লেখা তরজমা

চলুন, বুড়ো মহাবিশ্বের বয়স মাপি

 

মহাবিশ্ব ঠিক কতটা বুড়ো
সাজ্জাদুর রহমান

ছবিঃ মহাবিশ্বের সময়সীমা, বিগ ব্যাং মডেল অনুসরণে Source: NASA/WMAP



মহাবিশ্বের অভ্যন্তরেঃ

মহাবিশ্ব বলতে কি বুঝি আমরা? জটিলতায় না গিয়ে একেবারে সহজ ভাষায় মহাবিশ্বটাকে ছুঁতে পারি কিনা চলুন ভেবে দেখি! আমাদের চারপাশে যা কিছু আছে, যেসব আমরা স্পর্শ করতে পারি, অনুভবে নিতে পারি, উপস্থিতি বুঝতে পারি, পরিমাপ করতে পারি, নির্দিষ্টকরণ করতে পারি এগুলো সবই মহাবিশ্বের আওতাধীনে। তো এসবের মধ্যে কোন মূল্যবান জিনিসগুলো অন্তর্ভূক্ত হচ্ছে সেটিও জানা যাক পলকেই। সব ধরণের জীবিত বস্তু, গ্রহসমূহ, তারকারাজি, ছায়াপথ, ধূলাবরণ, আলো এমনকি সময়ও কিন্তু মহাবিশ্বের বিশালতার চক্করে ডুবে থাকে। তবে মহাবিশ্বের জন্মের আগে সময়, বস্তু এবং স্থানের কোন অস্তিত্ব ছিলনা। তবে এখন প্রশ্নও আসে জন্মই বা হল কিভাবে? আজকের এই অবস্থাতেই বা কিভাবে আসল? সেটিও জানা যাক, চলুন।

মহাবিশ্বের শুরুঃ

বড়সড় ব্যাঙের কথা শুনেছেন? যার মাধ্যমে মহাবিশ্বের সূচনা হয়েছিল? জি, ঠিক ধরেছেন বিগ ব্যাং এর কথাই বলা হচ্ছে। মহাবিশ্বের জন্ম সেখান থেকেই। যার প্রারম্ভিকা কত বছর আগে হয়েছিল?  বিগ ব্যাং জিনিসটা তাহলে কি? কিভাবে ঘটছে মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ?

সমগ্র মহাবিশ্ব বিন্দুবৎ অবস্থা থেকে সম্প্রসারিত হয়েছে। সে অবস্থাতে সকল পদার্থ এবং শক্তি অতি উত্তপ্ত এবং ঘন অবস্থায় বিরাজমান ছিল। এর আগে কি ছিল তা নিয়ে বিজ্ঞানীদের মাঝে একক ধারণা না থাকায় তা বর্ণনা করার জন্য “সিঙ্গুলারিটি বা মহাকর্ষীয় অদ্বৈত অবস্থান” শব্দটি বলা হয়ে থাকে। এরপরে স্ফীতি শুরু হয় যা বহু বছর ধরে চলে আসছে এবং আমরা আজকের এই মহাবিশ্ব দেখতে পাচ্ছি। অধিকাংশ অ্যাস্ট্রোনোমারদের মতে এভাবেই হয়েছিল এবং ঘটে চলছে সবকিছু। তবে ভিন্নমতও রয়েছে। এই সুযোগে চলুন পবিত্র কুরআনও ঘেটে দেখি। 

“যারা কুফরী করে তারা কি ভাবে না, আসমানসমূহ এবং যমীন ওতপ্রোত ভাবে মিশে ছিল, অতঃপর আমি উভয়কে পৃথক করে দিলাম আর সকল প্রাণবান জিনিসকে পানি থেকে সৃষ্টি করলাম। তবুও কি তারা ঈমান আনবে না?” (সূরা আম্বিয়া, ২১: ৩০)

তাফসীরে ইবনে কাছীরে এই আয়াতের ব্যাখ্যাতে পাওয়া যায়, একদম শুরুতে সবকিছু একত্রে ছিল। অতঃপর সেগুলো আলাদা করে ফেলা হয় এবং সেখান থেকে আকাশ, যমীনের সৃষ্টি হয়। ইবনে আব্বাস(রাঃ) এর বর্ণনা থেকেও একই রকম তথ্য পাই আমরা। আব্দুল্লাহ ইবনে উমর(রাঃ) এর কাছে এক ব্যক্তি উপস্থিত হয়ে যখন জিজ্ঞেস করেছিল কখন আকাশ ও যমীন সংযুক্ত ছিল এবং কিভাবে আলাদা হল। তারপর তিনি লোকটিকে বললেন আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস(রাঃ) এর কাছে যেতে, তাঁকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করতে এবং যা উত্তর দিবেন তা এসে তাকেও জানাতে। লোকটি তাঁর কাছে পৌঁছলেন এবং একইভাবে জিজ্ঞেস করলেন। উত্তর আসল, “হ্যাঁ, তারা একত্রে ছিল। তখন আসমান থেকে বৃষ্টিও হত না এবং মাটি থেকে ফসলও জন্মাত না। যখন মানুষকে পৃথিবীতে বসবাসের জন্য প্রস্তুত করা হল তখন উভয়টিই শুরু হল”। এরপর লোকটি ফিরে গিয়ে ইবনে উমর(রাঃ) কে সবটা জানাল। তিনি উদ্ধৃত করলেন, “আমি জানতাম ইবনে আব্বাস(রাঃ) কে কুরআনের মর্মার্থ বুঝবার প্রজ্ঞা দেয়া হয়েছে, তিনি সত্য বলেছেন এবং যেভাবে বলেছেন সেভাবেই ছিল সবকিছু”। এছাড়াও প্রসিদ্ধ তাবেয়ী সা’ইদ ইবনে যোবায়ের(রহঃ) থেকেও একইরূপ আলোচনা পাওয়া যায়।

মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ নিয়েও কুরআনের বর্ণনা পাই আমরা। আধুনিক বিজ্ঞান এবং কুরআনের বক্তব্য এখানে সুন্দর ভাবে সাদৃশ্যতা দেখায়। এসব থেকে মহাবিশ্বের সূচনা নিয়ে স্পষ্ট একটি ধারণা আমরা পেয়ে যাই।

“এবং আমি আমার শক্তি দ্বারা আকাশ নির্মাণ করেছি এবং অবশ্যই এটি সম্প্রসারিত হচ্ছে”। (সূরা আয-যারিয়াত, ৫১: ৪৭)



Planck has mapped the polarization of the CMB across the entire sky.  ESA/PLANCK COLLABORATION

Planck has mapped the polarization of the CMB across the entire sky.  ESA/PLANCK COLLABORATION




মহাবিশ্বের বয়সঃ

মহাবিশ্বের জন্মদিনে কতটি মোমবাতি জ্বালাবেন আপনি? আচ্ছা, যদিও গবেষকরা একটি সংখ্যা বলে দিয়েছেন তবে তারা সেটি কিভাবে নির্ণয় করলেন? কি? ভেবে কিনারা পাচ্ছেন? চলুন দেখি, বিজ্ঞানীদের পিছু করে দ্রুত কোন সমাধানে যেতে পারি কিনা। মহাবিশ্ব তথা ইউনিভার্সের বয়স নির্ধারণ করতে গিয়ে বিজ্ঞানীগণ দুটি উপায়ের দ্বারস্থ হয়েছেন। প্রথমত, মহাবিশ্বের সবচেয়ে পুরনো বস্তুকে অধ্যয়ন করা এবং কত দ্রুত সেটি স্ফীত হয়েছে তা পরিমাপ করা, সাধারণত এখানে তারকা বা স্টার ব্যবহার করা হয়। দ্বিতীয়ত, মহাবিশ্বের স্ফীত হবার হারকে পরিমাপ করা এবং বিগ ব্যাং-কে ফিরে দেখা।

মহাবিশ্বের বয়স তার ভেতরে থাকা বস্তুর তুলনায় অবশ্যই কম হতে পারে না। প্রথমত বিজ্ঞানীগণ প্রবীণতম তারকার বয়স নির্ণয় করার মাধ্যমে মহাবিশ্বের বয়স কত হতে পারে তার একটি সময়সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছেন। তারকার জীবনচক্র মূলত তার ভরের উপর নির্ভর করে। যে তারকার ভর যত বেশী সেটি তত তাড়াতাড়ি জ্বলে নিঃশেষ হয়। যেমন, সূর্যের চেয়ে দশগুণ ভর বিশিষ্ট কোন তারকা নিঃশেষ হতে ২০ মিলিয়ন বছর সময় নিবে যখন সুর্যের তুলনায় অর্ধেক ভর বিশিষ্ট কোন তারকা ২০ বিলিয়ন বছরেরও অধিক বেঁচে থাকবে। ভর শুধু জীবনচক্রেই নয়, ঔজ্জ্বল্যতেও প্রভাব ফেলে। বৃহদাকার তারকাগুলো বেশী উজ্জ্বল হয়ে থাকে।

ডেভিড সোবরাল, যিনি লিসবন বিশ্ববিদ্যালয়, পর্তুগাল-এর একজন অ্যাস্ট্রোনোমার; বলেছেন, “যে তারকাগুলো সর্বপ্রথম ভারী পরমাণু দ্বারা গঠিত হয়েছিল সেগুলোই আমাদের এই পর্যায়ে এনেছে”। ডেভিড সোবলার এবং তাঁর দলের সদস্যগণ গবেষণা করে উজ্জ্বল ছায়াপথ চিহ্নিত করেছেন এবং পপুলেশন-৩ (Population III) তারকারাজির প্রমাণও পেয়েছেন। "Population III" ছিল শুরুর দিককার বৃহদায়কার তারকারাজি যাদের জীবনকাল ছিল সংক্ষিপ্ত। এই তারকাগুলো শুধুমাত্র হাইড্রোজেন এবং  হিলিয়াম দিয়েই পূর্ণ ছিল। কিন্তু ফিউশনের মাধ্যমে তারা পরবর্তী প্রজন্মের তারকা তৈরি হবার উপাদান দিয়ে গিয়েছিল।











শুধু প্রথমদিককার তারকারাজিই নয়, গ্লোবিউলার ক্লাস্টারও একই রকম ধর্ম দেখিয়েছিল মহাবিশ্বের বয়সের সময়সীমা নির্ধারণ করতে। গ্লোবিউলার ক্লাস্টার হচ্ছে তারকারাজির ঘনসমষ্টি। মাধ্যাকর্ষণের দ্বারা দৃঢ়ভাবে আবদ্ধ থাকবার কারণে এরা আকৃতিতে গোলাকার হয় এবং কেন্দ্রের দিকে তুলনামূলক বেশী ঘনত্ব থাকে। সবচেয়ে প্রাচীন গ্লোবিউলার ক্লাস্টারের সন্ধান বিজ্ঞানীরা পেয়েছেন যার বয়সসীমা ১১-১৪ বিলিয়ন বছরের মধ্যে। আর্কিওলজিস্টগণ যেভাবে ফসিল থেকে পৃথিবীর ইতিহাস আবিষ্কার করে থাকে সেভাবেই অ্যাস্ট্রোনোমারগণও গ্লোবিউলার ক্লাস্টার থেকে ছায়াপথের ইতিহাসকে বের করে আনেন। মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি বা আকাশগঙ্গা ছায়াপথে মাত্র ১৫০ টি গ্লোবিউলার ক্লাস্টার রয়েছে বলে জানা গিয়েছে। তাই প্রতিটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক ছায়াপথসংক্রান্ত চক্র এবং গ্যালাক্সির গঠন সম্পর্কে জানতে। এসব থেকে সিদ্ধান্তে আসা যায় যে, মহাবিশ্বের বয়স ১১ বিলিয়ন বছর থেকে অন্তত কম নয়, খানিক বেশিই।  



Photo: Globular Clusters. Source: eso.org

এবার আসুন আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতার তত্ত্বে ঢুঁ মেরে আসি। সময় আপেক্ষিক, মাধ্যাকর্ষণ যত শক্তিশালী হবে সময় তত ধীর হবে। সাধারণ আপেক্ষিকতার তত্ত্বে বলা হয়েছে, পৃথিবী থেকে ভর বেশী এরকম বস্তুর সাপেক্ষে সময় ধীরে চলে। আইনস্টাইন থেকে আমরা আরোও জানতে পারি সময়ের হার  ত্বরণ এবং মাধ্যাকর্ষণের উপর নির্ভরশীল। সেজন্য সময়ের তারতম্য দেখা যায়। এক্ষেত্রে মুসলিম বিশ্বাসানুযায়ী বেহেশত এবং দোযখ দুটোই পৃথিবীর তুলনায় বড় এবং বৃহদায়কার কিন্তু আল্লাহর কুরসী থেকে অনেক ছোট। তাই আপেক্ষিকতার সাধারণ সূত্রানুযায়ী বেহেশত এবং দোযখের সময় পৃথিবীর তুলনায় অনেক ধীর যেহেতু সময় অধিক শক্তিশালী মাধ্যাকর্ষণ ক্ষেত্রে ধীরে চলে। এ সম্পর্কিত আয়াতও আমরা পাই আল্লাহর বাণী হতে,

“আর তারা তোমাকে আযাব ত্বরান্বিত করতে বলে, অথচ আল্লাহ কখনো তাঁর ওয়াদা ভঙ্গ করেন না। আর নিশ্চয়ই তোমার রবের নিকট এক দিন তোমাদের গণনায় হাজার বছরের সমান” । (সুরা আল-হাজ্জ্ব, ২২: ৪৭) ।

এখানে, স্পষ্টত দেখাই যাচ্ছে, সময় পৃথিবীতে দ্রুত পরিবাহিত হয় দোযখ কিংবা বেহেশতের তুলনায়। সাধারণ আপেক্ষিকতার তত্ত্বেও আমরা পেয়েছিলাম, সময় ধীরে চলে অধিক ভরের বস্তুর সাপেক্ষে। যেহেতু বেহেশত এবং দোযখ পৃথিবীর ভরের তুলনায় অধিক ভর বিশিষ্ট, তাই এখানে উভয় পক্ষ থেকেই আমরা একই সমাধানে আসতে পারি।








আমাদের পৃথিবী আনুমানিক ৪.৫৪ বিলিয়ন বছর বয়স্ক এবং সৌরজগৎ ৪.৫৭ বিলিয়ন বছর বয়স্ক। পৃথিবীতে প্রাপ্ত সবচেয়ে পুরাতনতম পাথরকে রেডিওমেট্রিক্যালি ডেট করে হিসাবটি নির্ণয় করা হয়েছে। এক্ষেত্রে সংখ্যাটি পঞ্চাশ মিলিয়ন বছর কম-বেশীও হতে পারে। অতএব পৃথিবীর বৃদ্ধি, সূর্য এবং আমাদের প্রতিবেশী গ্রহগুলির সাথে একই সাথে ৪.৫৭ বিলিয়ন বছর পূর্বে শুরু হয়েছিল। কুরআনে এসেছে,

“নিশ্চয়ই তোমার রব আসমানসমূহ এবং যমীন ছয়দিনে সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর আরশে উঠেছেন। তিনি রাতকে দিন দ্বারা ঢেকে দেন। প্রত্যেকটি একে অপরকে দ্রুত অনুসরণ করে। আর সৃষ্টি করেছেন সূর্য, চাঁদ এবং তারকারাজি, যা তাঁর নির্দেশে নিয়োজিত। জেনে রাখ, সৃষ্টি এবং নির্দেশ তাঁরই। আল্লাহ মহান, তিনি সকল সৃষ্টির রব”। (সূরা আল আ’রাফ, ০৭:৫৪)।

অপর একটি আয়াতে এসেছে,

 “বল, তোমরা কি তাকে অস্বীকার করবে যিনি দুইদিনে যমীন সৃষ্টি করেছেন? আর তোমরা কি তাঁর সমকক্ষ বানাতে চাচ্ছ? তিনিই সৃষ্টিকুলের রব”। (সূরা হামীম আস সাজদাহ, ৫০: ৩৮)।

দুইটি আয়াত থেকে দেখতে পাই মহাবিশ্ব ছয়দিনে এবং পৃথিবী দুইদিনে সৃষ্টি করা হয়েছে। অর্থাৎ পৃথিবী সৃষ্টিতে মহাবিশ্বের তিনভাগের একভাগ সময় লেগেছে। আবার বলা যায় এ হিসাবগুলো আল্লাহর কুরসীর সাপেক্ষে। অতএব যখন মহাবিশ্বের সবকিছুর বয়স ছয়দিন ছিল তখন পৃথিবীর বয়স ছিল দুইদিন। তারমানে চলে আসা সময় ধরে মহাবিশ্বের বয়সের সাথে পৃথিবীর বয়সের এক ধরণের অনুপাতিক সম্পর্ক রয়েছে। এখানে আল্লাহর কুরসী বলতে এটি বুঝায় না যে আল্লাহ এই কুরসীতেই উপবিষ্ট হন। বরং এটি আল্লাহই তৈরি করেছেন এবং একটি উদাহরণ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। কুরআনের ভাষ্যনুযায়ী এই কুরসী মহাবিশ্ব থেকেও প্রশস্ত। এখানে বুঝাই যাচ্ছে ভরের হিসাবেও এটি বিশালতর হবে। আল্লাহর কুরসী পৃথিবী থেকে অনেক অনেক বৃহদায়কার, তাই সেখানে সময়ও অনেক ধীরেই চলবে। আবার আল্লাহ যখন বলেছেন তিনি সবকিছু ছয়দিনের মাঝেই সৃষ্টি করেছেন তারমানে সেটি অস্তিত্বের সময়কালও নির্দেশ করে। অতএব বুঝা গেল পৃথিবীর অস্তিত্বও ছয়দিনের মাঝে দুইদিন। অর্থাৎ যদি মহাবিশ্ব ছয় বছর আগে সৃষ্টি হয় তবে পৃথিবী সৃষ্টি হয়েছে তার চার বছর পরে। মানে পৃথিবীর বয়স তাহলে দুই। এখান থেকে এটিও প্রমান হয় যে মহাবিশ্বের বয়স পৃথিবীর বয়সের তিনগুণ হবে।

আবার আধুনিক বিজ্ঞানে ফিরে আসি। বিজ্ঞানীগণ সম্প্রতি মহাবিশ্বের একটি বয়স নির্ধারণ করেছেন। গবেষণার বিষয়বস্তু হিসেবে তাঁরা নিয়েছিলেন মহাবিশ্বের প্রবীণতম আলোর ছবিকে। এই আলো যা মূলত “আফটার গ্লো অব দ্যা বিগ ব্যাং” অথবা “কসমিক মাইক্রোওয়েভ ব্যাকগ্রাউন্ড রেডিয়েশন” নামে পরিচিত। এই কসমিক মাইক্রোওয়েভ ব্যাকগ্রাউন্ড এক ধরণের বিকিরণ যা মহাবিশ্ব জুড়ে প্রবাহিত হয়েছে। এটি বিগ ব্যাং এর ৩৮০,০০০ বছর পরের সময়কে নির্দেশ করে যখন প্রোটন এবং ইলেক্ট্রন একত্র হয়ে পরমাণু গঠন করেছিল।


মহাবিশ্বের প্রবীণতম আলোর একাংশ। Source: ACT Collaboration.


আটাকামা কসমোলজি টেলিস্কোপ, যেটি চিলিতে অবস্থিত তার সহযোগীতায় বিজ্ঞানীগন নতুন কিছু আবিষ্কার করেছেন যার সাদৃশ্যতা রয়েছে প্রাচীন আলোর প্ল্যাংক স্যাটেলাইট কর্তৃক পরিমাপক তথ্যের সাথে। এই নতুন গবেষণা মহাবিশ্বের বয়স নিয়ে অ্যাস্ট্রোফিজিক্স কমিউনিটির সম্মুখে কিছু বিতর্কে আবার মশলা যুক্ত করেছে। প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে এসব নিয়ে কথা বলেছেন নতুন গবেষণাপত্রটির মূল লেখক সিমনে আইওলা। তিনি আরোও যুক্ত করেন, “এখন আমরা একটি সমাধান নিয়ে এসেছি যা প্ল্যাংক স্যাটেলাইট এবং আটাকামা কসমোলজি টেলিস্কোপকে এক সুতায় গেঁথেছে। এবং এই সমাধানটি জটিল পরিমাপগুলোকে যথাযোগ্য, বিশ্বস্ত করেছে”। সিমনে আইওলা ফ্ল্যাটিরন ইনস্টিটিউটস সেন্টার ফর কম্পিউটেশনাল অ্যাস্ট্রোফিজিক্স, নিউইয়র্ক সিটির একজন গবেষক। এই গবেষণা টিমটি ছিল একটি আন্তর্জাতিক সহযোগীতা কার্যক্রম যেখানে সাতটি দেশ থেকে একচল্লিশ জন গবেষক কাজ করেছেন।

এখনো আমাদের জানা বাকি এই গবেষণার ফলাফল কি। গবেষণার ফল হচ্ছে মহাবিশ্বের বর্তমান বয়স ১৩.৮ বিলিয়ন বছর।

মহাবিশ্বের ঘনত্ব এবং গঠন সম্পর্কে জানার জন্য বিজ্ঞানীগণ আরোও কিছু মিশন চালিয়েছিলেন। যেমন, নাসার “উইলকিনসন মাইক্রোওয়েভ এনিসোট্রপি প্রোব” (WMAP) এবং ইউরোপিয়ান মহাকাশ সংস্থার “প্ল্যাংক স্পেসক্রাফট”। বিগব্যাং থেকে অবশিষ্ট থাকা তাপীয় বিকিরণ পরিমাপ করে বিজ্ঞানীগণ মহাবিশ্বের ঘনত্ব, গঠন এবং সম্প্রসারণ হার নিয়ে ধারণা লাভ করেন। এই অবশিষ্ট থাকা তাপীয় বিকিরণকে বলে “কসমিক মাইক্রোওয়েভ ব্যাকগ্রাউন্ড”। উপরোক্ত দুটি মিশনই এই কসমিক মাইক্রোওয়েভ ব্যাকগ্রাউন্ডকে বিশদভাবে বর্ণনা করতে পেরেছিল। নাসার স্পিৎজার স্পেস টেলিস্কোপ হাবল ধ্রুবকের অনিশ্চয়তা হ্রাস করে মহাবিশ্বের বয়স নির্ণয়ে অবদান রেখেছে। WMAP পরিমাপের সাথে মিলে বিজ্ঞানীরা ডার্ক এনার্জির টানের গণনা করতে সক্ষম হন। সংক্ষেপে, ডার্ক ম্যাটার আকর্ষণ করে, ডার্ক এনার্জি প্রতিহত করে। যখন ডার্ক ম্যাটার পদার্থকে ভিতরে টেনে নিয়ে যায়, তখন ডার্ক এনার্জি এটিকে বাইরের দিকে ঠেলে দেয়। এছাড়াও, যখন ডার্ক এনার্জি শুধুমাত্র বৃহত্তম কসমিক স্কেলে নিজেকে দেখায়, ডার্ক ম্যাটার স্বতন্ত্র ছায়াপথ এবং মহাবিশ্বের উপর তার প্রভাব প্রয়োগ করে। ডার্ক এনার্জিই হচ্ছে মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের কারণ।

নাসার মিশনটি ২০১২ সালে ধারণা করে মহাবিশ্বের বয়স ১৩.৭৭২ বিলিয়ন বছর হতে পারে। ২০১৩ সালে স্পেসক্রাফট পরিমাপ করে বের করে যে সংখ্যাটি হবে ১৩.৮২ বিলিয়ন বছর। 

আবার আমরা পূর্বের আলোচনায় ফেরত যাব। কুরআনের ভাষার দিকে যদি তাকাই, দেখতে পেয়েছিলাম পৃথিবীর বয়স মহাবিশ্বের তিনভাগের একভাগ। যেহেতু পৃথিবীর আনুমানিক বয়স ৪.৫৪ বিলিয়ন বছর, অতএব এর তিনগুণ করলেই আমরা মহাবিশ্বের বয়সের কাছাকাছি একটা সংখ্যা পাবই। এবং আমরা সেটি পেয়েও যাই। (৪.৫৪৩x০৩ = ১৩.৬২৯) । অতএব বক্তব্যগুলো নিয়ে সন্দেহের কোন অবকাশই থাকে না।

সমাপনীঃ

সময় আপেক্ষিক। এটি নিয়ে কোন সন্দেহ নেই। ভিন্ন পর্যবেক্ষকের দৃষ্টিতে সময়ের মানও ভিন্ন হয়ে থাকে। ভর কম হলে সময় দ্রুত আবার অধিক ভর হলে সময় ধীরে বয়ে যায়। কুরআন আমাদের সামনে হিসাবগুলো অনুপাত আকারে প্রকাশ করেছে। অনুপাত ছাড়া অন্য কোন মাধ্যমে প্রকাশ করলে সেটা হয়ত সঠিক হত না বা কোন পর্যবেক্ষকের সাপেক্ষে সঠিক হলেও অন্য পর্যবেক্ষকের সাপেক্ষে তা মিথ্যা হত। কিন্তু অনুপাত যখন ১:৩ তখন সবার সাপেক্ষেই বিষয়টি সঠিক, যথার্থ হচ্ছে এবং হতে থাকবে।

তথ্যসূত্রঃ

1.         Al-Quran
2.      Tafsir Ibn Kathir
3.      Bengali translation: Bayaan Foundation
4.      The oldest surviving light reveals the universe's true age By Rafi Letzter - Staff Writer | Live Science
5.      How Old is the Universe? By Nola Taylor Redd | Space
6.      Study of big bang’s afterglow sheds light on the evolution of universe By Adrian Cho | Science | AAAS
7.      How Old Is Earth? - How Scientists Determine Its Age by Nola Taylor Redd | Space
8.      The age of the universe*Beckman Center, Mabel Spergel, David N Bolte, Michael Freedman, Wendy et al. 94,1997
9.      Dalrymple, G. B. (2001). The age of the Earth in the twentieth century: a problem (mostly) solved. Geological Society, London, Special Publications, 190(1), 205–221.
10.  The universe is 13.8 billion years old; scientists confirm by Doyle Rice | USA TODAY
11.  Age of Universe, Expanding Universe, Big Bang Crunch in Quran । Miracles of Quran
12.   Dark Energy vs. Dark Matter - HETDEX

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ