প্রথম ধাপ। কিন্তু তাদের অধিকাংশ শিক্ষাই শিক্ষক থেকে ছাত্র অর্থাৎ পার্রসন টু পারসন হয়েছে, সেভাবে কোনো প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠতে দেখা যায় না। তবে বলতেই হবে তাদের থেকে আমরা এই শিক্ষাব্যবস্থার একটা ভিত্তি পেয়েছিলাম,যার মাধ্যমে আমাদের দালান তৈরী করা সহজতর হয়েছিল।

শিক্ষাব্যবস্থা” শব্দবন্ধের “ব্যবস্থা” দ্বারা মূলত আমরা কি বুঝব? শিক্ষা দুনিয়ার প্রারম্ভ থেকেই ছিল, আল্লাহ আদম(আঃ)-কে প্রয়োজনীয় শিক্ষা দিয়েই প্রেরণ করেছিলেন। তবে “ব্যবস্থা” বললে এখানে ভিন্ন কিছু অবস্থা সামনে আসে। একটা প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি, কিংবা এমন অবস্থা যেখানে সার্বজনীন শিক্ষার পর্যাপ্ত সুযোগ বর্তমান থাকে। শিক্ষাটা সমাজের বাস্তবতায় পরিণত হয়, পারিপার্শ্বিকতার সাধারণ উপাদান হয়ে দাঁড়ায় তখন আমরা তাকে একটি ব্যবস্থা বলতে পারি। এ জিনিসগুলোর ধারণা অথবা বাস্তবায়ন আমরা প্রথম দেখতে পাই মুসলিম শাসনামলগুলোতে। মুসলিম শিক্ষাব্যবস্থা গ্রীক মডেল অনুসারেই গড়ে উঠছিল। যেটাকে আমরা প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমেও বলতে পারি। মোটাদাগে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা আসার আগে দুনিয়াতে দু’ধরনের শিক্ষাব্যবস্থা প্রচলিত ছিল। প্রথমত ছিল দাস-দাসীদের জন্য, দ্বিতীয়ত স্বাধীন মানুষদের জন্য। স্বাধীনদের হয় কোনো পথ পাঠশালায় যেতে হত কিংবা শিক্ষককে পর্যাপ্ত বেতন এবং সুবিধা নিয়ে বাসায় রাখা হত। দাসদের শিক্ষাটা ছিল অনেকটাই ব্যতিক্রম, নিচুমানের। দাসত্ব পাকাপোক্ত ভাবে করার জন্য যা প্রয়োজন তা শিক্ষা দেওয়া হত। এভাবেই একটি বৈষম্যমূলক অবস্থা ছিল যাকে যাই বলা হোক যথার্থ শিক্ষাব্যবস্থা বলা যায় না।

ইসলাম আসার পর কিছু জিনিসে ব্যাপক পরিবর্তন হল। যেমন নারী এবং দাসদের অধিকারে ব্যাপক সংস্কার আসল, মানুষ আসল স্বাধীনতার স্বরূপ বুঝল। সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হল শিক্ষাব্যবস্থায়। আগে কি কেউ কখনো কল্পনা করেছিল যুদ্ধবন্দীদের মুক্তিপণ হিসেবে শিক্ষা একটি মাধ্যম হতে পারে? কিংবা যুদ্ধবন্দীরা আসলেই মুক্তি পাওয়ার যোগ্য কিনা? তাদের সাথে ভালো ব্যবহার তো দূরের কথা! আমি বদর যুদ্ধের কথা বলছি। এইযে ছোট ছোট ঘটনাগুলো, এসবই ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থা কিংবা যথার্থ একটি শিক্ষাব্যবস্থার স্বরূপ দাঁড় করিয়েছিল।

ইসলামী শিক্ষাব‍্যবস্থা” পরিচিতি

জ্ঞানার্জনের পিছনে একটি মূখ‍্য উদ্দেশ‍্য বা দর্শন থাকে। বর্তমান বিজ্ঞান শিক্ষাতে আমরা একটি সাধারণ দর্শন দেখতে পাই। সহজ কথায় হচ্ছে, স্রষ্টার অস্তিত্বকে অস্বীকার করা। দর্শনের মারপ‍্যাচে আজকের সেক‍্যুলার-বিজ্ঞান-কেন্দ্রিক শিক্ষাব‍্যবস্থা সব ধরণের ঘটিত জিনিসগুলোকে তিনটি মূলনীতিতে ভাগ করেছে। এক, পরীক্ষা; দুই, পর্যবেক্ষণ  এবং তিন, চল-প্রতিরূপ। এই ত্রয়ীর মাধ্যমে তারা সবকিছুর কারণ অনুসন্ধানে লিপ্ত হয়। মজার বিষয় হচ্ছে এই ত্রয়ীর মাধ্যমে বিজ্ঞানের কিছু আইনকেও অস্বীকার করে। নিউটনের গতির তিনটি সূত্রে আসা যাক। প্রথম সূত্রে বলা আছে, কোনো বস্তুতে বল না দিলে তা স্থির থাকবে। ভেবে দেখেন, মোটাদাগে সব ঘটনার পেছনে একটা কারণ থাকতেই হবে বা চালিকাশক্তি। তাছাড়া কোনোকিছুই ঘটবে না। সূত্রের বক্তব‍্য এটিই। তারপর তৃতীয় সূত্রে যদি যাই, সবকিছুরই সমান বা বিপরীত প্রতিক্রিয়া থাকবে। মানে মানুষ যা করবে তার কোনোকিছুই কর্মফলবিহীন না, ফল ভোগ করতেই হবে। দেখেন এইযে বিষয়গুলো, এসব সরাসরি একটি কেন্দ্রীয় শক্তির নির্দেশ দেয়। আমরা জানি সেটি হচ্ছেন আল্লাহ। আধুনিক বস্তুবাদী বৈজ্ঞানিক দর্শনে এরকম অনেক দ্বিচারীতা উজ্জ্বল হয়ে আছে। এর প্রভাব পড়েছে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাতেও। না চাইতেও তা হয়ে যাচ্ছে সেক‍্যুলারাইজড। এখান থেকে ফিরতে হলে আমাদেরকে আসল শিক্ষাব্যবস্থা যা ইসলাম নিয়ে এসেছিল সেদিকে যেতে হবে।

ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থার মূলনীতিই ছিল নৈতিকতাসম্পন্ন শিক্ষা। কুরআন-হাদীসের পাশাপাশি সেখানে ছিল সব ধরনেরই শিক্ষা গ্রহণের উন্মুক্ত সুযোগ। দাস কিংবা স্বাধীন অথবা অন্যান্য ধর্মীয় লোক কারো সাথেই ছিল না কোনই বৈষম্য। সমাজে ছিল না নারী কিংবা পুরুষের বড়ত্ব, যোগ্যতাই ছিল একমাত্র মাপকাঠি। এই উন্মুক্ত ব্যবস্থার ফলে ইসলামী সালতানাতগুলোতে শিক্ষার ব্যাপক প্রচলন হয়। বিশ্বের নানান জায়গা থেকে জ্ঞানভান্ডারগুলো মুসলিম জগতে জড়ো হতে থাকে। অনুবাদ আন্দোলন শুরু হয়, মৌলিক কাজও আসতে থাকে। এভাবেই আমরা বৈচিত্র‍্যতা সম্বলিত একটি শিক্ষাসংস্কৃতির কল্প দেখতে পারি।

আবার দেখতে হবে যখন এই স্বর্ণযুগ বিশ্ব রাজনীতি মুসলিমরা নিয়ন্ত্রণ করত তখন কিন্তু যথেষ্ট পরিমান অন্য ধর্মানুসারীরাও শিখতে আসত। তারা গবেষণা করেছে, তৎকালীন শিক্ষাকে যথোপযুক্ত এবং উন্নত করতে সাহায্য করেছে। জ্যোতির্বিজ্ঞানী ইয়াহিয়া ইবনে আবু মানসূর, পদার্থবিদ জিবরিল ইবনে বখতিয়াশু কিংবা  চিকিৎসক ইসহাক ইবনে আমরানের মত বেশকিছু স্বনামধন্য ব্যক্তিত্ব ছিলেন তারা খ্রিস্টান অথবা ইহুদী হওয়া সত্ত্বেও একই ছন্দে মুসলিম সংস্কৃতিতে নিজেদের সমৃদ্ধ করেছিলেন। আধুনিক মিথ আমাদেরকে যে বলে ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থা শুধুই ধর্মীয় শিক্ষাটাই দিতে পারে, এখানেই এটি বানচাল হয়ে যায় এবং সর্বৈব মিথ্যায় পরিণত হয়। শুধুমাত্র ধর্মীয় শিক্ষা নিতে নিশ্চয় এতদবিখ্যাত ব্যক্তিগণ মুসলিম সাম্রাজ্যে আসেনি, তারা এখানে একটি যথার্থ, প্রকৃত এবং যুক্তিযুক্ত শিক্ষা সংস্কৃতির খোঁজ পেয়েছিলেন।

শিক্ষাব‍্যবস্থার মূলনীতি

রাসূল এমন একটি আরব সমাজে এসেছিলেন যেখানে লিখতে কিংবা পড়তে পারাটাই ছিল আশ্চর্য গুণ। তারা বিশেষ সম্মানের অধিকারী হত। হাতেগোণা কিছু লোক পাওয়া যেত যারা প্রকৃতই লিখতে পারদর্শী। এখানে রাসুল (সাঃ) কে একজন নবী কিংবা আল্লাহর প্রেরিত হিসেবে না ভেবে শুধুমাত্র একজন নেতা কিংবা সমাজ সংস্কারক হিসেবেও দেখি তবেও সাধারণভাবে এটা উপলব্ধি হয় যে তখনকার আবেদন এবং পারিপার্শ্বিকতা অনুযায়ী শিক্ষার চেয়ে প্রাধান্য পেতে পারে এমন অনেক কিছুই ছিল। শিক্ষার গুরুত্ব দুনিয়ার সব সমাজব্যবস্থা কিংবা সভ্যতাতে প্রবলভাবেই ছিল। জাহেলিয়‍্যাতি আরব সমাজে যেমন আবুল হাকামের (আবু জেহেল) কদর দেখা যায় ঠিক সেভাবেই। কুরআন নাযিলই হল “পড়” শব্দটা দিয়ে। সূরা আলাকের প্রথম আয়াতের কথা বলছি। প্রথম পাঁচ সর্বাগ্রে অবতীর্ণ হয়েছিল। মজার ব্যাপার হচ্ছে এই আয়াতগুলোই ইসলামের শিক্ষাব্যবস্থার ভিত্তি রচনা করে গিয়েছে যুগের পর যুগ।

অনুবাদটা যদি একবার দেখি,

 “পড় তোমার রবের নামে যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন। তিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন জমাটবাঁধা রক্তপিণ্ড থেকে। পড় এবং তোমার রব মেহেরবান। তিনি কলমের সাহায্যে শিখিয়েছেন। তিনি মানুষকে এমন জ্ঞান দিয়েছেন যা সে জানত না”।


এইযে পাঁচটি আয়াত যা শিক্ষাব‍্যবস্থার মূলনীতি হিসেবে পরবর্তীতে আবির্ভূত হয়, এগুলো দারুণ শক্তিশালী বার্তা বহন করে। এখানে আমরা পাই মানুষ হিসেবে আমাদের জ্ঞানার্জনের কথা, জ্ঞানার্জনের পিছনে কি উদ্দেশ্য, কিভাবে জ্ঞানার্জন করব। প্রথমেই বলা হচ্ছে পড়তে। এই প্রথম আয়াতের সাথে যদি পঞ্চম আয়াতের সংযোগ করা হয় তবে দেখা যায় মানুষ অনেক কিছু সম্পর্কেই অনাবগত। তাদেরকে আল্লাহ সেসব জানার সুযোগ দিয়েছেন, সেজন্য গবেষণা করে, পড়ে তা জানতে হবে। কিভাবে করবে?চতুর্থ আয়াতে বলা হয়েছে কলমের সাহায্যে। কলমের সাহায্যে মানে লিখিত কিছু। এখন, আপনি যৌক্তিক, প্রকৃত এবং সত্য কারণ কিংবা প্রেক্ষাপট ছাড়া কিছু লিখতে পারবেন না, এটিই নৈতিকতার দাবী। সেজন‍্য দরকার গবেষণা, চিন্তা সহ যাবতীয় প্রাসঙ্গিক কাজগুলোর। সবশেষে আয়াতগুলো থেকে আমরা জ্ঞানার্জনের উদ্দেশ্যও পেয়ে যাই। প্রথম তিন আয়াতের মাধ্যমে সেটাও স্পষ্ট। উদ্দেশ্য হচ্ছে নিজের রবকে চেনা, তার সৃষ্টি নিয়ে গবেষণা করা, তিনি মানুষকে যে দায়িত্ব দিয়ে প্রেরণ করেছেন তার আঞ্জাম দেওয়া। তিনি মেহেরবান, তাই মানুষ যখন এরকম অনুসন্ধানে লিপ্ত হবে তিনি তাদেরকে হতাশ করবেন না।

বলতে গেলে এখান থেকেই আমরা শিক্ষাব‍্যবস্থার মূলনীতিগুলোই পাই।

১. শিক্ষার কাজই হচ্ছে নতুন জ্ঞানের সৃষ্টি করা, এরজন‍্য গবেষণা বিকল্প কিছু নেই। শিক্ষা মুখস্থ করে আওড়ানো কিছু না, এটি যথার্থ চিন্তা এবং বাস্তবতার সম্মিলিত উপাদান।

২. গবেষণার ক্ষেত্রে সর্বদা সত‍্যের আশ্রয় নিতে হবে। এখানে অসত‍্য কিংবা অপ্রকৃত তথ‍্য ব‍্যবহারের কোনো সুযোগই থাকবে না।

৩. জ্ঞানার্জনের উদ্দেশ্যই হবে রবকে চেনা, তার সৃষ্টি নিয়ে গবেষণা করা।

বর্তমানে চলে আসা সেক‍্যুলার-মতাদর্শী-বিজ্ঞানভিত্তিক-পশ্চিমা শিক্ষাব্যবস্থাতে এই জিনিসগুলোই অনুপস্থিত। শিক্ষায় সত‍্যের চাইতে এখন দেখা যায় তথ্যের নিদারুণ ম্যানিপুলেশন। মিডিয়ার কথা নাই বা বললাম। এভাবেই সবখানেই মিথ্যার বেসাতি গড়ে উঠেছে।

বিজ্ঞান শিক্ষার একাল-সেকাল

বিজ্ঞানকে বলা হত প্রাকৃতিক দর্শন। ১৮০০ শতকের পরে এসে এই নাম পরিবর্তন হয়। বুঝাই যাচ্ছে বিজ্ঞান শুধুমাত্র কিছু সূত্র আর সংজ্ঞাধারী কিছু নয়, এর ব্যবহারিক দিকের সূত্রপাতই হয়েছিল রবের নিদর্শন, সৃষ্টিকে আরো গভীরভাবে বুঝতে। মুসলিম শিক্ষাব্যবস্থার হাত ধরেই বিজ্ঞানের ব্যবহারিক চর্চা শুরু হয়। বিজ্ঞান বা এই প্রাকৃতিক দর্শন বেরিয়ে আসে মিথ, কল্পনা কিংবা জাদুময় জগত থেকে। উপরে আলোচিত মূলনীতিসমূহ বিজ্ঞানের জন্যও খাটবে। বর্তমান বিজ্ঞান নিয়ন্ত্রণ করছে সেক্যুলার-পাশ্চত্য-দর্শন ব্যবস্থা।

রাসূল (সাঃ)-এর যুগে শিক্ষা-সংস্কৃতি

অন্ধকারাচ্ছন্ন আরব সমাজের বিপরীতে মদীনায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল আলোকিত এবং নৈতিকতাসম্পন্ন একটি সমাজব‍্যবস্থা। ওহীপ্রাপ্তির পর রাসূল বিভিন্ন জায়গায় সাহাবাদের জড়ো করে দারস দিতেন, কুরআনের আয়াত শুনাতেন। যেমন, মক্কায় আরকাম(রাঃ)-এর ঘরে এবং মদীনায় এসে মসজিদে নববীতে। যেহেতু নিয়মিত ওহী আসত তাই মুসলিমরা একটি পর্যায়ক্রমিক শিক্ষার মধ্যেই থাকত। পরিস্থিতিনুযায়ী তারা ওহীর দ্বারা সমাধান পেত। এতে কোনো প্রকার মতভেদ সৃষ্টির সুযোগই ছিল না।

বদরের যুদ্ধবন্ধীদের মাধ্যমে এই শিক্ষাব্যবস্থায় ব্যাপক একটি সংযোজন হয়েছিল। শিক্ষার বিনিময়ে মুক্তিই এখানে মূখ্য নয়, বরং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিটা গুরুত্বপূর্ণ, যা আসল শিক্ষার স্বরূপ দেখায়। যুদ্ধবন্দীরা এরকম দয়াপ্রাপ্ত হবে তা ছিল কল্পনাতীত। সাহাবাগণ দাওয়াতী কাজের অগ্রগতির জন‍্য ভাষাশিক্ষার পিছনেও বেশ সময় দিয়েছেন। ফিরে আসে সেই আগের কথা, রবকে বুঝার চেষ্টাতেই, তার জন্য কাজ করতে গিয়েই প্রসার হয়েছিল শিক্ষার আদর্শ একটি ব্যবস্থার। রাসূলের হাদীসও একটি উৎস ছিল জ্ঞানার্জনের কারণ তা ওহী দ্বারাই প্রভাবিত থাকত।

খোলাফায়ে রাশেদার শিক্ষা-সংস্কৃতি

রাসূল ইন্তেকাল করলে জ্ঞানের প্রধান উৎসটিও হারিয়ে গেল। আগে সত্য এবং প্রকৃত বিষয়কে যেভাবে ওহীর মাধ্যমে জানা যেত সেটা ভাটা পড়ল। সেখান থেকে আবু বকর(রাঃ)-এর মাধ্যমে প্রথম কুরআন লিখিতভাবে সংকলিত হল। উসমান (রাঃ)-এর সময়ে মুসলিম খেলাফত যখন আরোও বিস্তৃত হল তখন সর্বপ্রথম জ্ঞানের প্রশ্নে সংকট দেখা গেল।

সব জায়গাযর আরবী ভাষা এক নয়। মিশরে যেভাবে বলা হয় সৌদী আরবে হয় তার ব্যতিক্রম কিংবা সিরিয়ায় আরোও আলাদা, লিবিয়ায় গিয়ে তা হল অন্যকিছু। এভাবে যখন সীমানা বাড়ল, লোকজন কুরআনকে নিজেদের মত পড়া শুরু করল। উসমান(রাঃ) তখন কোরআনের আসল কপিটি ছড়িয়ে দেওয়ার মাধ্যমে তার সমাধান করলেন। তখন ফিকহ বোর্ড গঠন হয়েছিল উমর (রাঃ)-এর হাত ধরে। রাসূলের হাদীসগুলো তখনো নির্ভেজাল ভাবেই সাহাবাদের নিকট ছিল। এসবের বাইরে প্রাকৃতিক দর্শন কেন্দ্রিক কাজ তখন দেখা যায়নি। সবাই ওহীপ্রাপ্ত জ্ঞানকেই বিস্তার করতে ভূমিকা রাখছিল। দৈনন্দিন শিক্ষাটা রাসূলের যুগের মতই ছিল, মসজিদে নববী হয়েছিল অ-নামী বিশ্ববিদ্যালয়, পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সভ্যতার অন্যতম সফল পাঠশালা।

পরবর্তী শাসনব‍্যবস্থাগুলোতে শিক্ষা-সংস্কৃতি

মুসলিমদের জ্ঞানের জগতে উৎকর্ষতা শুরু হয় মূলত উমাইয়া শাসনামল থেকে। খালিদ ইবনে ইয়াযিদের হাত ধরে আমরা অনুবাদ যুগে প্রবেশ করি। তিনি আলকেমি চর্চাও করতেন। এভাবেই শিক্ষা শুধু এককেন্দ্রিক না থেকে অন্যান্য সভ্যতার জ্ঞানগুলো আমাদের হাতে আসতে থাকে। এর পিছনে বাণিজ্য কাফেলাগুলোর দারুণ প্রভাব থাকত। তাদের মাধ্যমে বহির্গত সভ্যতার জ্ঞানগুলো আমাদের কাছে পরিচিতি পেয়েছিল। এ সময় আমরা পেয়েছি বিখ্যাত ফকীহদের, ইসলামী আইনশাস্ত্রে যারা রেখেছেন অবিশ্বাস্য অবদান।

উমাইয়রা যা শুরু করেছিল, আব্বাসীরা এসে দিয়েছিল সেটার পূর্ণতা। একইসাথে তাদের মাধ্যমে শিক্ষার মাধ্যম পেয়েছিল প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা। বায়তুল হিকমাহ-এর কথা বলছি, জ্ঞানের জগতে এখনো অনন্য-অসাধারণ-অভূতপূর্ব একটি ইতিহাস। কি নিয়ে চর্চা হত না এখানে! অনুবাদ থেকে জ্যোতির্বিজ্ঞান, গণিত থেকে সমাজব্যবস্থা, নৈতিকতা থেকে যুক্তিবিদ্যা, সঙ্গীত থেকে ভাষাশিক্ষা সহ যাবতীয় সবকিছুই। পরবর্তী সালতানাতগুলো এর প্রেরণাতেই সামনে এগিয়েছে। এছাড়াও প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল আল-আযহার, কারাউইন বিশ্ববিদ্যালয়ের মত পৃথিবীর প্রাচীন জ্ঞানপিঠগুলোও।

সেলজুক এবং উসমানী পর্যায়ে ছিল জ্ঞানজগতে অনন্য কিছু সংযোজন। সেলজুকী ইমাম গাযালী মুসলিম চিন্তা-দর্শনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিলেন। এভাবে আমরা কতশত মনীষীদের দেখা পাব তার ইয়ত্তা নেই। নিযামিয়া মাদ্রাসার কথা দ্বিগবিদিক ছড়িয়েছিল। তবে সবচেয়ে বড় সংস্কার এসেছিল উসমানীদের প্রথম দুইশ বছরে। তারা পেরেছিল পুরো সম্রাজ্যকেই একটি শিক্ষা মডেলে নিয়ে আসতে। ক্যাডারভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থার দূর্দান্ত উদাহরণ ছিল সেটি। হাজারে হাজারে মাদরাসা গড়ে উঠেছিল, ছিল বিশেষায়িত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। সাম্রাজ্য পরিচালনার জন্য বিশেষ শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে লোক তৈরি করা হত, মেধাতন্ত্রের অপূর্ব নিদর্শন হয়ে উঠেছিল।

একই সময়ের বাংলা সালতানাতের কথাও আসবে। এই বাংলার আনাচে-কানাচে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল হাজারো এরকম মাদরাসা এবং খানকা। জাত-বর্ণ-ধর্ম নির্বিশেষে সবাই সেসবে পড়ত। মাদরাসা, খানকা-কেন্দ্রিক শিক্ষাব্যবস্থায় সব ধরণের শিক্ষাই পাওয়া যেত। এই বাংলার অর্থায়নেই রাসূলের জন্মভূমিতে পরিচালনা হত কয়েকটি মাদরাসাও।

ইসলামী শিক্ষাব‍্যবস্থার রূপরেখা

ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থা মোটাদাগে ইসলামী আদর্শ, মূল্যবোধ এবং দৃষ্টিভঙ্গী শেখা এবং চর্চাকেই বুঝায়। ইসলামী জীবনাদর্শকে মডেল করে গড়ে উঠে। এর মাধ্যমে আমাদের যে নৈতিকতার পাঠ দেওয়া হয় তা প্রচণ্ডভাবে আধুনিক ব্যবস্থায় অনুপস্থিত।

  ১. এটি একটি সার্বজনীন ব্যবস্থা, যা দুনিয়া এবং আখিরাত উভয়েরই প্রয়োজন মেটাবে।

  ২.  সব শিক্ষাকে ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গী ও চিন্তা-দর্শনের আলোকে কারিকুলাম প্রণয়ন করে চালাতে হবে।

  ৩. সব ধর্মের ক্ষেত্রে, নৈতিকবোধসম্পন্ন মানুষ গড়ে তোলাই হবে এর প্রধান লক্ষ্য। মুসলিমদের জন্য এর পাশাপাশি ধর্মীয় দিকেও মনোযোগ দিতে হবে। মুসলিমরা কুরআন, হাদীস, ফিকহ নিয়ে মৌলিক জ্ঞানার্জন করবে, অন্য ধর্মীয়রা এসব থেকে নিংড়ে আনা শিক্ষা গ্রহণ করবে।

  ৪.  শ্রেনীভিত্তিক ও উন্মুক্ত শিক্ষাব্যবস্থা থাকবে। অর্থাৎ একজন যা পড়তে ইচ্ছুক সেটাই পড়তে পারবে, কোনোকিছু চাপানো হবে না। তবে অবশ্যই এটি যথার্থ মানদণ্ড পেরুনোর মাধ্যমেই হতে হবে। শ্রেণীভিত্তিক লোক তৈরির জন্য বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান থাকবে।

  ৫.  শিক্ষার্জন এবং কাজপ্রাপ্তির ভারসাম্য রাখতে হবে। যোগ্যদের সঠিক স্থানে স্থাপন করতে হবে অর্থাৎ কঠোর মেধাতান্ত্রিক ব্যবস্থা দাঁড় করাতে হবে।

   ৬. শিক্ষার পরিবেশকে ইসলামী ছাঁচে ঢালাই করতে হবে।

সমাপ্তি

লেখাটিতে ইসলামী বলতে ইসলামকে জীবনাদর্শ মানে শুধু এরকম ব‍্যক্তিদের বুঝানো হয়নি বরং পুরো পৃথিবীর জন‍্য কল‍্যাণকর এরকম ব‍্যবস্থা হিসেবে বুঝানো হয়েছে। ইতিহাস বলে, এই ব‍্যবস্থা আমাদের দিয়েছিল স্বচ্ছ, যথার্থ, পাকাপোক্ত, বৈষম‍্যহীন, যুগোপযোগী, নৈতিকতাসম্পন্ন এবং আদর্শবাদী এক শিক্ষাসংস্কৃতি। পুরো পৃথিবীকে সঠিক পথে ফেরাতে এর বিকল্প নেই। আমাদের ভবিষ্যতের পথচলা এই উদ্দেশ্যকে সামনে রেখেই হোক। ইসলামকে পৃথিবীর রাজনৈতিক চালক হিসেবে ফিরিয়ে আনার আন্দোলন জোরদার হোক।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ